দক্ষিণ আফ্রিকার টি-টোয়েন্টি লিগে কোচ হিসেবে অভিষেক ম্যাচেই হার মানলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। জোহানেসবার্গ সুপার কিংসের বিরুদ্ধে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের মুখ দেখতে হল তাঁর দল প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসকে।
দক্ষিণ আফ্রিকা টি-টোয়েন্টি লিগ দিয়ে নিজের কোচিং জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনে তিনি একাধিক ভূমিকায় নিজেকে প্রমাণ করেছেন—ভারতীয় দলের সফল অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে রেখে গেছেন অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত, আবার প্রশাসক হিসেবেও ভারতীয় ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অংশ হয়েছেন। তবে এত দিনের বর্ণাঢ্য যাত্রার মধ্যেও সরাসরি কোচ হিসেবে কোনও দলের দায়িত্ব নেওয়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সেই কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকার এই টি-টোয়েন্টি লিগে তাঁর কোচিং অভিষেক ঘিরে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ছিল।
এর আগে আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসের মেন্টর ও ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট হিসেবে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। দল গঠন, খেলোয়াড় নির্বাচন, কৌশল নির্ধারণ এবং তরুণ ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে তৈরি করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল চোখে পড়ার মতো। দিল্লি ক্যাপিটালসের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পিছনে তাঁর চিন্তাধারার বড় প্রভাব ছিল বলেই মনে করা হয়। যদিও সেই দায়িত্বে থেকেও তিনি সরাসরি মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে কোচ হিসেবে ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা পাননি। তাই কোচ হিসেবে নতুন এই ভূমিকা তাঁর কাছেও ছিল একেবারে আলাদা চ্যালেঞ্জ।
প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসের কোচ হিসেবে প্রথম ম্যাচেই অবশ্য প্রত্যাশিত সূচনা করতে পারলেন না সৌরভ। জোহানেসবার্গ সুপার কিংসের বিরুদ্ধে অভিষেক ম্যাচেই ২২ রানে হেরে যায় তাঁর দল। ম্যাচের আগে কাগজে-কলমে প্রিটোরিয়াকে বেশ শক্তিশালী বলেই মনে করা হচ্ছিল। নিলাম টেবিলে সৌরভের নেতৃত্বে দলে একাধিক তারকা ক্রিকেটারকে নেওয়া হয়েছিল, যা দলের ভারসাম্য বাড়িয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। ব্যাটিং ও বোলিং—দু’দিকেই ছিল অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার মিশ্রণ।
ম্যাচের শুরুতে প্রিটোরিয়ার পারফরম্যান্সও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটায়। রান তাড়া করতে নেমে ওপেনারদের জুটি ভালো সূচনা এনে দেয় দলকে। কিন্তু ম্যাচ যত এগোতে থাকে, ততই ছন্দ হারাতে শুরু করে ব্যাটিং লাইনআপ। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একের পর এক উইকেট পড়ে যাওয়ায় চাপ বাড়ে দলের ওপর। জোহানেসবার্গের বোলাররা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগান এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য থেকে কিছুটা দূরেই থেমে যেতে হয় প্রিটোরিয়াকে।
এই পরাজয় সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের কোচিং জীবনের শুরুতে এক ধরনের বাস্তবতার সামনে দাঁড় করালেও, তা যে দীর্ঘ যাত্রার শেষ কথা নয়, সেটাও স্পষ্ট। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ সবসময়ই থাকে। প্রথম ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে সৌরভ ও তাঁর দল পরবর্তী ম্যাচে কীভাবে নিজেদের ফিরে পায়, সেটাই এখন দেখার।
এই লিগে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্তর্ভুক্তি শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বিশেষ করে নিলাম পর্বে তাঁর ভূমিকা নজর কেড়েছিল ক্রিকেটমহলের। একাধিক বড় নাম দলে তুলে নিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, প্রিটোরিয়াকে শক্তিশালী ইউনিট হিসেবেই গড়ে তুলতে চান। ডেওয়াল্ড ব্রেভিস, কেশব মহারাজের মতো তারকা ক্রিকেটারদের দলে নেওয়া সেই পরিকল্পনারই অংশ। কাগজে-কলমে প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসকে যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী দল বলেই মনে করা হচ্ছিল। ব্যাটিং, বোলিং ও অলরাউন্ডার—সব বিভাগেই ছিল অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার মিশেল। কিন্তু ক্রিকেট যে শেষ পর্যন্ত মাঠের খেলাই, সেই সত্যিই ফের একবার প্রমাণিত হল।
সুপারস্পোর্ট পার্কে অনুষ্ঠিত ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় জোহানেসবার্গ সুপার কিংস। শুরুটা খুব বেশি আক্রমণাত্মক না হলেও ধীরে ধীরে ইনিংস গুছিয়ে নিতে থাকে তারা। ওপেনিং জুটিতে বড় রান না এলেও মিডল অর্ডারে দৃঢ়তা দেখান রাইলি রুসো ও উইয়ান মুল্ডার। রুসোর ব্যাট থেকে আসে ৪৮ রানের কার্যকর ইনিংস, যেখানে ধৈর্য ও আগ্রাসনের সঠিক মিশ্রণ দেখা যায়। অন্য প্রান্তে মুল্ডার খেলেন ৪৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস, যা ইনিংসের ভিত গড়ে দেয়। শেষের দিকে আকিল হোসেন ঝোড়ো ব্যাটিং করে মাত্র ১০ বলে ২২ রান তুলে নেন, যার ফলে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৬৮ রানের লড়াকু স্কোর দাঁড় করাতে সক্ষম হয় জোহানেসবার্গ।
প্রিটোরিয়ার বোলিং আক্রমণ যদিও শুরুতে খুব একটা ছন্দে ছিল না, তবুও মাঝের ওভারগুলোতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। তবে যাঁর কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল, সেই কেশব মহারাজ এই ম্যাচে সম্পূর্ণ ব্যর্থ থাকেন। চার ওভার বল করেও তিনি একটি উইকেটও পাননি এবং রান আটকাতেও পারেননি। অভিজ্ঞ এই স্পিনারের ব্যর্থতা যে ম্যাচের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
১৬৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসের শুরুটা ছিল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। দুই ওপেনার উইল স্মিদ ও ব্রাইস পার্সনস আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাট করতে থাকেন। দু’জনের জুটিতে দ্রুতই ৭১ রান উঠে যায়। পাওয়ার প্লে-র ছ’ওভারে দলের রান পৌঁছে যায় ৪৮-এ, যা লক্ষ্য তাড়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছিল। দর্শকদের মধ্যে তখন জয়ের আশা তৈরি হচ্ছিল। সুপারস্পোর্ট পার্কের উইকেট সাধারণত রান তাড়ার জন্য সহায়ক বলেই পরিচিত, আর সেই সুবিধাটাই কাজে লাগাচ্ছিল প্রিটোরিয়া।
কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় নবম ওভারে। উইল স্মিদ আউট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ধস নামে প্রিটোরিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে। একের পর এক উইকেট পড়তে শুরু করে এবং পুরো দলই চাপে পড়ে যায়। এই ধসের মূল কারিগর ছিলেন ডুয়ান জানসেন। দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা অলরাউন্ডার মার্কো জানসেনের যমজ ভাই ডুয়ান এই ম্যাচে কার্যত একাই ভেঙে দেন প্রিটোরিয়ার ব্যাটিং স্তম্ভ। ৭১ রানে ১ উইকেট থাকা দল মুহূর্তের মধ্যেই ৮৯ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলে।
ডুয়ান জানসেন একে একে ব্রাইস পার্সনস, শাই হোপ, কোনর এস্থেরহুইজ়েন ও ড্যানিয়েল স্মিথকে ফিরিয়ে দেন। চার ওভার বল করে মাত্র ২৩ রান দিয়ে তিনি তুলে নেন ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। তাঁর নিখুঁত লাইন-লেন্থ ও ভ্যারিয়েশন প্রিটোরিয়ার ব্যাটারদের সম্পূর্ণ অসহায় করে তোলে। যে ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের উপর দলের বড় ভরসা ছিল, তিনিও ব্যর্থ হন। মাত্র ৬ রান করেই তাঁকে সাজঘরে ফিরতে হয়। ব্রেভিস আউট হওয়ার পর কার্যত জয়ের সমস্ত সম্ভাবনাই শেষ হয়ে যায় প্রিটোরিয়ার।
ডুয়ানের পাশাপাশি জোহানেসবার্গের আর এক পেসার রিচার্ড গ্লিসনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি চার ওভারে ৩৩ রান দিয়ে ২টি উইকেট তুলে নিয়ে চাপ আরও বাড়িয়ে দেন প্রিটোরিয়ার ওপর। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ওভারে লক্ষ্য থেকে ২২ রান দূরে থেকেই থেমে যেতে হয় প্রিটোরিয়াকে।
এই পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হার নয়, বরং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের কোচিং জীবনের শুরুর দিনেই এক বড় বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। গত মরসুমে প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালস পয়েন্ট তালিকায় পাঁচ নম্বরে শেষ করেছিল। সেই কারণেই দলের কোচ হিসেবে জোনাথন ট্রটকে সরিয়ে এ বার সৌরভের উপর ভরসা রেখেছিল ফ্র্যাঞ্চাইজি। প্রত্যাশা ছিল, তাঁর অভিজ্ঞতা ও ক্রিকেটীয় বোধ দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই হার দিয়ে শুরু হওয়ায় প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ দুটোই বেড়েছে।
তবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একটি ম্যাচ দিয়ে পুরো ছবি আঁকা যায় না—এই সত্যটা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের অজানা নয়। এই ফরম্যাটের স্বভাবই এমন, যেখানে একটি দিনের ফলাফল পরের ম্যাচে সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। কখনও এক ম্যাচে ব্যর্থতা যেমন দলকে প্রশ্নের মুখে ফেলে, তেমনই পরের ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সুযোগও থাকে। দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনে বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাওয়া সৌরভ জানেন, টি-টোয়েন্টিতে ধৈর্য ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসের কোচ হিসেবে প্রথম ম্যাচে হার দিয়ে শুরু হলেও, সেই পরাজয় যে দলের সামগ্রিক শক্তিকে খাটো করে দেখায় না, সেটাও পরিষ্কার। দলে রয়েছে অভিজ্ঞ ও প্রতিভাবান একাধিক ক্রিকেটার, যারা নিজেদের দিনে যে কোনও প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে সক্ষম। প্রথম ম্যাচে ব্যাটিং ধসে যে সমস্যাগুলি সামনে এসেছে, সেগুলি বিশ্লেষণ করে দ্রুত সমাধান বের করাই এখন কোচিং স্টাফের মূল লক্ষ্য। সৌরভের ক্রিকেটীয় দর্শন বরাবরই আক্রমণাত্মক অথচ বাস্তববাদী। সেই দর্শন মাঠে কত দ্রুত প্রতিফলিত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সোমবার দু’বারের চ্যাম্পিয়ন সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপের বিরুদ্ধে নামবে প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালস। এই ম্যাচটি শুধু পয়েন্ট টেবিলের নিরিখেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের কোচিং যাত্রার প্রথম মোড় ঘোরানোর সুযোগও এনে দিচ্ছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভালো পারফরম্যান্স দলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে এই ম্যাচে দল নির্বাচন, ব্যাটিং অর্ডার এবং বোলিং পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।
দু’বারের চ্যাম্পিয়ন সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপের শক্তি ও অভিজ্ঞতা প্রিটোরিয়ার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। তবে সেই চ্যালেঞ্জই হয়তো সৌরভের দলের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে। বড় দলের বিরুদ্ধে ভালো ফলাফল প্রায়শই নতুন শুরুর পথ দেখায়। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে, যেখানে প্রতিটি ওভার, প্রতিটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
এই ম্যাচেই হয়তো নিজের কোচিং জীবনের প্রথম জয়ের খোঁজে নামবেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। অভিষেক ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে তিনি কত দ্রুত দলকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন, সেটাই হবে তাঁর কোচিং দক্ষতার প্রথম বড় পরীক্ষা। মাঠের ফলাফলে তাঁর ক্রিকেটীয় দর্শন কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটাই এখন ক্রিকেটপ্রেমীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।