পূর্ব বর্ধমানের নাদনঘাট থানার পারুলডাঙ্গায় বাইক ও স্কুটির সামনাসামনি সংঘর্ষে মৃত্যু হল এক যুবকের। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুজন। দ্রুতগতির জেরে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান স্কুটি আরোহী। আহতদের কালনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পূর্ব বর্ধমান জেলায় ফের এক মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা গোটা এলাকা জুড়ে শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করল। নাদনঘাট থানার অন্তর্গত নশরতপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পারুলডাঙ্গা এলাকায় অবস্থিত এস টি কে কে সড়কে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাইক ও স্কুটির সামনাসামনি সংঘর্ষে মৃত্যু হল এক যুবকের। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দু’জন যুবক, যাঁরা বর্তমানে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। এই দুর্ঘটনা আবারও রাজ্যের গ্রামীণ সড়কগুলিতে ক্রমবর্ধমান বেপরোয়া গতির সমস্যা এবং সড়ক নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল নাগাদ একটি স্কুটি নদিয়া জেলার নবদ্বীপ দিক থেকে কালনার দিকে যাচ্ছিল। স্কুটিটি মাঝারি থেকে উচ্চ গতিতে চলছিল বলে স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছেন। অপরদিকে, একটি বাইক কালনা দিক থেকে নবদ্বীপের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। বিকেলের ব্যস্ত সময়ে এস টি কে কে সড়কে তখন অন্যান্য যানবাহনের চলাচলও ছিল। পারুলডাঙ্গা এলাকায় পৌঁছতেই আচমকা দুই গাড়ির মধ্যে সামনাসামনি সংঘর্ষ ঘটে।
দুর্ঘটনার মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উভয় গাড়ির গতিবেগ বেশি থাকায় সংঘর্ষের শব্দ দূর পর্যন্ত শোনা যায়। সংঘর্ষের ধাক্কায় স্কুটি এবং বাইক দু’টিই ছিটকে পড়ে রাস্তার একপাশে। স্কুটি আরোহী বিধান বিশ্বাস কয়েক ফুট দূরে ছিটকে পড়ে যান। মাথা ও শরীরের একাধিক অংশে গুরুতর আঘাত লাগে তাঁর। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন এবং আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। কেউ আহতদের জল দেন, কেউ আবার ফোন করে পুলিশ ও অ্যাম্বুল্যান্স ডাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিধান বিশ্বাসের আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং চরম উত্তেজনা ও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়।
মৃত যুবকের পরিচয় পাওয়া যায় বিধান বিশ্বাস (৩০) নামে। তিনি নদিয়া জেলার শান্তিপুর থানার মানিকনগর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিধান কাজের সূত্রে প্রায়ই বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে কী কাজে তিনি ওই সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। তাঁর অকালমৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। পরিবারের সদস্যরা এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না যে হাসিখুশি যুবকটি আর কখনও বাড়ি ফিরবেন না।
এই দুর্ঘটনায় বাইকে থাকা দু’জন আরোহী গুরুতরভাবে আহত হন। তাঁদের নাম শান্ত মল্লিক এবং বিল্টু মণ্ডল। দু’জনেই কালনা থানার নান্দাই গ্রাম পঞ্চায়েতের খরিনান গ্রামের বাসিন্দা। সংঘর্ষের পর তাঁরা রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা তৎপরতার সঙ্গে তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং পরে দ্রুত কালনা মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহত দু’জনেরই মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত রয়েছে। তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা বিশেষ পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। প্রয়োজনে তাঁদের বর্ধমান মেডিকেল কলেজ বা অন্য কোনও উচ্চতর চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
খবর পেয়ে নাদনঘাট থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশ দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাইক ও স্কুটিটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং আঘাতের মাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, অতিরিক্ত গতি এবং অসাবধানতাই এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে রাস্তার অবস্থা, যানবাহনের প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা অন্য কোনও কারণ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হবে না।
এই দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ফের এস টি কে কে সড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই সড়কে প্রায়ই যানবাহন অত্যধিক গতিতে চলাচল করে। পর্যাপ্ত স্পিড ব্রেকার, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং নিয়মিত পুলিশি নজরদারির অভাব রয়েছে। ফলে এই রাস্তায় প্রায়শই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের একাংশ জানান, দিনের বেলা যেমন দ্রুতগতির সমস্যা রয়েছে, তেমনই সন্ধ্যার পর এই রাস্তা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত আলো না থাকায় অনেক সময় চালকেরা সামনে আসা গাড়ি ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেন না। ফলে সামনাসামনি সংঘর্ষের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
এই ঘটনায় ফের একবার সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ সড়কগুলিতে যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে পরিকাঠামো ও নজরদারি বাড়েনি বলে অভিযোগ। দুর্ঘটনার পর সাময়িকভাবে আলোচনা শুরু হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা চাপা পড়ে যায়—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।
বিধান বিশ্বাসের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি সমাজের কাছেও এক কঠিন বার্তা। প্রতিদিনের যাতায়াত, কাজের প্রয়োজনে রাস্তায় বেরোনো মানুষের জীবনে যে কোনও মুহূর্তে এমন বিপদ নেমে আসতে পারে, এই দুর্ঘটনা তারই করুণ উদাহরণ। বেপরোয়া গতি, অসচেতন চালনা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি মিলেই এমন মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বারবার আবেদন জানিয়েও এই সড়কে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদি আগে থেকেই স্পিড নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি থাকত, তাহলে হয়তো এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।
বর্তমানে গোটা পারুলডাঙ্গা ও সংলগ্ন এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বৃহস্পতিবারের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর থেকে এলাকাজুড়ে থমথমে পরিবেশ। রাস্তার ধারে যেখানে প্রতিদিন যানবাহনের কোলাহল শোনা যেত, সেখানে এখন শুধুই চাপা নিস্তব্ধতা। স্থানীয় বাসিন্দারা একদিকে আহত শান্ত মল্লিক ও বিল্টু মণ্ডলের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন, অন্যদিকে অকালে প্রাণ হারানো বিধান বিশ্বাসের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনেরা বিধানের বাড়িতে ভিড় করে পরিবারটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, এই ক্ষতি কোনওভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।
বিধান বিশ্বাসের পরিবার এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তাঁর এই অকালপ্রয়াণ পরিবারের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কর্মক্ষম এক যুবককে হারিয়ে পরিবার শুধু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েনি, আর্থিক দিক থেকেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন আত্মীয়রা। এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, একটি মুহূর্তের অসতর্কতা কিংবা বেপরোয়া গতি কীভাবে গোটা পরিবারের জীবন চিরতরে বদলে দিতে পারে।
এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও দানা বাঁধছে। তাঁদের প্রশ্ন—এই সড়কে কি আদৌ কোনও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে? দুর্ঘটনার পরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে কিছুদিনের আলোচনার পর বিষয়টি আবার চাপা পড়ে যাবে। স্থানীয়দের দাবি, এস টি কে কে সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনার সমস্যা রয়েছে। বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও স্পিড ব্রেকার, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারির অভাব থেকেই যাচ্ছে।
এই মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা নতুন করে মনে করিয়ে দিল, সড়ক নিরাপত্তা কোনও বিলাসিতা নয়—এটি জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন। শুধু আইন-কানুন থাকলেই হবে না, তার সঠিক প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি চালকদের মধ্যেও সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছনোর তাগিদে অনেক সময় যে ঝুঁকি নেওয়া হয়, তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বিধান বিশ্বাসের মৃত্যু তারই এক নির্মম উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ সড়কগুলিতে যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে পরিকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়নি। ফলে প্রতিদিনের যাতায়াত ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার, কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং সড়কের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
এখন সবার মনেই একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই মৃত্যুর পর কি আদৌ কোনও স্থায়ী শিক্ষা নেওয়া হবে? নাকি বিধান বিশ্বাসের নামও ধীরে ধীরে আরও অনেক দুর্ঘটনার তালিকায় যুক্ত হয়ে যাবে? যতদিন না সচেতনতা, শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে, ততদিন এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার তালিকা শুধু দীর্ঘতরই হবে—এই আশঙ্কাই আজ সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।