অভিনেত্রী রুক্ষ্মিণী মৈত্রের সঙ্গে একটি ছবি ভাইরাল হতেই তাঁর স্ফীত মুখের কারণে নানা কটাক্ষ শুনতে হয়েছে এস্থেটিক স্পেশ্যালিস্ট সার্জন নৃপেন্দ্র গুহকে। এস্থেটিক সার্জারির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করলেন নৃপেন্দ্র।
সমাজমাধ্যমের যুগে একটি ছবি কখন যে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে, আর কখন সেটি কটাক্ষ ও ট্রোলের অস্ত্রে পরিণত হয়—তা বোঝা মুশকিল। সম্প্রতি ঠিক তেমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন এস্থেটিক স্পেশ্যালিস্ট সার্জন নৃপেন্দ্র গুহ। অভিনেত্রী রুক্ষ্মিণী মৈত্রের সঙ্গে তোলা একটি ছবি ভাইরাল হতেই, নৃপেন্দ্রের মুখের স্ফীত ভাব নিয়ে শুরু হয় নানা রকম কটাক্ষ, ব্যঙ্গ ও ব্যক্তিগত আক্রমণ। অথচ সেই ছবির আড়ালে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত—২৬ জানুয়ারি কলকাতায় তাঁর প্রথম এস্থেটিক ক্লিনিকের উদ্বোধন।
এই ঘটনার পর আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনায় বসেন নৃপেন্দ্র গুহ। এস্থেটিক সার্জারি, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে প্রচলিত ধারণা, সমাজমাধ্যমের বিচারসভা এবং সৌন্দর্যচর্চা নিয়ে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা—সবকিছু নিয়েই স্পষ্ট মত প্রকাশ করেন তিনি।
২৬ জানুয়ারি, কলকাতার একটি অভিজাত এলাকায় নৃপেন্দ্র গুহের প্রথম ক্লিনিকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুক্ষ্মিণী মৈত্র। স্বাভাবিকভাবেই সেই মুহূর্তের বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ক্লিনিকের উদ্বোধন বা নৃপেন্দ্রের দীর্ঘদিনের পেশাগত সাফল্যের বদলে, নেটিজেনদের একাংশের নজর গিয়ে পড়ে তাঁর মুখের দিকে।
ছবিতে নৃপেন্দ্রের মুখ কিছুটা স্ফীত দেখানোয়, শুরু হয় নানা ধরনের মন্তব্য—কেউ কটাক্ষ করেন, কেউ ব্যঙ্গ করেন, আবার কেউ সরাসরি এস্থেটিক সার্জারিকে দায়ী করেন সেই চেহারার জন্য। সমাজমাধ্যমের এই ‘তাৎক্ষণিক বিচার’-এর মুখে পড়ে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তবে নৃপেন্দ্র গুহ বিষয়টিকে দেখেছেন অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।
কলকাতার ছেলে নৃপেন্দ্র গুহ প্রায় ২০ বছর ধরে এস্থেটিক সার্জনের পেশায় যুক্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি রাশিয়া থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করতে দুবাই ও আয়ারল্যান্ড থেকে এস্থেটিক সার্জারি নিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।
নৃপেন্দ্রের দাবি অনুযায়ী, টলিপাড়া ও বলিউডের বহু পরিচিত অভিনেতা-অভিনেত্রী তাঁর কাছে এসে বিভিন্ন ধরনের এস্থেটিক ট্রিটমেন্ট ও সার্জারি করিয়েছেন। যদিও রোগীর গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে তিনি কখনওই নির্দিষ্ট নাম প্রকাশ করেন না।
সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মন্তব্যগুলির মূল সুর ছিল একটাই—এস্থেটিক সার্জারির ‘ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’। এই প্রসঙ্গে আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নৃপেন্দ্র গুহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“এস্থেটিক সার্জারির ক্ষেত্রে ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ বলে আলাদা করে কিছু নেই।”
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, আধুনিক এস্থেটিক চিকিৎসায় যে সমস্ত ট্রিটমেন্ট ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তার প্রায় সবকটিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) দ্বারা অনুমোদিত। অর্থাৎ, সঠিক পদ্ধতিতে এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের হাতে হলে এগুলি নিরাপদ।
নৃপেন্দ্রের কথায়, “মানুষ অনেক সময় ‘হিলিং টাইম’ আর ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’-এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে চান না। ধরুন, আপনি হার্ট সার্জারি করালেন। অস্ত্রোপচারের পর তো সঙ্গে সঙ্গে আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন না। শরীরের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। এস্থেটিক সার্জারির ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই।”
নৃপেন্দ্র গুহের মতে, এস্থেটিক সার্জারির পরে মুখ বা শরীরের কোনও অংশ কিছুদিন ফুলে থাকা, লালচে হওয়া বা সামান্য অস্বস্তি অনুভব করা একেবারেই স্বাভাবিক। এটিকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না বলে ‘হিলিং প্রসেস’-এর অংশ বলা উচিত।
তিনি বলেন, “অস্ত্রোপচার যত জটিল হবে, হিলিং টাইমও তত বেশি লাগবে। কারও ক্ষেত্রে কয়েক দিন, কারও ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু সমাজমাধ্যমে মানুষ একটি মুহূর্তের ছবি দেখে চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেয়।”
এই প্রসঙ্গেই নিজের ভাইরাল হওয়া ছবির কথাও উল্লেখ করেন নৃপেন্দ্র। তিনি জানান, ছবিটি তোলা হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন তিনি নিজেও একটি নির্দিষ্ট ট্রিটমেন্টের হিলিং ফেজের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু সেই প্রেক্ষাপট না জেনেই নানা মন্তব্য করা হয়েছে।
নৃপেন্দ্রের মতে, ভারতে এখনও এস্থেটিক সার্জারি নিয়ে বহু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি শুধুমাত্র ‘অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা’ বা ‘কৃত্রিম সৌন্দর্য’-এর নাম। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা।
তিনি বলেন, “এস্থেটিক ট্রিটমেন্ট শুধু চেহারা সুন্দর করার জন্য নয়। অনেক সময় এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। জন্মগত কোনও সমস্যা, দুর্ঘটনার দাগ, বয়সজনিত পরিবর্তন—এই সব ক্ষেত্রেই এস্থেটিক সার্জারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
সমাজমাধ্যমের ট্রোলিং প্রসঙ্গে নৃপেন্দ্র গুহ জানান, তিনি বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার বদলে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবেই দেখছেন। তাঁর মতে, একজন চিকিৎসকের পেশাগত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা বিচার করার বদলে চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করা এক ধরনের মানসিকতারই পরিচয়।
তিনি বলেন, “আজ আমার সঙ্গে হয়েছে, কাল অন্য কারও সঙ্গে হবে। তাই এই বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলা জরুরি।”
কলকাতায় প্রথম ক্লিনিক উদ্বোধনের মাধ্যমে নৃপেন্দ্র গুহ তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ও নিরাপদ পদ্ধতির মাধ্যমে এস্থেটিক চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল—একটি ভাইরাল ছবি যেমন মুহূর্তের মধ্যে কাউকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে, তেমনই সেটি ভুল ধারণা ও অর্ধসত্যের জন্মও দিতে পারে। আর সেই অর্ধসত্য ভাঙতে প্রয়োজন খোলাখুলি আলোচনা, তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং সচেতনতা—ঠিক যেটা নৃপেন্দ্র গুহ করার চেষ্টা করছেন।
নৃপেন্দ্র গুহকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কটি আসলে কোনও একক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজ, মানসিকতা এবং সমাজমাধ্যম-নির্ভর বিচারপ্রবণতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। একটি ভাইরাল ছবি, কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যমানতা এবং তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা হাজারো মন্তব্য—এই সমীকরণ আজকের ডিজিটাল সমাজে পরিচিত। কিন্তু সেই মন্তব্যগুলির আড়ালে যে একজন মানুষ, একজন চিকিৎসক এবং দীর্ঘ কুড়ি বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই।
এস্থেটিক সার্জারি নিয়ে সমাজে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, এই ঘটনা আবারও তা সামনে এনে দিয়েছে। ‘স্ফীত মুখ’ দেখলেই তাকে ব্যর্থ সার্জারি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফল বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা প্রমাণ করে, আমরা এখনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলি বুঝতে কতটা পিছিয়ে রয়েছি। নৃপেন্দ্র গুহ যেভাবে ‘হিলিং টাইম’-এর বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন, তাতে স্পষ্ট—চিকিৎসা কোনও যাদু নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ার সময় লাগে, ধৈর্য লাগে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সচেতনতা লাগে।
এই ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সৌন্দর্য ও শরীর নিয়ে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। আজকের দিনে সৌন্দর্যকে ঘিরে এক অদ্ভুত দ্বিচারিতা কাজ করে। একদিকে আমরা নিখুঁত চেহারার প্রতি আকৃষ্ট হই, ফিল্টার-নির্ভর ছবি দেখি, তারকাদের ঝকঝকে উপস্থিতি উপভোগ করি। অন্যদিকে কেউ যদি সেই সৌন্দর্যচর্চার প্রক্রিয়া নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন বা তার বাস্তব রূপ আমাদের সামনে আসে, তখনই শুরু হয় কটাক্ষ ও বিদ্রূপ। নৃপেন্দ্র গুহের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সমাজমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমাজমাধ্যম আজ মত প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম, কিন্তু একই সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের ‘তাৎক্ষণিক আদালত’, যেখানে প্রমাণ, প্রেক্ষাপট বা তথ্য যাচাই ছাড়াই রায় ঘোষণা করা হয়। একজন চিকিৎসকের মুখের সামান্য স্ফীতভাব নিয়েই যেভাবে পেশাগত দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। কারণ আজ যদি একজন এস্থেটিক সার্জন এই ধরনের আক্রমণের শিকার হন, কাল অন্য কোনও চিকিৎসক, বিজ্ঞানী বা পেশাজীবীও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারেন।
নৃপেন্দ্র গুহের বক্তব্য থেকে আর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এস্থেটিক সার্জারি কেবল বিলাসিতা নয়, এটি অনেক মানুষের জীবনে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার একটি মাধ্যম। দুর্ঘটনার ক্ষত, জন্মগত ত্রুটি বা বয়সজনিত পরিবর্তন—এই সব ক্ষেত্রেই এস্থেটিক চিকিৎসার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই ইতিবাচক দিকগুলি প্রায়শই চাপা পড়ে যায় ‘কৃত্রিম সৌন্দর্য’ বা ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ শব্দগুলির আড়ালে।
এই বিতর্ক আমাদের চিকিৎসা-সচেতনতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কি যথেষ্ট জানি, কোন চিকিৎসা পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে? আমরা কি বুঝি, একটি অস্ত্রোপচারের পর শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? না কি আমরা শুধুই দৃশ্যমান ফলাফল দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই? নৃপেন্দ্র গুহের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, তথ্যের অভাব কীভাবে ভুল ধারণাকে জন্ম দেয় এবং সেই ভুল ধারণা কীভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ঘটনা আমাদের সহানুভূতির অভাবের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একজন মানুষের চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করা যত সহজ, সেই মানুষের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করা ততটাই কঠিন। একজন চিকিৎসক হয়েও নৃপেন্দ্র গুহ যে এই ধরনের ট্রোলিংয়ের শিকার হতে পারেন, তা প্রমাণ করে—সমাজমাধ্যমে কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নন।
সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনা যদি আমাদের একটুও সচেতন করে, যদি আমরা পরের বার কোনও ভাইরাল ছবি দেখার আগে প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করি, তাহলেই এই বিতর্কের সার্থকতা থাকবে। নৃপেন্দ্র গুহের বক্তব্য কেবল তাঁর নিজের পক্ষে সাফাই নয়; এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাস্তবতা, সৌন্দর্যচর্চার সত্য এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে এক দৃঢ় বার্তা।
কারণ, চিকিৎসা মানেই ধৈর্য, বোঝাপড়া আর সময়। আর মানুষ হিসেবে আমাদেরও সেই সময়টুকু দেওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি।