ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সবচেয়ে চর্চিত ক্রিকেটার, বিরাট কোহলি, সম্প্রতি তাঁর টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর চোখের ভাষা, মনোভাব এবং শারীরিক ভাষা নিয়ে বিভিন্ন সাবেক ক্রিকেটারদের মধ্যে একাধিক আলোচনা চলছে। সম্প্রতি রবিন উথাপ্পা, ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার, কোহলির টেস্ট অবসর প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, তার চোখেই লুকিয়ে আছে এক গল্প, যা স্পষ্টভাবে বোঝায় যে কোহলি এখনও ক্রিকেটের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার এবং ভালোবাসা বজায় রেখেছেন। উথাপ্পা মনে করেন, কোহলির টেস্ট অবসর প্রত্যাহারের সময় এখনই।উথাপ্পার মন্তব্য এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ বিরাট কোহলির শখ এবং মানসিকতা তাঁর ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকার জন্য আগ্রহী রয়েছে। তিনি তাঁর খেলাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন এটি কেবল এক দৌড় নয়, একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। ক্রিকেট প্রেমিকরা এবং বিশেষজ্ঞরা এই মন্তব্যের পর এখন ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন যে কোহলি কি আবার টেস্ট ক্রিকেটে ফিরে আসবেন, এবং তাঁর জন্য ভবিষ্যতের পথ কী হবে।এখন প্রশ্ন উঠছে, কোহলি কি সত্যিই আবার তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার চালিয়ে যাবেন?
বিরাট কোহলি: ক্রিকেটের মহাকাব্য, অবসর নিয়ে নতুন বিতর্ক
ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে বিরাট কোহলির স্থান এক অদ্বিতীয়। একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর অর্জন এবং দারুণ সাফল্য ভারতীয় ক্রিকেটকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি কোহলি তাঁর টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। এর ফলে ক্রিকেট মহলে বেশ কিছু প্রশ্ন এবং বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও কোহলির অবসর ঘোষণা অনেকেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন, তবে ক্রিকেটবিশ্বে এক নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে প্রাক্তন ক্রিকেটাররা এবং ক্রিকেট প্রেমিকরা এ বিষয়ে তাঁদের মতামত জানিয়েছেন।
বিরাট কোহলি ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেন এবং তারপর থেকে তাঁর ক্যারিয়ার একে একে গড়ে উঠেছে। তাঁর ব্যাটিং দক্ষতা এবং স্ট্রাইক রেটের জন্য তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত। কোহলির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য একাধিক ধাপে ভাগ করা যায়। প্রথমে তিনি সীমিত ওভারের ক্রিকেটে একে একে নিজের স্থান পাকা করেন এবং পরবর্তীতে টেস্ট ক্রিকেটে আরও বড় সাফল্য লাভ করেন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিং সামর্থ্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মানসিকতা তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের তকমা দেয়।
কোহলি তাঁর ক্যারিয়ারের বহু বছর ধরে ভারতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে ভারত একাধিক সাফল্য অর্জন করেছে। তাঁর অধীনে ভারতীয় দল টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বে অন্যতম শক্তিশালী দল হয়ে ওঠে। কোহলির নেতৃত্বে ভারতের ব্যাটিং আক্রমণ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এবং দলটি নানা জায়গায় বিদেশী মাঠে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল।
সম্প্রতি কোহলি টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। যদিও কিছু ক্রিকেট প্রেমিক এবং বিশ্লেষক এই সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিক মনে করেছেন, কিন্তু অন্যরা একে একটু অপ্রত্যাশিত মনে করছেন। একদিকে কোহলি এখনও তাঁর সেরা ফর্মে রয়েছেন এবং তার চোখে যে আগ্রহ এবং তৃষ্ণা দেখায় তা তাকে আরো বেশিদিন মাঠে থাকতে প্রেরণা দেয়। কিন্তু অন্যদিকে, কোহলির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানানো উচিত, বিশেষত যখন তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছেন।
এ বিষয়ে রবিন উথাপ্পা, ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার, এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "তার চোখেই লুকিয়ে আছে এক গল্প।" উথাপ্পা আরো বলেন, "কোহলি যদি চাইতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি আরো বেশিদিন টেস্ট ক্রিকেটে খেলতে পারতেন। তবে তিনি যদি মনে করেন যে তাঁর সময় শেষ, তা হলে সেটা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু একথাও সত্য, কোহলির মতো একজন খেলোয়াড়ের জন্য টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়া খুব বড় একটি সিদ্ধান্ত।"
কোহলির ব্যাটিং স্টাইল এবং মনোভাব ক্রিকেট বিশ্বে এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। তিনি তাঁর ব্যাটিংয়ে যে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন, তা অন্য অনেক ক্রিকেটারের কাছে এক অনুপ্রেরণা। কোহলি জানতেন কিভাবে চাপের মধ্যে নিজের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শন করতে হয়। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতে চিত্তাকর্ষক রান সংগ্রহ করতে পারতেন, যা তাকে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত করেছে।
বিশেষত, কোহলি যে সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর প্রথম সেঞ্চুরি করেন, তা ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল। তিনি একের পর এক টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন এবং ভারতের বিভিন্ন মাঠে তাঁর ব্যাটিং শৈলী দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। তার ব্যাটিংয়ের মধ্যে ছিল স্নিগ্ধতা, শক্তি এবং একনিষ্ঠতা, যা তাকে ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে অন্যতম করে তুলেছিল।
টেস্ট ক্রিকেটে কোহলির সাফল্য ছিল অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং দায়িত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যাটিংয়ের মান নির্ধারণ করা হয়েছিল তাঁর সঙ্গীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভারতীয় দলের জন্য ম্যাচ জয়ের অঙ্গীকার দিয়ে। কোহলির একটি বড় সাফল্য ছিল তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় দল বিদেশে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল, যা ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরল ছিল। তার নেতৃত্বে ভারতের খেলোয়াড়রা পরস্পরকে সহায়তা করে এবং শক্তিশালী বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছিল।
কোহলির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল ২০১৭ সালে ভারতীয় দলের ইংল্যান্ড সফরে টেস্ট সিরিজ জয়। তিনি এমন এক সময়ে দলকে নেতৃত্ব দেন যখন বিদেশী মাঠে ভারতীয় দল একটু চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। তবে কোহলি তাদের সব চাপ কাটিয়ে দলকে জয় এনে দেন।
কোহলির অবসর নেওয়ার পরবর্তী সিদ্ধান্ত কি হতে পারে, সেটা নিয়ে অনেকেই অনুমান করছেন। কোহলির ক্ষেত্রে এটি নিশ্চিত যে, তিনি অন্য দলে বা বিদেশী ক্রিকেটে নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতীয় ক্রিকেটে কোহলির স্থান কী হবে, সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও কোহলি তাঁর ক্যারিয়ারে অনেক কিছু অর্জন করেছেন, তবে তাঁর অনুপস্থিতিতে ভারতীয় দলের ব্যাটিং আক্রমণ কিভাবে পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এদিকে, ক্রিকেটবিশ্বে অনেকেই আশা করছেন যে কোহলি তাঁর অবসর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। তাঁদের মতে, কোহলির মতো খেলোয়াড়ের অবসর নেওয়া শুধু ভারতের জন্য নয়, বিশ্বের ক্রিকেটের জন্যও বড় ক্ষতি হবে। বিশেষত, তাঁর আগ্রহ এবং শারীরিক সক্ষমতা থেকে বোঝা যায় যে কোহলি হয়তো আরো কয়েকটি বছর টেস্ট ক্রিকেটে খেলতে পারবেন।
এখন, ক্রিকেটপ্রেমীরা শুধুমাত্র কোহলির ক্যারিয়ার নিয়ে নয়, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সমানভাবে আগ্রহী। তবে যা বলাই যায়, তা হলো কোহলি যতই মাঠে না থাকুন, তার অবদান এবং তার নাম ভারতীয় ক্রিকেটে চিরকাল রয়ে যাবে।
২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখলেও ২০১১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় কোহলির। এরপরের গল্পটা শুধুই সাফল্যের চূড়ায় ওঠার। ১২৩টি টেস্টে ৯,২৩০ রান, ৩০টি সেঞ্চুরি এবং ভারতের হয়ে সবচেয়ে সফল অধিনায়ক হিসেবে বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়ের গৌরব—সবই তাঁর ঝুলিতে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাঁর নেতৃত্বে ভারতের আগ্রাসী জয় এবং ২০১৭ সালে ইংল্যান্ড সফরের সাফল্য তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা অধিনায়কদের কাতারে নিয়ে গেছে।
২০২৫ সালের ১২ মে ইনস্টাগ্রামে এক আবেগঘন বার্তায় কোহলি টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায় জানান। ভক্তদের মনে প্রশ্ন উঠেছিল—কোহলি কি আরও কয়েক বছর পারতেন না? যেখানে জো রুট বা স্টিভ স্মিথের মতো তাঁর সমসাময়িকরা এখনও রাজত্ব করছেন, সেখানে কোহলির বিদায় মেনে নিতে পারছেন না অনেক বিশ্লেষক।
সম্প্রতি ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার রবিন উথাপ্পা কোহলির অনুশীলনের কিছু ছবি দেখে মন্তব্য করেছেন, "বিরাটের চোখে এখনও সেই পুরনো জেদ লুকিয়ে আছে। একজন ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে আমি চাইব সে তাঁর অবসর ভেঙে টেস্টে ফিরে আসুক।" তবে অন্যদিকে সঞ্জয় মাঞ্জরেকার সমালোচনা করে বলেছেন, টেস্টের কঠিন চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে ওডিআই-এর সহজ পথ বেছে নেওয়া বিরাটের মতো ক্রিকেটারের থেকে কাম্য ছিল না।
বর্তমানে কোহলি শুধু ওডিআই ফরম্যাটে মনোনিবেশ করলেও ক্রিকেট ভক্তদের হৃদয়ে একটাই প্রশ্ন—তিনি কি আবার টেস্টের সাদা জার্সিতে ফিরবেন? বিসিসিআই সচিবের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, দলের প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনার দরজা সবসময় খোলা।
উপসংহার বিরাট কোহলি কেবল একজন ব্যাটসম্যান নন, তিনি ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটের ‘পোস্টার বয়’। মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল এক অন্যরকম উন্মাদনা। কোহলি মাঠের বাইরে থাকলেও তাঁর অভাব ভারতের ব্যাটিং অর্ডারে স্পষ্ট। তিনি আবার ফিরবেন কি না, তা সময়ই বলবে; কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটের মহাকাব্যে তাঁর নাম যে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।