ডিজিসিএর নতুন নিয়ম অনুযায়ী ব্রেদালাইজারে অ্যালকোহলের মাত্রা ০.০০১ থেকে ০.০০৯ ধরা পড়লেও পাইলটদের আর সঙ্গে সঙ্গে সাসপেন্ড করা হবে না ২৪ ঘণ্টার বিরতির পর শর্তসাপেক্ষে ফের ডিউটিতে ফেরার সুযোগ মিলবে।
ভারতের বিমান পরিবহণ ব্যবস্থায় পাইলটদের দায়িত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয় একটি ছোট ভুলও যেখানে বহু মানুষের জীবনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে সেই কারণে পাইলটদের ক্ষেত্রে শারীরিক মানসিক সক্ষমতা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে বরাবরই কড়া নিয়ম মেনে চলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি বিশেষ করে মদ্যপান সংক্রান্ত বিষয়ে এতদিন কোনও রকম ছাড় দেওয়া হয়নি প্রি ফ্লাইট ব্রেদালাইজার পরীক্ষায় সামান্যতম অ্যালকোহলের উপস্থিতি ধরা পড়লেই বড় শাস্তির মুখে পড়তে হত পাইলটদের
এর আগে নিয়ম ছিল উড়ানের আগে ব্রেদালাইজার পরীক্ষায় রিপোর্ট পজিটিভ এলেই পাইলটকে তিন মাসের জন্য ফ্লাইট ডিউটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হত এমনকি যদি মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য এক মাত্রাও ধরা পড়ত তবুও সেটিকে পজিটিভ হিসেবেই গণ্য করা হত এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে অনিচ্ছাকৃত বা অত্যন্ত সামান্য মাত্রার অ্যালকোহলের উপস্থিতির জন্যও পাইলটদের দীর্ঘ সময় কাজ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে দ্বিতীয়বার এই ধরনের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হত তখন সংশ্লিষ্ট পাইলটের লাইসেন্স পর্যন্ত তিন বছরের জন্য বাতিল করে দেওয়া হত ফলে পেশাগত জীবনে তৈরি হত বড় অনিশ্চয়তা
এই প্রেক্ষাপটেই এবার কিছুটা বাস্তবসম্মত অবস্থান নিতে চলেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন ডিজিসিএ নতুন নিয়মে জানানো হয়েছে ব্রেদালাইজার পরীক্ষায় যদি শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য এক থেকে শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য নয় পর্যন্ত রিডিং আসে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে পাইলটকে সাসপেন্ড করা হবে না এই ক্ষেত্রে তাঁকে ২৪ ঘণ্টার বিশ্রাম নিতে হবে এবং তার পরে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আবার ডিউটিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে
তবে এই ছাড় কোনওভাবেই সবার জন্য নয় এই সুযোগ শুধুমাত্র সেই পাইলটদের জন্য যাঁরা প্রথমবার এই ধরনের ঘটনায় ধরা পড়ছেন অর্থাৎ যাঁদের বিরুদ্ধে আগে কখনও মদ্যপান সংক্রান্ত নিয়ম ভাঙার কোনও রেকর্ড নেই তাঁদের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে যদি আগে এমন কোনও ঘটনা থেকে থাকে তাহলে আগের মতোই কঠোর শাস্তি কার্যকর হবে এবং সেই ক্ষেত্রে তিন বছরের জন্য লাইসেন্স বাতিলের নিয়ম বহাল থাকবে
এই নতুন নিয়মের পিছনে শুধু পাইলটদের স্বস্তি দেওয়ার বিষয়টিই নয় বরং দেশের বিমান সংস্থাগুলির বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে সম্প্রতি পাইলটদের বিশ্রাম সংক্রান্ত ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশন বা এফডিটিএল নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর থেকেই সমস্যায় পড়েছে একাধিক এয়ারলাইন্স নতুন নিয়ম অনুযায়ী পাইলটদের বেশি সময় বিশ্রাম দিতে হচ্ছে ফলে আগের মতো ঘনঘন ফ্লাইট শিডিউল করা সম্ভব হচ্ছে না
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিমান সংস্থাগুলির অপারেশনাল পরিকল্পনায় অনেক ক্ষেত্রে ফ্লাইট বাতিল বা পুনর্নির্ধারণ করতে হচ্ছে শুধু পর্যাপ্ত পাইলট না থাকার কারণে নতুন পাইলট নিয়োগ করতে গিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সংস্থাগুলিকে প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে লাইসেন্সিং সব মিলিয়ে প্রতিটি নতুন পাইলট তৈরি করতে সময় ও অর্থ দুইই লাগছে
এই পরিস্থিতিতে যদি কোনও পাইলট সামান্য ব্রেদালাইজার রিডিংয়ের কারণে তিন মাসের জন্য কাজের বাইরে চলে যান তাহলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে একদিকে ফ্লাইট পরিচালনায় সমস্যা অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতি সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে এয়ারলাইন্সগুলির উপর সেই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞের মতে নতুন মদ্যপান সংক্রান্ত নিয়ম আসলে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য আগের নিয়মে সামান্য প্রযুক্তিগত বা পরিবেশগত কারণে ব্রেদালাইজারে অতি কম মাত্রার অ্যালকোহল ধরা পড়লেও পাইলটকে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হত কিন্তু বাস্তবে সেই মাত্রা কোনওভাবেই উড়ান নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তৈরি করত না বর্তমান নিয়মে সেই বাস্তবতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তবে একই সঙ্গে শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনও আপস করা হয়নি
নতুন নিয়মে এখনও পরিষ্কার করে বলা রয়েছে যে ইচ্ছাকৃত মদ্যপান বা নিয়ম ভাঙার কোনও প্রমাণ পাওয়া গেলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে প্রথমবারের সুযোগ শুধুমাত্র সামান্য রিডিংয়ের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ এবং সেটিও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা হয়েছে শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য নয় এর বেশি হলেই আগের মতোই পজিটিভ হিসেবে ধরা হবে
এই পরিবর্তনকে অনেক পাইলট স্বস্তির নিঃশ্বাস হিসেবে দেখছেন অতীতে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে যেখানে সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অনেক পরে বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ব্রেদালাইজারে সামান্য রিডিং ধরা পড়েছিল আর তার জেরে দীর্ঘদিন কাজ হারাতে হয়েছিল এবার সেই ধরনের পরিস্থিতিতে অন্তত সম্পূর্ণভাবে পেশাগত ক্ষতির মুখে পড়তে হবে না বলে মনে করছেন তাঁরা
অন্যদিকে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে কোনও রকম আপস করা হচ্ছে কি না সেই প্রশ্নও উঠছে তবে বিশেষজ্ঞদের মতে নতুন নিয়মে এখনও নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে কারণ ২৪ ঘণ্টার বাধ্যতামূলক বিরতি রাখা হয়েছে এবং পুনরায় ডিউটিতে ফেরার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অনুমতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে
সব মিলিয়ে বলা যায় মদ্যপান সংক্রান্ত এই নতুন নিয়ম একদিকে যেমন পাইলটদের জন্য মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে তেমনই অন্যদিকে দেশের বিমান সংস্থাগুলির উপর বাড়তে থাকা চাপ কিছুটা হলেও কমাতে সাহায্য করবে এফডিটিএল নিয়মের কারণে যেখানে অপারেশনাল সংকট তৈরি হয়েছে সেখানে এই সামান্য ছাড় কার্যত একটি বড় স্বস্তি হিসেবেই দেখা হচ্ছে
আগামী দিনে এই নিয়ম বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং তা উড়ান নিরাপত্তা ও এয়ারলাইন্স পরিচালনার উপর কতটা প্রভাব ফেলে সেদিকেই নজর থাকবে সকলের তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি যে পাইলট ও বিমান সংস্থা উভয়ের কাছেই কিছুটা হলেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে তা বলাই যায়
আগামী দিনে এই নিয়ম কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োগ কতটা স্বচ্ছ ও কঠোর হয় তার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে বিশেষ করে উড়ান নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনও রকম ঢিলেমি বা গাফিলতির জায়গা নেই বলে মত বিশেষজ্ঞদের নিয়মে কিছুটা ছাড় দেওয়া হলেও নজরদারি ও পরীক্ষা পদ্ধতি যাতে আরও শক্তিশালী করা হয় সেই দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে
এই নতুন ব্যবস্থায় ব্রেদালাইজার পরীক্ষার প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে অনেক সময় পরিবেশগত কারণ যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন বা নির্দিষ্ট খাবার ও ওষুধের প্রভাবে সামান্য রিডিং দেখা দিতে পারে ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের বিষয়গুলি আরও নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করা যায় সে জন্য আধুনিক যন্ত্র ও প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন হবে
এয়ারলাইন্সগুলির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে প্রতিটি ঘটনায় আলাদা করে যাচাই বিশ্রামের সময় নির্ধারণ এবং পুনরায় ডিউটিতে ফেরানোর আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমতি নিশ্চিত করতে হবে এতে প্রশাসনিক কাজের চাপ বাড়বে তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি সংস্থাগুলির জন্য লাভজনক হতে পারে কারণ অকারণে দীর্ঘ সময় পাইলটদের বসিয়ে রাখতে হবে না
যাত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বড় অংশের যাত্রী চান সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং কড়া নিয়ম আবার অন্য অংশের যাত্রী বুঝতে পারেন যে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত না নিলে গোটা বিমান পরিষেবা ব্যবস্থাই সংকটে পড়তে পারে তাই এই পরিবর্তন সম্পর্কে যাত্রীদের মধ্যে স্বচ্ছ তথ্য ও সচেতনতা তৈরি করাও প্রয়োজন
পাইলটদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম একদিকে যেমন স্বস্তি দিচ্ছে তেমনই দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে কারণ প্রথমবার সুযোগ পাওয়া মানে দ্বিতীয়বার কোনও ছাড় নেই এই বার্তাটিও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ফলে পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায় আরও বেশি করে এসে পড়ছে তাঁদের উপর
বিশেষজ্ঞদের মতে এই পরিবর্তন একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে দেখা যেতে পারে ভবিষ্যতে এফডিটিএল নিয়ম পাইলট প্রশিক্ষণ কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত নজরদারির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও সংস্কার আনা হতে পারে যাতে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা দুটির মধ্যেই ভারসাম্য বজায় থাকে
সব মিলিয়ে বলা যায় এই নতুন নিয়ম শুধু মদ্যপান সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা নয় বরং এটি ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহণ ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলিকে স্বীকার করে নেওয়ার একটি পদক্ষেপ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব স্পষ্ট হবে এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজন হলে আরও সংশোধন আনা হতে পারে আপাতত পাইলট ও এয়ারলাইন্স উভয়ের মধ্যেই যে কিছুটা হলেও স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে তা অস্বীকার করা যায় না