? বাবার মুখাগ্নি করল ছোট্ট সহজ শ্মশানে পাশে ছিলেন মা Priyanka Sarkar ছেলের মানসিক অবস্থা নিয়েই এখন সবার চিন্তা।
গত ২৪ ঘণ্টা যেন এক ভয়ংকর ঝড় হয়ে বয়ে গিয়েছে এক মা ও তার ১৩ বছরের ছেলের জীবনে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হল এমন এক বয়সে, যখন সাধারণত শিশুরা এখনও পৃথিবীটাকে স্বপ্নের মতো দেখতেই শেখে। কিন্তু বাস্তব কখনও কখনও এতটাই নির্মম হয় যে, সেই স্বপ্নভাঙা মুহূর্তকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনও উপায় থাকে না।
সোমবার বিকেলে কলকাতার Keoratala Crematorium-এর পরিবেশ ছিল এক অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া। ভিড় ছিল, মানুষের ঢল ছিল, কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেও যেন এক ধরনের চাপা স্তব্ধতা কাজ করছিল। কারণ, সেখানে শেষ বিদায় জানাতে আনা হয়েছিল টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা Rahul Arunoday Banerjee-কে।
শ্মশানের গেটে যখন ঢুকছিলেন অভিনেত্রী Priyanka Sarkar, তাঁর এক হাত শক্ত করে ধরে ছিল তাঁর ছেলে সহজ। চারদিকে ক্যামেরা, সাংবাদিক, ভক্তদের ভিড়—সব কিছুর মাঝেও তিনি যেন একটাই কাজ করছিলেন—ছেলেকে আগলে রাখা।
সহজের চোখে তখন কেমন যেন এক অচেনা শূন্যতা। সে চারদিকে তাকাচ্ছিল, কিন্তু যেন কিছুই দেখছিল না। হয়তো এত বড় একটি ঘটনার গুরুত্ব তখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি সে। আবার হয়তো বুঝেও উঠতে পারছিল না—কীভাবে এই বাস্তবতাকে গ্রহণ করবে।
একটা শিশুর জীবনে বাবার উপস্থিতি মানে নিরাপত্তা, ভরসা, বন্ধুত্ব—সব কিছু। আর সেই মানুষটাই হঠাৎ করে চলে গেলে, সেই শূন্যতা কোনও শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না।
শ্মশানের ভিতরে প্রবেশ করার সময় সহজের মুখে কোনও আবেগের প্রকাশ দেখা যায়নি। অনেকেই বলেছেন, সে যেন যন্ত্রচালিতের মতো মায়ের সঙ্গে হাঁটছিল। এই নিরুত্তাপ ভাবটাই হয়তো আসলে গভীর শোকের বহিঃপ্রকাশ—যেখানে চোখের জলও পথ খুঁজে পায় না।
ভিতরে তখন শোয়ানো ছিল তার বাবার নিথর দেহ। যে মানুষটা হয়তো কিছুদিন আগেও তার সঙ্গে গল্প করছিল, হাসছিল, সময় কাটাচ্ছিল—আজ সেই মানুষটাই নিস্তব্ধ।
এই দৃশ্য কোনও ১৩ বছরের শিশুর জন্য কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব।
শেষকৃত্যের সময় আসে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। হিন্দু রীতিনীতি অনুযায়ী, পুত্রের হাতেই সম্পন্ন হয় পিতার মুখাগ্নি। আর সেই দায়িত্বই পালন করতে হয় সহজকে।
একটা শিশু, যে এখনও স্কুলের বই, খেলাধুলা আর বন্ধুত্বের জগতে থাকার কথা—সে দাঁড়িয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার সামনে। নিজের বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে তাকে নিজেকেই আগুন দিতে হচ্ছে।
এই দৃশ্য উপস্থিত সকলকে নাড়িয়ে দেয়।
অনেকেই বলেছেন, পুরো সময়টা জুড়ে সহজ একটাও কথা বলেনি। তার মুখে কোনও কান্না ছিল না, কিন্তু সেই নীরবতা ছিল আরও বেশি ভারী।
বিকেল ঠিক ৫টা ১২ মিনিটে চুল্লিতে ঢোকানো হয় অভিনেতার দেহ। এই সময়টা যেন চিরকালের মতো থমকে যায় উপস্থিত সকলের কাছে।
এই মুহূর্তেই যেন বাস্তবটা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে—ফিরে আসবেন না তিনি আর।
সহজ তখনও নীরব। পাশে মা Priyanka Sarkar। দু’জনেই যেন নিজেদের ভেতরে লড়াই করছেন।
শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পরে, অস্থিভস্ম হাতে নিয়ে শ্মশান থেকে বেরিয়ে আসেন মা ও ছেলে। সেই সময়টাও ছিল একই রকম নিস্তব্ধ।
সহজের মুখে তখনও কোনও অভিব্যক্তি নেই। হয়তো তার ভিতরে চলছে এক ভয়ংকর আবেগের ঝড়—যার কোনও বহিঃপ্রকাশ নেই।
তাঁদের সঙ্গে ছিলেন অভিনেত্রী তথা সাংসদ Sayani Ghosh। তাঁর গাড়িতেই শ্মশান ছাড়েন মা ও ছেলে।
এরপর তাঁরা যান Babughat-এ। সেখানে গঙ্গার জলে ভাসানো হয় অস্থিভস্ম।
এই পর্বটাও সমান আবেগঘন। কারণ, এখানেই শেষ হয় সমস্ত পার্থিব সম্পর্কের শেষ রীতি।
রবিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যুর খবর। তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে ঘটে দুর্ঘটনা। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় সব কিছু।
সেই সময় কলকাতায় নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন Priyanka Sarkar। খবর পাওয়ার পর প্রথমেই ছুটে যান শাশুড়ির কাছে।
সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল ছেলেকে এই খবর দেওয়া।
পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গিয়েছে, সহজকে বিষয়টি বোঝানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু মা হিসেবে Priyanka Sarkar সেই দায়িত্ব পালন করেন অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে।
তিনি চেষ্টা করেছেন যাতে ছেলের উপর আঘাতটা একটু হলেও কম পড়ে। এমনকি মিডিয়ার চোখ থেকেও ছেলেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন।
পুরো ঘটনার পর থেকে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—সহজ কেমন আছে?
তার নীরবতা, তার স্থির দৃষ্টি—সব কিছুই মানুষকে ভাবাচ্ছে।
অনেকেই মনে করছেন, সে হয়তো এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি কী ঘটেছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, সে সব বুঝেও নিজের মধ্যে চেপে রাখছে।
? টলিপাড়ার উপস্থিতি: শোকের ভিড়ে তারকাদের নীরবতা
সোমবার কেওড়াতলা মহাশ্মশান যেন শুধুমাত্র একটি শেষকৃত্যের স্থান ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল আবেগ, স্মৃতি আর শোকের এক গভীর মিলনক্ষেত্রে। টলিউডের বহু পরিচিত মুখ সেই দিন হাজির ছিলেন প্রিয় সহকর্মীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। সেখানে ছিলেন Prosenjit Chatterjee, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলা সিনেমার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাঁর মুখেও স্পষ্ট ছিল শোকের ছাপ—কথা কম, চোখে গভীর বিষাদ।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট পরিচালক Kaushik Ganguly, যিনি বহুবার তাঁর সংবেদনশীল কাজের মাধ্যমে মানুষের মন ছুঁয়ে গেছেন। কিন্তু এদিন তাঁর নিজের মুখেও যেন সেই সংবেদনশীলতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল বাস্তবের শোকের সামনে দাঁড়িয়ে। আরও বহু অভিনেতা, পরিচালক, টেকনিশিয়ান—প্রায় পুরো টলিপাড়া যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল এই কঠিন সময়ে।
তবে এত মানুষের উপস্থিতি, এত পরিচিত মুখ, এত ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—সব কিছুর মাঝেও একটাই দৃশ্য বারবার সবার দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছিল। সেই দৃশ্যটি ছিল ১৩ বছরের এক কিশোর—সহজ। তার মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই, চোখে জল নেই, কিন্তু সেই নীরবতাই যেন সবচেয়ে বেশি কথা বলছিল।
অনেকেই এগিয়ে এসে সমবেদনা জানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এমন এক পরিস্থিতিতে কী বলা উচিত, তা যেন কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কারণ, এই শোক কোনও সাধারণ শোক নয়—এটা এক শিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
চারপাশে যারা ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই হয়তো নিজের মতো করে ভাবছিলেন—এই বয়সে এত বড় আঘাত কীভাবে সামলাবে সে? তার ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ে উঠবে এই শূন্যতার মধ্যে? এই প্রশ্নগুলোই যেন ভাসছিল বাতাসে।
কেউ কেউ বলছিলেন, সহজের এই নীরবতা হয়তো সাময়িক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো সে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারবে। আবার কেউ মনে করছিলেন, এই অভিজ্ঞতা তার ভিতরে এক গভীর ছাপ রেখে যাবে, যা হয়তো সারাজীবন তার সঙ্গে থাকবে।
মা Priyanka Sarkar-এর ভূমিকা এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি যেমন নিজের ব্যক্তিগত শোক সামলাচ্ছেন, তেমনই তাঁকে সামলাতে হচ্ছে তাঁর ছেলেকেও। এই দ্বৈত দায়িত্ব কোনওভাবেই সহজ নয়। তবুও তাঁকে দৃঢ় থাকতে হচ্ছে—নিজের জন্য নয়, ছেলের জন্য।
এই দিনটি শুধু একজন অভিনেতার শেষযাত্রা নয়, বরং এটি একটি পরিবারের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা—যেখানে নেই সেই মানুষটি, যিনি ছিলেন কেন্দ্রবিন্দু।
? উপসংহার: এক অসমাপ্ত গল্প
জীবন সব সময় সরল পথে চলে না। কখনও কখনও তা এমন মোড় নেয়, যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। Rahul Arunoday Banerjee-এর আকস্মিক মৃত্যু ঠিক তেমনই এক ঘটনা, যা নাড়িয়ে দিয়েছে শুধু তাঁর পরিবারকে নয়, গোটা ইন্ডাস্ট্রিকেও।
একটা ১৩ বছরের ছেলে—সহজ। যে বয়সে তার সবচেয়ে বড় চিন্তা হওয়া উচিত ছিল পড়াশোনা, বন্ধু, খেলা—সেই বয়সেই তাকে মুখোমুখি হতে হল জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার। বাবার মৃত্যু শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, এটি একটি নিরাপত্তাবোধের হারিয়ে যাওয়া, একটি আশ্রয়ের ভেঙে পড়া।
সহজের মুখে আমরা কোনও কান্না দেখিনি, কোনও চিৎকার শুনিনি। কিন্তু তার এই নীরবতাই হয়তো সবচেয়ে বড় আর্তনাদ। অনেক সময় মানুষ এতটাই ভেঙে পড়ে যে, সে কাঁদতেও পারে না। তার অনুভূতিগুলো জমে থাকে ভিতরে, স্তব্ধ হয়ে।
এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারেন একজন মানুষ—তার মা। Priyanka Sarkar এখন শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি একজন মা, যাকে একই সঙ্গে নিজের শোক সামলে ছেলেকে শক্ত করে দাঁড়াতে শেখাতে হবে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ক্ষত একটু শুকোবে, ব্যথা একটু কমবে। কিন্তু এই শূন্যতা কোনও দিন পুরোপুরি ভরাট হবে না। তবুও জীবন থেমে থাকে না। এগিয়ে যেতে হয়, নতুন করে বাঁচতে শিখতে হয়।
এই গল্পের কোনও সম্পূর্ণ সমাপ্তি নেই। কারণ, এটি এখনও চলছে। সহজের জীবন, তার লড়াই, তার বড় হয়ে ওঠা—সবটাই এখনও বাকি। হয়তো একদিন সে নিজের মতো করে এই শোককে শক্তিতে পরিণত করবে।
আর তখনই হয়তো এই অসমাপ্ত গল্প একটা নতুন অর্থ পাবে।