বুধবার বিকেল থেকেই মহারাষ্ট্রের পুণের শিবনেরী দুর্গে শিবাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বাড়তে থাকে ভিড় সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় হাতি দরজা ও গণেশ দরজা দিয়ে একসঙ্গে প্রবেশের সময় হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কিতে আতঙ্ক ছড়ায়। আহত হন একাধিক দর্শনার্থী।
মহারাষ্ট্রের পুণে জেলার জুন্নর এলাকার ঐতিহাসিক শিবনেরী দুর্গ বুধবার পরিণত হয়েছিল এক বিশাল জনসমুদ্রে। ছত্রপতি ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ-এর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এ বছরও দুর্গ প্রাঙ্গণে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের আনাগোনা শুরু হলেও বিকেলের পর থেকেই ভিড় দ্রুত বাড়তে থাকে। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমান, কয়েক হাজার মানুষ ওই দিন দুর্গে উপস্থিত হয়েছিলেন—কেউ অনুষ্ঠান অংশ নিতে, কেউ বা ঐতিহাসিক স্থানটি ঘুরে দেখতে, আবার কেউ শুধুই শিবাজির জন্মভূমিতে শ্রদ্ধা জানাতে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বিকেল চারটার পর থেকেই হাতি দরজা ও গণেশ দরজার সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সন্ধ্যা নামতেই পরিস্থিতি জটিল আকার নেয়। দুর্গে প্রবেশের এই দুই পথ তুলনামূলক সঙ্কীর্ণ। একই সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢোকার চেষ্টা করায় প্রবেশপথে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়। অনেকেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে ভেবে তাড়াহুড়ো করছিলেন। ফলে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়, আর সেই ধাক্কাধাক্কির মধ্যেই কয়েকজন হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয় পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি।
চোখের সামনে মানুষ পড়ে যেতে দেখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভিড়ের চাপে পড়ে যাঁরা পড়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই মহিলা ও শিশু বলে জানা গিয়েছে। কেউ কেউ চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত ছুটে আসেন। তাঁরা পড়ে যাওয়া মানুষদের টেনে তোলেন এবং ভিড় সরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হুড়োহুড়ির মুহূর্তে পরিস্থিতি সামলানো সহজ ছিল না।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর কথায়, “লাইন ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। হঠাৎই পিছন দিক থেকে চাপ বাড়তে থাকে। একসঙ্গে অনেকেই ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। তখনই কয়েকজন পড়ে যান।”
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করে জুন্নর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। বেশির ভাগেরই চোট আঘাত সামান্য হলেও কয়েকজনের অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। প্রাথমিক চিকিৎসার পর কয়েকজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
শিবাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রতি বছরই শিবনেরী দুর্গে ব্যাপক জনসমাগম হয়। তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, এ বছর ভিড় ছিল প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি। সামাজিক মাধ্যমে আগাম প্রচার, বিভিন্ন সংগঠনের বিশেষ কর্মসূচি এবং ছুটির দিন পড়ায় মানুষ বেশি সংখ্যায় উপস্থিত হয়েছিলেন বলে অনুমান। ভিড়ের এই অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের হিমশিম খেতে হয়।
শিবনেরী দুর্গে উঠতে হলে একাধিক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয়। দুর্গে প্রবেশের জন্য মোট সাতটি দরজা রয়েছে, প্রতিটির আলাদা নাম ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। তবে গণেশ দরজা ও হাতি দরজাই প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই দুই পথই তুলনামূলক সঙ্কীর্ণ হওয়ায় একই সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢুকতে গেলে চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ঘটনার পর প্রশাসনের তরফে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যারিকেড বসানো হয় এবং প্রবেশ ও প্রস্থান আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কী কারণে আচমকা হুড়োহুড়ি শুরু হল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নেওয়া হচ্ছে।
শিবনেরী দুর্গ শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য নয়, এটি মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শিবাজি মহারাজের জন্মস্থান হিসেবেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ফলে জন্মজয়ন্তীর দিনে এখানে মানুষের আবেগ ও ভক্তি স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বাসের মাত্রা ছাড়ায়। সেই আবেগই কখনও কখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এ দিনের ঘটনাও যেন সেই সতর্কবার্তাই দিল।
পুণে জেলার জুন্নর এলাকার ঐতিহাসিক শিবনেরী দুর্গ-এ ছত্রপতি ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ-এর জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনের দিনে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল, তার পর থেকেই স্বাভাবিকভাবেই একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এত বড় জনসমাগমের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি কতটা ছিল? ভিড় নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি? সঙ্কীর্ণ প্রবেশপথে মানুষের চাপ সামাল দেওয়ার মতো পরিকাঠামো কি যথেষ্ট ছিল? এই সব প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, প্রতি বছরই জন্মজয়ন্তীতে বিপুল ভিড় হয়, ফলে প্রশাসনের পক্ষে আগাম আন্দাজ করা কঠিন ছিল না যে এ বারও কয়েক হাজার মানুষ আসতে পারেন। তাঁদের দাবি, আগাম অনলাইন বা অফলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হলে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি দর্শনার্থীকে একসঙ্গে প্রবেশ করতে দেওয়া হত না। তাতে হুড়োহুড়ির সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যেত। বিশেষ করে গণেশ দরজা ও হাতি দরজার মতো সঙ্কীর্ণ প্রবেশপথে ব্যাচভিত্তিক প্রবেশের ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হত বলে মনে করছেন অনেকে।
আরও একাংশের মত, পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক ও সিভিল ডিফেন্স কর্মী মোতায়েন করা গেলে ভিড়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আগাম সতর্কতা নেওয়া যেত। ভিড়ের চাপ বাড়তে শুরু করলেই সাময়িকভাবে প্রবেশ বন্ধ রেখে বেরোনোর পথ খুলে দেওয়া, অথবা বিকল্প দরজা ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া—এই ধরনের দ্রুত সিদ্ধান্ত হয়তো বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করতে পারত। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, লাইন ধীরে এগোলেও হঠাৎ পিছন থেকে চাপ তৈরি হয়েছিল। সেই মুহূর্তে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কর্মী সামনে ছিলেন না বলেই বিশৃঙ্খলা বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহাসিক স্থানে আয়োজিত বৃহৎ জনসমাগমের ক্ষেত্রে ‘ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ আলাদা করে তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। দুর্গের ভৌগোলিক গঠন, সিঁড়ির ঢাল, প্রবেশ ও প্রস্থান পথের প্রস্থ—সবকিছু মাথায় রেখে পূর্বপরিকল্পনা করতে হয়। শিবনেরী দুর্গে পৌঁছাতে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয় এবং দুর্গে প্রবেশের একাধিক দরজা থাকলেও সবগুলি সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলে মানুষের স্রোত নির্দিষ্ট কয়েকটি দরজায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে ভবিষ্যতে আলাদা ‘এন্ট্রি’ ও ‘এক্সিট’ লেন চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।
প্রশাসন সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের অনুষ্ঠানে আরও কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে। প্রবেশপথে শক্ত ব্যারিকেড, দিকনির্দেশক বোর্ড, লাউডস্পিকারের মাধ্যমে নিয়মিত ঘোষণা এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে। প্রয়োজন হলে ড্রোন নজরদারির ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। ভিড়ের ঘনত্ব নির্ধারণে প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
শুধু প্রশাসনিক প্রস্তুতি নয়, জনসচেতনতার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসবের আবেগে অনেক সময় মানুষ ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু সঙ্কীর্ণ বা উঁচু-নিচু স্থানে তাড়াহুড়ো করা বিপজ্জনক। তাই বড় অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া যেতে পারে—ধাক্কাধাক্কি না করা, লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, শিশু ও বয়স্কদের আলাদা সহায়তা দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে।
এ ছাড়া, নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক স্লট করে দর্শনার্থীদের প্রবেশের ব্যবস্থা করা গেলে ভিড় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। যেমন সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা—এই তিন ভাগে ভাগ করে আলাদা আলাদা সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। তাতে একসঙ্গে অতিরিক্ত মানুষের চাপ পড়বে না।
জুন্নর এলাকার বাসিন্দাদের মতে, শিবনেরী দুর্গ শুধুমাত্র একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি আবেগের জায়গা। তাই এখানে আয়োজিত যে কোনও অনুষ্ঠানে মানুষের ভিড় হবেই। সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েই পরিকল্পনা করা উচিত। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলছেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকলে দর্শনার্থীদের আস্থা বাড়ে এবং ভবিষ্যতে পর্যটনও বাড়ে।
ঘটনার পর আহতদের দ্রুত চিকিৎসা ও উদ্ধারকাজে প্রশাসনের তৎপরতার প্রশংসা করেছেন অনেকে। তবে একই সঙ্গে তাঁদের দাবি, কেবল ঘটনার পর ব্যবস্থা নয়—আগাম প্রস্তুতিই আসল চাবিকাঠি। কারণ একবার ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
শিবাজি জন্মজয়ন্তীর মতো ঐতিহাসিক ও আবেগঘন দিনে এমন বিশৃঙ্খলা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। সৌভাগ্যবশত বড় কোনও প্রাণহানি ঘটেনি, তবে বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং আতঙ্কের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিল—বৃহৎ জনসমাগমের ক্ষেত্রে ভিড় ব্যবস্থাপনা কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়, এটি জীবনরক্ষার প্রশ্ন।
ভবিষ্যতে আরও সুসংগঠিত পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশিক্ষিত কর্মী মোতায়েন এবং জনসচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এমন পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে প্রশাসন—সবাই এখন একবাক্যে বলছেন, আবেগের উৎসব হোক নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করার পাশাপাশি সকলের প্রত্যাশা—আগামী দিনে যাতে শিবনেরী দুর্গে কেবল উৎসবের আনন্দই ধ্বনিত হয়, আতঙ্কের স্মৃতি নয়।