শ্রম দফতর সূত্রে জানা গেছে, আগামী বছর জুলাই থেকে পরের বছরের জুন পর্যন্ত সারা দেশে এই সমীক্ষা চলবে। সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে, তবে আন্দামান ও নিকোবরকে এই সমীক্ষার বাইরে রাখা হয়েছে।
করোনাকালীন লকডাউন ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন এক সময়, যখন পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনযুদ্ধ চোখের সামনে খুলে গিয়েছিল সবচেয়ে নির্মম রূপে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করতে আসা লক্ষ লক্ষ শ্রমিক মুহূর্তের মধ্যে হয়ে পড়েছিলেন বেকার, আশ্রয়হীন, অনিশ্চয়তার ছায়াতলে। রোজগার বন্ধ হওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল, গণপরিবহন থমকে যাওয়ায় বাড়ি ফেরার পথ হয়ে উঠেছিল মৃত্যুফাঁদ। দীর্ঘ পদযাত্রা, দুর্ঘটনা, খাদ্যাভাব, চিকিৎসাহীনতা— সেই সমস্ত ছবি দেশবাসীর স্মৃতিতে এখনও তাজা। লকডাউন যেন উন্মোচন করেছিল বহু দিন ধরে চলে আসা এক আড়াল— পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রকৃত হাল-হকিকত।
এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সরকারকে, নীতি-নির্ধারকদের এবং গবেষকদের সামনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছিল:
দেশের পরিযায়ী শ্রমিকরা কোথায় দাঁড়িয়ে? তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা কত? তাঁদের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, আয়— সবকিছুই কি যথেষ্ট?
এই প্রশ্নগুলির প্রকৃত উত্তর নেই কোনও একক, নির্ভরযোগ্য, আধুনিক তথ্যভাণ্ডারে। তাই দেশের শ্রমবাজার সম্পর্কিত নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বারবার দেখা দিচ্ছিল তথ্যঘাটতি। অবশেষে সেই ঘাটতি মেটাতেই পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় তথ্য সংগ্রহ অভিযানের পথে এগোল কেন্দ্রীয় সরকার।
কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রক ইতিমধ্যেই সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হবে এই এক বছরের বিস্তৃত জাতীয় সমীক্ষা। ভারতজুড়ে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত পৌছে তথ্য সংগ্রহ করা হবে গ্রাম-শহর উভয় অঞ্চল থেকেই।
তবে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে— আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে এই সমীক্ষা কার্যকর হবে না, ভৌগোলিক দূরত্ব, বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা এবং নমুনা কাঠামো নির্ধারণের কারণ দেখিয়েই তা বাদ রাখা হয়েছে।
ভারতে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে সর্বশেষ বৃহৎ সমীক্ষা হয়েছিল ২০০৭-০৮ সালে, ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অর্গানাইজ়েশন (NSO)-এর অধীনে। ২০২০–২১ সালে একটি ছোট আকারের নমুনাভিত্তিক সমীক্ষা চালানো হলেও তা যথেষ্ট বিস্তৃত নয়।
কিন্তু গত এক-দেড় দশকে ভারতের শ্রমবাজারে প্রচুর পরিবর্তন হয়েছে:
অনির্ধারিত শ্রমক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের ধরণ বদলেছে।
শহরমুখী পরিযায়নের হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
নির্মাণ, অবকাঠামো, উৎপাদন, পরিবহণ, পরিষেবা খাতে পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডিজিটাল ইন্ডিয়া, ই-কমার্স, গিগ ইকোনমির উত্থান পরিযায়ী শ্রমশক্তিকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে বারবারই দেখা গেছে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঠিক তথ্যের অভাবে সরকারি পরিকল্পনা কার্যকর করতে সমস্যা হয়।
এ অবস্থায় কেন্দ্র মনে করছে, নতুন নীতি প্রণয়ন, শ্রমিক সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, কল্যাণ প্রকল্প ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য হালনাগাদ তথ্য অপরিহার্য। সেই কারণে দেশব্যাপী সমীক্ষার উদ্যোগ।
এই সমীক্ষাকে শুধু সংখ্যা গণনা নয়, বরং একটি মাল্টিলেয়ারড সামাজিক-অর্থনৈতিক ডেটা সংগ্রহের প্রকল্প হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে—
সরকারের নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী—
যাঁরা নিজ রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করছেন, তাঁরা পরিযায়ী শ্রমিক।
বছরে ১৫ দিন থেকে ৬ মাস বাইরে কাজ করলে তাঁরা স্বল্পমেয়াদি পরিযায়ী।
এই সংজ্ঞা তথ্য সংগ্রহে নতুন মাত্রা এনে দেবে, যেহেতু পূর্বে বহু স্বল্পমেয়াদি বা মৌসুমি শ্রমিককে পরিযায়ী তালিকায় ধরা হতো না।
সমীক্ষকেরা জানবেন—
কাজের সন্ধান
দারিদ্র্য
পরিবার/সমাজের চাপ
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
কৃষি আয়ের অনিশ্চয়তা
নির্মাণ/শিল্পক্ষেত্রে নিয়োগ
শহরমুখী আকর্ষণ
মৌসুমি চাহিদা
এই কারণগুলির বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৭-০৮ সালের পর যেহেতু আর কোনো পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা হয়নি, তাই বর্তমান সংখ্যা ঠিক কত— তা অজানা। অনেক গবেষকের মতে ভারতের পরিযায়ী শ্রমিক সংখ্যা ১২ থেকে ২০ কোটি হতে পারে— তবে এটি অনুমান মাত্র। এই সমীক্ষা দেশের প্রকৃত পরিমাণ জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
– দৈনিক/সাপ্তাহিক/মাসিক আয়
– নিয়োগের প্রকৃতি: স্থায়ী / অস্থায়ী / মৌসুমি / গিগ
– কাজের সময়
– শ্রমিক কি চুক্তিভিত্তিক? ঠিকাদারের মাধ্যমে?
– শিল্প বা ক্ষেত্রভিত্তিক বিভাজন
এই তথ্য শ্রমবাজারের মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেবে।
পরিযায়ী শ্রমিকদের
শিক্ষা
পারিবারিক আয়
আবাসন
স্বাস্থ্যসেবা
পরিচয়পত্র/ডকুমেন্টেশন
সরকারি সুবিধা পাওয়ার অবস্থা
—এই সব বিষয় বিশ্লেষণের আওতায় আসবে।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সাধারণত—
বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, ওডিশা, পশ্চিমবঙ্গ— উৎস রাজ্য
মহারাষ্ট্র, গুজরাত, তামিলনাড়ু, কর্নাটক, তেলেঙ্গানা, দিল্লি, পাঞ্জাব— আকর্ষণীয় গন্তব্য
এই প্রবাহ কীভাবে বদলেছে, তা জানা নীতি প্রণয়নের জন্য জরুরি।
নির্মাণ শিল্পই পরিযায়ী শ্রমিকের সবচেয়ে বড় নিয়োগকর্তা, তবে—
উৎপাদন
বস্ত্রশিল্প
পরিবহণ
খুচরো বাজার
গিগ ইকোনমি (ডেলিভারি, ক্যাব, লজিস্টিক্স)
—এগুলি এখন পরিযায়ী শ্রমিকদের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
সমীক্ষা এসব ক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবে।
এই জাতীয় সমীক্ষা হবে সরাসরি মাঠপর্যায়ে গিয়ে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে।
সমীক্ষকেরা—
পরিবারের বাসস্থান
কাজের স্থানের তথ্য
মাসিক যাতায়াত
খরচ
শিশুদের স্কুলিং
স্বাস্থ্য ও বীমা
সব কিছুই নথিভুক্ত করবেন।
সমীক্ষার কাঠামো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি হবে ভারতের শ্রমবাজার ও পরিযায়ী বাস্তবতার সবচেয়ে বড় ডেটাবেস।
যদিও সরকার এই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে—
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের অধীনে কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে ব্যয়ভার বহন করা হবে।
পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রকের সহযোগিতায় সমীক্ষা পরিচালিত হবে।
রাজ্য শ্রম দফতরগুলিকে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করতে হবে।
এই সমীক্ষার জন্য হাজার হাজার কর্মী, ডেটা এন্ট্রি সহায়ক ও তদারকি দল নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে— পরিযায়ী শ্রমিকরা দেশের উন্নয়নচক্রের কেন্দ্রবিন্দু হলেও, নীতির ক্ষেত্রে তাঁদের গুরুত্ব যথেষ্ট উপলব্ধি করা হয়নি।
করোনাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
সমীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য—
সামাজিক সুরক্ষা
E-Shram Card-এর বিস্তার
পেনশন
বিমা
আবাসন প্রকল্প
খাবার, রেশন স্থানান্তরযোগ্যতা
—এই সব নীতিতে পরিবর্তন আনতে সাহায্য করবে।
অসংগঠিত ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘন প্রায়ই সামনে আসে। প্রকৃত তথ্য জানলে আইন প্রয়োগ কার্যকর হবে।
নির্মাণ, শিল্প, লজিস্টিক্স— সবক্ষেত্রেই শ্রমশক্তি পরিকল্পনায় তথ্য অত্যন্ত জরুরি।
লকডাউনে পরিযায়ী শ্রমিকদের বিপর্যয় প্রমাণ করেছিল— সঠিক কেন্দ্রীয় ডেটাবেস না থাকলে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন।
এই সমীক্ষা সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান।
পরিযায়ী তত্ত্ব, গ্রাম-শহর সম্পর্ক, শ্রম অর্থনীতি— এসব ক্ষেত্রে নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে।
এই সমীক্ষার পর ভারতের শ্রমবাজার সম্পর্কে বহু জটিল ধাঁধার সমাধান হবে—
প্রকৃত পরিযায়ী সংখ্যা
মাইগ্রেশন প্যাটার্ন
আয় ও দারিদ্র্যের সম্পর্ক
শিল্পভিত্তিক শ্রম বণ্টন
শহরাঞ্চলের শ্রম নির্ভরতা
নারী পরিযায়ী শ্রমিকের হার
গিগ অর্থনীতির পরিযায়ী নির্ভরতা
এ ছাড়াও পরিবারভিত্তিক তথ্য জানাবে—
শিশুর স্কুল ড্রপআউট হার
স্বাস্থ্যঝুঁকি
আবাসন সমস্যা
পরিচয়পত্র ও সরকারি সুবিধা পাচ্ছে কি না
এই অলঙ্ঘনীয় ডেটাবেস দেশের নীতি নির্ধারকদের জন্য হবে এক বিপুল সম্ভার।
ডেটা সংগ্রহের পর—
প্রাথমিক বিশ্লেষণ
রাজ্যভিত্তিক তথ্য শ্রেণিবিন্যাস
শিল্পভিত্তিক প্রতিবেদন
জাতীয় স্তরীয় পর্যালোচনা
– এবং শেষে ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘মাইগ্রেশন রিপোর্ট’ প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ।
পরিযায়ী শ্রমিকরা ভারতের আর্থিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। শহরের উঁচু দালান, মেট্রো রেল, সড়ক নির্মাণ, কারখানা, গুদাম, রেস্তরাঁ— দেশের শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রের বৃহৎ অংশ তাঁদের শ্রমের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ সমাজের চোখে তাঁরা থেকে যান ‘অদৃশ্য’ নাগরিক হিসেবে— পরিচয়হীন, নিরাপত্তাহীন, পরিসংখ্যানের পাতায় অনুপস্থিত।
কেন্দ্রের এই সর্বভারতীয় সমীক্ষা সেই অদৃশ্যতাকে ভেঙে সামনে আনবে বাস্তবে থাকা মানুষের কাহিনি— তাঁদের অর্থনীতি, সংগ্রাম, আশঙ্কা, স্বপ্ন ও জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র। ভারতের শ্রমবাজারকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে এবং ভবিষ্যতের নীতি আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যনির্ভর করে তুলতে এই সমীক্ষা এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।