Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সিগন্যাল বিভ্রাটে ভোর থেকেই বিপর্যয়ে Kolkata Metro Blue Line: দক্ষিণেশ্বর থেকে বরাহনগর রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ

শনিবার সকালে সিগন্যাল সমস্যার জেরে কলকাতা মেট্রোর ব্লু লাইনে ট্রেন চলাচলে বড় বিঘ্ন ঘটে। দক্ষিণেশ্বর থেকে বরাহনগর পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়, অফিসযাত্রী থেকে সাধারণ যাত্রী—সবাই সমস্যায় পড়েন।

শনিবারের সকালটি কলকাতার বহু মানুষের কাছে যেন আচমকা এক দুঃস্বপ্নের মতো উপস্থিত হয়। নিত্যদিনের মতো অনেকে দক্ষিণেশ্বর, বরাহনগর, নোয়াপাড়া, শ্যামবাজার হয়ে শহরের মূল অংশে পৌঁছতে মেট্রো ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই ব্লু লাইনের ওপর ভর করে থাকা এই নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে থমকে গেল। সিগন্যালিং সিস্টেমে হঠাৎ ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দক্ষিণেশ্বর থেকে বরাহনগর পর্যন্ত মেট্রো চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং যাত্রীদের ওপর নেমে আসে তীব্র ভোগান্তি। ভোরবেলাতেই স্টেশনগুলোতে দেখা যায় অস্বাভাবিক ভিড়, অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগে ভরা মুখ। ট্রেন নেই, কবে আসবে কেউ জানে না—স্টেশনের ডিজিটাল বোর্ডেও দেখাচ্ছে কেবল ‘ট্রেন উপলব্ধ নয়’ বার্তা। যাত্রীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো দু-এক মিনিট দেরি হচ্ছে। কিন্তু সময় যত এগোতে থাকে, পরিষেবা বন্ধের অস্বস্তিকর সত্যিটা ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কলকাতা মেট্রোর এই অংশটি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও শহরের উত্তরাংশের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ দক্ষিণেশ্বর, বরাহনগর, নোয়াপাড়া হয়ে শ্যামবাজার, মহাত্মা গান্ধী রোড কিংবা কেন্দ্রীয় কলকাতার বিভিন্ন অংশে যাতায়াত করেন। এই রুটে মেট্রো চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে প্রায় সব বিকল্প পরিবহনের ওপর চাপ পড়ে। স্টেশন ছেড়ে যে সকল যাত্রী অটো, ট্যাক্সি বা বাস ধরতে বের হন, তারাও আরও সমস্যায় পড়েন কারণ বাইরে তখন অস্বাভাবিক ভিড়, দীর্ঘ যানজট ও ভাড়াবৃদ্ধির ঘটনা দেখা যায়। মেট্রোর ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে সামান্য বিপর্যয়ও পুরো এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থা অচল করে দিতে সক্ষম।

দক্ষিণেশ্বর স্টেশনে তখন দেখা যায় পরিবারের সঙ্গে বের হওয়া বয়স্ক মানুষ থেকে শুরু করে পরীক্ষার উদ্দেশে যাওয়া ছাত্রছাত্রী—সবাই উদ্বিগ্ন। অনেকেই অপেক্ষা করতে করতে স্টেশনের চেয়ারে বসে ফোনে বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করছেন। কেউ অফিসে ফোন করে জানাচ্ছেন যে দেরি হবে, কেউ আবার ভাবছেন আদৌ সময়মতো পৌঁছতে পারবেন কি না। দুপুর নাগাদ পরীক্ষায় পৌঁছতে হবে এমন কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে দেখা যায়, তারা বিভিন্ন স্টেশনে বারবার খোঁজ নিচ্ছেন কোনও ট্রেন চলছে কি না। কেউ কেউ আবার নিরুপায় হয়ে বাড়ি ফিরে যান কারণ বিকল্প পরিবহনে ওই সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

মেট্রো কর্তৃপক্ষের তরফে ঘোষণা শোনা যায় যে সিগন্যাল রিলে প্যানেলে গুরুতর ত্রুটি দেখা দিয়েছে এবং প্রযুক্তিগত ইঞ্জিনিয়াররা সমস্যাটি চিহ্নিত করে ঠিক করার চেষ্টা করছেন। সিগন্যাল প্যানেল মেট্রো পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে ট্রেনের গতিবিধি, ট্রেনের অবস্থান, ট্র্যাক পরিবর্তন, দিকনির্দেশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই অংশে সামান্য ত্রুটি দেখা দিলেই ট্রেন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আধুনিক মেট্রো ব্যবস্থায় সিগন্যাল সিস্টেম অত্যন্ত সেনসিটিভ। তাই কোনও ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চালানো যায় না। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে কর্তৃপক্ষ তৎক্ষণাৎ পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু যাত্রীরা অভিযোগ করেন, ঘোষণা করার সময় সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। কবে ট্রেন চলতে পারে, কতটা সময় লাগতে পারে—এমন কোনও অনুমানও জানানো হয়নি। ফলে যাত্রীরা আরও বেশি সমস্যায় পড়েন।

বরাহনগর ও নোয়াপাড়া স্টেশনেও একই বিশৃঙ্খলা। নোয়াপাড়ার মতো বড় স্টেশনে সকাল থেকেই প্রচুর যাত্রী ভিড় করেন কারণ এই স্টেশনটি একাধিক রুটের সংযোগস্থল। এখানে ট্রেন না চলায় যাত্রীরা হতাশ হয়ে পড়েন এবং পাশাপাশি এলাকার বাসস্ট্যান্ড ও অটোস্ট্যান্ডে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়। স্টেশন চত্বরের বাইরে তখন দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখে স্পষ্ট হতাশা ও রাগ। অনেক বয়স্ক যাত্রী বলেন, মেট্রো সাধারণত নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য পরিষেবা দিলেও মাঝে মাঝে এই ধরনের বিপর্যয় তাদের জন্য বড় অসুবিধা তৈরি করে। বিশেষ করে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বের হওয়া মানুষদের জন্য এমন পরিস্থিতি খুবই দুশ্চিন্তার।

দক্ষিণেশ্বর বা বরাহনগরের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে প্রতিদিন বহু মানুষ হাসপাতালে যান। এই মেট্রোর ওপর তাদের নির্ভরতা অত্যন্ত গভীর। মেট্রো পরিষেবা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ট্যাক্সি ধরেন কিংবা ভিড় ঠেলে বাসে ওঠেন। সেখানে আবার দীর্ঘ যানজট, রাস্তার ধীর গতি, এবং অস্বাভাবিক অস্বস্তি যাত্রীদের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কেউ কেউ ভিড়ের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেট্রোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ায় অভ্যস্ত যাত্রীরা যখন হঠাৎ খোলা রাস্তায় ভিড়ের মাঝে পড়েন, তখন অসুস্থতা বাড়ে এবং বিরক্তিও তীব্র হয়।

এদিকে, সিগন্যাল রক্ষণাবেক্ষণ দলের ইঞ্জিনিয়াররা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সব সার্কিট ও রিলে পরীক্ষা করতে শুরু করেন। আধুনিক রিলে সিস্টেমে কখনও কখনও অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চাপ, সার্কিট লিকেজ, কিংবা মাইক্রো-চিপের গ্লিচের কারণে হঠাৎ বিভ্রাট দেখা দিতে পারে। এই ধরনের ত্রুটি চিহ্নিত করতে সময় লাগে এবং ত্রুটি দূর করার আগে ট্রেন চালানো যায় না। ইঞ্জিনিয়ারদের সবাই ছুটে আসেন পরিস্থিতি সামাল দিতে। তারা বিভিন্ন স্টেশনের সিগন্যাল কন্ট্রোল রুমে গিয়ে প্রতিটি ইউনিট পরীক্ষা করেন। অনেকে বলেন, এই লাইনের নতুনত্ব থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন যাতে এই ধরনের সমস্যা না দেখা দেয়।

news image
আরও খবর

যাত্রীদের অনেকেই অভিযোগ করেন, মেট্রো কর্তৃপক্ষের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে সময়মতো আপডেট দেওয়া হয়নি। আধুনিক যুগে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা তৎক্ষণাৎ আপডেট দিতেন, তাহলে যাত্রীরা আগেই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারতেন। অনেকে বলেন, মেট্রো কর্তৃপক্ষ এ ধরনের পরিস্থিতিতে ‘শাটল বাস’ চালানো বা বিকল্প ব্যবস্থা দেওয়ার কথা ভাবতে পারে। যদিও মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সিগন্যাল সমস্যাটি অনুমান করা সম্ভব ছিল না এবং তারা যত দ্রুত সম্ভব পরিষেবা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন।

সময় যত এগোতে থাকে, যাত্রীদের হতাশা ততই বৃদ্ধি পায়। কর্মজীবীদের ক্ষেত্রে সময়মতো অফিসে না পৌঁছানো মানে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতছাড়া হওয়া, মিটিং মিস করা, কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তিরস্কার পাওয়া—এ সবই তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই বলেন, মেট্রোর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবায় যদি এই ধরনের সমস্যা বারবার দেখা দেয়, তাহলে তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। কারণ শহরের ব্যস্ততম সড়কপথে কোনও নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল।

মেট্রো পরিষেবা বন্ধ থাকলেও স্টেশনের নিরাপত্তা রক্ষীরা যাত্রীদের সাহায্য করার চেষ্টা করেন। তারা যাত্রীদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানান। কিন্তু যাত্রীদের একজন বলেন, যাত্রীদের ক্ষোভ বাড়া স্বাভাবিক, কারণ তাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছিলেন। বহু গৃহবধূ বাজার বা প্রয়োজনীয় কাজে বেরিয়ে পড়েছিলেন, এবং পরিষেবা বন্ধ থাকায় তারা বিকল্প পথ খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। বাচ্চাদের নিয়ে বেরোনো পরিবারগুলিও সমস্যায় পড়েন।

দুপুরের দিকে ধীরে ধীরে পরিষেবা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হলেও প্রথমদিকে ট্রেনগুলি খুব সীমিত গতিতে এবং সতর্কতার সঙ্গে চালানো হয়। টেকনিক্যাল টিম সিস্টেম ঠিক হওয়ার পরে প্রথমে ‘ট্রায়াল রান’ করে দেখে সবকিছু স্বাভাবিক আছে কি না। তারপরই যাত্রীদের ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে পরিষেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছু সময় লাগে এবং অনেক যাত্রী তখনও স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। এই সময় ঘোষণা করা হয় যে পরিষেবা চালু হলেও কিছুটা দেরি থাকতে পারে, তাই যাত্রীদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ করা হয়।

এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে বড় শহরের গণপরিবহনে প্রযুক্তিগত জটিলতা স্বাভাবিক হলেও তা কমিয়ে আনার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সঠিক পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক মেট্রো রেল পরিষেবায় সিগন্যালিং সিস্টেম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই অংশটি নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ও কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে রাখা প্রয়োজন। কলকাতা মেট্রো দেশের প্রথম মেট্রো রেল হওয়ায় এখানে উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ চলছে অনেক বছর ধরে। কিন্তু নতুন ব্লু লাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশে বারবার সমস্যা দেখা দিলে যাত্রীদের ভরসা ক্ষুণ্ণ হয়।

দিনের শেষভাগে পরিষেবা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সকালের সেই বিপর্যয় মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। অনেকেই মনে করেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের সমস্যা হলে মেট্রো কর্তৃপক্ষকে আরও দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যাত্রীরা চান, তাদের যে ভরসার ওপর প্রতিদিনের যাত্রা নির্ভর করে, সেই ভরসা যেন অটুট থাকে

Preview image