Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রামায়ণ প্রস্তুতির মাঝেই আমিষের থালা? রণবীরকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

রণবীর কাপুরকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে একটি ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে, যেখানে তাঁকে পরিবারের সঙ্গে বসে মাছ ও পাঁঠার মাংস খেতে দেখা যায়। নিতেশ তিওয়ারির বৃহৎ প্রকল্প রামায়ণ এ ভগবান রামের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তিনি নাকি আমিষ খাবার পরিহার করছেন এমন দাবি আগেই ছড়িয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি এই খবরগুলি ভ্রান্ত ছিল? অনেকেই বলছেন ভিডিওটি পুরনো, আবার অনেকে দাবি করছেন এটি বর্তমান। সত্যতা যাচাই না করেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নৈতিকতার বন্যা বইছে। রণবীরের পক্ষ থেকে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া না আসায় জল্পনা আরও ঘনিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবন ও তাঁর চরিত্রের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার কারণেই এই বিতর্ক এত বড় হয়েছে।

বলিউডে রণবীর কাপুরের জনপ্রিয়তা এমন এক স্তরে পৌঁছেছে, যেখানে তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি মন্তব্য, এমনকি প্রতিটি অভ্যাসও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। অভিনয়ের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, চরিত্রে ডুবে যাওয়ার ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের সৌম্য আচরণের জন্য তিনি বরাবরই বেশ প্রশংসিত। বিশেষ করে যখন থেকে জানা গেল যে নিতেশ তিওয়ারি পরিচালিত ‘রামায়ণ’ সিনেমায় তিনি ভগবান রামের চরিত্রে অভিনয় করবেন, তখন থেকেই তাঁর ওপর নজর বেড়ে গেছে বহুগুণ। কারণ ভারতীয় দর্শকের কাছে ‘রামায়ণ’ শুধু একটি গল্প নয়; এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং আবেগঘন পরিচয়। ফলে এই চরিত্রে অভিনয়কারী অভিনেতার প্রতিটি পদক্ষেপই আরও বেশি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। ঠিক সেই কারণেই সম্প্রতি একটি ভিডিও ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক, যা রণবীর কাপুরকে আবার খবরের শিরোনামে এনেছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, রণবীর পরিবারের সঙ্গে বসে খাচ্ছেন মাছ ও পাঁঠার মাংস। দৃশ্যটি প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, ‘রামায়ণ’-এর প্রস্তুতির জন্য নাকি তিনি দীর্ঘদিন ধরে আমিষ খাবার এড়িয়ে চলছেন—তাহলে এই ভিডিওর ব্যাখ্যা কী? অন্যদিকে অনেকেই দাবি করছেন ভিডিওটি পুরনো, কিন্তু তারিখ না জানা থাকায় বিতর্ক থামছেই না। আর এই বিভ্রান্তির মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া তৈরি করে ফেলেছে নিজস্ব তীব্র প্রতিক্রিয়া, যেখানে রণবীর কাপুর হয়ে উঠেছেন মোরাল পুলিশিংয়ের নতুন লক্ষ্য।

বলিউডে এ ধরনের বিতর্ক নতুন নয়, তবে রণবীরকে কেন্দ্র করে বিতর্কটি বিশেষভাবে অর্থবহ হয়ে উঠেছে কারণ তিনি এমন এক চরিত্রে অভিনয় করতে চলেছেন যাঁকে দেশের কোটি কোটি মানুষ শ্রদ্ধা করেন। সেই শ্রদ্ধা থেকেই অনেক দর্শকের মনে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, যেন পর্দায় রামের ভূমিকায় অভিনয় করতে হলে ব্যক্তিগত জীবনেও একই ধরনের সংযমী আচরণ পালন করা উচিত। এই প্রত্যাশাই ভিডিওটিকে ঘিরে বিতর্ককে আরও বাড়িয়েছে। যদিও রণবীর নিজে কখনও প্রকাশ্যে জানাননি যে তিনি পুরোপুরি নিরামিষভোজী হয়ে গেছেন, তবে তাঁর ডায়েট, চরিত্র প্রস্তুতি ও ‘রামায়ণ’–এর শুটিং নিয়ে প্রচারিত নানা প্রতিবেদনে ভক্তদের মনে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল যে তিনি নাকি পুরোপুরি নিরামিষ খাওয়া শুরু করেছেন। সেখান থেকেই ভিডিওটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই প্রশ্ন—তাহলে কি এসব প্রচার অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর ছিল?

সোশ্যাল মিডিয়ার গতিবেগ আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে একটি ভিডিও সামনে আসামাত্রই তা মুহূর্তে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কেউ সময় নিয়ে যাচাই করতে চান না, ভিডিওটি কবে তোলা, কোথায় তোলা, প্রেক্ষাপট কী—এসব প্রশ্ন গ্রাস করে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ঝড়। রণবীরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই মন্তব্যবক্সে ছুটে এসেছে একের পর এক নৈতিকতার পাঠ, কেউ বলছেন একজন আগামী ‘রামচন্দ্র’ আমিষ খাবেন কীভাবে, তো কেউ আবার বলছেন অভিনেতার ব্যক্তিগত খাবার-দাবার নিয়ে এত মাতামাতিরই বা কী দরকার? এই দুই মেরুর মধ্যে দাঁড়িয়ে চাপে পড়েছেন রণবীর কাপুর, যিনি হয়তো জানতেও পারেননি তাঁর পারিবারিক কোনও একটি সাধারণ মুহূর্ত এত বড় বিতর্ক ডেকে আনবে।

অনেক দর্শকই উল্লেখ করছেন, ভিডিওটি হয়তো পুরনো হতে পারে। পারিবারিক কোনও উৎসব বা অনুষ্ঠানের সময় এটি ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে, এরপর কোনও ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড হয়েছে। যদি সত্যিই এমন হয়, তবে পুরনো একটি ভিডিওকে এখনকার প্রেক্ষিতে ব্যবহার করা শুধু ভুলই নয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কেউই নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না। তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার রীতিতে সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনও যেন ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং আরও দ্রুত রাগ-ক্ষোভ প্রকাশই হয়ে উঠেছে নতুন স্বাভাবিক।

এত বিতর্কের মাঝেও রণবীরের পক্ষ থেকে বা তাঁর টিমের পক্ষ থেকেও এখনো কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ মনে করছেন এই নীরবতা কৌশলগত, কারণ তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মন্তব্য করলে তা আরও বড় আকার নিতে পারে। আবার অনেকে মনে করছেন, তাঁরা হয়তো পুরো ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। জনপ্রিয় অভিনেতাদের ক্ষেত্রে এটি নতুন নয়—অনেক সময়ে প্রতিক্রিয়া না দিলে বিতর্ক নিজে থেকেই থেমে যায়। তবে রণবীরের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কতটা জটিল হয়ে উঠবে, তা সময়ই বলবে।

বলিউডের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তারকারা প্রায়ই তাঁদের চরিত্রের প্রস্তুতির জন্য ডায়েট পরিবর্তন করেন, কড়া ব্যায়াম শুরু করেন, বা শরীরচর্চার রুটিন কঠোর করেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাঁরা তাঁদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অভ্যাস চিরকালের জন্য বদলে ফেলেন। কখনও কখনও মিডিয়া বিভিন্ন কারণেই এই পরিবর্তনগুলিকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করে, যা পরে সমস্যা তৈরি করে যখন ভক্তরা বাস্তবতা ও প্রচারের মধ্যে অমিল দেখতে পান। রণবীরের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

তারকাদের ব্যক্তিগত খাবার-দাবার নিয়ে সমালোচনা করার প্রবণতা শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের সব জায়গায় রয়েছে। তবে ভারতীয় দর্শক বিশেষত পৌরাণিক চরিত্রে অভিনয়কারী অভিনেতাদের ক্ষেত্রে আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন। কারণ ভারতীয় সংস্কৃতিতে পৌরাণিক চরিত্রের প্রতি আবেগপূর্ণ মনোভাব অত্যন্ত গভীর। অনেক দর্শক পর্দায় রামের চরিত্রে অভিনয় করা একজন অভিনেতাকে বাস্তব জীবনের মানদণ্ডেও সেই চরিত্রের প্রতীক হিসেবে দেখেন। এতে কখনও কখনও সমস্যা তৈরি হয়, কারণ অভিনেতা শেষ পর্যন্ত একজন সাধারণ মানুষই—যাঁর ব্যক্তিগত জীবনে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

news image
আরও খবর

অন্যদিকে, এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত ‘মোরাল পুলিশিং’-এর প্রবণতাকে। তারকাদের একটি ভিডিও দেখলেই তাঁদের বিচার করা, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মতামত দেওয়া, কিংবা তাঁদের জীবনযাপনকে প্রশ্নের মুখে ফেলা এখন সাধারণ আচরণে পরিণত হয়েছে। রণবীরের ক্ষেত্রে যেহেতু ‘রামায়ণ’ নামক একটি বিশাল সাংস্কৃতিক প্রকল্প যুক্ত, তাই বিতর্কটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত অভ্যাস কি তাঁর পেশাগত চরিত্রকে প্রভাবিত করে? বা করা উচিত? নাকি শুধু দর্শকের আবেগই তাঁকে এমন এক অবস্থানে দাঁড় করায় যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে হয়?

এখানে আরেকটি দিকও বিবেচনা করা জরুরি। বলিউডের প্রচার কৌশল বহু সময়ই তারকাদের নিয়ে নানা আকর্ষণীয় তথ্য ছড়িয়ে দেয়, যা ছবির প্রতি আগ্রহ বাড়ায়। দর্শক যখন শুনেছিলেন যে রণবীর রামের চরিত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সে কারণে হয়তো খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনছেন, তখন সেই খবরকেই অনেকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এটি আদৌ সত্য কি না, তা কখনও স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। ফলে ভুল বোঝাবুঝির জন্ম হয়েছে, যা পরে এসে দাঁড়িয়েছে আজকের এই বিতর্কের ভিত হিসেবে।

এদিকে, নিতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’ ইতিমধ্যেই বছরের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি। বিশাল বাজেট, নিখুঁত ভিজ্যুয়াল কারিগরি এবং চরিত্র নির্বাচন—সব মিলিয়ে এই ছবিকে ঘিরে প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। রামচন্দ্রের মতো এক চরিত্রে রণবীরের আগমনকেই দর্শক অনেকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখছেন। সেই সম্মানই বদলে যাচ্ছে সংবেদনশীল প্রত্যাশায়, যেখানে অভিনেতার প্রতিটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও দাঁড়াচ্ছে জনমতের কাঠগড়ায়। এই প্রেক্ষাপটই ভিডিওটিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

চলচ্চিত্র জগতে কাজ করার সময় অভিনেতাদের জীবনে একটি ‘দ্বৈত বাস্তবতা’ তৈরি হয়। একদিকে তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীন, অন্যদিকে দর্শকের প্রত্যাশার ভার তাঁদের ওপর প্রভাব ফেলে। রণবীর বর্তমানে সেই দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর একটি পারিবারিক দুপুরের খাবারও হয়ে গেছে জনসমালোচনার বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে আমরা কি একজন অভিনেতার উপর অযথা বেশি চাপ তৈরি করছি? তাঁরা কি সবসময় নিজেদের চরিত্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবনযাপন করবেন, নাকি তাঁদেরও নিজেদের মতো choices করার অধিকার রয়েছে?

এমন বিতর্কের মাঝেই উঠে আসে আরও বড় প্রশ্ন সোশ্যাল মিডিয়া কি আজকার দিনে বাস্তবের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে? এর মাধ্যমে সত্য যেমন ছড়ায়, তেমনই ছড়ায় ভুল তথ্যও। আর একজন জনপ্রিয় তারকার ক্ষেত্রে ভুল তথ্য ছড়ালে তা দ্রুতই রূপ নেয় তীব্র বিতর্কে। এই বিতর্কই আবার মানুষের মধ্যে অযথা আবেগ জন্ম দেয়, যা কখনও কখনও অপ্রয়োজনে কারও সুনামকে আঘাত করে।

এই পুরো ঘটনা থেকে স্পষ্ট একটি বিষয় সামনে আসে—ভারতীয় দর্শকের কাছে পৌরাণিক চরিত্রের গুরুত্ব অপরিসীম, এবং সেই গুরুত্ব অভিনেতাদের ক্ষেত্রেও কোনও না কোনওভাবে প্রতিফলিত হয়। রণবীর কাপুরের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটছে। তাঁর প্রতিটি আচরণ, অভ্যাস, এমনকি খাদ্যাভ্যাসও বিশেষ নজরে রাখা হচ্ছে কারণ তিনি অভিনয় করছেন রামের চরিত্রে। কিন্তু তিনি যে একজন অভিনেতা, এবং বাস্তব জীবনে তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে, সেই সরল সত্যটি অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ভিডিওটি সত্যি হোক বা পুরনো—এটি একটি বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তবে সেই বিতর্ক তুলে ধরছে সমাজের একটি প্রতিচ্ছবি। আমাদের প্রত্যাশা কখনও কখনও বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। রণবীর কাপুর একজন অভিনেতা; তাঁর কাজ চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলা। পর্দায় তিনি রামচন্দ্র হতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি একজন সাধারণ মানুষ—যাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত।

Preview image