রানিকে ফুচকা খাওয়ানোর ইচ্ছা থাকলেও তা আর পূরণ হল না—এই আক্ষেপই ধরা পড়ল দেবশ্রী রায়ের কথায়।
বোনঝির জন্য মাসির দিন—কলকাতায় রানি মুখোপাধ্যায়, আবেগে ভরল দেবশ্রী রায়ের সকাল
কলকাতার সকালটা অন্যরকমই ছিল দেবশ্রী রায়ের কাছে। শহরে এসেছেন তাঁর আদরের বোনঝি—বলিউড অভিনেত্রী রানি মুখোপাধ্যায়। কাজের ব্যস্ততা যতই থাকুক না কেন, এই দিনটা ছিল একান্তই মাসি আর বোনঝির। গ্ল্যামার, ক্যামেরার ঝলক, শুটিংয়ের সময়সূচি—সবকিছুকে ছাপিয়ে সেই চিরচেনা আত্মীয়তার উষ্ণতায় ভরে উঠেছিল তাঁদের সময়টা। রানি শহরে পা রেখেই দেবশ্রী তাঁকে নিয়ে ছুটলেন কালীঘাটের মায়ের কাছে পুজো দিতে। আর সেখান থেকেই শুরু হল গল্প, স্মৃতি আর না-পাওয়ার একরাশ আক্ষেপ।
কালীঘাটে পুজো—নতুন শুরু আর পুরনো বিশ্বাস
দেবশ্রী জানালেন, “২০২৫ সালটা খুব একটা ভাল যায়নি। তাই পুজো দিতে গিয়েছিলাম।” কথার মধ্যে ধরা পড়ল বিশ্বাসের জায়গা, যেখান থেকে নতুন করে শুরু করার শক্তি পাওয়া যায়। রানি অবশ্য শহরে এসেছেন কাজের প্রয়োজনে। শুটিংয়ের ব্যস্ততা, মিটিং, নানা প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে সময় ছিল কম। তবু মাসির আবদার ফেলতে পারেননি। কলকাতায় পা রাখার পর প্রথমেই কালীঘাটে গিয়ে মায়ের কাছে প্রণাম। দেবশ্রী বলেন, “ওর কাজের খুব চাপ। তাই পুজোর পরেই গাড়ি ঘুরিয়ে হোটেলে চলে এলাম।”
এই কথার মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা—ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করে নেওয়া, একে অপরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া। কালীঘাটের মন্দিরে মা কালীর সামনে দাঁড়িয়ে দু’জনেই যেন একটু শান্তি খুঁজে পেলেন। দেবশ্রীর মতে, “পুজো দিলে মনে হয়, সব সমস্যার সমাধান হবে। অন্তত মনটা হালকা হয়।”
ফুচকার স্বপ্ন অধরাই—আক্ষেপ দেবশ্রীর গলায়
মাসির একটাই ইচ্ছে ছিল—রানিকে ফুচকা খাওয়াবেন। কলকাতায় এলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া যেন এক ধরনের রীতি। দেবশ্রী নিজেই সেই পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সময়ের অভাবে সেটাও হল না। আক্ষেপের সুরেই তিনি বললেন, “ভাঁড়ে চা খাওয়ার ইচ্ছা ছিল, সেটাও হল না।” কলকাতার চায়ের দোকান, আড্ডা, ফুটপাথের খাবার—এই ছোট ছোট আনন্দগুলোই তো শহরের প্রাণ। কিন্তু রানি এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, এসবের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ হল না।
তবে দেবশ্রী জানালেন, এই আক্ষেপ সাময়িক। রানি কথা দিয়েছেন, মার্চ মাসে আবার কলকাতায় আসবেন। তখন তাঁর সব পছন্দের খাবার সাজিয়ে রাখবেন মাসি। “ও বলেছে মার্চে এসে তেলাপিয়া মাছের ঝোল খাবে আর ফুচকা খাবে।” দেবশ্রীর চোখে তখন যেন ভবিষ্যতের আনন্দের ঝিলিক। কলকাতার রান্নাঘরের গন্ধ, মাছের ঝোলের স্বাদ, আর ফুচকার ঝাল-মিষ্টি চাট—সব মিলিয়ে বোনঝিকে নিয়ে কাটানো এক নিখুঁত দিনের স্বপ্ন আঁকছেন তিনি।
ছোটবেলার স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া
রানিকে দেখলেই দেবশ্রীর মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও স্মৃতির সেই মুহূর্তগুলো এখনও অমলিন। দেবশ্রী বললেন, “ছোটবেলায় রানি যা কাঁদত! ভাবতেই পারিনি বড় হয়ে এমন এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবে ও।” আজকের রানি মুখোপাধ্যায়—আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী, সফল প্রযোজনা সংস্থার মুখ, অসংখ্য পুরস্কারের অধিকারী—এই মানুষটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে একসময় কাঁদত, আবদার করত, আর পরিবারের সবাইকে ব্যস্ত করে রাখত।
দেবশ্রী আরও যোগ করলেন, “রানি যখন ছোট, আমিও তখন বাচ্চা। সবাই ওকে কোলে নিত, সেটা দেখে আমারও ইচ্ছা হত।” এই কথাগুলো যেন একেবারে ঘরোয়া, চেনা অনুভূতির গল্প। পরিবারে নতুন সদস্য এলে যেমন সবাই তাকে ঘিরে থাকে, তেমনই ছোট রানি ছিলেন পরিবারের আদরের কেন্দ্রবিন্দু। দেবশ্রীও তখন নিজেই তরুণী, আর বোনঝিকে নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
মুম্বইয়ের দিনগুলো—হাত ধরে ঘোরা, দিদির বকুনি
দেবশ্রী স্মৃতিচারণায় বললেন, “মুম্বইয়ে গেলে ওর হাত টেনে টেনে নিয়ে আমি ঘুরতাম। আর দিদি বকত আমাকে, ‘ওর হাত যে খুলে যাবে।’” এই ছোট্ট ঘটনা যেন তাঁদের সম্পর্কের রসায়নটা বোঝায়। একদিকে মাসির আদুরে টান, অন্যদিকে মায়ের উদ্বেগ—সব মিলিয়ে পরিবারের সেই চিরন্তন দৃশ্যপট। মুম্বইয়ের রাস্তায় হাত ধরে হাঁটা, দোকান দেখানো, গল্প করা—এইসব ছোট মুহূর্তই আজ বড় স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
আজ যখন দেবশ্রী রানিকে দেখেন, তখন সেই ছোট্ট মেয়েটির ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। সময় বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে, খ্যাতির আকাশ ছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছেছেন রানি—তবু মাসির চোখে তিনি এখনও সেই আদরের বোনঝি।
ঝুমার কথা মনে পড়ে—একটু মনখারাপ
এই সাক্ষাতে দেবশ্রীর কণ্ঠে যেমন ছিল আনন্দ, তেমনই ছিল এক চিলতে মনখারাপ। তিনি বলেন, “আজ একটু মনখারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, ঝুমা থাকলে আমাদের সঙ্গে ও-ও যেত।” এই কথার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক ধরনের শূন্যতা। পরিবারে কেউ না থাকলে বা প্রিয়জন হারালে, বিশেষ মুহূর্তগুলোতে তাঁদের অনুপস্থিতি আরও বেশি করে অনুভূত হয়। দেবশ্রীর কথায় সেই অনুভূতির প্রতিফলন স্পষ্ট।
এই মনখারাপ অবশ্য মুহূর্তের। কারণ, সামনে রয়েছে আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি। মার্চ মাসে রানি কলকাতায় ফিরবেন—এই আশাই দেবশ্রীর মনকে আবার উজ্জ্বল করে তুলেছে।
রানি মুখোপাধ্যায়—শহরের মেয়ের কলকাতায় ফেরা
রানি মুখোপাধ্যায় কলকাতার মেয়ে। তাঁর শিকড় এই শহরেই। যদিও কর্মজীবনের সূত্রে তিনি মুম্বইয়ে থাকেন, তবু কলকাতার প্রতি তাঁর টান কখনও কমেনি। কালীঘাটে পুজো দেওয়া, ফুচকার স্বপ্ন দেখা, মাছের ঝোলের কথা বলা—এই সবই তাঁর শহরের সঙ্গে অটুট সম্পর্কের প্রমাণ।
দেবশ্রী রায়ের কথায় ধরা পড়ল সেই আত্মীয়তার উষ্ণতা, যা শুধুই রক্তের সম্পর্ক নয়, বরং স্মৃতি, অভিজ্ঞতা আর ভালোবাসার বন্ধন। বলিউডের উজ্জ্বল আলোয় থাকা এক তারকা আর টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী—দু’জনের সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটাই পরিচয়: মাসি আর বোনঝি।
তারকাদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত—গ্ল্যামারের আড়ালে মানুষ
এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল তারকাদের গ্ল্যামারের আড়ালে থাকা মানুষটাকে দেখা। ক্যামেরার সামনে তাঁরা যেমন আলাদা জগতে থাকেন, ঠিক তেমনই পরিবারের সঙ্গে তাঁরা একেবারে সাধারণ মানুষ। দেবশ্রী রানিকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কোথাও তাঁর স্টারডমের কথা তোলেননি। তিনি বলেছেন তাঁর কাঁদা, তাঁর আবদার, তাঁর ছোটবেলার গল্প। এইসবই বোঝায়, সম্পর্কের জায়গায় খ্যাতির কোনও ভূমিকা নেই।
রানিও যে এত ব্যস্ততার মাঝেও মাসির সঙ্গে সময় কাটাতে চেয়েছেন, কালীঘাটে পুজো দিতে গিয়েছেন—এই বিষয়গুলো তাঁর পারিবারিক মূল্যবোধের পরিচয় দেয়। বলিউডের তারকা হয়েও তিনি সেই চেনা পরিবারের মেয়েটাই রয়ে গেছেন।
মার্চের অপেক্ষা—ফুচকা, তেলাপিয়া আর ভাঁড়ে চা
এই সাক্ষাতের শেষটা যেন এক প্রতিশ্রুতির সুরে বাঁধা। মার্চ মাসে আবার কলকাতায় আসবেন রানি। তখন দেবশ্রী তাঁর জন্য সাজিয়ে রাখবেন সব পছন্দের খাবার। ফুচকা, তেলাপিয়া মাছের ঝোল, ভাঁড়ে চা—এই সবই যেন আগামী দিনের আনন্দের প্রতীক।
দেবশ্রী বলেন, “মার্চে আবার কলকাতায় আসবে রানি। তখন বোনঝির সব পছন্দের জিনিস সাজিয়ে রাখব।” এই কথায় রয়েছে অপেক্ষার উষ্ণতা, ভবিষ্যতের আনন্দের ছবি। মাসি-বোনঝির সম্পর্কের এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই জীবনের বড় সুখ।
কলকাতার আত্মা আর পরিবারের বন্ধন
এই পুরো ঘটনাটির মধ্যে দিয়ে উঠে আসে কলকাতার আত্মা—খাবার, আড্ডা, পুজো, সম্পর্কের উষ্ণতা। রানি মুখোপাধ্যায় শহরে এলেই যেন আবার সেই কলকাতার মেয়েটা হয়ে ওঠেন। আর দেবশ্রী রায় তাঁর মাসির ভূমিকায় ফিরে যান—যিনি বোনঝিকে আদর করেন, তাঁর জন্য রান্না করতে চান, তাঁর সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
এই গল্প শুধুই দুই তারকার সাক্ষাৎ নয়। এটি এক পরিবারের গল্প, এক সম্পর্কের গল্প, যেখানে ভালোবাসা, স্মৃতি আর ভবিষ্যতের অপেক্ষা একসঙ্গে মিশে গেছে।
উপসংহার—তারকাদের জীবনের ঘরোয়া মুহূর্ত
বোনঝি এসেছে শহরে—এই একটি বাক্যেই যেন সব আবেগ ধরা পড়ে। দেবশ্রী রায়ের সকাল থেকে ব্যস্ত হয়ে ওঠা, কালীঘাটে পুজো দেওয়া, ফুচকা না খেতে পারার আক্ষেপ, ছোটবেলার স্মৃতি, ঝুমার কথা মনে পড়া—সব মিলিয়ে এই গল্প একেবারে হৃদয়ের কাছের।
রানি মুখোপাধ্যায় যতই বলিউডের বড় তারকা হন না কেন, মাসির চোখে তিনি সেই ছোট্ট রানি, যে কাঁদত, হাত ধরে ঘুরত, আর মাছের ঝোল আর ফুচকার স্বপ্ন দেখত। আর দেবশ্রী রায় যতই জনপ্রিয় অভিনেত্রী হন না কেন, বোনঝির কাছে তিনি সেই আদরের মাসি, যিনি তাঁর জন্য সব সময় কিছু না কিছু সাজিয়ে রাখেন।
মার্চের অপেক্ষা এখন দু’জনেরই। তখন হয়তো আবার কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া হবে, বাড়িতে রান্না হবে তেলাপিয়া মাছের ঝোল, আর মাসি-বোনঝির সেই চেনা হাসি আবার ফিরবে।