Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

চোরাই বাইকে স্টান্ট ক্যামেরার সামনে প্রেম পেছনে ভয়ংকর প্রতারণা

বিভিন্ন মডেলের চোরাই বাইকে চড়ে রিল বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করত সে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত বড় চাকরিজীবী বলে পরিচয় দিয়ে সহজেই বিশ্বাস অর্জন করত।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝলমলে রিল, দামি বাইকের গর্জন, আর নিজেকে ‘বড় চাকরিজীবী’ বলে জাহির করা—এই সবকিছুর আড়ালে চলছিল এক ভয়ংকর প্রতারণার খেলা। বিভিন্ন মডেলের চোরাই বাইকে চড়ে রিল বানিয়ে তা পোস্ট করাই ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। আর সেই রিলের ঝলক দেখেই প্রেমের ফাঁদে পা দিতেন বহু তরুণী। এইভাবেই একের পর এক মানুষকে প্রতারিত করছিল উত্তর ২৪ পরগনার বাসিন্দা সামির আহমেদ।

সামিরের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল ছিল একেবারে নিখুঁতভাবে সাজানো। নামী ব্র্যান্ডের পোশাক, দামি স্মার্টফোন, দ্রুতগতির বাইক—সব মিলিয়ে সে নিজেকে তুলে ধরত একজন সফল, প্রতিষ্ঠিত যুবক হিসেবে। অনেক সময় নিজেকে বড় কোনও কর্পোরেট সংস্থার কর্মী বলেও পরিচয় দিত। তার এই সাজানো পরিচয়েই সহজে বিশ্বাস করতেন অনেক তরুণী। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আলাপ, তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, প্রেম—এরপর ডেটিংয়ের নাম করে কাছাকাছি আসা। অভিযোগ উঠেছে, এই সম্পর্কের সুযোগ নিয়েই সে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করত এবং শেষে সুযোগ বুঝে প্রতারণা চালাত।

এই প্রতারণার জাল ছিঁড়ে বেরোয় গত ১৭ জানুয়ারি। পাটুলি এলাকায় রিল বানাতে গিয়েই কার্যত ‘হাটে হাঁড়ি ভেঙে যায়’ সামিরের। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সেদিন ত্রিপুরার এক যুবক পাটুলিতে তাঁর পিসির বাড়িতে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পিসতুতো দাদা। দু’জনে মিলে বাইকে চড়ে স্থানীয় একটি ঝিলের ধারে যান রিল বানানোর উদ্দেশ্যে। ঠিক সেই সময় সেখানে হাজির হয় সামির আহমেদ।

নিজেকে দক্ষ কনটেন্ট ক্রিয়েটর পরিচয় দিয়ে সামির তাঁদের আরও ভালো রিল বানানোর প্রলোভন দেখায়। তার কথায় ভুলে ত্রিপুরার ওই যুবক ও তাঁর দাদা সামিরের সঙ্গে নিউ গড়িয়ার দিকে রওনা দেন। অভিযোগ, নিউ গড়িয়ায় পৌঁছে সামির নিজের বাইকটি একটি মেট্রো স্টেশনের কাছে রেখে দেয়। এরপর ‘একসঙ্গে রিল বানানো’র অছিলায় ত্রিপুরার যুবকের বাইক ও আইফোন নিজের হাতে নেয় সে।

সব কিছু যেন স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু রিল বানানোর মাঝেই আচমকা বাইকের গতি বাড়িয়ে দেয় সামির। মুহূর্তের মধ্যেই সে চোখের আড়াল হয়ে যায়। প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও দ্রুতই প্রতারণার বিষয়টি পরিষ্কার হয়। এরপরই পাটুলি থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ত্রিপুরার যুবক। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ চুরির মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে।

তদন্তের প্রথম ধাপেই পুলিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পায়। ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা সামিরের বাইকের নম্বর প্লেট খতিয়ে দেখে জানা যায়, সেটি বেনিয়াপুকুর এলাকার এক ব্যক্তির নামে নথিভুক্ত। আরও খোঁজ নিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ওই বাইকটি ১৫ জানুয়ারি স্থানীয় একটি পার্কিং লট থেকে চুরি হয়েছিল। এখান থেকেই স্পষ্ট হয়—এই ঘটনা নিছক প্রতারণা নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি চোরাই বাইক চক্র।

পুলিশের সন্দেহ আরও দৃঢ় হয় যখন খোওয়া যাওয়া আইফোনের লোকেশন ট্র্যাক করা হয়। প্রযুক্তির সাহায্যে দেখা যায়, মোবাইলটির অবস্থান উত্তর ২৪ পরগনার বিড়া এলাকায়। সেই এলাকাতেই সামির আহমেদের বাড়ি। এরপর পাটুলি থানার ওসি তীর্থঙ্কর দে’র নির্দেশে তদন্তকারী অফিসার মিন্টু করণ ২৯ জানুয়ারি সামিরের বাড়িতে হানা দেন।

তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে উদ্ধার হয় একটি চোরাই বাইক ও আইফোন। যদিও অভিযুক্ত সামির তখন বাড়িতে ছিল না। জিজ্ঞাসাবাদে তার মা পুলিশকে জানান, দু’দিন আগেই ওই বাইক ও মোবাইল বাড়িতে রেখে ছেলে হঠাৎ পালিয়ে যায়। তিনি স্বীকার করেন, তাঁর ছেলে দীর্ঘদিন ধরেই বাইক চুরির সঙ্গে যুক্ত।

পুলিশি তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। জানা গিয়েছে, সামির নিয়মিত বিভিন্ন এলাকা থেকে বাইক চুরি করত। সেই সব চোরাই বাইক দিয়েই বানানো হতো রিল। দ্রুতগতির বাইক, স্টান্ট, ঝিলের ধারে বা শহরের ফাঁকা রাস্তায় শুট করা ভিডিও—এসবই ছিল তার সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্টের মূল আকর্ষণ। আর এই কনটেন্ট দেখেই আকৃষ্ট হতেন বহু তরুণী।

পুলিশের দাবি, সামিরের এই জীবনযাপন পুরোপুরি ভুয়ো। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে যে ‘উঁচু লাইফস্টাইল’-এর ছবি তুলে ধরত, বাস্তবে তার কোনও বৈধ রোজগার ছিল না। চুরি করা বাইক ও প্রতারণার মাধ্যমেই সে এই বিলাসবহুল জীবন চালাত। তদন্তকারীদের মতে, সামির একা নয়—এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

news image
আরও খবর

বর্তমানে অভিযুক্ত সামির আহমেদ পলাতক। তার সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার অ্যাকাউন্টগুলিও নজরে রাখা হচ্ছে। পুলিশ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে জানিয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝলমলে প্রোফাইল, দামি বাইক বা বড় চাকরির দাবি দেখেই যেন কেউ সহজে বিশ্বাস না করেন।

এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ার আড়ালে কতটা অন্ধকার লুকিয়ে থাকতে পারে। চকচকে রিল, দামি বাইক আর মিথ্যে পরিচয়ের ফাঁদে পা দিয়ে কত সহজেই বিপদে পড়তে পারেন সাধারণ মানুষ। তাই সচেতনতা আর সতর্কতাই হতে পারে এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত সামির আহমেদের ডিজিটাল গতিবিধির দিকেও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। তার ব্যবহৃত একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, ফলোয়ার লিস্ট এবং ডাইরেক্ট মেসেজের তথ্য খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ মনে করছে, এই অ্যাকাউন্টগুলির মাধ্যমেই সে নতুন শিকার খুঁজত এবং নিজের ভুয়ো পরিচিতি আরও ছড়িয়ে দিত। ইতিমধ্যেই তার কয়েকটি অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে, যা থেকে তদন্তকারীদের অনুমান—পালানোর আগে সে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করেছে।

পুলিশ আধিকারিকদের মতে, এই ধরনের অপরাধে সোশ্যাল মিডিয়া এখন বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বাস্তবে যার কোনও স্থায়ী চাকরি বা বৈধ আয় নেই, সে-ও কয়েকটি ভালো ছবি, ভিডিও আর সাজানো গল্পের মাধ্যমে নিজেকে সফল ও প্রতিষ্ঠিত বলে তুলে ধরতে পারে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, অনেক সময় এই ঝলমলে উপস্থাপনায় সহজেই প্রভাবিত হয়ে পড়েন। সামিরের ঘটনাও তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, সামির শুধু বাইক চুরি করেই থেমে থাকেনি। চোরাই বাইকগুলির নম্বর প্লেট বদলে বা আংশিক ঢেকে সে নিয়মিত শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াত। কোথাও রিল বানানো, কোথাও ডেটিং—এইভাবেই সে নিজের অপরাধকে আড়াল করত। পুলিশের মতে, এই স্টাইলটাই তাকে দীর্ঘদিন ধরা পড়তে দেয়নি। কারণ, সাধারণ মানুষের চোখে সে ছিল একজন ‘রিল ক্রিয়েটর’ বা ‘বাইক লাভার’, অপরাধী নয়।

এই ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে তরুণ-তরুণীদের সতর্ক করা হয়েছে। অপরিচিত কারও সঙ্গে শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আলাপ হলে দ্রুত ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দামি গাড়ি, বাইক বা বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি দেখেই কাউকে বিশ্বাস না করার কথাও বলা হয়েছে। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে তবেই কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছে পুলিশ।

সমাজবিদদের মতে, এই ধরনের ঘটনা আসলে আমাদের সময়ের বড় বাস্তবতা তুলে ধরে। সোশ্যাল মিডিয়া যেমন মানুষের প্রতিভা প্রকাশের মাধ্যম, তেমনই তা হয়ে উঠছে প্রতারণার প্ল্যাটফর্মও। বাস্তব জীবন আর অনলাইন জীবনের মধ্যে ফারাক বুঝতে না পারলেই বিপদ বাড়ে। সামিরের মতো অভিযুক্তরা এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পাটুলির এই ঘটনা শুধু একটি চুরি বা প্রতারণার মামলা নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা—যা মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল দুনিয়ার ঝলকানির আড়ালে সব সময় সত্য লুকিয়ে থাকে না। তাই প্রতিটি রিল, প্রতিটি প্রোফাইল আর প্রতিটি মধুর কথার পেছনে বাস্তবতা যাচাই করা আজ সময়ের দাবি। কারণ একটু অসতর্কতাই কাউকে ঠেলে দিতে পারে বড় বিপদের দিকে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পাটুলির এই ঘটনা শুধু একটি চুরি বা প্রতারণার মামলা নয়; এটি সমাজের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেখা প্রতিটি ছবি, ভিডিও বা গল্প যে বাস্তব হবে—তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা এক ভুয়ো জগতের মুখোমুখি হন সাধারণ মানুষ। ঝকঝকে রিল, দামি বাইক, বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি দেখে অনেকেই সহজেই প্রভাবিত হয়ে পড়েন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে হলে অনলাইন পরিচয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা জরুরি। অপরিচিত কারও ব্যক্তিগত দাবি, চাকরি বা আর্থিক অবস্থান যাচাই না করে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক হতে পারে। বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ডিজিটাল নিরাপত্তাও আজ সমান প্রয়োজনীয়। কারণ এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তই কারও জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

Preview image