Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

হরিশ রানার জীবনযুদ্ধ শেষের কাছাকাছি, খাওয়া দাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ

বিশ্বের কিছু দেশে সক্রিয় ইচ্ছামৃত্যু আইনসম্মত, যেমন নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং লুক্সেমবার্গে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যু সম্ভব।

হরিশ রানা, গাজিয়াবাদের বাসিন্দা, যিনি গত ১৩ বছর ধরে কোমার গভীরে আচ্ছন্ন ছিলেন, বর্তমানে তাঁর জীবনের শেষ যাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ওয়ার্ডে শুয়ে থাকা হরিশের জীবনের এই শান্তিপূর্ণ এবং অন্তিম যাত্রা তার জন্য একটি কঠিন তবে স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পরিবার একসময় তাকে সুস্থ করার জন্য সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করেছিল, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং সময়ের কঠিন বাস্তবতা তাকে দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী করে রেখেছিল।

হরিশ রানার স্বেচ্ছামৃত্যু চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নির্দেশে, যেখানে আদালত পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যু বা লিভিং উইল সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করেছিল। ভারতীয় আইন অনুসারে, এ ধরনের মৃত্যুর জন্য সক্রিয় সহায়তা বা সরাসরি প্রাণঘাতী ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি নেই। তবে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে চিকিৎসকদের একটি দল ধীরে ধীরে তার জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা বন্ধ করতে শুরু করে, এবং হরিশ এখন নিজে থেকেই শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছেন।

একটি বিশাল আইনি এবং মানবিক সংগ্রামের পর, হরিশ এবং তার পরিবার এই যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর জন্য আবেদন করেছিলেন। এই প্রক্রিয়া অনুসারে, তাকে ভেন্টিলেটর এবং ফিডিং টিউব থেকে মুক্ত করা হয়েছে। মৃত্যুর পথটি ধীরে ধীরে আসছে, তবে চিকিৎসকরা তাকে মনস্তাত্ত্বিক শান্তি প্রদান এবং শারীরিক ব্যথা কমাতে বিশেষ ওষুধ দিয়ে সহায়তা করছেন।

১৩ বছরের যাত্রা

হরিশ রানা ২০১১ সালে একটি দুর্ঘটনার শিকার হন, যখন তিনি চতুর্থ তলা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। এর ফলস্বরূপ, তার মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডে স্থায়ী আঘাত লাগে, এবং তিনি স্থায়ী উদ্ভিজ্জ অবস্থায় PVS চলে যান, অর্থাৎ তার শারীরিক অবস্থা জীবিত থাকলেও তিনি পুরোপুরি অচেতন ছিলেন। ওই দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী ছিলেন এবং তাঁর বাবা মা তাকে সুস্থ করার জন্য তাদের সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করেন।

তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা তাকে সুস্থ করতে পারেনি। এই সময়ে, পরিবারটি বহুবার হিমশিম খেয়েছে এবং এক সময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাদের সন্তানকে এভাবে চলতে থাকা, শুধুমাত্র যন্ত্রের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা, আর সম্ভব নয়। তারা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন, যেখানে তারা হরিশের জন্য স্বেচ্ছামৃত্যু চাওয়ার আবেদন করেন।

অরুণা শানবাগের ঘটনা

ভারতে পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল অরুণা শানবাগের ঘটনা দিয়ে। অরুণা ৪২ বছর ধরে অচেতন অবস্থায় ছিলেন এবং ২০১১ সালে তার বন্ধু পিঙ্কি ভিরানি সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করেন। তার মামলার পর, সুপ্রিম কোর্ট পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যু অনুমোদন দেয় কিছু শর্ত সাপেক্ষে।

অরুণা শানবাগ ২০১৫ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তার মামলা দেশে লিভিং উইল এবং মর্যাদার সাথে মৃত্যুবরণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, যা পরবর্তীতে অন্যান্য মামলার জন্য আইনি পথ তৈরি করে।

কমন কজ বনাম ভারত সরকার

২০১৮ সালে, সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করে। আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে, মর্যাদার সাথে মৃত্যু সবার সাংবিধানিক অধিকার এবং এটি ২১ নং অনুচ্ছেদের অধীনে জীবনধারণের অধিকার হিসেবে গণ্য হবে। এই রায়ের মাধ্যমে 'লিভিং উইল' ধারণাটি আইনি স্বীকৃতি পায়।

হরিশ রানার মামলায় এই সিদ্ধান্তের নীতিগুলি প্রযোজ্য হয়েছিল, যেখানে তার মৃত্যুর সময় কোনো কৃত্রিম সহায়তার ব্যবস্থা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

news image
আরও খবর

বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি

বিশ্বজুড়ে ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে আইনগুলি আলাদা আলাদা। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং লুক্সেমবার্গের মতো কিছু দেশে সক্রিয় ইচ্ছামৃত্যু প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যু আইনসম্মত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজ্য এবং কলম্বিয়াতেও সহায়ক আত্মহত্যা অনুমোদিত। তবে ভারতে, কেবল পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুই আইনসম্মত, যার অর্থ হলো শুধুমাত্র জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলা যায়, সরাসরি প্রাণহানি করা নয়।

বিশ্বব্যাপী এই বিতর্কটি কেবল বেঁচে থাকার অধিকারকেই নয়, বরং যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর অধিকারকেও কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। ইচ্ছামৃত্যু বা লিভিং উইল সম্পর্কিত আইনগুলি বিভিন্ন দেশে আলাদা হলেও, মানবাধিকার, মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে এই বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হিসেবে উঠে আসছে।

এভাবে, হরিশ রানার মতো ব্যক্তিরা, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে বাস করছেন, তাদের জন্য এই ধরনের আইনি পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর মাধ্যমে তারা মর্যাদার সাথে মৃত্যুবরণের অধিকার প্রাপ্ত হচ্ছেন, যা আমাদের সমাজের আইনি ও মানবিক মানসিকতার পরিবর্তনকে তুলে ধরে।

হরিশ রানার মতো ব্যক্তিরা, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে বাস করছেন, তাদের জন্য ইচ্ছামৃত্যু বা লিভিং উইল সম্পর্কিত আইনি পরিবর্তনগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এই আইনি পরিবর্তনগুলির মাধ্যমে তারা মর্যাদার সাথে মৃত্যুবরণের অধিকার পাচ্ছেন, যা সমাজের আইনি এবং মানবিক মানসিকতার পরিবর্তনকে প্রকাশ করে। এটি একটি দীর্ঘ এবং প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন যা মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত আমাদের ধারণাগুলিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

এটা বিশ্বাস করা হতো যে, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জীবিত থাকা একটি মানুষকে কোনো কৃত্রিম সহায়তা ছাড়াই মরতে দেওয়া হয়নি। তবে বর্তমান যুগে, বিশেষ করে গত কয়েক দশকে, এই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে, মানুষ এখন বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবনধারণের জন্য যন্ত্রের সাহায্যে বেঁচে থাকতে পারে। তবে এটি অনেক সময় রোগীর জন্য শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণা বাড়িয়ে তোলে, এবং রোগী অথবা তার পরিবারের পক্ষ থেকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাওয়া এক ন্যায্য দাবি হয়ে দাঁড়ায়। এই অবস্থায়, ইচ্ছামৃত্যুর আইনি স্বীকৃতি মৃত্যুর পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কিত নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দেয়।

প্রথমে, মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিচার করা যেতে পারে। মর্যাদার সাথে মৃত্যুবরণ করা একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে দেখা উচিত, যা মৃত্যুর সময় মানুষকে সম্পূর্ণভাবে তার নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দেয়। যারা দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী বা কোমায় রয়েছেন, তাদের জন্য চিকিৎসা প্রযুক্তির সাহায্যে এক ধরনের জীবনধারণ সম্ভব হলেও, তা যদি তাদের দেহ এবং মনকে আরও বেশি যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে, তবে তারা নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে, তারা কীভাবে মরতে চান। এটি তাদের মর্যাদার প্রতি একটি সম্মান হিসেবে কাজ করে।

এছাড়াও, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতসহ অনেক দেশে, মৃত্যু সম্পর্কিত ধারণাগুলি এখনও প্রচলিত বিশ্বাস এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত। অনেক ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষের জীবন মরণ প্রক্রিয়া আল্লাহ বা ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত, এবং মৃত্যুর সময় কোনও মানুষের পছন্দ করা উচিত নয়। তবে এই ধারণার পরিবর্তন ঘটে যখন ব্যক্তি নিজের অধিকার এবং সিদ্ধান্তের উপর গুরুত্ব দেয়। এই পরিবর্তন একটি সুস্থ সমাজ এবং আইনের উন্নতির সূচনা।

এটা সত্যি যে, কিছু মানুষের জন্য, লিভিং উইল বা ইচ্ছামৃত্যু আইনের প্রয়োগ কষ্টকর হতে পারে, কারণ এটি মৃত্যুর একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া। তবে, আমাদের সমাজে মর্যাদা, দয়া, এবং মানবিকতার একটি দৃঢ় ভিত্তি থাকা উচিত। এভাবে, হরিশ রানা এবং তার মতো অন্যরা তাদের জীবনের শেষ অংশটি শান্তিপূর্ণভাবে এবং মর্যাদার সাথে কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন। এটি তাদের জন্য একটি বড় মানসিক মুক্তি, যা তাদের অতীতের যন্ত্রণা ও সংগ্রামকে এক ধরনের সমাপ্তি দেয়।

একই সঙ্গে, এটি আমাদের সমাজে মৃত্যু সম্পর্কিত একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে, যেখানে জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে একটি গঠনমূলক সংলাপ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে, আমরা মৃতের জন্য সঠিক সম্মান প্রদানের পাশাপাশি জীবিতদেরও তাদের ব্যক্তিগত অধিকার এবং মর্যাদাকে সম্মান জানাতে পারি। শেষ পর্যন্ত, মৃত্যুর অধিকার আমাদের সমাজে মানবাধিকার এবং স্বাধীনতার নতুন এক স্তর তৈরি করতে সহায়ক হবে, যা মানবিকতার বৃহত্তর দিকটি তুলে ধরে।

Preview image