Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ভয়াবহ গুদাম অগ্নিকাণ্ড ৩২ ঘণ্টা পরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে আগুন মৃতের সংখ্যা অজানা

মঙ্গলবার সকালে গুদাম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমার। তিনি জানান, ওই গুদামের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার জন্য দমকল বিভাগের কোনও ছাড়পত্র ছিল না। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

পূর্ব কলকাতার আনন্দপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যেন থামছেই না। ৩২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি আগুন। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসছে ধোঁয়া, কোথাও আবার ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ইতিমধ্যেই মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট জনে। এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

রবিবার রাত প্রায় তিনটে নাগাদ আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত একটি মোমো প্রস্তুতকারী সংস্থার গুদামে হঠাৎই আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশাপাশি অবস্থিত আরও একটি গুদামে। দুটি গুদামেই ছিল প্রচুর দাহ্য পদার্থ। আগুনের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও আগুনের তীব্রতায় তা সম্ভব হয়নি।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকল বাহিনী। প্রথমে কয়েকটি ইঞ্জিন পাঠানো হলেও পরে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে আরও ইঞ্জিন আনা হয়। মোট ১২টি দমকল ইঞ্জিন দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু গুদামের ভেতরে থাকা বিপুল পরিমাণ দাহ্য সামগ্রী, প্লাস্টিক, কাঠ, কাপড়, রাসায়নিক উপাদান এবং গ্যাস সিলিন্ডারের মতো জিনিস আগুনকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ফলে সোমবার রাত পর্যন্তও আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি।

মঙ্গলবার সকালেও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। কোথাও কোথাও এখনও আগুন জ্বলছে। দমকল কর্মীরা নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। তবে গুদামের ভেতরের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখনও পর্যন্ত আট জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু আগুনে পুড়ে যাওয়া দেহাংশ এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছে যে তাঁদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার হওয়া দেহাংশগুলি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের অনুমান, অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আরও কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধারকাজ চললেও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় কাজের গতি ধীর হয়ে পড়েছে।

ঘটনার প্রায় দেড় দিন পর মঙ্গলবার বেলা নাগাদ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রাজ্যের দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। তিনি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জোড়া গুদাম ঘুরে দেখেন এবং দমকল আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেন। স্বজনহারাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। দমকলমন্ত্রী বলেন, এই গুদাম এলাকা কার্যত একটি জতুগৃহের মতো ছিল। প্রায় ৩৫ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ওই গুদামে পাশাপাশি একটি মোমো কারখানা এবং একটি ডেকরেটার্সের গুদাম ছিল। ভেতরে ছিল বিপুল পরিমাণ দাহ্য সামগ্রী। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ রূপ নেয়।

সুজিত বসু আরও জানান, গুদামে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এ বিষয়ে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গুদামে আদৌ ফায়ার অডিট হয়েছিল কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা হবে। তিনি আশ্বাস দেন, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমারও। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ওই গুদামের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে দমকল বিভাগের তরফে কোনও ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, দমকলের অনুমোদন ছাড়াই দিনের পর দিন ওই গুদাম পরিচালিত হচ্ছিল। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অনুমোদন ছাড়াই কীভাবে এত বড় গুদাম চলছিল—এই প্রশ্নের উত্তরে ডিজি জানান, বিভাগের তরফে কোনও ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই মন্তব্যের পর প্রশাসনিক গাফিলতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ময়নার বিজেপি বিধায়ক অশোক ডিন্ডাও। স্থানীয় বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরাও সেখানে পৌঁছান। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিজেপি কর্মীরা তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখান এবং ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেন। পাল্টা জবাব দেন তৃণমূল সমর্থকেরাও। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। যদিও রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্য প্রশাসনিক অবহেলা এবং নিরাপত্তার গাফিলতিই মূল কারণ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় বিপজ্জনকভাবে গুদাম পরিচালিত হচ্ছিল। বহুবার অভিযোগ করা হলেও প্রশাসনের তরফে কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের মতে, যদি আগেই যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে এত বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের গুদাম পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা বিধি থাকা উচিত। নিয়মিত ফায়ার অডিট, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ, এবং প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই নিয়ম মানা হয় না। ফলে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

news image
আরও খবর

এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক অবহেলা, নিরাপত্তার গাফিলতি এবং নিয়ম লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ উদাহরণ। প্রতিটি মৃত ব্যক্তির পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবন। নিখোঁজদের পরিবার এখনও আশায় বুক বাঁধছে—হয়তো তাঁদের প্রিয়জনেরা বেঁচে আছেন। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, সেই আশা তত ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।

এই ঘটনার পর রাজ্য জুড়ে গুদাম এবং কারখানাগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—রাজ্যের কতগুলি গুদাম এবং কারখানা এখনও দমকলের অনুমোদন ছাড়াই চলছে? কত জায়গায় নিয়ম লঙ্ঘন হচ্ছে? আর কত বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষায় রয়েছে শহর?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পর রাজ্য সরকারকে অবিলম্বে সমস্ত গুদাম এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির ফায়ার সেফটি অডিট করতে হবে। পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

আনন্দপুরের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কলকাতার ইতিহাসে এক ভয়ঙ্কর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আগুন শুধু গুদাম পোড়ায়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে বহু মানুষের স্বপ্ন, জীবন এবং ভবিষ্যৎ। এখন দেখার, প্রশাসন এই ঘটনার থেকে কী শিক্ষা নেয় এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কী পদক্ষেপ নেয়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পর রাজ্য সরকারকে অবিলম্বে সমস্ত গুদাম এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির ফায়ার সেফটি অডিট করতে হবে। পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

আনন্দপুরের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কলকাতার ইতিহাসে এক ভয়ঙ্কর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আগুন শুধু গুদাম পোড়ায়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে বহু মানুষের স্বপ্ন, জীবন এবং ভবিষ্যৎ। এখন দেখার, প্রশাসন এই ঘটনার থেকে কী শিক্ষা নেয় এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কী পদক্ষেপ নেয়।

এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শহরের কতগুলো গুদাম, কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনও দমকলের অনুমোদন ছাড়াই চলছে? কত জায়গায় নিয়মের তোয়াক্কা না করে বিপজ্জনকভাবে ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে? কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যেখানে প্রতিটি এলাকায় হাজার হাজার মানুষ বসবাস করেন, সেখানে এই ধরনের অব্যবস্থাপনা যে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, আনন্দপুরের ঘটনা তারই এক নির্মম উদাহরণ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় বিপজ্জনকভাবে গুদাম পরিচালিত হচ্ছিল। গুদামের ভিতরে কী ধরনের সামগ্রী রাখা হচ্ছে, কতটা দাহ্য পদার্থ মজুত রয়েছে—তা নিয়ে কোনও স্বচ্ছতা ছিল না। তবুও প্রশাসনের তরফে কোনও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে একসময় সেই অবহেলা ভয়াবহ দুর্ঘটনায় রূপ নেয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি দিলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি সুসংহত নীতি, যেখানে প্রতিটি গুদাম ও কারখানার নিয়মিত ফায়ার অডিট বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

এই অগ্নিকাণ্ড রাজ্য সরকারের পাশাপাশি কর্পোরেশন, দমকল বিভাগ এবং শিল্প সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। কার দায় কতটা—তা নিয়ে বিতর্ক চললেও, সবচেয়ে বড় সত্য হল, এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সাধারণ মানুষ। তাঁদের পরিবারের কাছে প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা রাজনৈতিক বিতর্কের কোনও মূল্য নেই। তাঁদের কাছে শুধু একটাই বাস্তবতা—অপূরণীয় ক্ষতি।

আনন্দপুরের গুদাম অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়, বরং এটি আমাদের নগর ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি আয়না। এই ঘটনা যদি প্রশাসন ও সমাজকে নাড়া না দেয়, যদি এর পরেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

আজ আনন্দপুরে যে আগুন জ্বলেছে, তা যেন আগামী দিনে আর কোনও পরিবারকে গ্রাস না করে—এই আশা নিয়েই তাকিয়ে আছে কলকাতা। সময়ই বলবে, এই ঘটনার পর সত্যিই কোনও পরিবর্তন আসে কি না, নাকি এই ঘটনাও ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় চাপা পড়ে যায়।

Preview image