রাজ্যজুড়ে জাঁকিয়ে বসেছে শীতের আমেজ। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ সব জায়গায়ই তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাচ্ছে। সকাল ও রাতের দিকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে সঙ্গে কুয়াশার চাদরে মোড়া পথঘাট। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস আগামী কয়েক দিন এই শীতের দাপট আরও বাড়বে।
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এখন শীতের পরশ ছড়িয়ে পড়েছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই সকালবেলার বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা অনুভূত হচ্ছে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার আস্ত চাদরে ঢেকে যাচ্ছে গ্রামের পথঘাট, শহরের ব্যস্ত রাস্তা, এমনকি নদীর ঘাট পর্যন্ত। সূর্যের আলো ঢুকতে ঢুকতে যেন কুয়াশার ফাঁক দিয়ে প্রকৃতি হাসছে এক মোলায়েম হাসি। বাংলার প্রকৃতি এখন পরিণত হয়েছে এক নিঃশব্দ কবিতায়, যার প্রতিটি শব্দের মধ্যে শীতের রঙ মিশে আছে।
এই সময়টা বাঙালির জীবনে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শীত মানেই উৎসবের ঋতু, মিষ্টির মৌসুম, পিঠে-পায়েসের সুবাসে ভরে থাকা রান্নাঘর, আর একের পর এক ভ্রমণের পরিকল্পনা। বছরের এই সময়টায় মানুষ যেন একটু বেশি শান্ত, একটু বেশি নিরিবিলি হয়ে ওঠে। সকালে চায়ের কাপ হাতে সূর্যের আলো পোহানো, বিকেলে পার্কে হাঁটাহাঁটি, আর রাতে কম্বল মুড়িয়ে গল্প শোনা সবই যেন এক প্রশান্তির পরশ এনে দেয়।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, হিমালয়ের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া দ্রুত নেমে আসছে, যার ফলে উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গেও তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। হিমাচল, উত্তরাখণ্ড ও জম্মু-কাশ্মীরের তুষারপাতের প্রভাবে উত্তর ভারতের বায়ুপ্রবাহ যখন দক্ষিণপূর্ব দিকে বয়ে যায়, তখন সেটিই বাংলায় শীতের আমেজ আনে। গত এক সপ্তাহ ধরে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলায় তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ভোরবেলা কুয়াশায় ঢেকে যায় চা-বাগানের সারি সারি গাছ, আর সন্ধ্যা নামলেই হাওয়া আরও ঠান্ডা হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়াও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, বর্ধমান সব জায়গাতেই সকাল ও রাতে হিমেল হাওয়ার ছোঁয়া টের পাওয়া যাচ্ছে। কলকাতার তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ১৬-১৭ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে। রাস্তার মোড়ে গরম চায়ের দোকানে এখন ভিড় বেড়েছে। স্কুলগামী বাচ্চারা সোয়েটার পরে বেরোচ্ছে, অফিসগামী মানুষদের হাতে কফির কাপ। পার্ক স্ট্রিট থেকে শুরু করে নিউ টাউন পর্যন্ত রাস্তায় আলোর সাজে উৎসবের আমেজ ফুটে উঠেছে।
শহরের সকাল এখন অনেক বেশি শান্ত। সূর্যের আলো যখন ভবনের ফাঁক দিয়ে এসে ঘুমন্ত জানালায় পড়ছে, তখন মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই মানুষকে নতুন দিনের আহ্বান জানাচ্ছে। কলকাতার বিকেলও এই সময় অন্যরকম সুন্দর। গরমের দমবন্ধ রোদ নেই, বরং আছে নরম আলোর ছোঁয়া। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, রবীন্দ্র সরোবর বা আলিপুর চিড়িয়াখানায় ভিড় বাড়ছে। শিশুরা রোদে খেলছে, বৃদ্ধেরা বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছেন, প্রেমিক-প্রেমিকারা হাঁটছেন হাত ধরে সব মিলিয়ে শহরের আবহাওয়া এখন স্বপ্নের মতো শান্ত ও মিষ্টি।
উত্তরবঙ্গের দৃশ্য আবার একেবারে অন্যরকম। দার্জিলিং, কালিম্পং, লাটাগুড়ি, ডুয়ার্স সব জায়গায়ই এখন পর্যটকদের ঢল। পাহাড়ে সকালের কুয়াশা, দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা রূপ, আর চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা কাপ সব মিলে যেন ছবির মতো এক স্বপ্নরাজ্য। স্থানীয় হোটেল ও হোমস্টেগুলিতে এখন ঘর পাওয়া মুশকিল। এই সময় ভ্রমণপ্রেমীরা ভিড় জমাচ্ছেন পাহাড়ি জায়গায়। পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এই বছর নভেম্বরের শেষ থেকেই উত্তরবঙ্গের পর্যটন ব্যবসা গত বছরের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গ্রামের দৃশ্যও কম সুন্দর নয়। ভোরবেলায় কুয়াশায় ঢাকা মাঠে কৃষকরা কাজ করছেন, খেতের ধারে ধোঁয়া উঠছে মাটির চুলা থেকে, আর আশেপাশে গরু-মুরগির ডাক শুনে মনে হয় জীবন কতটা সহজ, কতটা ছন্দে বাঁধা। শীতের সকালে ধানক্ষেতের গায়ে শিশিরবিন্দু ঝলমল করে ওঠে সূর্যের আলোয়। গ্রামের মায়েরা ঘরোয়া রান্নায় ব্যস্ত, পিঠে-পায়েস বানাচ্ছেন খেজুরের গুড় দিয়ে। গরম পিঠের গন্ধে যেন গোটা গ্রাম ভরে ওঠে।
বাংলার শীত মানেই মিষ্টির উৎসব। বাজারে এখন নতুন গুড় এসেছে, নলেন গুড়ের পায়েস, চিতই-পিঠে, দুধপুলি, আর পাটিসাপটার গন্ধে মুখর গোটা রাজ্য। শহরের রেস্তোরাঁয় চলছে “উইন্টার ফেস্টিভাল”, “পিঠে উৎসব” এবং “ফুড ফেয়ার”। মানুষজন দল বেঁধে যাচ্ছে পার্কে, মেলায়, বা নদীর ধারে পিকনিকে। শীত যেন এক উৎসবের নাম হয়ে উঠেছে।
তবে শীতের আনন্দের সঙ্গে কিছু অসুবিধাও আসে। ঘন কুয়াশার কারণে সকালবেলায় ট্রেন ও বিমানের সময়সূচিতে দেরি হচ্ছে। রাস্তার দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে এই সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, ঠান্ডার কারণে সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের রোগী বেড়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা আরও ২ থেকে ৩ ডিগ্রি হ্রাস পেতে পারে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কনকনে শীত নামতে পারে। মৌসম ভবন জানিয়েছে, এই বছরের শীত কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এল নিনো প্রভাবের কারণে এই বছর বৃষ্টিপাত কম হবে, ফলে বাতাস শুষ্ক থাকবে এবং ঠান্ডার প্রভাব বেশি অনুভূত হবে।
উত্তরবঙ্গে ইতিমধ্যেই হিমশীতল রাত শুরু হয়েছে। অনেক জায়গায় ঘাসের ওপর শিশির জমে থাকে সারারাত, আর সকালে সূর্যের আলো পড়তেই তা ঝিকমিক করে ওঠে। দার্জিলিংয়ে তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ৫ ডিগ্রির নিচে নেমে এসেছে। সিকিম ও কালিম্পংয়ের কিছু এলাকায় হালকা তুষারপাতের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। পর্যটকরা এই সময় পাহাড়ের রোমান্টিক পরিবেশ উপভোগ করছেন।
কলকাতা ও আশপাশের শহরগুলোয় মানুষজন এখন রোদের জন্য অপেক্ষা করেন। সকালে গরম কম্বল ছেড়ে উঠে জানালার পাশে বসে সূর্যের আলো পোহানো এখন অনেকের প্রিয় অভ্যাস। অফিসে যাওয়ার পথে গরম চায়ের দোকানে ভিড় জমে। কলেজের ছাত্রছাত্রীরা রোদের মধ্যে বসে আড্ডা দিচ্ছে, গাছের নিচে বই পড়ছে। এই সময়ের কলকাতা যেন অন্য এক ছন্দে বেঁচে ওঠে।
গ্রামীণ জীবনে শীতের অর্থ আবার আলাদা। কৃষকরা এখন ফসল কাটার কাজে ব্যস্ত। নতুন ধানের গন্ধে গ্রাম ভরে উঠেছে। খড়ের গাদায় বসে গরম রোদ পোহানো, বাচ্চাদের হইচই, আর সকালের কুয়াশায় ভেজা গাছের ডালে পাখির ডাকসব মিলিয়ে এক অন্যরকম আনন্দ। গ্রামীণ মহিলারা এই সময় বীজ বপনের প্রস্তুতিতেও ব্যস্ত থাকেন। শীতের আবহাওয়া কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত কারণ মাটি শুকনো থাকে না, আবার বেশি ভেজাও হয় না। ফলে বীজ দ্রুত অঙ্কুরিত হয়।
শহর আর গ্রামের শীতের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও অনুভূতি এক সব জায়গাতেই শীত মানে স্বস্তি, উচ্ছ্বাস, আর প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকা। শীতের রাতগুলো নির্জন হলেও তাদের মধ্যে একরাশ শান্তি লুকিয়ে থাকে। আকাশের তারা যেন আরও কাছে আসে, আর হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় মনটা প্রশান্ত হয়ে যায়।
এই ঋতুতে বাংলার সাংস্কৃতিক আবহও চাঙা হয়ে ওঠে। স্কুল, কলেজ, ক্লাব, সংগঠন সব জায়গায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, মেলা ও যাত্রা। বড়দিন ও নববর্ষের উৎসবের প্রস্তুতিতে পার্ক স্ট্রিট, নিউ টাউন, একবিংশ শতাব্দীর কলকাতা যেন এক আলোকোজ্জ্বল শহরে পরিণত হয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পিকনিক ও মেলার আয়োজন হয়, যা মানুষকে একত্রে বেঁধে রাখে।
তবে এই আনন্দের মাঝেও স্বাস্থ্য সচেতন থাকা জরুরি। আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা লাগা, গলা ব্যথা, ও হাঁচি-কাশির সমস্যা বাড়ে। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, রাতে ঘুমের সময় জানালা বন্ধ রাখতে, গরম পোশাক পরে বেরোতে, এবং বেশি করে গরম জল খেতে। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য বিশেষ যত্ন নেওয়া দরকার, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ শীতকে ভালোবাসে। এটি কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, বরং মানসিক এক প্রশান্তি। বছরের এই সময়টা যেন সবাইকে একটু থামিয়ে দেয়, একটু শান্ত করে তোলে। দিনগুলো ছোট হয়ে আসে, রাতগুলো লম্বা হয়, আর সেই নিরব রাতের মধ্যে মানুষ খুঁজে পায় নিজের ভেতরের নীরবতা।
এই শীতের ঋতু বাংলার সংস্কৃতি, কৃষি, পর্যটন, ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একদিকে এটি আনন্দের সময়, অন্যদিকে জীবনের এক বাস্তব ছন্দ। আবহাওয়া দফতরের মতে, এই বছর শীত আরও কিছুদিন স্থায়ী হবে এবং জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ঠান্ডার প্রভাব বজায় থাকবে।
বাংলার প্রকৃতি এখন এক প্রশান্ত ছবির মতো সাদা কুয়াশায় মোড়া সকাল, নরম রোদে ভরা দুপুর, আর কনকনে ঠান্ডায় মোড়া নীলচে রাত। শহর থেকে গ্রাম, পাহাড় থেকে সমতল সব জায়গাতেই শীতের এই ছোঁয়া মানুষকে একত্রে এনে দিয়েছে। এই ঋতু মানুষকে শেখায় ধৈর্য, শান্তি, আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাঁচার আনন্দ।
শীত কেবল আবহাওয়ার নাম নয়, এটি জীবনের এক কবিতার ঋতুযে খানে কুয়াশার চাদরের নিচে ঘুমিয়ে থাকে প্রশান্তি, আর রোদের কোমল আলোয় জেগে ওঠে জীবনের রঙ। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি কোণে এখন সেই কবিতার সুর বাজছে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছে শীতে