Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পরেশ রাওয়াল ক্ষিপ্ত: মঞ্চে দর্শকের অশ্লীল মন্তব্যে সরাসরি প্রতিক্রিয়া

অভিনেতা পরেশ রাওয়াল এক শো চলাকালীন দর্শকের অশ্লীল আচরণের জবাবে মঞ্চে নেমে সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।প্রতিশোধ নাটকের সময় অশ্লীল মন্তব্যে উত্তেজিত হয়ে পরেশ রাওয়াল তিন চারবার চড় মেরেছেন।রাগের মুহূর্তে অভিনয় থেমে যায়, তবে পরেশ বলেন, এমন আচরণে চুপ থাকা সম্ভব নয়।নিজের রাগপ্রবণ স্বভাব নিয়ে আফসোস আছে, তবে এখন তিনি নিজেকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের মতো শক্তিশালী করেছেন।থিয়েটার কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হলেও অভিনেতা অপরাধবোধে ভুগছেন না।

বহুমুখী অভিনেতা পরেশ রাওয়াল বাংলা চলচ্চিত্র এবং থিয়েটারের একটি পরিচিত নাম। পর্দায় যেমন তার তুখোড় অভিনয়, তেমনি থিয়েটার জগতে তার দাপটও সমানভাবে অনুভূত হয়। তিনি শুধুমাত্র একজন অভিনেতা নন, বরং একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব যার উপস্থিতি মঞ্চে স্বয়ং দর্শককেও প্রভাবিত করে। সম্প্রতি এক পডকাস্টে তিনি নিজের জীবনের এক বিস্ময়কর ঘটনার কথা জানিয়েছেন, যা কেবল তার রাগপ্রবণ স্বভাবের দিকে ইঙ্গিত দেয় না, বরং একজন মানুষের নৈতিকতার সীমা, ধৈর্য এবং আত্মসম্মানের সংজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত।

পরেশ রাওয়াল শেয়ার করেছেন যে, একবার তিনি ‘প্রতিশোধ’ নামক নাটকের একটি বিশেষ শোতে অভিনয় করছিলেন। সবকিছুই শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবে। মঞ্চের দৃশ্যাবলী, সহঅভিনেতাদের সঙ্গে পারস্পরিক সমন্বয় এবং দর্শকদের প্রতিক্রিয়া—সবই পরিকল্পিত রীতিতে এগোচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই পরিস্থিতি বদলে যায়। দর্শকদের মধ্যে একজন ব্যক্তি বারবার অশ্লীল মন্তব্য করতে শুরু করেন। প্রথমে পরেশ সংযম বজায় রাখার চেষ্টা করেন, মঞ্চের সীমানা ও পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেন। কিন্তু সময় যত বাড়ে, ওই দর্শকের আচরণ আরও দৃষ্টি আকর্ষণীয় এবং সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে ওঠে।

পরেশ বলেন, “আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। কিন্তু কেউ যদি এমন অশ্লীল আচরণ করে, তাহলে চুপ থাকা যায় না।” রাগে কন্ট্রোল হারিয়ে তিনি মঞ্চ থেকে নেমে সরাসরি দর্শকদের মাঝে ঢুকে পড়েন এবং ওই ব্যক্তিকে তিন-চারবার চড় মারেন। এই মুহূর্তে নাটক থমকে যায়। দর্শক ও সহঅভিনেতাদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরেশের এই আচরণ নাটকের পরিচালক এবং থিয়েটার কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে। যদিও এই ঘটনা নাটকীয় এবং তাত্ত্বিকভাবে “নায়কীয়” মনে হতে পারে, বাস্তবে এটি একটি গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

এই ঘটনার পরপরই থিয়েটার কর্তৃপক্ষ পরেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। একটি প্রফেশনাল সেটিং-এ এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, এমনটাই তাদের বক্তব্য ছিল। যদিও পরেশ নিজে কোনো অপরাধবোধ অনুভব করেননি, তিনি স্বীকার করেছেন যে এই ধরনের রাগপ্রবণ মুহূর্ত তার নিজের জন্য ক্ষতিকর। তিনি পডকাস্টে উল্লেখ করেন, “আমি মাঝে মাঝে আক্রমণাত্মক হয়ে যাই, সেটা ভালো নয়। রাগই আমাকে কষ্ট দেয়।”

পরেশ রাওয়াল তার বাবার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে নিজের আচরণের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, তার বাবা ছিলেন একই রকম বদমেজাজি। তবে পরেশের বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছেন। “এখন আমি নিজেকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের মতো বানিয়েছি, যেন কেউ আমাকে সহজে স্পর্শ করতে না পারে।” এই কথার মাধ্যমে পরেশ বোঝাতে চেয়েছেন যে, তিনি রাগ ও উত্তেজনার পরিস্থিতি থেকে নিজের মানসিক সুরক্ষা করেছেন।

পরেশ রাওয়ালের এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত রাগের গল্প নয়। এটি থিয়েটার শিল্পের মধ্যে প্রফেশনালিজম, দর্শক এবং অভিনেতার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সামাজিক নৈতিকতার জটিলতা প্রকাশ করে। থিয়েটার বা চলচ্চিত্রে অভিনেতারা তাদের অভিনয়কে প্রায়শই বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। কিন্তু বাস্তব জীবনের সীমা স্পষ্ট এবং কখনো কখনো সেই সীমার লঙ্ঘন গুরুতর ফলাফলের দিকে নিয়ে যায়। পরেশের ঘটনা তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।

news image
আরও খবর

এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানসিক চাপ ও উত্তেজনার মুহূর্তে একজন মানুষ কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। পরেশ রাওয়ালের রাগপ্রবণতা যদিও অস্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তবুও তিনি এই আচরণের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, সমাজে অশ্লীলতা এবং অসভ্য আচরণের মোকাবেলা করা প্রায়ই একজন মানুষের সীমা পরীক্ষা করে। তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু যখন সেই সীমা অতিক্রম করা হয়, তখন প্রতিক্রিয়ার কোন বিকল্প নেই।

এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। রাগ একটি প্রাকৃতিক অনুভূতি, যা সব মানুষ অনুভব করে। তবে সমস্যাটি আসে তখন যখন সেই রাগ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে এবং পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরেশ রাওয়াল এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে রাগই তাকে ক্ষতি করে, কিন্তু তিনি এটিকে নিজের জীবনের একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করছেন এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

থিয়েটার বা চলচ্চিত্র জগতে এমন ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু পরেশের ঘটনা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে কারণ এটি একজন অভিজ্ঞ অভিনেতার আচরণ এবং দর্শকের সীমা লঙ্ঘনের মধ্যে সংঘর্ষের গল্প বলে। এটি থিয়েটার শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠও দেয়: দর্শক এবং অভিনেতার মধ্যে পারস্পরিক সম্মান অপরিহার্য। একজন অভিনেতা যতই অভিজ্ঞ হোক না কেন, তাকে অবশ্যই পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে, এবং দর্শককেও একটি নৈতিক আচরণ বজায় রাখতে হবে।

পরেশ রাওয়াল নিজে এই ঘটনার পর থেকে পরিবর্তিত হয়েছেন। তিনি আরও সংযমী, ধৈর্যশীল এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। তার কথায়, “আমি এখন নিজেকে সুরক্ষিত রেখেছি, যেন কেউ সহজে আমাকে উত্কণ্ঠিত করতে না পারে।” এটি শুধুমাত্র রাগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নয়, বরং এটি একজন শিল্পীর নিজের মানসিক সুস্থতা এবং থিয়েটার শিল্পের প্রতি দায়িত্বশীলতার দৃষ্টান্ত।

উপসংহারে বলা যায়, পরেশ রাওয়ালের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে রাগ এবং উত্তেজনার মুহূর্তে মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়। এটি আমাদের শেখায় যে, পেশাদার পরিবেশে নিয়ন্ত্রণ এবং ধৈর্য অপরিহার্য, এবং ব্যক্তিগত সীমা ও সম্মানের মূল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরেশ রাওয়ালের মত অভিনেতার জীবন শুধুমাত্র অভিনয় নয়, বরং একটি শৃঙ্খলিত জীবনযাত্রার শিক্ষা।

পরিশেষে, এই ঘটনার থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ গ্রহণ করা যায়: একজন ব্যক্তি তার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে হবে, এবং দর্শক হিসেবে আমাদেরও অন্যের কর্মের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। পরেশ রাওয়াল যদিও মুহূর্তের উত্তেজনায় স্বভাবসিদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তবুও তিনি এখন আরও পরিপক্ক এবং মানসিকভাবে দৃঢ় হয়ে উঠেছেন। এটি একজন শিল্পীর বিকাশ এবং মানবিক শিক্ষার গল্প হিসেবেই চিরকাল স্মরণীয় থাকবে।

Preview image