কলকাতার রাস্তাঘাটের দুরবস্থা এখন উড়ালপুলেও ছড়িয়েছে। পিচের আস্তরণ উঠে জায়গায় জায়গায় বেরিয়ে পড়ছে নুড়িপাথর, ফাটল ধরা অংশে দেখা যাচ্ছে রড। ফলে গাড়ি চলাচলের সময় লাফিয়ে উঠছে, দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। বর্ষার জলে পিচ নরম হয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, ভারী যানচাপ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই এই অবনতি। প্রশাসন জানিয়েছে, শীঘ্রই শুরু হবে বড়সড় মেরামতির কাজ, যার মাধ্যমে উড়ালপুলগুলির খোলনলচে বদলে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘স্বাস্থ্যপরীক্ষা’ আগেই হয়েছিল, তাতে ‘রোগ’ও ধরা পড়েছে। কিন্তু সাময়িক ‘পিচের মলমে’ আর কাজ চলছে না। এবার সম্পূর্ণ অস্ত্রোপচারের পথে হাঁটছে শহর কলকাতা। আচার্য জগদীশচন্দ্র বোস রোড (এজেসি বোস রোড) উড়ালপুল এবং গড়িয়াহাট উড়ালপুল—এই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর খোলনলচে বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশনার্স (এইচআরবিসি)। কাজ শুরু হলে এই দুই উড়ালপুলই কয়েক দিনের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হতে পারে। আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
ঝড়বৃষ্টির মরসুম শেষ হতেই শহরের রাস্তাঘাটের দুরবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এমনকি উড়ালপুলেও মিলছে না স্বস্তি। পিচ উঠে বেরিয়ে পড়েছে নুড়িপাথরের কঙ্কাল, কোথাও কোথাও ফাটল আর গর্তের দখলে পুরো রাস্তা। এজেসি বোস রোড উড়ালপুলের উপরে চলাচল মানেই এখন ধাক্কা আর ঝাঁকুনি। রেসকোর্সের সামনে এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে পৌঁছনো অ্যাম্বুল্যান্সগুলিকেও সহ্য করতে হচ্ছে সেই ধাক্কা। আশ্চর্যের বিষয়, সংলগ্ন ‘মা উড়ালপুল’-এর রাস্তা মসৃণ ও ঝকঝকে, যা তুলনায় এজেসি বোস রোডের অবস্থা আরও চোখে পড়ার মতো করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এজেসি বোস রোড উড়ালপুলের সংস্কারে খরচ হবে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। এইচআরবিসি-র সচিব জ্যোতিষ্মান চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “দু’টি উড়ালপুলকেই সম্পূর্ণ সারাই করা হবে—শুধু উপরের প্যাচওয়ার্ক নয়, কাঠামোগত মেরামতির কাজও হবে। অনুমতি মিললেই কাজ শুরু হবে।”
গড়িয়াহাট উড়ালপুলের ক্ষেত্রেও অবস্থা শোচনীয়। মাত্র ৫৭১ মিটার দীর্ঘ হলেও এটি দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত উড়ালপুল। সর্বত্রই পিচ ক্ষয়ে বেরিয়ে এসেছে ছোট ছোট পাথর, মাঝের দিকে গর্ত তৈরি হয়ে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এখানে খরচ হবে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা। অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ হলেই কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে এইচআরবিসি।
এবারের সংস্কারে শুধুমাত্র পিচের নতুন স্তর দেওয়ার পরিকল্পনা নয়—উড়ালপুলের নীচের অংশেও বড়সড় কাজ হবে। স্ল্যাবের নীচে বেয়ারিং বদলানো, নিকাশি ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বৃষ্টির জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে মূল লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞদের আশা, এইবারের কাজের পর অন্তত কয়েক বছর এই উড়ালপুলগুলি টেকসই থাকবে।
এদিকে, যাদবপুরের জীবনানন্দ সেতুর অবস্থাও উদ্বেগজনক। সেতুর গায়ে ফাটল, রাস্তায় গর্ত এবং নীচে দেখা যাচ্ছে খালি জায়গা—যেখান দিয়ে নিচের রাস্তা পর্যন্ত দেখা যায়! স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের ফাঁকা অংশ বিপজ্জনক, যেকোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কলকাতা পুরসভার রাস্তার দায়িত্বে থাকা অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় অবশ্য জানিয়েছেন, “সেতু সংস্কারের দায়িত্ব পুরসভার নয়, তবে নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দফতরকে জানানো হয়।” তিনি বৃষ্টির মরসুমকেই দায়ী করেছেন পিচ উঠে যাওয়ার জন্য।
সব মিলিয়ে, শহরের ব্যস্ততম দু’টি উড়ালপুলে আসন্ন সংস্কার এখন সময়ের দাবি। তবে কাজ চলাকালীন যে যান চলাচলে বড়সড় প্রভাব পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।