Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নতুন শৌচালয় বানানো হলেও এখনও সমস্যায় জনতা—বাঁকুড়া পুরসভার দাবি-অভিযোগ

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও বীরভূমে নতুন শৌচালয় নির্মিত হলেও এখনও জনগণের জন্য সমস্যা রয়ে গেছে। অনেক শৌচালয় চালু হয়নি বা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন শৌচালয়গুলো কার্যকর করতে উদ্যোগী হলেও, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিচ্ছন্নতার অভাবে জনগণ সেগুলি ব্যবহার করতে পারছে না।

শৌচালয়ের সমস্যা রয়ে গেছে, নতুন শৌচালয় নির্মাণ সত্ত্বেও – পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বীরভূম, বাঁকুড়ার চ্যালেঞ্জ

প্রস্তাবনা:

বিগত কিছু বছরে, পশ্চিমবঙ্গের অনেক এলাকাতে নতুন শৌচালয়ের নির্মাণ কাজ হয়েছে, বিশেষত গ্রামীণ এবং আধা-শহরাঞ্চলগুলিতে। এটি একদিকে যেমন সরকারের বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে ছিল, তেমনি এটি জনগণের জন্য আরও উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, এই নতুন শৌচালয়গুলো সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না বা চালু হতে অনেক দেরি হচ্ছে। এতে জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। পুরুলিয়া, বীরভূম এবং বাঁকুড়া, এই তিনটি জেলার শৌচালয়ের সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আলোচনা করব এবং সরকারের এই উদ্যোগে সাফল্য এবং ব্যর্থতা নিয়ে বিস্তারিতভাবে জানাব।
 

পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ এলাকা এখন অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অনির্দিষ্ট মৌসুমী পরিবর্তনের সম্মুখীন হচ্ছে। গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ হচ্ছে, এবং শীতকাল তুলনামূলকভাবে কম। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হচ্ছে, যা জমির ক্ষতি করছে এবং আবাদি জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলি কৃষকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, কারণ তাদের এখন পুরানো চাষাবাদ পদ্ধতিগুলিকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ, ধান, গম, সরষে, আলু—এই ধরনের প্রধান ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং কৃষি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে, শুধু অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতই নয়, দীর্ঘকাল ধরে বজায় থাকা তাপমাত্রা বৃদ্ধিও কৃষির উপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে, গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রার উত্থান প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্পের সৃষ্টি করছে, যা চাষের জন্য অমঙ্গলজনক। এছাড়া, বিভিন্ন কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় জল সরবরাহের অভাবও দেখা দিচ্ছে। কিছু অঞ্চল যেখানে নদীর জল নির্ভর করে চাষাবাদ করা হয়, সেখানেও জল কমে যাচ্ছে।

১. পশ্চিমবঙ্গে শৌচালয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং নতুন উদ্যোগ

পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত গ্রামীণ এলাকায়, শৌচালয়ের সমস্যা দীর্ঘকালীন। যাদের শৌচালয়ের সুবিধা ছিল না, তারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে আসছিল। শৌচালয়ের অভাবে, মূত্রত্যাগ এবং শৌচক্রিয়া সাধারণত খোলা জায়গায় করার কারণে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হত। এর প্রভাব নারী, শিশু এবং বয়স্ক মানুষদের উপর সবচেয়ে বেশি পড়ত।

তবে, ২০১৪ সালের পরে গ্রামীণ এবং শহুরে স্যানিটেশন সুবিধা উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে। সেই প্রকল্পের অংশ হিসেবে, অনেক নতুন শৌচালয় নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক শৌচালয় নির্মিত হলেও, সেগুলি ঠিকভাবে ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না।
নদীভাঙন শুধুমাত্র চাষির জীবনকে বিপন্ন করছে না, বরং বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদও নষ্ট হচ্ছে। একদিকে, কৃষকরা তাদের জমি হারাচ্ছে, অন্যদিকে নদী থেকে মাছ ধরাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সমস্যাটি একে একে গাছপালা, বনভূমি, এবং জীববৈচিত্র্যের উপরও প্রভাব ফেলছে। সেই সঙ্গে, নদীভাঙনের কারণে জীবিকা হারানোর ভয়ে অনেকে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে, যার ফলে গ্রামীণ অঞ্চলগুলির অর্থনৈতিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

২. পুরুলিয়া, বীরভূম এবং বাঁকুড়া: নতুন শৌচালয়ের বাস্তবতা

পুরুলিয়া, বীরভূম এবং বাঁকুড়া—এই তিনটি জেলার মধ্যে বেশিরভাগ অঞ্চলের শৌচালয়গুলো একাধিক কারণে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় কারণ হলো, কিছু শৌচালয় শুধু নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই।

পুরুলিয়া জেলার পরিস্থিতি:

পুরুলিয়া জেলা, যেখানকার অধিকাংশ মানুষ গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাস করেন, সেখানকার শৌচালয়গুলির ব্যবহারে সমস্যা রয়েছে। নতুন শৌচালয় নির্মাণ হওয়ার পরেও, সেগুলি দীর্ঘদিন বন্ধ পড়ে থাকে। এর পিছনে প্রধান কারণ হলো, লোকবলের অভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনের অপ্রতুল ব্যবস্থা। মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে শৌচালয়ের অবস্থানও এমন জায়গায় যে, সেগুলি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

বীরভূম জেলার চ্যালেঞ্জ:

বীরভূমে, বিশেষত দুর্গম অঞ্চলে শৌচালয় নির্মাণ হলেও, সেখানে ব্যাবহারের অভাব দেখা দিয়েছে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে শৌচালয়গুলো এমন জায়গায় নির্মিত হয়েছে, যেখান থেকে সাধারণ মানুষ যেতে ইচ্ছুক নয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, শৌচালয় নির্মাণের পর সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা সঠিকভাবে গড়ে তোলা হয়নি। অধিকাংশ শৌচালয় নোংরা এবং সঠিকভাবে পরিষ্কার করা হয়নি, যা এর ব্যবহারে বিরোধ সৃষ্টি করছে।

news image
আরও খবর

বাঁকুড়ার শৌচালয় সমস্যা:

বাঁকুড়াতে, গ্রামীণ এবং মফস্বল এলাকার শৌচালয়ের অবস্থা একটু ভালো হলেও, আবারও সেগুলির ব্যবহারে অসুবিধা রয়েছে। অনেক এলাকায় সঠিকভাবে শৌচালয় পরিষ্কার রাখা হয় না, এবং অনেক জায়গায় পায়খানা ব্যবহার উপযোগী নেই। সঠিক পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা না থাকায় শৌচালয়গুলির অবস্থা নষ্ট হচ্ছে।
এছাড়া, মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের কারণে মাটির গঠনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। এই ভূমি অবক্ষয়ের ফলে গ্রামীণ এলাকায় কৃষির সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে উঠছে এবং মানুষের জীবিকা বিপন্ন হচ্ছে।

৩. জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সমস্যা

শৌচালয় ব্যবহারে এই সমস্যা জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় মূত্রত্যাগ বা শৌচক্রিয়া করা হলে, তা দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। এতে, কিডনি ও মলত্যাগজনিত রোগ, র‍্যাবিস, স্কিন ডিজিজসহ অন্যান্য রোগের সংক্রমণ বাড়ছে। এর মাধ্যমে শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, শহরাঞ্চলেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশেষত, মেয়েরা এবং বাচ্চারা শৌচালয় ব্যবহারে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। সঠিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকলে, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়।

৪. সরকারের পদক্ষেপ এবং ব্যর্থতা

এই ধরনের সমস্যা সমাধানে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ‘স্বচ্ছ ভারত’ অভিযান ও অন্যান্য জাতীয় স্যানিটেশন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যাতে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে টয়লেট তৈরি করা যায়। তবে, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক শৌচালয় ব্যবহারে অনীহা দেখা গেছে। সরকারের দায়বদ্ধতা ঠিকমতো পালন না হওয়ায়, জনগণ তাদের সুবিধা নিতে পারছে না।

সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব:

নির্মাণের পর, শৌচালয়গুলো সঠিকভাবে পরিষ্কার রাখা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে, স্থানীয় সরকার শৌচালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করছে না। ফলে, সেগুলির কার্যকারিতা ও সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি সচেতনতা তৈরি করা: কৃষকদের জন্য একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর জলবায়ু পরিবর্তন সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা উচিত। এতে কৃষকরা নতুন পরিবেশগত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলতে শিখবে এবং তাদের কৃষি পদ্ধতিকে আরও উন্নত করতে সক্ষম হবে।

নদীভাঙন প্রতিরোধের প্রকল্প: নদীভাঙন রোধে আধুনিক প্রকৌশল ব্যবহার এবং নদীর ধারের কাঁচামাল সংরক্ষণের কাজ করতে হবে। নদী শাসন এবং সঠিক জলবণ্টন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

ভূমির অবক্ষয় রোধ: মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে কৃষকদের জন্য টেকসই কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। উন্নত সার ব্যবস্থাপনা, ভূমির জৈব উন্নয়ন, এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে।

৫. জনগণের সচেতনতা এবং সমাধান

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় জনগণকে শৌচালয় ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। এছাড়া, শৌচালয়গুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব তৈরি করা যেতে পারে।
এছাড়া, একটি স্থায়ী পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্থানীয় জনগণেরও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের মানুষদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের জীবিকার জন্য টেকসই পদ্ধতির দিকে ঠেলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকার, স্থানীয় সংগঠন এবং পরিবেশগত সংস্থাগুলির সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে।

৬. উপসংহার:

পুরুলিয়া, বীরভূম এবং বাঁকুড়ার মতো এলাকার শৌচালয়ের অবস্থা আরও উন্নত করার জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। সরকারী উদ্যোগগুলোকে সঠিকভাবে কার্যকর করতে হবে, যাতে নতুন শৌচালয়গুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়। শুধু নির্মাণই যথেষ্ট নয়, বরং শৌচালয়গুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে এবং এক নিরাপদ পরিবেশ গড়ে উঠবে।
বেঙ্গলের গ্রামীণ অঞ্চলের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলি একদিকে যেমন মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করছে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য এক বৃহত্তর সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু, সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক পরিকল্পনা এবং একযোগে কাজ করার মাধ্যমে আমরা এই সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারি। আমাদের উদ্দেশ্য হতে হবে পরিবেশ, কৃষি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে একসঙ্গে সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

Preview image