নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকা সত্ত্বেও কেন অন্যত্র রক্তের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে? স্বাস্থ্য দফতরের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে আসছে, নিয়মিত রক্তদান শিবির আয়োজন এবং পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহে ঘাটতিই এর অন্যতম কারণ। রোগীদের যাতে জরুরি সময়ে রক্তের জন্য অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের মুখাপেক্ষী হতে না হয়, সেই লক্ষ্যেই হাসপাতালগুলিকে নিজেদের রক্তের জোগান আরও শক্তিশালী করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বেসরকারি হাসপাতালে নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, সেই ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসাধীন রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলে অনেক সময় তাঁদের পরিজনদের অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কে ছুটতে হচ্ছে। শুধু বিরল রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রেই যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা নয়—সাধারণ রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রেও অন্যত্র গিয়ে রক্ত সংগ্রহ করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। এই পরিস্থিতির বদল ঘটাতে এবার বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে নিজেদের রক্তের জোগানের ক্ষেত্রে আরও ‘স্বনির্ভর’ হওয়ার বার্তা দিল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের নিয়ন্ত্রণাধীন রক্ত সঞ্চালন পর্ষদ।
স্বাস্থ্য দফতরের তরফে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে মূলত বেসরকারি হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির সক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকা সত্ত্বেও যদি নিয়মিতভাবে অন্য ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে কাঙ্ক্ষিত বলে মনে করছে না স্বাস্থ্য দফতর। রোগী ভর্তি হওয়ার পর তাঁর প্রয়োজনীয় রক্ত ও রক্তজাত উপাদান যাতে হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাতেই যতটা সম্ভব নিশ্চিত করা যায়, সেই লক্ষ্যেই একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য দফতরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বেসরকারি হাসপাতালগুলির নিজস্ব উদ্যোগে রক্তদান শিবিরের সংখ্যা কম হওয়া কিংবা পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহ না হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের সময় রক্তের জোগানে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে চিকিৎসাধীন রোগীর পরিজনদের অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কে গিয়ে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ধরনের পরিস্থিতি রোগী ও তাঁর পরিবারের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। তাই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় রক্তের জোগান নিশ্চিত করতে নিজেদের ব্লাড ব্যাঙ্কের পরিকাঠামো ও রক্তের মজুত ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকার অন্যতম উদ্দেশ্য হল সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও রক্তজাত উপাদান সরবরাহ করা। কিন্তু বাস্তবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনের সময় হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্কে পর্যাপ্ত রক্ত না থাকায় রোগীর পরিজনদের অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে অপারেশন, দুর্ঘটনা, প্রসবকালীন জটিলতা কিংবা গুরুতর অসুস্থতার মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত রক্তের প্রয়োজন হলে এই নির্ভরতা সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশিকায় তাই রোগীর সংখ্যা এবং হাসপাতালের পরিষেবার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যাপ্ত রক্ত ও রক্তজাত উপাদান মজুত রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্ককে শুধুমাত্র নামমাত্র পরিষেবা হিসেবে না রেখে রোগীদের বাস্তব প্রয়োজন মেটানোর মতো সক্ষম করে তোলার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রক্তের জোগান ঠিক রাখতে নিয়মিত রক্তদান শিবির আয়োজনকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তদান শিবির আয়োজনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্কে পর্যাপ্ত রক্তের মজুত তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে রক্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। রক্তদান শিবিরের মাধ্যমে সংগৃহীত রক্ত যেন ‘বিনিময়হীন’ রক্তদান হয়, তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ রক্তদানের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কোনও সুবিধা বা প্রত্যক্ষ প্রতিদান দেওয়ার পরিবর্তে স্বেচ্ছায় রক্তদানের ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রক্তের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে নিয়মিত রক্তদান শিবির আয়োজন করা হলে হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্তের মজুত বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি, কোন রক্তের গ্রুপের চাহিদা বেশি এবং কোন রক্তজাত উপাদানের প্রয়োজন তুলনামূলক বেশি—সেই অনুযায়ী সংগ্রহ ও মজুতের পরিকল্পনাও করা যেতে পারে।
রক্ত সঞ্চালন পর্ষদের নির্দেশিকায় মূলত পাঁচটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যাপ্ত রক্ত ও রক্তজাত উপাদান সংক্রান্ত পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা যদি বেশি হয়, তাহলে সেই অনুযায়ী ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্তের মজুত এবং পরিষেবার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিয়ম মেনে নিয়মিত রক্তদান শিবির আয়োজনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। রক্তের চাহিদা পূরণের জন্য শুধুমাত্র অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের উপর নির্ভর না করে নিজেদের উদ্যোগে রক্ত সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, কোনও রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর রক্তের গ্রুপ এবং প্রয়োজনীয় রক্তজাত উপাদান যাতে পাওয়া যায়, তার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময়মতো রক্তের জোগান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
চতুর্থত, অন্য ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে নিয়মিত রক্ত সংগ্রহের প্রবণতা কমানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে কোনও নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপ বা উপাদানের ঘাটতি থাকলে। কিন্তু নিয়মিতভাবে অন্যত্র থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হলে হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্কের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই কারণেই নিজেদের ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চমত, রক্তের যথাযথ ব্যবহার এবং রক্ত মজুত রাখার জন্য হাসপাতালের বিভিন্ন চিকিৎসা বিভাগের সঙ্গে ব্লাড ব্যাঙ্কের সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কোন রোগীর কতটা রক্ত প্রয়োজন, কোন ক্ষেত্রে কোন রক্তজাত উপাদান প্রয়োজন এবং কতটা মজুত রাখা দরকার—এই বিষয়ে চিকিৎসা বিভাগ ও ব্লাড ব্যাঙ্কের মধ্যে সমন্বয় থাকলে রক্তের অপচয় কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজনের সময়ে জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।
রক্তের প্রয়োজন হলে রোগীর পরিজনদের অন্যত্র পাঠানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর চিকিৎসা চলাকালীন যদি হঠাৎ রক্তের প্রয়োজন হয়, তখন পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ব্লাড ব্যাঙ্কে যোগাযোগ করতে হয়। কোথাও রক্তের গ্রুপ মেলে কি না, কোথায় পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, কীভাবে দ্রুত রক্ত সংগ্রহ করা যাবে—এসব নিয়ে পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়তে হয়।
স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশিকার অন্যতম উদ্দেশ্য হল এই ধরনের পরিস্থিতি যতটা সম্ভব কমানো। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর প্রয়োজনীয় রক্তের জোগান হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা গেলে রোগীর পরিজনদের উপর চাপ কমতে পারে। একইসঙ্গে জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সময় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে বিরল রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনও রক্তের গ্রুপের চাহিদা থাকলেও যদি স্থানীয়ভাবে তার পর্যাপ্ত মজুত না থাকে, তাহলে অন্য ব্লাড ব্যাঙ্ক বা রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সাধারণ রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রেও যদি নিয়মিতভাবে অন্যত্র থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়, তাহলে হাসপাতালের নিজস্ব রক্ত সংগ্রহ ও মজুত ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে বলেই নির্দেশিকায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রক্তের জোগান শুধু ব্লাড ব্যাঙ্কের উপর নির্ভর করে না। হাসপাতালের বিভিন্ন চিকিৎসা বিভাগে প্রতিদিন কতজন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, কী ধরনের চিকিৎসা চলছে, কতগুলি অস্ত্রোপচার হচ্ছে এবং কোন ধরনের রক্তজাত উপাদানের চাহিদা তৈরি হচ্ছে—এই তথ্যগুলির সঙ্গে ব্লাড ব্যাঙ্কের পরিকল্পনার সমন্বয় থাকা জরুরি।
এই কারণেই নির্দেশিকায় হাসপাতালের চিকিৎসা বিভাগগুলির সঙ্গে ব্লাড ব্যাঙ্কের সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর ফলে আগাম রক্তের প্রয়োজন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রক্ত মজুত রেখে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও কমানো যেতে পারে।
রক্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সীমিত সম্পদ। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহার—তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা জরুরি। নির্দেশিকায় সেই ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
শুধু নির্দেশ দিয়েই বিষয়টি শেষ করা হয়নি। বেসরকারি হাসপাতালগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে রক্ত সঞ্চালন পর্ষদ। অর্থাৎ কোনও হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক পরিচালনা, রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা পরিষেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
এর ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলির ব্লাড ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে রক্তের গুণমান, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তজাত উপাদান সরবরাহের ক্ষেত্রেও উন্নতি আনার চেষ্টা করা যেতে পারে।
তবে স্বাস্থ্য দফতরের এই বিজ্ঞপ্তিকে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অনেকের বক্তব্য, এই নির্দেশিকার মাধ্যমে কার্যত স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে বেসরকারি হাসপাতালে নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকা সত্ত্বেও সাধারণ রক্তের গ্রুপের রক্ত পেতেও রোগীর পরিজনদের অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কে যেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, নির্দেশিকার উদ্দেশ্যকে অন্যভাবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ। তাঁদের মতে, হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ককে আরও কার্যকর করার জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ নির্দেশিকা প্রয়োজন ছিল। নিয়মিত রক্তদান শিবির, পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহ, সঠিক মজুত এবং চিকিৎসা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হাসপাতালগুলিকে নিজেদের প্রয়োজনের একটি বড় অংশ মেটানোর মতো সক্ষম করে তোলাই এর লক্ষ্য।
এই বিতর্কের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—রোগীর প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত রক্ত পাওয়া নিশ্চিত করা চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাসপাতালের নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকলে সেই পরিকাঠামো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিরল রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রে অন্যত্র থেকে রক্ত সংগ্রহ করার প্রয়োজন অনেক সময় বাস্তব কারণেই তৈরি হতে পারে। কিন্তু সাধারণ রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রেও যদি রোগীর পরিবারকে নিয়মিত অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কে যেতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকা সত্ত্বেও সেখানে পর্যাপ্ত রক্ত কেন নেই?
স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশিকার মূল লক্ষ্যগুলির একটি হল এই প্রশ্নের সমাধান করা। হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা অনুযায়ী রক্তের চাহিদা নির্ধারণ, সেই অনুযায়ী রক্ত সংগ্রহ, নিয়মিত রক্তদান শিবির আয়োজন এবং পর্যাপ্ত মজুত রাখার ব্যবস্থা করা হলে এই ধরনের নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে বাস্তবে এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে হাসপাতালগুলির উদ্যোগ, রক্তদাতার অংশগ্রহণ, ব্লাড ব্যাঙ্কের পরিকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির উপর।
রক্ত সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি তার যথাযথ ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয়ভাবে রক্ত ব্যবহার না করা, প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট রক্তজাত উপাদান ব্যবহার করা এবং সঠিক তাপমাত্রায় রক্ত সংরক্ষণ করা—এসব বিষয়েও হাসপাতালগুলিকে সতর্ক থাকতে হয়।
এই কারণেই চিকিৎসা বিভাগের সঙ্গে ব্লাড ব্যাঙ্কের সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোনও রোগীর চিকিৎসায় ঠিক কী প্রয়োজন, কতটা প্রয়োজন এবং কখন প্রয়োজন—এই তথ্য আগে থেকে জানা গেলে রক্ত ব্যবস্থাপনাও আরও পরিকল্পিত হতে পারে।
একইসঙ্গে রক্তের মজুতের নিয়মিত পর্যালোচনা করলে কোন গ্রুপের রক্ত কমে যাচ্ছে এবং কোন উপাদানের চাহিদা বাড়ছে, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। সেই অনুযায়ী রক্তদান শিবিরের পরিকল্পনাও করা যেতে পারে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে ‘স্বনির্ভর’ হওয়ার বার্তা দেওয়া হলেও এই নির্দেশ বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালগুলি নিয়মিত রক্তদান শিবির আয়োজন করছে কি না, পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহ করছে কি না, রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত মজুত রাখছে কি না এবং অপ্রয়োজনে অন্য ব্লাড ব্যাঙ্কের উপর নির্ভর করছে কি না—এসব বিষয় ভবিষ্যতে নজরে আসতে পারে।
রক্তের জোগান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হাসপাতাল, ব্লাড ব্যাঙ্ক, চিকিৎসক, রক্তদাতা এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পরিকাঠামো থাকলেই হবে না, প্রয়োজনের সময়ে সেই পরিকাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বেসরকারি হাসপাতালে নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ক থাকা সত্ত্বেও রোগীর পরিজনদের অন্যত্র রক্তের জন্য পাঠানোর অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য দফতরের এই নির্দেশিকা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিয়মিত রক্তদান শিবির, পর্যাপ্ত রক্ত সংগ্রহ, সঠিক সংরক্ষণ এবং হাসপাতালের চিকিৎসা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজস্ব ব্লাড ব্যাঙ্ককে আরও শক্তিশালী করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই নির্দেশিকার ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে রক্তের জোগান কতটা শক্তিশালী হয় এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের রক্তের প্রয়োজন মেটাতে তাঁদের পরিজনদের অন্যত্র ছুটে বেড়ানোর পরিস্থিতি কতটা কমে।