Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পুজোয় ট্রেনের টিকিট নেই? গাড়ি নিয়ে ঘুরে আসুন ওডিশার ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’

পাহাড় কেটে নদীর তীব্র স্রোতে তৈরি হয়েছে অপূর্ব পাথুরে গিরিখাত—ওডিশার এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই পর্যটকদের মূল আকর্ষণ।

পুজোর ছুটিতে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু ট্রেনের টিকিট পাচ্ছেন না? তাহলে এবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন ওডিশার এক অপূর্ব অফবিট গন্তব্যের উদ্দেশে। পশ্চিম ওডিশার সুন্দরগড় জেলার পাহাড়, জঙ্গল, নদী এবং জলাধার ঘেরা এলাকায় লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি—কণাকুণ্ড গিরিখাত। স্থানীয়ভাবে এই জায়গাটি ওডিশার ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ নামেও পরিচিত। চারপাশের সবুজ পাহাড় আর তার মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া বিশাল পাথুরে গিরিখাত এই জায়গাটিকে করে তুলেছে অন্যরকম।

কণাকুণ্ডের কাছেই রয়েছে শান্ত-স্নিগ্ধ সরাফগড় ড্যাম ও নেচার ক্যাম্প। ফলে একই সফরে প্রকৃতির পাথুরে সৌন্দর্য, পাহাড়ি পরিবেশ, জলাধার, জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণের স্বাদ নেওয়া সম্ভব। যাঁরা ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে নিরিবিলি জায়গায় কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তাঁদের জন্য এই অঞ্চলটি বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে।

সরাফগড় এলাকায় নৌকাবিহারের অভিজ্ঞতাও পাওয়া যায়। সরকারি EcoTour Odisha-র বর্তমান প্ল্যাটফর্মে Sarafgarh Dam Boating-কে একটি তালিকাভুক্ত eco experience হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কণাকুণ্ড কেন ‘ওডিশার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’?

এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে কণাকুণ্ড গিরিখাত। নদীর দীর্ঘদিনের ক্ষয়প্রক্রিয়ায় পাহাড়ি পাথরের মধ্যে তৈরি হয়েছে খাড়া দেওয়ালের মতো গিরিখাত ও গভীর পাথুরে খাঁজ। প্রকৃতির এই ভূ-আকৃতিই জায়গাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

বর্ষার সময় নদীর জল বেড়ে গেলে গিরিখাতের চরিত্র বদলে যায়। জলের প্রবল স্রোত তখন পাথুরে অংশের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলে। অন্যদিকে শীতকালে জলস্তর কমে গেলে পাথরের নানা আকৃতি, খাঁজ এবং গিরিখাতের কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে ঋতুভেদে একই জায়গার সৌন্দর্যও বদলে যায়।

ফটোগ্রাফির জন্যও এই অঞ্চল যথেষ্ট আকর্ষণীয়। পাথুরে গিরিখাতের সঙ্গে চারপাশের সবুজ পাহাড় এবং নীল আকাশ মিলে তৈরি করে দারুণ প্রাকৃতিক দৃশ্য। তবে গিরিখাতের পাথুরে অংশে নামার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে বর্ষাকালে জলের স্রোত তীব্র থাকায় নদীর কাছে যাওয়া বা জলে নামা বিপজ্জনক হতে পারে।

সরাফগড় ড্যাম: পাহাড়-জঙ্গলের মাঝে নীল জল

কণাকুণ্ড দেখার পাশাপাশি সরাফগড় ড্যামও এই ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। পাহাড় এবং ঘন সবুজ জঙ্গলের মাঝে বিস্তৃত জলাধারের দৃশ্য শহুরে ব্যস্ততা থেকে একেবারেই আলাদা অনুভূতি দিতে পারে।

সকালবেলায় জলাধারের উপর আলো পড়ার দৃশ্য যেমন সুন্দর, তেমনই বিকেলের সূর্যাস্তও মন কেড়ে নিতে পারে। প্রকৃতিপ্রেমীরা দীর্ঘ সময় জলাধারের ধারে বসে চারপাশের নীরবতা উপভোগ করতে পারেন।

বর্তমানে EcoTour Odisha-র অভিজ্ঞতার তালিকায় Sarafgarh Dam Boating-ও রয়েছে। অর্থাৎ জলাধারের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নৌকাবিহারের সুযোগও পাওয়া যেতে পারে। তবে ভ্রমণের আগে বর্তমান পরিষেবা, সময়সূচি ও বুকিং সংক্রান্ত তথ্য সরকারি প্ল্যাটফর্মে দেখে নেওয়া ভালো।

পাখিপ্রেমীদের জন্যও আকর্ষণীয়

সরাফগড় জলাধার এবং আশপাশের বনাঞ্চল পাখি দেখার জন্যও আকর্ষণীয় হতে পারে। বিশেষ করে শীতকালে বিভিন্ন পাখির আনাগোনা বাড়তে পারে। তাই সঙ্গে দূরবীন এবং ক্যামেরা রাখলে ভালো।

ভোরবেলা পাখির ডাক শুনতে শুনতে জলাধারের ধারে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা এই সফরকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে। যাঁরা প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্যও এই এলাকা বেশ আকর্ষণীয়।

তবে পাখি বা বন্যপ্রাণী দেখার সময় তাদের বিরক্ত না করা এবং জঙ্গলের পরিবেশের কোনও ক্ষতি না করাই দায়িত্বশীল পর্যটনের মূল নিয়ম।

উষাকোঠি ঘুরে দেখার সুযোগ

কণাকুণ্ড ও সরাফগড়ের পাশাপাশি কাছাকাছি অঞ্চলের আরও কিছু জায়গা ভ্রমণ পরিকল্পনায় রাখা যেতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম উষাকোঠি। জঙ্গল, পাহাড় এবং বন্যপ্রাণের জন্য এই অঞ্চলটি পরিচিত।

উষাকোঠি ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির আশপাশে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে। জঙ্গল সাফারি বা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকলে সেটিও ভ্রমণসূচিতে যোগ করা যায়। তবে স্যাংচুয়ারি এলাকায় প্রবেশ, সাফারি এবং অন্যান্য কার্যকলাপের নিয়ম ও সময় ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাওয়ার আগে সরকারি নির্দেশিকা দেখে নেওয়া উচিত।

গুহা ও জলপ্রপাতের টান

এই অঞ্চলের ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে আশপাশের গুহা ও জলপ্রপাতও দেখা যেতে পারে। উষাকোঠি অঞ্চলের গুহাগুলি নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রাচীনত্ব ও রক আর্টের কথা প্রচলিত রয়েছে। তবে কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা গুহার দেওয়ালে আঁকা চিত্র স্পর্শ, ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট করা একেবারেই উচিত নয়।

এর পাশাপাশি কইলি ঘোঘার মতো জলপ্রপাতও প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করতে পারে। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে জলপ্রপাতের রূপ বদলে যায়। তবে জলপ্রপাতের কাছে পাথর ভিজে পিচ্ছিল থাকতে পারে। তাই ছবি তুলতে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় ওঠা বা জলের খুব কাছে যাওয়া এড়ানো জরুরি।

কোথায় থাকবেন?

সরাফগড় জলাধারের কাছেই রয়েছে Sarafgarh Nature Camp। প্রকৃতির মধ্যে রাত কাটাতে চান এমন পর্যটকদের জন্য এই ধরনের eco-camp আলাদা অভিজ্ঞতা দিতে পারে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এখানে কটেজ ও টেন্ট—দুই ধরনের থাকার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে।

জলাধারের কাছে থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগ করা এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ। শহরের হোটেলের মতো ব্যস্ত পরিবেশের বদলে এখানে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।

news image
আরও খবর

খাবারের ক্ষেত্রেও স্থানীয় ওডিয়া রান্নার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। তবে থাকার ব্যবস্থা, খাবার, কটেজের ধরন এবং বর্তমান ভাড়া বা availability ভ্রমণের আগে সরকারি EcoTour Odisha প্ল্যাটফর্মে যাচাই করে নেওয়া উচিত। EcoTour Odisha হল ওডিশার Forest, Environment & Climate Change Department-এর অধীন পরিচালিত সরকারি eco-tourism প্ল্যাটফর্ম।

কীভাবে যাবেন?

আকাশপথে:
এই অঞ্চলে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঝারসুগুড়ার Veer Surendra Sai Airport একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর। বিমানবন্দর থেকে গাড়ি ভাড়া করে সুন্দরগড় ও সরাফগড়ের দিকে যাওয়া যায়। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিমানবন্দর থেকে সরাফগড়ের দূরত্ব প্রায় ৬০-৭০ কিলোমিটারের মধ্যে।

রেলপথে:
ট্রেনে গেলে Jharsuguda Junction অথবা Rourkela-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ব্যবহার করা যেতে পারে। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছনো যায়। দূরত্ব ও রাস্তার পরিস্থিতি অনুযায়ী সময় লাগতে পারে, তাই যাত্রার আগে route planning করে নেওয়া ভালো।

সড়কপথে:
পুজোর ছুটিতে ট্রেনের টিকিট না পেলে সড়কপথই হতে পারে সবচেয়ে সুবিধাজনক বিকল্প। কলকাতা, ভুবনেশ্বর বা রৌরকেল্লা থেকে গাড়ি নিয়ে সুন্দরগড়ের দিকে যাওয়া যায়। নিজস্ব গাড়ি থাকলে আশপাশের একাধিক জায়গা একসঙ্গে ঘুরে দেখার সুবিধাও থাকে।

তবে পাহাড়ি ও জঙ্গলঘেরা এলাকায় রাতের বেলায় গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। দিনের আলোয় যাত্রা শেষ করার চেষ্টা করা ভালো।

কখন যাবেন?

কণাকুণ্ড ও সরাফগড় ভ্রমণের জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ সময়টিকে তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক সময় হিসেবে ধরা যায়। বর্ষার পর প্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে এবং শীতকালে আবহাওয়া সাধারণত ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক থাকে।

শীতকালে জলাধারের আশপাশে পাখি দেখার সুযোগও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে গিরিখাতের পাথুরে অংশও অনেক সময় পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।

তবে নির্দিষ্ট কোনও জায়গায় যাওয়ার আগে স্থানীয় আবহাওয়া, রাস্তার পরিস্থিতি এবং বন দফতরের নির্দেশিকা দেখে নেওয়া জরুরি।

কণাকুণ্ডে নামার সময় সতর্কতা

কণাকুণ্ডের পাথুরে গিরিখাত দেখতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিরাপত্তা। বর্ষাকালে নদীতে জলের স্রোত অত্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে। তাই বর্ষার সময়ে জলে নামা বা পাথরের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।

শীতকালে জল কম থাকলেও পাথর ভিজে থাকলে পিছলে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ভালো grip-এর জুতো পরা, একা না যাওয়া এবং স্থানীয়দের পরামর্শ মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাকৃতিক জায়গায় প্লাস্টিক, বোতল বা অন্য কোনও আবর্জনা ফেলে আসা উচিত নয়। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য বজায় রাখার দায়িত্ব পর্যটকদেরও।

আগে থেকে বুকিং করুন

সরাফগড়ের মতো অফবিট eco-destination-এ থাকার জায়গা সীমিত হতে পারে। তাই পুজোর ছুটিতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগে থেকেই থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া ভালো।

সরকারি EcoTour Odisha প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন nature camp এবং nature-based experience-এর তথ্য ও বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। Sarafgarh Dam Boating-ও বর্তমানে তাদের experience তালিকায় রয়েছে।

তবে ভ্রমণের তারিখের কাছাকাছি গিয়ে accommodation, boating, safari বা অন্য কোনও পরিষেবা চালু আছে কি না, তার সময়সূচি এবং বুকিংয়ের নিয়ম অবশ্যই পুনরায় যাচাই করে নিন।

এক সফরে প্রকৃতি, পাহাড়, নদী ও জঙ্গল

পুজোর ছুটিতে যদি দার্জিলিং, পুরী বা দিঘার চেনা ভিড় এড়িয়ে একটু অন্যরকম জায়গায় যেতে চান, তাহলে পশ্চিম ওডিশার এই পাহাড়-জঙ্গল-জলাধার ঘেরা অঞ্চল আপনার ভ্রমণ তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে।

কণাকুণ্ডের পাথুরে গিরিখাত, সরাফগড়ের নীল জল, নৌকাবিহার, জঙ্গলের সবুজ, পাখির ডাক, জলপ্রপাত এবং আশপাশের প্রকৃতি—সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হতে পারে এক অন্যরকম উইকএন্ড ট্রিপ। সবচেয়ে বড় কথা, ট্রেনের টিকিটের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে নিজের গাড়ি বা ভাড়া করা গাড়িতে রোড ট্রিপের পরিকল্পনাও করা যায়।

তবে অফবিট জায়গায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সৌন্দর্য উপভোগ করলেই হবে না, পরিবেশ এবং স্থানীয় নিয়মের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। জঙ্গলে শব্দ না করা, আবর্জনা না ফেলা, বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত না করা এবং বিপজ্জনক জলাশয় বা গিরিখাতে না নামাই হওয়া উচিত পর্যটকের প্রথম দায়িত্ব।

পুজোর ছুটিতে তাই একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা চাইলে পশ্চিম ওডিশার কণাকুণ্ড ও সরাফগড়কে ঘিরে একটি রোড ট্রিপের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। যাওয়ার আগে অবশ্যই সরকারি পর্যটন প্ল্যাটফর্মে থাকার ব্যবস্থা, boating, প্রবেশের নিয়ম, রাস্তার অবস্থা এবং স্থানীয় বিধিনিষেধের সর্বশেষ তথ্য দেখে নিন। EcoTour Odisha-তে বর্তমানে বিভিন্ন eco-destination, stay এবং nature-based experience-এর তথ্য পাওয়া যায়।

Preview image