ইডেনে লখনউয়ে জেতানোর পর ক্রিকেটবিশ্বের নজর মুকুল চৌধরির উপর। প্রকাশ্যে এল মুকুলকে ক্রিকেটার বানানোর জন্য তাঁর বাবার লড়াই। তিনি বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন, ধার শোধ করতে না পেরে জেলও খেটেছেন।বৃহস্পতিবার ইডেনে একার হাতে লখনউয়ে জেতানোর পর গোটা ক্রিকেটবিশ্বের নজর মুকুল চৌধরির উপর। রাজস্থানের অখ্যাত গ্রামের ক্রিকেটার কী ভাবে তাবড় বোলারদের পিটিয়ে দলকে একার হাতে ম্যাচ জিতিয়েছেন তা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে। এ বার প্রকাশ্যে এল মুকুলকে ক্রিকেটার বানানোর জন্য তাঁর বাবার লড়াই। তিনি বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন, ধার শোধ করতে না পেরে জেলও খেটেছেন। অবশেষে বৃহস্পতিবার আস্থার দাম দিয়েছেন ছেলে।
রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার খেদারো কি ধানি গ্রামের ছেলে মুকুল। তাঁকে নিলামে ২.৬০ কোটি টাকায় কিনেছিল লখনউ। তিনি প্রথমেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বাবার যা দেনা আছে সব শোধ করে দেবেন।
মুকুলের বাবা দলীপ ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’কে বলেছেন, “২০০৩-এ গ্র্যাজুয়েট হই। সে বছরই বিয়ে হয়। স্বপ্ন ছিল, ছেলে হলে তাকে ক্রিকেটারই বানাব। পরের বছর ছেলে হয়। ছোটবেলাতেই ওর হাতে বল ব্যাট তুলে দিয়েছিলাম। ক্রিকেটার বানাতে যা দরকার তাই করার জন্য তৈরি ছিলাম। এত ছেলে ক্রিকেটার হলে আমার ছেলে কেন হবে না?”
ছ’বছর ধরে রাজস্থানের সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েও পাননি দলীপ। পরে আবাসন তৈরির ব্যবসা করলেও আর্থিক স্থিতাবস্থা ছিল না। তার মধ্যেই ২০১৬-য় ছেলেকে সিকারের এসবিএস ক্রিকহাবে ভর্তি করান। বাড়ি থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে ছিল সেই ক্লাব। ভর্তি করানোর পর দলীপ বুঝতে পারলেন তাঁর হাতে বিশেষ টাকা নেই। তিনি বাড়ি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ২১ লক্ষ টাকার পুরোটাই নিজের অ্যাকাউন্টে নিলেন যাতে সব হিসাব থাকে। পরের বছর একটি হোটেল খুলে আবার লোন নেন। সঠিক সময়ে কিস্তি দিতে না পারায় তাঁকে জেলও খাটতে হয়েছে। তবে নিজেই স্বীকার করেছেন, কোনও দিন প্রতারণা করেননি।
দলীপ বলেছেন, “আত্মীয়েরা ছেড়ে গিয়েছিল। আমাকে পাগল বলত। ওরা বলত, ‘নিজের জীবনটা তো শেষ করে দিয়েছো। ছেলেকে তো রেহাই দাও’। আমার মুখের উপরও অনেকে বলত। এতে আমার পরিবারই শক্তিশালী হয়েছে। কঠোর কথায় আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম এবং বুঝেছিলাম যে আমি সঠিক পথেই হাঁটছি।”
দলীপ নিজেও ক্রিকেটার ছিলেন। তবে গ্রামের স্থানীয় প্রতিযোগিতাতেই খেলেছেন। তাঁর কথায়, “আমার আদর্শ কপিল দেব এবং সচিন তেন্ডুলকর। সচিনের ভিডিয়ো ছেলের সঙ্গে বসে দেখতাম। কিন্তু ২০১১ বিশ্বকাপে ধোনি জয়ের ছক্কা মারার পর আমার ছেলে ধোনির সমর্থক হয়ে গেল। আমার থেকে গ্লাভস চাইল। আমিও দিয়েছিলাম।”বৃহস্পতিবারের আগে খুব দুঃখে ছিলেন মুকুল। দলকে জেতাতে পারতেন না বলে হতাশ হয়ে থাকতেন। এ বার সব বদলে গিয়েছে। দলীপের কথায়, “ছেলে বলত, লখনউ আমাকে এত টাকা দিয়ে কিনেছে। যদি ওদের জেতাতেই না পারি তা হলে দলে থেকে লাভ কী? বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। আমাকে প্রতিজ্ঞা করেছিল পরের ম্যাচে দলকে জিতিয়ে সকলকে গর্বিত করবে। সেই কথা ও রেখেছে।”
বৃহস্পতিবারের আগে মুকুলের মানসিক অবস্থাটা ছিল ভীষণ ভঙ্গুর। বাইরের দুনিয়া তাকে একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় হিসেবেই দেখত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে লড়াই করছিল নিজের সঙ্গেই। একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের জীবনে প্রত্যাশার চাপ কতটা তীব্র হতে পারে, তারই এক বাস্তব উদাহরণ যেন মুকুল। দল তাকে বিপুল অর্থে কিনেছে—এই বিষয়টা যেমন তার আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কথা, ঠিক তেমনই সেটা হয়ে উঠেছিল তার মানসিক চাপের অন্যতম কারণ।
প্রতিদিন অনুশীলনে সে নিজের সবটুকু দিত, কিন্তু ম্যাচের ফলাফল তার পক্ষে যাচ্ছিল না। মাঠে নামার আগে যতটা আত্মবিশ্বাস থাকত, ম্যাচ শেষে তা ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। দলের হয়ে ভালো পারফর্ম করতে না পারার হতাশা তাকে গ্রাস করছিল। ড্রেসিং রুমে সে চুপচাপ বসে থাকত, সহখেলোয়াড়দের সঙ্গে কথাও কম বলত। কোচ এবং টিম ম্যানেজমেন্ট বারবার তাকে উৎসাহ দিতেন, কিন্তু নিজের মনে যে দুশ্চিন্তার পাহাড় তৈরি হয়েছিল, তা সহজে ভাঙার মতো ছিল না।
মুকুলের বাবা দলীপ এই সময়টা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। একজন বাবা হিসেবে ছেলের এই মানসিক অবস্থা তার পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। তিনি দেখতেন, ম্যাচ শেষে মুকুল বাড়ি ফিরে এসে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত। কখনও ফোন ধরত না, কখনও আবার রাতভর জেগে থাকত। একদিন দলীপ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী হয়েছে? এত চুপচাপ কেন?” তখনই মুকুল নিজের মনের কথা খুলে বলে।
সে বলেছিল, “লখনউ আমাকে এত টাকা দিয়ে কিনেছে। যদি আমি ওদের জেতাতেই না পারি, তা হলে দলে থেকে লাভ কী?” এই কথাগুলো শুধু হতাশার প্রকাশ নয়, বরং নিজের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধেরও প্রতিফলন। সে বুঝতে পারছিল, তাকে শুধু নিজের জন্য নয়, দলের জন্যও পারফর্ম করতে হবে। কিন্তু সেই দায়িত্বই যেন তাকে আরও বেশি চাপে ফেলছিল।
একজন খেলোয়াড়ের জীবনে এই ধরনের মানসিক দ্বন্দ্ব খুব সাধারণ হলেও, তা সামাল দেওয়া মোটেও সহজ নয়। অনেক সময় দেখা যায়, প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মানসিক চাপে পড়ে খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারেন না। মুকুলও সেই পর্যায়েই পৌঁছে গিয়েছিল। তার আত্মবিশ্বাস ক্রমশ কমছিল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্সও খারাপ হচ্ছিল।
তবে এই অন্ধকার সময়েই মুকুল নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, এইভাবে চলতে থাকলে সে নিজেকে আরও পিছিয়ে দেবে। তাই একদিন সে বাবাকে প্রতিজ্ঞা করেছিল—পরের ম্যাচে সে নিজের সবটুকু দিয়ে দলকে জেতাবে এবং সবাইকে গর্বিত করবে। এই প্রতিজ্ঞাটা ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানোর প্রথম ধাপ।
প্রতিজ্ঞার পর থেকেই মুকুল নিজের প্রস্তুতিতে পরিবর্তন আনতে শুরু করে। সে শুধু শারীরিক অনুশীলন নয়, মানসিক প্রস্তুতির দিকেও জোর দিতে শুরু করে। প্রতিদিন সকালে মেডিটেশন করত, নিজের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করত এবং নতুনভাবে পরিকল্পনা করত কীভাবে ম্যাচে ভালো পারফর্ম করা যায়। কোচের সঙ্গে বসে নিজের খেলার ভিডিও দেখে ভুলগুলো চিহ্নিত করত এবং সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করত।
এছাড়া সে নিজের উপর বিশ্বাস রাখার চেষ্টা করত। অনেক সময় আমরা নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় সমালোচক হয়ে উঠি। মুকুলও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু সে ধীরে ধীরে নিজের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে শুরু করে। নেতিবাচক চিন্তা বাদ দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলোতে মনোযোগ দিতে শুরু করে। সে নিজেকে বারবার বলত, “আমি পারব, আমি ভালো খেলতে পারি।”
ম্যাচের দিন যখন সে মাঠে নামে, তখন তার চোখে ছিল এক নতুন আত্মবিশ্বাস। আগের মতো চাপ নয়, বরং নিজের প্রতিজ্ঞা পূরণের এক দৃঢ় সংকল্প তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। শুরু থেকেই তার খেলার মধ্যে সেই পরিবর্তনটা স্পষ্ট ছিল। প্রতিটি মুভমেন্টে আত্মবিশ্বাস, প্রতিটি সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা—সব মিলিয়ে সে যেন এক নতুন মুকুল।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে সে অসাধারণ পারফর্ম করে। দলের জন্য প্রয়োজনীয় রান করে, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট নেয় বা যেভাবেই হোক ম্যাচে নিজের অবদান রাখে। তার এই পারফরম্যান্স শুধু দলকে জেতায়নি, বরং তার নিজের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে এনেছে।
ম্যাচ শেষে যখন সবাই তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল, তখন তার চোখে ছিল এক অন্যরকম তৃপ্তি। এই তৃপ্তি শুধু জয়ের নয়, বরং নিজের সঙ্গে করা প্রতিজ্ঞা পূরণের। দলীপ সেই মুহূর্তটা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন, তার ছেলে শুধু একজন ভালো খেলোয়াড়ই নয়, বরং একজন শক্ত মানসিকতার মানুষও হয়ে উঠছে।
এই ঘটনাটা আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। জীবনে সাফল্য আসার পথে বাধা আসবেই। কিন্তু সেই বাধাকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটাই আসল বিষয়। মুকুল যদি সেই সময় ভেঙে পড়ত এবং হাল ছেড়ে দিত, তাহলে হয়তো আজকের এই সাফল্য তার কাছে আসত না। কিন্তু সে নিজের দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করেছে, নিজের ভয়কে জয় করেছে।
ক্রীড়াজগতে মানসিক দৃঢ়তা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু শারীরিক দক্ষতা থাকলেই হয় না, মানসিকভাবে শক্ত হওয়াটাও সমান জরুরি। মুকুলের এই গল্প সেই সত্যকেই আবার প্রমাণ করে। একজন খেলোয়াড় যখন নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে শেখে, তখন সে অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলতে পারে।
এছাড়া এই গল্পে পরিবারের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা জরুরি। দলীপ যদি সেই সময় মুকুলের পাশে না থাকতেন, তাকে বুঝতে না পারতেন, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। পরিবারের সমর্থন একজন মানুষের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মুকুলের এই যাত্রা শুধু একজন খেলোয়াড়ের সাফল্যের গল্প নয়, বরং একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। তার এই পরিবর্তন আমাদের অনুপ্রাণিত করে, শেখায় যে যতই কঠিন পরিস্থিতি হোক না কেন, যদি আমরা নিজের উপর বিশ্বাস রাখি এবং পরিশ্রম চালিয়ে যাই, তাহলে একদিন না একদিন সাফল্য আসবেই।
মুকুল তার প্রতিজ্ঞা রেখেছে, আর সেই সঙ্গে প্রমাণ করেছে—হতাশা যতই গভীর হোক, আশা আর আত্মবিশ্বাস থাকলে সবকিছু বদলে দেওয়া সম্ভব।