Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

হাড়হিম রাতের পথদুর্ঘটনা: শ্মশানযাত্রীদের বহনকারী বাস উল্টে খালে, ট্রাকের ধাক্কায় মৃতের স্তূপ

ঘন কুয়াশা আর নিয়ন্ত্রণ হারানো গতির জেরে ভয়াবহ পথদুর্ঘটনা। শ্মশানযাত্রীদের বহনকারী বাস খালে উল্টে পড়ে, পেছন থেকে ট্রাকের ধাক্কায় একাধিক প্রাণহানি। ঘটনাস্থলে শোক ও আতঙ্কের আবহ।

ভোররাতের নিস্তব্ধতা সাধারণত শান্তির প্রতীক। চারপাশ নিঃশব্দ, আকাশে আলো-অন্ধকারের মিশেল, প্রকৃতি যেন নতুন দিনের প্রস্তুতির মুহূর্তে। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতাকেই ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে হঠাৎ নেমে আসে এক ভয়ংকর আতঙ্ক। ঘন কুয়াশার সাদা পর্দায় ঢাকা জাতীয় সড়কে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক পথদুর্ঘটনা, যা মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। শ্মশানযাত্রীদের বহনকারী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের গভীর খালে উল্টে পড়ে। আর ঠিক সেই সময় পেছন দিক থেকে ছুটে আসা একটি ভারী ট্রাক বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বদলে যায় বহু মানুষের জীবন, ভেঙে পড়ে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন।

শ্মশানযাত্রীদের এই মর্মান্তিক পরিণতি গোটা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। যাঁরা কয়েক ঘণ্টা আগেও একসঙ্গে বসে প্রিয়জনের স্মৃতিচারণ করছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারলেন না। একের পর এক নিথর দেহ সারিবদ্ধভাবে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় মানুষও নির্বাক হয়ে যান। এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়।

দুর্ঘটনার জেরে জাতীয় সড়কে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যানজট তৈরি হয়। পুলিশ দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাস ও ট্রাক সরিয়ে রাস্তা স্বাভাবিক করার কাজ শুরু করে। পাশাপাশি গোটা ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসছে, ঘন কুয়াশা, অতিরিক্ত গতি এবং রাতের সময় পর্যাপ্ত সতর্কতার অভাব—এই তিনের সম্মিলিত ফলেই এত বড় বিপর্যয় ঘটেছে।

কুয়াশার দাপট আর অদৃশ্য বিপদ

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি অনুযায়ী, দুর্ঘটনার আগের কয়েক ঘণ্টা ধরেই ওই এলাকায় কুয়াশার দাপট ছিল চরমে। রাত নামার পর থেকেই ধীরে ধীরে ঘন হতে থাকে কুয়াশা। ভোরের দিকে দৃশ্যমানতা নেমে আসে কয়েক ফুটে। রাস্তার দিকচিহ্ন, বাঁক, সাইনবোর্ড—সবকিছুই যেন কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে যানবাহন চালানো যে কতটা বিপজ্জনক, তা বারবার প্রশাসনের তরফে জানানো হলেও বাস্তবে বহু চালক সেই সতর্কতা মানেন না।

এই ঘটনার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাসচালক সামনের বাঁক ও রাস্তার প্রান্ত ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেননি। কুয়াশার কারণে দূরের কোনও আলো কিংবা প্রতিফলক চোখে পড়ছিল না। ফলস্বরূপ বাসটি প্রথমে হালকা দুলে ওঠে। যাত্রীরা প্রথমে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তাছাড়া হয়ে যায় এবং পাশের গভীর খালে উল্টে পড়ে।

শ্মশানযাত্রীদের যাত্রা, যা শেষ হল মৃত্যুমিছিলে

এই বাসের যাত্রীদের অধিকাংশই ছিলেন শ্মশানযাত্রী। কেউ বাবা-মাকে, কেউ ভাই-বোনকে, কেউ আবার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে শেষ বিদায় জানাতে যাচ্ছিলেন। শোক আর নীরব কান্নায় ভরা ছিল বাসের পরিবেশ। কেউ চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, কেউ চোখ বুজে প্রার্থনায় মগ্ন, কেউ আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনকে সামলানোর চেষ্টা করছিলেন।

অনেক যাত্রী গভীর রাতে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের কল্পনাতেও ছিল না, যে এই যাত্রা শেষ হবে এমন বিভীষিকায়। আচমকা বাস উল্টে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার, কান্না আর সাহায্যের আর্তনাদে ভরে ওঠে চারপাশ। কেউ আসনের নিচে চাপা পড়েন, কেউ জানালার কাচে আছড়ে পড়েন, কেউ আবার একে অপরের উপর পড়ে আটকে যান।

দ্বিতীয় ধাক্কা: ট্রাকের সজোরে আঘাত

বাস খালে উল্টে পড়ার পরও হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এখানেই শেষ হয়নি। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে পেছন দিক থেকে আসা একটি ভারী ট্রাক বাসটিকে দেখতে না পেয়ে সজোরে ধাক্কা মারে। এই দ্বিতীয় আঘাতেই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

ট্রাকের ধাক্কায় বাসের একটি বড় অংশ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। লোহার কাঠামো বেঁকে যায়, আসনগুলো উপড়ে যায়, জানালার কাচ ছিটকে পড়ে চারদিকে। অনেক যাত্রী তখন বাসের ভিতরে আটকে পড়েন। কারও হাত বেরিয়ে ছিল জানালার ফাঁক দিয়ে, কারও পা চাপা পড়ে যায় ভারী লোহার নিচে। কেউ অচেতন হয়ে পড়েন, কেউ তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন।

উদ্ধারকাজ: সময়ের সঙ্গে লড়াই

দুর্ঘটনার বিকট শব্দে আশপাশের গ্রামের মানুষজন প্রথমে ছুটে আসেন। ঘন কুয়াশা, অন্ধকার আর আতঙ্কের মধ্যেও তাঁরা মানবিকতার পরিচয় দেন। কেউ খালে নেমে পড়েন, কেউ বাসের কাচ ভাঙার চেষ্টা করেন, কেউ আবার আহতদের টেনে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত আলো, যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণের অভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করতেই দেরি হয়ে যায়।

পরে খবর পেয়ে পুলিশ ও দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। ক্রেন, কাটার ও আলো ব্যবহার করে ধীরে ধীরে বাসের ভিতর থেকে একে একে যাত্রীদের বের করে আনা হয়। আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠানো হয়। অনেকের শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, কেউ নিথর হয়ে পড়েছিলেন, কেউ আবার শেষ নিঃশ্বাস নিতে নিতে প্রিয়জনের নাম ডাকছিলেন।

news image
আরও খবর

মৃত্যুর হিসাব আর হাসপাতালের কান্না

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহতের সংখ্যাও কম নয়। বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তখন হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনেরা কেউ নাম ধরে ডাকছেন, কেউ ডাক্তারদের কাছে আকুতি করছেন, কেউ আবার নিথর দেহের পাশে বসে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। যাঁরা প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানাতে বেরিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারলেন না—এই বাস্তবতা যেন বিশ্বাস করতেই পারছেন না পরিবারের সদস্যরা।

শোকস্তব্ধ এলাকা, স্তব্ধ সমাজ

এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা এলাকা শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। স্থানীয় মানুষজন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, যে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। যাঁদের সঙ্গে গতকালও কথা হয়েছে, যাঁদের সঙ্গে চা খাওয়া হয়েছে, আজ তাঁরা আর নেই—এই ভাবনাই সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়।

শ্মশানযাত্রীদের এই মর্মান্তিক পরিণতি যেন শোকের উপর শোক চাপিয়ে দেয়। একদিকে আগেই ছিল মৃত্যুর বেদনা, তার উপর এই দুর্ঘটনা এনে দেয় আরও গভীর ক্ষত। বহু পরিবার একসঙ্গে একাধিক সদস্যকে হারিয়ে ফেলেছে। শিশু, বৃদ্ধ, যুবক—কেউই রেহাই পাননি।

যান চলাচল ব্যাহত, তদন্ত শুরু

দুর্ঘটনার পর জাতীয় সড়কে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক কিলোমিটার জুড়ে তৈরি হয় যানজট। পুলিশ দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাস ও ট্রাক সরিয়ে রাস্তা স্বাভাবিক করার কাজ শুরু করে। একই সঙ্গে গোটা ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসছে, ঘন কুয়াশা, অতিরিক্ত গতি এবং রাতের সময় পর্যাপ্ত সতর্কতার অভাব—এই তিনের সম্মিলিত ফলেই এত বড় বিপর্যয় ঘটেছে। বাস ও ট্রাক চালকের ভূমিকা, গাড়ির যান্ত্রিক অবস্থা, রাস্তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বারবার সতর্কতা, তবু কেন একই ঘটনা?

এই দুর্ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় রাতের বেলা যান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। প্রশাসনের তরফে আগেও বারবার সতর্কতা জারি করা হয়েছে—কুয়াশার সময় গতি কমানো, হেডলাইট ব্যবহার, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, প্রয়োজনে যান চলাচল সীমিত করা। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রেই এই নির্দেশিকা মানা হয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কুয়াশার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাই শুধু চালকদের সতর্কতা নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত সাইনেজ, রিফ্লেক্টর, স্ট্রিট লাইট এবং নিয়মিত নজরদারি। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত জরুরি।

শেষ কথা: এক বিভীষিকা, এক শিক্ষা

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই হাড়হিম পথদুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি। এটি ভেঙে দিয়েছে বহু পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ আর বেঁচে থাকার ভরসা। শোকস্তব্ধ এলাকাবাসী ও নিহতদের পরিবার এখন একটাই দাবি তুলছেন—যাতে এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য দ্রুত, কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক প্রশাসন।

এই মর্মান্তিক ঘটনা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এক মুহূর্তের অসতর্কতা কত বড় মূল্য চুকিয়ে দিতে পারে। কুয়াশা, রাত আর গতির সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে সচেতনতা আর দায়িত্ববোধের কোনও বিকল্প নেই। না হলে এমন ট্র্যাজেডি বারবার ফিরে আসবে, আর আমরা শুধু শোক প্রকাশ করেই থেমে থাকব।

Preview image