Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আরজি কর রহস্যে চাঞ্চল্য: নির্মল-সহ তিন জনের গ্রেফতারি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ নির্যাতিতার পরিবার

নির্যাতিতার পরিবারের অভিযোগ, দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে বাধা দিয়ে তড়িঘড়ি দেহ দাহ করা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় নথিও পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি বলে দাবি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিন জনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আর্জি জানানো হয়েছে আদালতে।

আরজি কর রহস্যে চাঞ্চল্য: নির্মল-সহ তিন জনের গ্রেফতারি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ নির্যাতিতার পরিবার
রাজনীতি

আরজি কর হাসপাতালে মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে ফের তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার তদন্ত, প্রমাণ নষ্টের অভিযোগ এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে শুরু থেকেই একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। সেই আবহেই এ বার আরও তিন জনের গ্রেফতারির দাবি তুলে শিয়ালদহ আদালতের দ্বারস্থ হল নির্যাতিতার পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, গোটা ঘটনার পরবর্তী সময়ে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে এমন কিছু পদক্ষেপ করেছিলেন, যা তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণেই পানিহাটির তৎকালীন বিধায়ক নির্মল ঘোষ-সহ আরও দু’জন— সোমনাথ দাস এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবি তুলেছে পরিবার। বুধবার আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে ওই তিন জনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আর্জিও জানানো হয়েছে।

নির্যাতিতার পরিবারের বক্তব্য, তাঁদের মেয়ের মৃত্যুর পর গোটা ঘটনার পরিচালনায় একাধিক অসঙ্গতি চোখে পড়ে। অভিযোগ, নির্যাতিতার দেহের দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পরিবারের হাতে প্রয়োজনীয় নথি বা প্রক্রিয়াগত কাগজপত্র তুলে না দিয়েই তড়িঘড়ি দেহ দাহ করার ব্যবস্থা করা হয়। পরিবারের দাবি, এত দ্রুত দাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পেছনে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, এই সমস্ত ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত থাকতে পারেন ওই তিন ব্যক্তি। সেই কারণেই আদালতের মাধ্যমে তাঁরা দাবি তুলেছেন, অভিযুক্তদের হেফাজতে নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।

বুধবার শিয়ালদহ আদালতে মামলার শুনানিকে ঘিরে ছিল যথেষ্ট উত্তেজনা। আদালতে সিবিআইয়ের আইনজীবী সওয়াল করতে গিয়ে বলেন, তদন্তকারী সংস্থা কাকে গ্রেফতার করবে, তা নির্ধারণ করার অধিকার অন্য কারও নেই। তদন্তের স্বার্থে সংস্থাই সিদ্ধান্ত নেবে কোন পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি জানান, এই বিষয়ে সিবিআই নিজেদের তরফে একটি জবাব পেশ করতে চায়। তবে সেই বক্তব্যের বিরোধিতা করে নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী পাল্টা সওয়াল করেন যে, তদন্তে দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও এখনও অতিরিক্ত চার্জশিট জমা দেওয়া হয়নি, যদিও ২০২৪ সালে দাখিল হওয়া প্রথম চার্জশিটেই অতিরিক্ত চার্জশিটের উল্লেখ ছিল। পরিবারের আইনজীবীর বক্তব্য, এই বিলম্ব স্বাভাবিক নয় এবং এর ফলে তদন্তের গতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

পরিবারের আইনজীবী আদালতে আরও দাবি করেন, ঘটনার পরপরই কিছু ব্যক্তি অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে নির্মল ঘোষ এবং পরে সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আদালতে তিনি দাবি করেন, “তাঁরা দেহ হাইজ্যাক করে নেন।” অর্থাৎ, নির্যাতিতার পরিবারের মতামত বা সম্মতি উপেক্ষা করেই দ্রুত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেই কারণেই তাঁদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে দাবি জানানো হয়েছে।

এই মামলার রাজনৈতিক গুরুত্বও এখন ক্রমশ বাড়ছে। কারণ, আরজি কর-কাণ্ড ইতিমধ্যেই রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে এই ঘটনার প্রভাব স্পষ্ট ভাবে চোখে পড়েছে। পানিহাটিতে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী করেছিল নির্মল ঘোষের পুত্র তীর্থঙ্কর ঘোষকে। অন্য দিকে বিজেপি প্রার্থী করে নিহত নির্যাতিতার মা-কে। আবেগঘন এই নির্বাচনী লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হন নির্যাতিতার মা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ফলাফল শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও ন্যায়বিচারের দাবির প্রতিফলন।

নির্যাতিতার মা-র রাজনৈতিক ময়দানে প্রবেশ এবং জয়লাভ এই আন্দোলনকে আরও বড় মাত্রা দিয়েছে। মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, তা ধীরে ধীরে বৃহত্তর জনসমর্থন পেতে শুরু করে। নির্বাচনে জয়ের পরেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর মূল লক্ষ্য এখনও মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার আদায় করা। বুধবার আদালতে পৌঁছে তিনি বলেন, “এটার প্রায়োরিটি আগে। আমার মেয়ে আমার গোটা পৃথিবী ছিল। আমার এই জায়গাটা থাকবে মেয়ের জন্য অন্তত।” তাঁর এই বক্তব্য আদালত চত্বরে উপস্থিত বহু মানুষের আবেগকে নাড়া দেয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল বিজেপিও সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছে। নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার আগেই বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, আরজি কর-কাণ্ডে নতুন করে কমিশন গঠন করা হবে। বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণেই তিনি বলেন, “সন্দেশখালি থেকে আরজি কর— যেখানে যেখানে মা-বোন-কন্যাদের উপর অত্যাচার হয়েছে, সব কিছুর তদন্তে কমিশন বসবে। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। বিরোধীদের দাবি, রাজ্যে নারী নিরাপত্তা প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা ব্যর্থ এবং আরজি কর-কাণ্ড সেই ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

news image
আরও খবর

অন্য দিকে, শাসকদল এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। তৃণমূলের তরফে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া না মিললেও দলের একাংশের মতে, তদন্ত প্রক্রিয়া চলাকালীন রাজনৈতিকভাবে বিষয়টিকে ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে। তবে বিরোধীরা পাল্টা বলছে, এত গুরুতর ঘটনায় যদি নিরপেক্ষ তদন্তে কোনও বাধা না থাকে, তা হলে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেফতারির দাবিতে আপত্তির কারণ কী?

আরজি কর-কাণ্ড সামনে আসার পর থেকেই রাজ্য জুড়ে চিকিৎসক সমাজ, ছাত্রছাত্রী, নাগরিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। আন্দোলনের জেরে বহু বার রাজপথে নেমেছেন জুনিয়র ডাক্তাররা। তাঁদের দাবি ছিল, শুধু মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করলেই হবে না, গোটা ঘটনার পেছনে যদি কোনও প্রভাবশালী চক্র থাকে, তা হলে তাদেরও সামনে আনতে হবে।

পরিবারের নতুন এই আবেদন সেই দাবিকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষত দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে বাধা এবং তড়িঘড়ি দেহ দাহ করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, কোনও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের রিপোর্টই তদন্তের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সেখানে যদি কোনও প্রক্রিয়াগত ত্রুটি বা ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপ ঘটে থাকে, তা হলে গোটা তদন্তের উপরই তার প্রভাব পড়তে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আদালত যদি এই অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়, তা হলে তদন্তের পরিধি আরও বাড়তে পারে।

বুধবার আদালতে শুনানির পর বিচারক জানান, আগামী ৫ জুন মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। সেই দিন সিবিআই তাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আদালত এই মামলায় নতুন করে কোনও নির্দেশ দেয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে। কারণ, পরিবারের অভিযোগ এবং সিবিআইয়ের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য সামনে এসেছে। ফলে আগামী শুনানি এই মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ— সকলের নজর এখন এই মামলার উপর। নির্যাতিতার পরিবার এখনও বিশ্বাস করে, পুরো সত্য সামনে আসেনি। তাঁদের অভিযোগ, শুধু মূল অপরাধ নয়, ঘটনার পরবর্তী সময়ে যা যা ঘটেছে, সেগুলিও সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। সেই কারণেই তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁদের আশা, আদালতের হস্তক্ষেপে তদন্তে নতুন দিশা মিলবে এবং যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তাঁদের ভূমিকা সম্পর্কেও সত্য সামনে আসবে।

আরজি কর-কাণ্ড ইতিমধ্যেই বাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত এবং সংবেদনশীল ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি অপরাধের তদন্ত নয়, বরং প্রশাসনিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং বিচারব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থারও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং তদন্তকারী সংস্থার পদক্ষেপ এই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তবে আপাতত একটাই বিষয় স্পষ্ট— মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে নির্যাতিতার পরিবারের লড়াই এখনও থামেনি, বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

Preview image