ভারতের নীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে সমুদ্রের ৫০০ মিটার গভীরে তৈরি হলো ভারতের প্রথম আন্ডারওয়াটার সিটি বা জলের তলার শহর মৎস্য নগর। প্রধানমন্ত্রী আজ এই ফিউচারিস্টিক হ্যাবিট্যাট বা বাসস্থানের উদ্বোধন করলেন। এখানে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করবেন এবং পর্যটকরা সমুদ্রের রহস্যময় জগত উপভোগ করতে পারবেন।
মানুষ চাঁদে গেছে মঙ্গলে রোভার পাঠিয়েছে কিন্তু নিজের গ্রহের সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে খুব কমই জানে। পৃথিবীর তিন ভাগ জল অথচ সেই জলের নিচের জগত আমাদের কাছে আজও এক অজানা রহস্য। কিন্তু আজ থেকে সেই রহস্য আর রহস্য থাকবে না। ভারতের বিজ্ঞানীরা অসাধ্য সাধন করে দেখালেন। আন্দামান সাগরের গভীরে তৈরি হলো ভারতের এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মানুষের বসবাসযোগ্য জলের তলার শহর। এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে মৎস্য নগর। আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রী একটি বিশেষ সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজে করে সমুদ্রের নিচে গিয়ে এই শহরের উদ্বোধন করেন।
সমুদ্রের নিচে এক টুকরো ভারত
পোর্ট ব্লেয়ার থেকে প্রায় ৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে নীল দ্বীপের কাছে এই শহরটি তৈরি করা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার বা দেড় হাজার ফুট নিচে এই শহরটি অবস্থিত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে যেন কয়েকটি বিশাল কাঁচের গম্বুজ বা ডোম সমুদ্রের তলদেশে বসানো আছে। এই গম্বুজগুলো একে অপরের সাথে স্বচ্ছ টানেল দিয়ে যুক্ত। শহরের আয়তন প্রায় ২০ একর। এখানে একসাথে ২০০ জন মানুষ থাকতে পারবেন। বর্তমানে ১০০ জন বিজ্ঞানী এবং ২০ জন ক্রু সদস্য বা কর্মী এখানে বসবাস শুরু করেছেন।
প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা
জলের নিচে ৫০০ মিটার গভীরে জলের চাপ বা ওয়াটার প্রেসার প্রচণ্ড। সাধারণ সাবমেরিন বেশিক্ষণ এই চাপ সহ্য করতে পারে না। তাই মৎস্য নগরের দেওয়াল তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ধরনের টাইটানিয়াম সংকর ধাতু বা অ্যালয় দিয়ে যা ইস্পাতের চেয়েও শক্ত কিন্তু ওজনে হালকা। গম্বুজগুলোর কাঁচ হলো এক্রাইলিক গ্লাস যা বুলেটপ্রুফ এবং অত্যধিক চাপ সহ্য করতে সক্ষম।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অক্সিজেনের জোগান। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই শহরে বাতাস সরবরাহ করার জন্য সমুদ্রের ওপর থেকে কোনো পাইপ নামানো হয়নি। বরং শহরের ভেতরেই রয়েছে বিশাল অক্সিজেন জেনারেটর যা সমুদ্রের জলকে ইলেকট্রোলাইসিস বা তড়িৎ বিশ্লেষণ করে অক্সিজেন তৈরি করে। কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করার জন্য রয়েছে কৃত্রিম গাছ বা বায়ো রিয়্যাক্টর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ওশেন থার্মাল এনার্জি কনভারশন বা ওটেক প্রযুক্তি। অর্থাৎ সমুদ্রের ওপরের গরম জল এবং নিচের ঠান্ডা জলের তাপমাত্রার পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা হচ্ছে।
মৎস্য নগরের অন্দরমহল
শহরের ভেতরে ঢুকলে মনে হবে আপনি কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার সেটে আছেন। চারপাশের দেওয়াল স্বচ্ছ তাই আপনি সোফায় বসে চা খেতে খেতে দেখতে পাবেন বিশাল তিমি বা হাঙর আপনার পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে যাচ্ছে। রঙবেরঙের কোরাল বা প্রবাল এবং অদ্ভুত সব সামুদ্রিক প্রাণী আপনার প্রতিবেশী। এখানে রয়েছে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগার লিভিং কোয়ার্টার বা থাকার ঘর জিমনেসিয়াম বা ব্যায়ামাগার এবং একটি ছোট সিনেমা হল।
বিজ্ঞানীদের জন্য এখানে রয়েছে ডিপ সি মাইনিং বা গভীর সমুদ্রের খনি গবেষণার ব্যবস্থা। ভারত মহাসাগরের তলদেশে রয়েছে পলিমেটালিক নোডিউল বা বহু মূল্যবান খনিজ পদার্থ যেমন ম্যাঙ্গানিজ নিকেল এবং কোবাল্ট। এই খনিজগুলো ব্যাটারি এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মৎস্য নগরের বিজ্ঞানীরা রোবট পাঠিয়ে এই খনিজগুলো আহরণ করার উপায় খুঁজবেন।
পর্যটনের নতুন দিগন্ত
তবে মৎস্য নগর কেবল বিজ্ঞানীদের জন্য নয়। এর একটি অংশ পর্যটকদের জন্যও খুলে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের ধনকুবের এবং রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকরা এখানে এসে থাকতে পারবেন। এর জন্য তৈরি করা হয়েছে মৎস্য ভিলা। এখানে এক রাত থাকার খরচ প্রায় ৫ লক্ষ টাকা। তবে এই ভিলা থেকে সমুদ্রের যে দৃশ্য দেখা যায় তা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা সম্ভব নয়। পর্যটকদের জন্য রয়েছে আন্ডারওয়াটার ওয়াক বা জলের নিচে হাঁটার ব্যবস্থা। বিশেষ ধরনের ডাইভিং সুট পরে তারা সমুদ্রের তলদেশে হাঁটতে পারবেন এবং সামুদ্রিক প্রাণীদের স্পর্শ করতে পারবেন।
নীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি
প্রধানমন্ত্রী তার উদ্বোধনী ভাষণে বলেন ভারত মহাসাগর হলো আমাদের ভবিষ্যৎ। মৎস্য নগর আমাদের নীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এখান থেকে আমরা সমুদ্রের ঔষধ বা মেরিন মেডিসিন নিয়ে গবেষণা করব। অনেক সামুদ্রিক শ্যাওলা এবং স্পঞ্জ থেকে ক্যান্সারের ওষুধ পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম রক্ষা করার জন্য আমরা এখান থেকে নজরদারি চালাতে পারব। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে এবং কোরাল ব্লিচিং বা প্রবাল ধ্বংস হচ্ছে। মৎস্য নগর থেকে বিজ্ঞানীরা এই পরিবর্তনগুলো খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
খাদ্য নিরাপত্তা এবং মেরি কালচার
জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে পৃথিবীতে খাদ্যের সংকট দেখা দিচ্ছে। মৎস্য নগরে শুরু হয়েছে মেরি কালচার বা সামুদ্রিক চাষ। এখানে বিশেষ ধরনের খাঁচায় মাছ এবং চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। এছাড়াও সি উইড বা সামুদ্রিক আগাছা চাষ করা হচ্ছে যা পুষ্টিগুণে ভরপুর। বিজ্ঞানীরা বলছেন আগামী দিনে সমুদ্রই হবে আমাদের খাদ্যের প্রধান উৎস। এই শহর সেই লক্ষ্যের দিকেই একটি বড় পদক্ষেপ।
চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকি
অবশ্যই জলের নিচে থাকার অনেক ঝুঁকি আছে। যদি কোনো কারণে গম্বুজে ফাটল ধরে তবে মুহূর্তের মধ্যে জল ঢুকে সব কিছু ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ভয়ের কথা মাথায় রেখে মৎস্য নগরে রয়েছে অটোমেটেড এমার্জেন্সি রেসপন্স সিস্টেম বা স্বয়ংক্রিয় জরুরি ব্যবস্থা। যদি কোনো সেন্সর বিপদ সংকেত দেয় তবে সঙ্গে সঙ্গে সেই অংশটি বা কম্পার্টমেন্টটি সিল করে দেওয়া হবে এবং বাকি শহরটি সুরক্ষিত থাকবে। এছাড়াও রয়েছে এস্কেপ পড বা পালানোর ক্যাপসুল যা যাত্রীদের নিয়ে দ্রুত সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারবে।
মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা বা সাইকোলজিক্যাল এফেক্ট
সূর্যের আলো না দেখে দীর্ঘদিন জলের নিচে থাকলে মানুষের মনে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন আসতে পারে। তাই মৎস্য নগরের ভেতরে কৃত্রিম সূর্যালোক বা আর্টিফিশিয়াল সানলাইট এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে আলো বাড়ে এবং কমে যাতে শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক বা দেহঘড়ি ঠিক থাকে। এছাড়াও বিনোদনের জন্য ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা ভিআর গেম এবং লাইব্রেরি রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ভারতের এই সাফল্যে বিশ্বজুড়ে সাড়া পড়ে গেছে। চীন এবং আমেরিকাও সমুদ্রের নিচে শহর তৈরির পরিকল্পনা করছে কিন্তু ভারত তাদের আগেই এটি বাস্তবায়িত করল। টাইম ম্যাগাজিন একে একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ারিং মার্ভেল বা বিস্ময় বলে অভিহিত করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ জানিয়েছে মহাসাগরের টেকসই উন্নয়নের জন্য মৎস্য নগর একটি মডেল হতে পারে।
পরিবেশবিদদের উদ্বেগ
তবে কিছু পরিবেশবিদ এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে মানুষের কোলাহল এবং আলোর কারণে গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। অনেক সামুদ্রিক প্রাণী অন্ধকারে থাকে এবং শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। মৎস্য নগরের জেনারেটর এবং সাবমেরিনের শব্দে তাদের অসুবিধা হতে পারে। সরকার অবশ্য জানিয়েছে তারা সাইলেন্ট টেকনোলজি বা নিঃশব্দ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং কঠোর পরিবেশবিধি মেনে চলছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মানুষের জন্য এটি এক বিশাল সুযোগ। পর্যটন বাড়ার ফলে স্থানীয়দের আয় বাড়বে। পোর্ট ব্লেয়ারে নতুন নতুন হোটেল এবং রেস্তোরাঁ তৈরি হচ্ছে। মৎস্য নগরে খাবার এবং অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহের জন্য স্থানীয় যুবকদের নিয়োগ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
সরকার জানিয়েছে মৎস্য নগর হলো সমুদ্রযান মিশনের বা সমুদ্রযান প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ। প্রথম ধাপে আমরা মানুষকে সমুদ্রের গভীরে পাঠিয়েছিলাম। দ্বিতীয় ধাপে আমরা সেখানে থাকার ব্যবস্থা করলাম। তৃতীয় ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা লাক্ষাদ্বীপ এবং গুজরাটের উপকূলে আরও দুটি আন্ডারওয়াটার সিটি তৈরি করব। তখন ভাড়াও অনেক কমবে এবং মধ্যবিত্ত মানুষও সেখানে যেতে পারবেন।
উপসংহার
২০২৬ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি দিনটি প্রমাণ করল যে মানুষের কৌতূহল এবং সাহসের কোনো সীমা নেই। আমরা মহাকাশের তারার দিকে তাকিয়েছি আবার সমুদ্রের অতল গহ্বরেও নেমেছি। মৎস্য নগর কেবল একটি শহর নয় এটি হলো প্রকৃতির সাথে মানুষের সহাবস্থানের এক নতুন পরীক্ষা। আমরা যদি সমুদ্রকে সম্মান করি এবং তার সম্পদ সাবধানে ব্যবহার করি তবে সমুদ্র আমাদের অনেক কিছু ফিরিয়ে দেবে। ভারতের তেরঙ্গা আজ কেবল এভারেস্টের চূড়ায় নয় প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরেও উড়ছে। জয় হিন্দ।