রাতে শহরের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্ত করতে সদর পুলিশের বিশেষ টহল অভিযান পরিচালিত হয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার ও আবাসিক এলাকায় নজরদারি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শহরের রাত যেন আর শুধু অন্ধকারের নীরবতা নয়—এখন তা আইন-শৃঙ্খলার শক্ত খাঁচার ভেতরে আবদ্ধ এক সচেতন, সতর্ক, নিয়ন্ত্রিত সময়। গত কয়েক মাস ধরে শহরে ছোটবড় অপরাধের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছিল। বিশেষ করে সন্ধের পর মাতাল চালকদের উপদ্রব, বাইক স্কোয়াডের বেআইনি রেসিং, চুরি-ছিনতাই, বাড়িঘরে চুরি, পথচারীদের হেনস্থা, এমনকি বহিরাগত দুষ্কৃতীদের চলাচল—এসবই পুলিশ প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই সদর পুলিশ সিদ্ধান্ত নেয়, শহরের আইন-শৃঙ্খলা টাইট করতে রাতের বিশেষ টহল চালানো হবে, যা শুধু সাধারণ টহল নয়—একটি পরিকল্পিত, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে তৈরি বিশেষ অভিযান।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সদর থানার আঙিনায় বাড়তে থাকে ব্যস্ততা। অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) থেকে শুরু করে ট্রাফিক, উইমেন পেট্রোলিং টিম, সাইবার ইউনিট—সব বিভাগের অফিসাররা ব্রিফিং রুমে জড়ো হন। সেখানে প্রথমে দিনের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়—কোথায় অপরাধ বাড়ছে, কোন এলাকায় আলো কম, কোন রাস্তা জরাজীর্ণ, কোথায় অচেনা সন্দেহভাজনদের দেখা গেছে, কোথায় বেপরোয়া বাইক রাইডারদের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে—সব তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়।
ওসি-র নির্দেশ স্পষ্ট—
“আজ রাতের টহল হবে কঠোর, সর্বাঙ্গীন, এবং জিরো টলারেন্স নীতিতে।”
পুলিশ সদস্যরা সঙ্গে নেন অত্যাধুনিক টর্চ, বডিক্যাম, জিপিএস যুক্ত মোবাইল ডিভাইস, ওয়াকিটকি, ডিজিটাল নোটবুক এবং অবশ্যই পুলিশ ভ্যান, মোবাইল পেট্রোল ইউনিট ও বাইক পেট্রোল স্কোয়াড।
শহরকে রাতের অপারেশনের জন্য ৬টি জোনে ভাগ করা হয়েছে।
জোন–১: রেলস্টেশন, অটোস্ট্যান্ড, বাসটার্মিনাস
জোন–২: বাজার, শপিং কমপ্লেক্স, বাণিজ্যিক এলাকা
জোন–৩: কলেজ স্ট্রিট, স্কুল-কলেজ এলাকা
জোন–৪: হাসপাতাল ও আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ রোড
জোন–৫: আবাসিক এলাকা, ফ্ল্যাট কমপ্লেক্স
জোন–৬: উপকণ্ঠ, বাইপাস, অল্প আলোযুক্ত অঞ্চল
প্রতি জোনেই অন্তত একটি মোবাইল পেট্রোল গাড়ি, একটি বাইক স্কোয়াড এবং একটি ফুট পেট্রোলিং ইউনিট মোতায়েন হয়। এর ফলে কোনো ঘটনা ঘটলেও তাৎক্ষণিক সাড়া—রেসপন্স টাইম—একেবারে কয়েক মিনিটের মধ্যে নামিয়ে আনা গেছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ আসছিল, রাত বাড়লেই শহরের নির্জন জায়গাগুলোতে কিছু যুবক গাড়ি থামিয়ে জমায়েত করছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে মাদক সেবন, ব়েসিং, উচ্চ শব্দে গান বাজানো এবং সড়কে হাঙ্গামার অভিযোগ উঠেছিল।
সেই কারণেই সদর পুলিশের একটি বিশেষ টিমকে নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে—
বাইপাস সংলগ্ন অন্ধকার অঞ্চল
নদীর ধারের সেতু
ফাঁকা মাঠ সংলগ্ন রাস্তা
পুরনো শিল্পাঞ্চলের অব্যবহৃত শেড
এই চারটি এলাকায় রাতের পর রাত টহল অব্যাহত রাখা হয়েছে।
পুলিশের পেট্রোল ভ্যান থামতে না থামতেই পুলিশ সদস্যরা নামেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন, আইডি যাচাই করেন, প্রয়োজনে তল্লাশি চালান। সমাজবিরোধীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কয়েকজন পেশাদার অ্যান্টি-সোশ্যালকে শহরের বাইরে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সমস্যার সৃষ্টি হত মদ্যপ ড্রাইভিং এবং বেপরোয়া বাইক রেসিং নিয়ে।
ট্রাফিক পুলিশ তাই রাত ১০টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বড় রাস্তাগুলিতে নাকা চেকিং শুরু করেছে। সেখানে—
ব্রেথ অ্যানালাইজার দিয়ে পরীক্ষা
নথিপত্র যাচাই
হেলমেটবিহীন বাইক আরোহীকে জরিমানা
সাইলেন্সার খুলে রাখা বাইক বাজে শব্দে চালালে মামলা
ওভারলোডেড ট্রাক আটক
সন্দেহভাজন মালামালের গাড়ি পরীক্ষা
গত এক সপ্তাহে রাতের নাকা চেকিং থেকে মিলেছে অসংখ্য মামলা, জরিমানা আদায় হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। উচ্ছৃঙ্খল রেসারদের গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
এতে শহরের সাধারণ পথচারীদের ভরসা বেড়েছে।
শহরের বেশ কিছু জায়গা যেমন—
হাসপাতালের সামনে
কলেজ এলাকার মোড়
শপিং মলে যাওয়ার রাস্তা
বড় বাজারের পিছনের অলি
নির্জন বাসস্টপ
এগুলি রাতের দিকে মহিলাদের কাছে ভীতিকর হয়ে উঠত। অভিযোগ এসেছিল—উত্যক্ত করা, অশালীন মন্তব্য, মোবাইলে ছবি তুলে নেওয়া, এমনকি চুরি ও ছিনতাইয়েরও ঘটনা।
তাই সদর পুলিশ চালু করেছে উইমেন নাইট পেট্রোল টিম—যেখানে রাতেই নারী কনস্টেবলরা স্কুটি নিয়ে টহল দেন। তাঁরা সরাসরি মহিলাদের কাছে গিয়ে কথা বলেন, প্রয়োজন হলে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে শহরে এক নতুন ধরনের নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
২১ শতকের পুলিশি ব্যবস্থাপনা কেবল শারীরিক টহলে সীমাবদ্ধ নয়। সদর পুলিশ শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ৪০টিরও বেশি হাই-রেজোলিউশন সিসিটিভি বসিয়েছে। লাইভ মনিটরিং করা হয় থানার কন্ট্রোল রুমে। কোনো অস্বাভাবিক নড়াচড়া চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী টহল ইউনিটকে বার্তা পাঠানো হয়।
পাশাপাশি, টহলের সময় প্রত্যেক অফিসারের গায়ে থাকে বডিক্যাম। এতে—
আচরণগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত
অভিযোগ উঠলে সঠিক প্রমাণ পাওয়া
অপরাধী শনাক্ত করতে সুবিধা
তল্লাশি বা চেকিংয়ের সময় ভুল বোঝাবুঝি কমে যায়
এই দিকটি শহরের মানুষের চোখে পুলিশের প্রতি বিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
যেসব এলাকায় গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করা কঠিন—সেসব অলিগলিতে নিয়মিত ফুট পেট্রোলিং চলছে। তাঁরা—
খোলা দোকান বন্ধ করানো
সিসিটিভি কাজ করছে কি না দেখা
সন্দেহজনক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ
রাতের প্রহরীদের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি জানা
আবাসিক এলাকায় জেগে থাকা বাসিন্দাদের কাছ থেকে অভিযোগ নেওয়া
ফুট পেট্রোলের উপস্থিতি দুষ্কৃতীদের মধ্যে এক অস্বস্তি ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
একসময় শহরের কয়েকটি মৌজায় চুরির ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। চোরেরা প্রধানত—
বাড়ির পেছনের গেট
বারান্দা
পরিত্যক্ত ঘর
ফ্ল্যাট কমপ্লেক্সের নীচের তলা
গ্যারেজ এলাকা
এসব জায়গা দিয়ে প্রবেশ করত। তাই পুলিশের বিশেষ নাইট–ওয়াচ টিম এসব জায়গায় বিশেষ নজর রাখছে। কয়েকজন পুরনো কুখ্যাত চোরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলবও করা হয়েছে।
হোটেল–লজে অতিথিদের ডিটেইলস অনেকসময় ঠিকমতো নথিভুক্ত করা হয় না। এতে দুষ্কৃতীরা সহজেই আড়ালে থাকে। তাই সদর পুলিশ হোটেল আইন অনুযায়ী প্রত্যেক অতিথিশালায় রাতের চেকিং চালাচ্ছে।
নথিপত্র, রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ—সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে হোটেল কর্তৃপক্ষও আইনগতভাবে আরও সতর্ক হচ্ছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন প্রতারণা, জুয়া, বেআইনি মানি ট্রান্সফারের অভিযোগ বাড়ত। তাই সাইবার টিমও রাতজাগা, বিশেষ করে—
সন্দেহজনক আইপি ট্র্যাকিং
অবৈধ অনলাইন গেমিং
ফেক প্রোফাইলের অপব্যবহার
রাত ১টার পর ভুয়া লিঙ্ক পাঠানো প্রতারক চক্র
এই কাজগুলো নজরে রাখছে সাইবার সেল। কয়েকটি বড় প্রতারণা চক্রের হদিশও মিলেছে।
রাতের টহল শুরু হওয়ার পর—
অযাচিত জমায়েত কমেছে
মদ্যপ ড্রাইভিং কমেছে
চুরি-ছিনতাই প্রায় ৪৭% হ্রাস
বাইক রেসিং বন্ধ হওয়ার মুখে
মহিলারা স্বস্তিতে রাতের বাজার করতে পারছেন
ব্যবসায়ীদের আস্থা বেড়েছে
অ্যাম্বুল্যান্স যাতায়াত সহজ হয়েছে
শহরের সাধারণ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় পুলিশের প্রশংসা জানাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন—
“আগে রাতের শহরে ভয় ছিল, এখন সাহস আছে।”
রাতের টহলের সময় পুলিশ প্রায়ই—
রাত্রি প্রহরীদের সঙ্গে আড্ডা দেয়
রাস্তায় থাকা ভবঘুরেদের খাবার দেয়
হকারদের সমস্যা শোনে
প্রবীণ নাগরিকদের বাড়ি পৌঁছে দেয়
পথ হারানো শিশুদের পরিবার খুঁজে দেয়
এই মানবিক ভূমিকা পুলিশের প্রতি জনআস্থা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সদর পুলিশ জানিয়েছে—
আরও ২০টি সিসিটিভি বসবে
নতুন নাইট–ড্রোন নজরদারি চালু হবে
বিশেষ কুকুর স্কোয়াড বাড়ানো হবে
মহিলাদের জন্য ‘সেফ করিডর’ চিহ্নিত করা হবে
কিছু রাস্তায় স্মার্ট স্ট্রিটলাইট বসানো হবে
এতে টহল আরও কার্যকর ও দ্রুত হবে।
শহরের আইন-শৃঙ্খলা শুধুমাত্র পুলিশের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি সমাজেরও দায়িত্ব। তবু এই স্পষ্ট যে, সদর পুলিশের রাতের টহল শহরকে এক নতুন নিরাপত্তার আবরণে ঢেকে ফেলেছে। অপরাধীচক্রগুলিকে দমানো, নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং শহরের রাতকে আরও নিরাপদ ও শান্ত রাখার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ এক বড় সাফল্য।
রাত যতই গভীর হোক—
সদর পুলিশের নীল আলো জ্বলে থাকলে শহর নিশ্চিন্ত