৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখটি ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য একটি আবেগের দিন হয়ে রইল। টি ২০ বিশ্বকাপের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। তার আগেই বিরাট কোহলির একটি টুইট ঘিরে ক্রিকেট বিশ্বে জল্পনা তুঙ্গে। তিনি লিখেছেন শেষবারের মতো তেরঙ্গা জার্সিতে নামার প্রস্তুতি। বোর্ড সূত্রে খবর এই বিশ্বকাপের পরেই টি ২০ ফরম্যাটকে বিদায় জানাতে পারেন কিং কোহলি। তার এই ইঙ্গিতে ভক্তদের মন ভেঙে গেছে তবে অনেকেই একে তার শেষ মাস্টাস্ট্রোক হিসেবে দেখছেন।
ভারতীয় ক্রিকেটের আকাশে আজ এক বিষাদের মেঘ জমেছে। যে মানুষটি গত দেড় দশক ধরে ১৪০ কোটি ভারতবাসীর আশা ভরসার প্রতীক হয়ে ছিলেন সেই বিরাট কোহলি আজ এমন এক ইঙ্গিত দিলেন যা শোনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। ২০২৬ সালের টি ২০ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি। ভারত এবং শ্রীলঙ্কার মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা এই মেগা ইভেন্টের জন্য যখন সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ঠিক তখনই কিং কোহলির একটি টুইট সোশ্যাল মিডিয়ায় সুনামি বয়ে আনল।
আজ সকাল ১০টা নাগাদ বিরাট কোহলি তার এক্স হ্যান্ডেলে বা টুইটারে একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনি ভারতের নীল জার্সি পরে ড্রেসিংরুমে বসে আছেন এবং তার চোখের দৃষ্টি সুদূরে নিবদ্ধ। ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন শেষবারের মতো তেরঙ্গা জার্সিতে নামার প্রস্তুতি। প্রতিটি মুহূর্ত অনুভব করতে চাই। জয় হিন্দ। এই সামান্য কয়েকটি শব্দ মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্ত সবার মনেই এখন একটাই প্রশ্ন তবে কি ২০২৬ টি ২০ বিশ্বকাপই বিরাটের শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট।
বিসিসিআই এবং নির্বাচকদের প্রতিক্রিয়া
বিসিসিআই বা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের তরফ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে বোর্ডের এক উচ্চপদস্থ কর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন বিরাট আমাদের আগেই জানিয়েছিলেন যে তিনি তরুণদের সুযোগ দেওয়ার জন্য টি ২০ ফরম্যাট থেকে সরে দাঁড়াতে চান। আমরা তাকে অনুরোধ করেছিলাম ঘরের মাঠে বিশ্বকাপটি খেলে অবসর নিতে। মনে হচ্ছে তিনি সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত করেছেন।
নির্বাচকরাও মনে করছেন বিরাটের এই সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ের। ভারতীয় ক্রিকেটে এখন শুভমান গিল যশস্বী জয়সওয়াল এবং রিঙ্কু সিংয়ের মতো এক ঝাঁক তরুণ প্রতিভা উঠে এসেছে। বিরাট সরে গেলে তাদের জন্য দরজা খুলে যাবে। তবে বিরাটের অভাব পূরণ করা কি আদৌ সম্ভব। এই প্রশ্নটা নির্বাচকদেরও ভাবাচ্ছে। রোহিত শর্মা আগেই টি ২০ থেকে অবসর নিয়েছেন এবার যদি বিরাটও সরে যান তবে ভারতীয় দল এক বড় অভিজ্ঞতার শূন্যতায় পড়বে।
ভক্তদের আবেগ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়
বিরাটের এই টুইটের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগের বন্যা বয়ে গেছে। হ্যাশট্যাগ থ্যাঙ্কইউবিরাট এবং হ্যাশট্যাগ ডোন্টগোবিরাট এখন বিশ্বজুড়ে ট্রেন্ডিং। দিল্লির এক কলেজ ছাত্র রাহুল মেহরা লিখেছেন আমি ক্রিকেট দেখা শুরু করেছি বিরাটকে দেখে। ও যদি না থাকে তবে টিভি দেখার কোনো মানেই হয় না। কলকাতার এক আইটি কর্মী সুমনা সেন লিখেছেন ২০০৭ এর সচীন টেন্ডুলকারকে যেতে দেখে কেঁদেছিলাম। আজ আবার সেই একই কষ্ট হচ্ছে। বিরাট শুধু একজন ক্রিকেটার নন তিনি একটি যুগ।
অনেক ভক্ত আবার পুরনো স্মৃতি শেয়ার করছেন। মোহালিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেই ৮২ রানের ইনিংস বা মেলবোর্নে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হারিস রউফকে মারা সেই ঐতিহাসিক ছক্কা ভিডিওগুলো আজ বারবার শেয়ার হচ্ছে। বিরাটের অবসরের জল্পনা যেন ক্রিকেট প্রেমীদের এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে।
বিরাটের টি ২০ ক্যারিয়ার এক নজরে
২০০৬ সালে টি ২০ ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পর থেকে বিরাট কোহলি নিজেকে এই ফরম্যাটের অঘোষিত রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আন্তর্জাতিক টি ২০ তে তিনিই একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি ৪০০০ এর বেশি রান করেছেন এবং যার গড় ৫০ এর ওপরে। চেজ মাস্টার বা রান তাড়া করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। ২০১৪ এবং ২০১৬ টি ২০ বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট। তার ফিটনেস এবং রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে তাকে বিশ্বের যেকোনো অ্যাথলিটের ঈর্ষার পাত্র করে তুলেছে।
পরিসংখ্যান বলছে বিরাট কোহলি ভারতের হয়ে ১২৫টিরও বেশি টি ২০ ম্যাচ খেলেছেন। তার স্ট্রাইক রেট ১৩৮ এর কাছাকাছি যা আধুনিক ক্রিকেটের বিচারে অত্যন্ত সম্মানজনক। তবে কেবল রান বা সেঞ্চুরি দিয়ে বিরাটকে মাপা যাবে না। চাপের মুখে তিনি যেভাবে দলকে টেনে তোলেন তা অতুলনীয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সেই ম্যাচটি তার ক্যারিয়ারের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
কেন এই সিদ্ধান্ত
ক্রিকেট পন্ডিতরা মনে করছেন এই সিদ্ধান্তের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত বয়স এবং ফিটনেস। বিরাটের বয়স এখন ৩৭ ছুঁই ছুঁই। যদিও তিনি দলের সবচেয়ে ফিট ক্রিকেটার তবুও শরীরের ওপর ধকল যাচ্ছে। টেস্ট এবং ওয়ানডে ফরম্যাটে আরও কয়েক বছর খেলার জন্য তিনি হয়তো ছোট ফরম্যাট থেকে সরে দাঁড়াতে চাইছেন।
দ্বিতীয়ত পারিবারিক সময়। বিরাট এবং অনুষ্কা শর্মা তাদের দুই সন্তান অকায় এবং ভামিকার সাথে আরও বেশি সময় কাটাতে চান। টানা ক্রিকেটের সূচি থেকে কিছুটা বিরতি তাদের প্রয়োজন।
তৃতীয়ত তরুণদের সুযোগ। বিরাট সবসময়ই দলের স্বার্থ আগে দেখেন। তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন যে ২০২৮ সালের অলিম্পিক বা ২০৩০ এর বিশ্বকাপের জন্য এখন থেকেই নতুন দল তৈরি করা দরকার। তাই তিনি নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে এক মহানুভবতার পরিচয় দিচ্ছেন।
সতীর্থদের প্রতিক্রিয়া
বিরাটের দীর্ঘদিনের সতীর্থ এবং বন্ধু রোহিত শর্মা একটি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন বিরাটের মতো খেলোয়াড় শতাব্দীতে একবারই আসে। ও যদি অবসর নেয় তবে সেটা হবে বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য এক বড় ক্ষতি। তবে ওর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো উচিত। আমরা চাইব ও কাপ জিতেই মাঠ ছাড়ুক।
হার্দিক পান্ডিয়া যিনি সম্ভবত পরবর্তী টি ২০ অধিনায়ক হবেন তিনি বলেন বিরাটের জুতোর মাপ অনেক বড়। ওর জায়গা নেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। ও মাঠে থাকা মানেই আমাদের কাছে এক বাড়তি শক্তি। এই বিশ্বকাপে আমরা ওর জন্য জান লড়িয়ে দেব।
তরুণ ক্রিকেটার শুভমান গিল বলেছেন বিরাট ভাই আমার আইডল। তার সাথে ব্যাট করা আমার জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা। তিনি যদি অবসর নেন তবে ড্রেসিংরুমটা অনেক খালি মনে হবে।
বিশ্বকাপ ২০২৬ এক আবেগের মঞ্চ
২০২৬ টি ২০ বিশ্বকাপ এবার ভারতের মাটিতে হচ্ছে। ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে। ভক্তরা ইতিমধ্যেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন যে ফাইনালে ভারতের জয়ের পর বিরাটের কাঁধে জাতীয় পতাকা থাকবে এবং সচীন টেন্ডুলকারের মতো তাকেও কাঁধে নিয়ে মাঠ ঘোরানো হবে। ২০১১ সালে সচীন যেমন ওয়াংখেড়েতে বিশ্বকাপ জিতে বিদায় নিয়েছিলেন ২০২৬ এ বিরাটও কি সেই রূপকথার পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন।
এই বিশ্বকাপটি কেবল একটি ট্রফি জয়ের লড়াই নয় এটি হতে চলেছে এক মহাতারকার বিদায়ী সংবর্ধনা। প্রতিটি ম্যাচ প্রতিটি বল এবং প্রতিটি শট এখন ইতিহাসের পাতায় তোলা থাকবে। টিকিট নিয়ে এখনই হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। সবাই চায় শেষবারের মতো তাদের প্রিয় নায়ককে চোখের সামনে দেখতে।
বিজ্ঞাপন এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু
বিরাটের অবসরের খবরে তার ব্র্যান্ড ভ্যালুতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের মতে অবসরের পরেও বিরাটের জনপ্রিয়তা কমবে না। মহেন্দ্র সিং ধোনি বা সচীন টেন্ডুলকার যেমন অবসরের পরেও ব্র্যান্ডের দুনিয়ায় রাজত্ব করছেন বিরাটও তাই করবেন। বরং তার শেষ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কোম্পানিগুলো বিশাল সব ক্যাম্পেইন প্ল্যান করছে। ওয়ান লাস্ট টাইম বা শেষবারের মতো এই থিমে তৈরি বিজ্ঞাপনগুলো দর্শকদের আবেগকে ছুঁয়ে যাবে।
আগামী দিনের বিরাট
টি ২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও বিরাট যে আইপিএল খেলে যাবেন তা একপ্রকার নিশ্চিত। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর বা আরসিবি ভক্তদের জন্য এটি এক বড় স্বস্তি। বিরাট আগেই বলেছিলেন তিনি যতদিন ক্রিকেট খেলবেন ততদিন আরসিবি তেই থাকবেন। তাই লাল জার্সিতে তাকে আরও কয়েক বছর দেখা যাবে।
এছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে বিরাটের লক্ষ্য অনেক দূর। সচীন টেন্ডুলকারের ১০০ সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙার জন্য তার আরও ২০টি সেঞ্চুরি প্রয়োজন। ওয়ানডে এবং টেস্টে ফোকাস করে তিনি হয়তো সেই মাইলফলক স্পর্শ করতে চাইবেন। তার ফিটনেস যা তাতে তিনি অনায়াসেই ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত টেস্ট খেলতে পারবেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
উপসংহার
২০২৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দিল যে সব ভালো জিনিসেরই শেষ আছে। বিরাট কোহলি নামের যে ধ্রুবতারাটি ভারতীয় ক্রিকেটের আকাশকে গত ১৫ বছর ধরে আলোকিত করে রেখেছে তার অস্ত যাওয়ার সময় আসন্ন। কিন্তু অস্ত যাওয়ার আগে তিনি শেষবারের মতো জ্বলে উঠতে চান।
এই টি ২০ বিশ্বকাপ তাই কেবল খেলা নয় এটি এক আবেগের নাম। বিরাট কোহলি যখন ব্যাট হাতে মাঠে নামবেন তখন ১৪০ কোটি হৃদয় তার সাথে স্পন্দিত হবে। তিনি আউট হলে ভারত কাঁদবে তিনি ছক্কা মারলে ভারত হাসবে। কাপ আসুক বা না আসুক বিরাট কোহলি ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে যে স্থান দখল করে আছেন তা চিরস্থায়ী।
আমরা শুধু এইটুকুই আশা করতে পারি যে তার বিদায়টা যেন রাজকীয় হয়। ক্রিকেট দেবতা যেন তার সেরা সন্তানের জন্য সেরা চিত্রনাট্যটি লিখে রাখেন। ২০২৬ এর বিশ্বকাপ হয়ে উঠুক বিরাটের বিশ্বকাপ। শেষবারের মতো তেরঙ্গা জার্সিতে তাকে দেখার জন্য আমরা প্রস্তুত কিন্তু তাকে বিদায় জানানোর জন্য কি আমরা সত্যিই প্রস্তুত। উত্তরটা সম্ভবত না। কারণ রাজারা সিংহাসন ছাড়তে পারেন কিন্তু রাজত্ব ছাড়েন না। ক্রিকেট বিশ্বের হৃদয়ে বিরাট কোহলি আজীবন রাজা হয়েই থাকবেন।