Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রাতে খাওয়ার পর ধূমপান ফুসফুসের বাইরেও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে শরীরের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ

খাওয়ার পর অনেকেরই ধূমপান করার অভ্যাস রয়েছে। কিন্তু এই অভ্যাস শুধু ফুসফুসের ক্ষতিই করে না, ধীরে ধীরে মারাত্মক ক্ষতি করে পাকস্থলীতেও। খাবার হজমে সমস্যা, অ্যাসিডিটি, গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস চললে হজমতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই খাবারের পর ধূমপান থেকে দূরে থাকাই শরীরের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

রাতে খাওয়ার পর ধূমপান ফুসফুসের বাইরেও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে শরীরের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ
স্বাস্থ্য সচেতনতা

ঝাল, তেল, মশলা সবই কমিয়ে দিয়েছেন। রাতের খাবারেও আর আগের মতো ভূরিভোজ নেই। বিরিয়ানি, পোলাও বা মাংসের লোভ সংযত করার চেষ্টা করছেন নিয়মিত। কখনও হালকা ভাত-ডাল-সবজি, কখনও আবার অল্প মাংসের স্টু আর রুটি সব মিলিয়ে খাবারের দিক থেকে যথেষ্ট সচেতন হয়েই চলেছেন। তবু সমস্যার যেন কোনও শেষ নেই। রাতে খেয়ে শুতে গেলেই গলা আর বুকে জ্বালা শুরু হয়। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় অস্বস্তিতে। সকালে উঠে মনে হয় পেট ঠিকমতো পরিষ্কার হয়নি, পেটে ব্যথা করছে, ভারী ভাব রয়ে গেছে। মনে হচ্ছে রাতের খাবারটা যেন হজমই হয়নি।

এই অভিজ্ঞতা কিন্তু আজ শুধু আপনার একার নয়। শহর থেকে গ্রাম সব জায়গাতেই বহু মানুষ একই সমস্যায় ভুগছেন। দিনের পর দিন তেল-ঝাল কমিয়ে, ডায়েট মেনে চলার পরেও কেন অম্বল, গ্যাস, বুকজ্বালা পিছু ছাড়ছে না এই প্রশ্নটাই ঘুরছে অনেকের মাথায়। অনেকে ধরে নেন, নিশ্চয়ই পাকস্থলীতে কোনও জটিল সমস্যা হয়েছে। কেউ আবার নিয়ম করে হজমের ওষুধ খাওয়া শুরু করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটা হচ্ছে।

হজমের সমস্যা মানেই ওষুধ এই ধারণা একেবারেই সঠিক নয়। বরং নিয়মিত হজমের ওষুধ খাওয়ার ফলে শরীর নিজের স্বাভাবিক হজমক্ষমতা হারাতে শুরু করে। পাকস্থলী ধীরে ধীরে ‘আলসে’ হয়ে যায়। সামান্য খাবার খেলেও তখন ওষুধ ছাড়া আর কাজ চলে না। অনেকেই আবার ভরসা রাখেন ঘরোয়া টোটকায় জোয়ানের জল, জিরে ভেজানো জল, ইসবগুল। এগুলো সাময়িক আরাম দিলেও সমস্যার মূল কারণ দূর করতে পারে না।

তাহলে এত সচেতনতার পরেও কেন এই অম্বল, গ্যাস, বুকজ্বালা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসে বিশেষ করে রাতের খাবারের পর কী করছি, সেটার মধ্যে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, অম্বল বা অ্যাসিডিটির সমস্যা শুধু কী খাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে না, বরং কখন খাচ্ছেন, কীভাবে খাচ্ছেন এবং খাওয়ার পর আপনার শরীর কী অবস্থায় থাকছে এই তিনটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাতের খাবারের সময় এবং তার পরের সময়টা আমাদের হজমতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল। দিনের বেলায় শরীর যতটা সক্রিয় থাকে, রাতে ঠিক ততটাই ধীরে চলে। সূর্যাস্তের পর থেকেই হজমশক্তি কমতে শুরু করে। তাই রাতে ভারী খাবার খেলে পাকস্থলীর উপর চাপ পড়ে। কিন্তু শুধু ভারী খাবারই নয়, হালকা খাবার খেলেও যদি কিছু ভুল অভ্যাস থাকে, তাহলে সমস্যা হবেই।

অনেকেরই অভ্যাস খাওয়ার সময় জল খাওয়ার। কেউ কেউ আবার এক গ্লাস নয়, রীতিমতো বোতল ভরে জল খান। এতে কী হয়? খাবারের সঙ্গে সঙ্গে জল খেলে পাকস্থলীর অ্যাসিড পাতলা হয়ে যায়। ফলে খাবার ভাঙার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। হজম অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরে সেই আধপাচা খাবার থেকেই গ্যাস, অম্বল, পেট ফাঁপার সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাওয়ার অন্তত আধ ঘণ্টা আগে বা খাওয়ার আধ ঘণ্টা পরে জল খাওয়া সবচেয়ে ভালো।

এর পরের বড় সমস্যা হলো খাওয়ার পর শরীরের নড়াচড়া না করা। অনেকেই রাতের খাবার খেয়েই সোফায় বসে পড়েন মোবাইল, টিভি বা ল্যাপটপ হাতে। কেউ কেউ আবার সরাসরি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েন। এই অভ্যাস পাকস্থলীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। খাওয়ার পর অন্তত ১৫–২০ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করলে হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে। এতে খাবার দ্রুত পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে পৌঁছাতে সাহায্য করে এবং গ্যাস জমার প্রবণতা কমে।

সবচেয়ে বড় ভুলটি হয় যখন রাতের খাবার আর ঘুমের মধ্যে সময়ের ব্যবধান খুব কম থাকে। অনেকেই রাত ১০টা বা ১১টায় খাওয়া সেরে ফেলেন এবং আধ ঘণ্টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন। এই অবস্থায় পাকস্থলীতে তৈরি হওয়া অ্যাসিড সহজেই খাদ্যনালি দিয়ে উপরে উঠে আসে। এর ফলেই বুকজ্বালা, গলা জ্বালা, টক ঢেঁকুরের মতো সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, ঘুমোতে যাওয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খাওয়া উচিত।

রাতের খাবারের ধরনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু তেল-ঝাল খাচ্ছেন না, তাই যতটা ইচ্ছে ততটা খাওয়া যায়। কিন্তু রাতের খাবার যতই স্বাস্থ্যকর হোক না কেন, পরিমাণ যদি বেশি হয়, তাহলেও সমস্যা হবেই। রাতে খাবার হওয়া উচিত দিনের সবচেয়ে হালকা মিল। কারণ রাতে শরীর বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়, তখন হজমতন্ত্র অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে পারে না।

এবার আসা যাক আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রায় অবহেলিত অভ্যাসের কথায় রাতে খাওয়ার পর ধূমপান।

অনেকেই আছেন, যাঁদের কাছে খাবারের পর সিগারেট যেন ‘ফুলস্টপ’-এর মতো। খাবার শেষ মানেই একটি সিগারেট। কেউ কেউ আবার বলেন, এতে নাকি হজম ভালো হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং খাবারের পর ধূমপান অ্যাসিডিটির সমস্যাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

সিগারেটের ধোঁয়া শুধু ফুসফুসের ক্ষতি করে না, এটি সরাসরি পাকস্থলী এবং খাদ্যনালিকেও প্রভাবিত করে। আমাদের খাদ্যনালির নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশি থাকে, যাকে বলা হয় লোয়ার ইসোফেজিয়াল স্পিঙ্কটার। এই পেশির কাজ হলো পাকস্থলীর অ্যাসিডকে নিচেই আটকে রাখা, যাতে তা উপরে উঠে খাদ্যনালিতে না আসে। ধূমপান এই পেশিটিকে শিথিল করে দেয়। ফলে পাকস্থলীর অ্যাসিড সহজেই উপরে উঠে আসে এবং শুরু হয় বুকজ্বালা, গলা জ্বালা, দীর্ঘমেয়াদি অম্বল।

শুধু তাই নয়, ধূমপান পাকস্থলীর ভেতরের আবরণকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাব আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস চলতে থাকলে গ্যাস্ট্রাইটিস, আলসার এমনকি খাদ্যনালির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

আরও ভয়ংকর দিক হলো, অনেকেই এই সমস্যাগুলোকে হালকা ভাবে নেন। ভাবেন, আজ একটু জ্বালা হচ্ছে, কাল ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিনের পর দিন এই উপসর্গ চলতে থাকলে তা ‘জিইআরডি’ নামের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগের রূপ নিতে পারে। তখন শুধু রাত নয়, দিনের বেলাতেও বুকজ্বালা, ঢেঁকুর, বমি বমি ভাব লেগে থাকে।

news image
আরও খবর

এই অবস্থায় সমাধান একটাই ওষুধের উপর নির্ভর না করে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা। রাতের খাবারের সময় ঠিক করা, খাবারের পর কিছুটা হাঁটা, ঘুমের আগে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাতে খাওয়ার পর ধূমপান একেবারে বন্ধ করা।

চিকিৎসকেরা প্রায় একবাক্যে বলেন, হজমের সমস্যা বা অম্বলের মতো উপসর্গের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ওষুধ হলো অভ্যাস পরিবর্তন। কিন্তু এই কথাটা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে তা মানা ততটাই কঠিন। বিশেষ করে যাঁরা বছরের পর বছর একটি নির্দিষ্ট রুটিনে অভ্যস্ত, তাঁদের কাছে হঠাৎ করে রাতের খাবারের সময় বদলানো, খাওয়ার পর হাঁটার অভ্যাস তৈরি করা বা ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া মানসিকভাবে বেশ চাপের। তাই চিকিৎসকেরা আগেই সতর্ক করে দেন শুরুতে একটু অস্বস্তি হবেই। শরীর যেমন পুরনো অভ্যাসে অভ্যস্ত, তেমনই মনও সেই ছকে বাঁধা। কিন্তু নিয়ম মেনে কয়েক সপ্তাহ চললেই শরীর নিজেই পরিবর্তনের সংকেত দিতে শুরু করে।

প্রথম যে পরিবর্তনটা বেশির ভাগ মানুষই টের পান, তা হলো বুকজ্বালা কমে যাওয়া। যাঁরা প্রতিদিন রাত হলেই বুকে আগুন জ্বলার মতো অনুভূতিতে ভুগতেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সেই জ্বালাভাব হালকা হতে শুরু করে। রাতে শুয়ে পড়ার পর আর গলা পর্যন্ত টক জল উঠে আসার অনুভূতি থাকে না। মাঝরাতে আর ঢেঁকুর বা অস্বস্তির কারণে ঘুম ভাঙে না। অনেকেই বলেন, দীর্ঘদিন পর রাতে শান্তিতে ঘুমোতে পারছেন।

এর পরের বড় পরিবর্তনটা দেখা যায় সকালে। যাঁদের প্রতিদিন সকালে পেট পরিষ্কার হতে সমস্যা হতো, যাঁরা ঘুম থেকে উঠেই পেটের ভারী ভাব বা ব্যথা নিয়ে দিন শুরু করতেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই উপসর্গগুলোও ধীরে ধীরে কমে আসে। সকালে উঠে আর মনে হয় না যে রাতের খাবারটা হজম হয়নি। বরং শরীর হালকা লাগে, মনও তুলনামূলকভাবে ফুরফুরে থাকে। চিকিৎসকদের মতে, এটি আসলে হজমতন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার লক্ষণ।

রাতের ঘুম গভীর হওয়াটাও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। অম্বল বা অ্যাসিডিটির সমস্যায় যাঁরা ভোগেন, তাঁদের অনেকেরই ঘুমের সমস্যা থাকে। কেউ মাঝরাতে বারবার জেগে ওঠেন, কেউ আবার সকালে উঠে ক্লান্ত বোধ করেন, যদিও রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় ছিলেন। অভ্যাস বদলানোর কয়েক সপ্তাহ পর এই চিত্রটা বদলাতে শুরু করে। গভীর ঘুম শরীরকে বিশ্রাম দেয়, হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখে এবং পরোক্ষভাবে হজমক্ষমতাও বাড়ায়।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটে পাকস্থলীর ভিতরে, যদিও তা চোখে দেখা যায় না। পাকস্থলী ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা ফিরে পায়। অ্যাসিড নিঃসরণ নিয়ন্ত্রিত হয়, খাবার ভাঙার প্রক্রিয়া সঠিক পথে ফিরে আসে। আগে যেখানে সামান্য ভুল খাবার খেলেই সমস্যা হতো, সেখানে শরীর একটু বেশি সহনশীল হয়ে ওঠে। চিকিৎসকেরা বলেন, এটিই প্রমাণ করে যে ওষুধ নয়, সঠিক অভ্যাসই হজমতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভরসা।

অম্বল, গ্যাস বা হজমের সমস্যা এই শব্দগুলো শুনলে অনেকেই ভাবেন, এগুলো তো খুব সাধারণ সমস্যা। আজকাল প্রায় সবারই একটু-আধটু গ্যাস হচ্ছে, অম্বল হচ্ছে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়। এই সমস্যাগুলোকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে ধীরে ধীরে সেগুলো শরীরের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রথমে শুধু অস্বস্তি, পরে তা রূপ নিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রিক সমস্যায়, খাদ্যনালির প্রদাহে কিংবা আলসারের মতো জটিল রোগে।

শহুরে জীবনে কাজের চাপ, অনিয়মিত খাওয়া, দেরিতে ঘুমানো সব মিলিয়ে হজমের সমস্যা যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। অনেকেই এটাকে জীবনযাপনের স্বাভাবিক অংশ বলে মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন, শরীরের এই সংকেতগুলোকে উপেক্ষা করা মানেই ভবিষ্যতের জন্য সমস্যা জমিয়ে রাখা। কারণ হজমতন্ত্র ভালো না থাকলে শরীর ঠিকমতো পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না। তার প্রভাব পড়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার উপর, ত্বক থেকে শুরু করে মন-মেজাজ সবকিছুর উপর।

এই কারণেই চিকিৎসকেরা শুধু কী খাচ্ছেন, সেটার দিকে নজর দিতে বলেন না। বরং কীভাবে খাচ্ছেন এবং খাওয়ার পর কী করছেন, এই বিষয়গুলোর উপর সমান গুরুত্ব দেন। অনেক সময় দেখা যায়, একজন মানুষ খুব স্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছেন, তেল-ঝাল প্রায় ছুঁছেন না, তবু সমস্যায় ভুগছেন। কারণ খাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করছেন, খাবার ভালো করে চিবোচ্ছেন না, কিংবা খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ছেন। এই ছোট ছোট ভুলগুলোই ধীরে ধীরে বড় সমস্যার জন্ম দেয়।

খাওয়ার অভ্যাস আসলে শুধু পাকস্থলীর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এটি পুরো শরীরের ছন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কখন খাবেন, কতটা খাবেন, কতক্ষণ পর বিশ্রাম নেবেন এই সব কিছুর একটি স্বাভাবিক তাল আছে। আধুনিক জীবনে আমরা সেই তালটা ভেঙে ফেলেছি। কখনও খুব দেরিতে খাচ্ছি, কখনও আবার খাওয়ার পরপরই স্ক্রিনের সামনে বসে যাচ্ছি। শরীর তখন তাল মেলাতে না পেরে নানা উপসর্গের মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করে দেয়।

এই সতর্কবার্তাগুলোকেই আমরা অম্বল, গ্যাস, পেটের ব্যথা বলে হালকাভাবে এড়িয়ে যাই। সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার বদলে আমরা সহজ সমাধানের খোঁজ করি। একটি ট্যাবলেট খেলেই যদি আরাম মেলে, তাহলে অভ্যাস বদলানোর ঝামেলা কেন নেব এই মানসিকতাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। কারণ ওষুধ সাময়িকভাবে উপসর্গ ঢেকে দিলেও সমস্যার শিকড় থেকে যায়।

চিকিৎসকেরা তাই বলেন, সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ উপায় অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট পরিবর্তনের মধ্যেই। রাতের খাবার একটু আগে খাওয়া, খাওয়ার পর কয়েক মিনিট হাঁটা, ঘুমোতে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখা, ধূমপান বা অতিরিক্ত চা-কফির অভ্যাস কমানো এই পরিবর্তনগুলো আলাদা করে খুব কঠিন নয়। কিন্তু এগুলোর সম্মিলিত প্রভাব শরীরের উপর গভীর।

এই পরিবর্তনগুলো মানলে শুধু অম্বল বা গ্যাসই কমে না, বরং সার্বিকভাবে শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মন ভালো থাকে, কাজে মন বসে, দিনের মধ্যে অকারণে ক্লান্তি আসে না। দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌যন্ত্র, লিভার এবং হরমোনের ভারসাম্যের উপরও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরীরের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া তৈরি হওয়া। শরীর কী চাইছে, কখন ক্লান্ত হচ্ছে, কখন বিশ্রাম দরকার এই সংকেতগুলো বুঝতে শেখা। অম্বল বা হজমের সমস্যা আসলে শরীরের ভাষায় বলা একটি সতর্কবার্তা। সেই বার্তাকে গুরুত্ব দিলে শরীরও ধীরে ধীরে আমাদের সহযোগিতা করতে শুরু করে।

তাই সুস্থ থাকার জন্য সব সময় বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় রাতের খাবারের পরের সেই ছোট্ট সময়টুকু, সেই কয়েক মিনিটের হাঁটা, কিংবা একটি অভ্যাস ছাড়ার সিদ্ধান্তই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান এনে দিতে পারে। শরীরের যত্ন মানে শুধু ভালো খাবার খাওয়া নয়, বরং সঠিক সময়ে, সঠিক নিয়মে এবং সঠিক অভ্যাসের সঙ্গে জীবনযাপন করাই প্রকৃত সুস্থতার চাবিকাঠি।

Preview image