প্রায় ২৮০০ বছর আগে Homer রচিত গ্রিক মহাকাব্য Iliad-এর একটি অংশ এবার পাওয়া গেল মিশরের এক মমির সঙ্গে। সমাধিতে সংরক্ষিত প্যাপিরাসে লেখা এই অংশটি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও মিশরীয় সভ্যতার এক অনন্য সংযোগের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মিশরের ইতিহাস যেমন প্রাচীন, তেমনই রহস্যে ঘেরা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রত্নতত্ত্ববিদরা ছুটে গিয়েছেন এই মরুভূমির দেশে—পিরামিড, সমাধি, ফ্যারাওদের নিদর্শন আর মমির সন্ধানে। বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারও হয়েছে। তবুও মিশরের বুকের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা রহস্য যেন শেষ হওয়ার নয়।
সম্প্রতি সেই রহস্যের ঝুলিতে যোগ হল এক নতুন অধ্যায়—একটি মমির সঙ্গে পাওয়া গেল প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যের অংশ। যা শুধু প্রত্নতত্ত্ব নয়, সাহিত্য ইতিহাসকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
এই মমিটি আবিষ্কৃত হয়েছে মিশরের প্রাচীন শহর Oxyrhynchus-এ, যা বর্তমানে আল বাহনাসা নামে পরিচিত। এটি Cairo থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।
প্রাচীন কালে এই শহরটি ছিল গ্রিক-রোমান সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে বহু প্যাপিরাস নথি আগেও পাওয়া গেছে, যেগুলো ইতিহাস, প্রশাসন, সাহিত্য ও দৈনন্দিন জীবনের নানা তথ্য বহন করে।
গবেষকদের হাতে এসেছে একটি ক্ষতিগ্রস্ত প্যাপিরাসের টুকরো, যা বিশ্লেষণ করে জানা গেছে—এটি গ্রিক মহাকাব্য Iliad-এর অংশ।
এই মহাকাব্যটি রচনা করেছিলেন প্রখ্যাত কবি Homer, প্রায় ২৮০০ বছর আগে। ট্রয় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে লেখা এই কাব্য পশ্চিমা সাহিত্যের অন্যতম ভিত্তি।
অন্যদিকে, যে মমির সঙ্গে এই প্যাপিরাস পাওয়া গেছে, তার বয়স আনুমানিক ১৬০০ বছর—অর্থাৎ অনেক পরবর্তী সময়ের। ফলে এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, প্রাচীন মিশরে গ্রিক সাহিত্য কেবল পরিচিতই ছিল না, তা কোনওভাবে শেষকৃত্যের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
এই আবিষ্কারটি করেছে University of Barcelona-এর একদল গবেষক। তাঁদের দলের অন্যতম ভাষাতত্ত্ববিদ Ignasi-Xavier Adiego জানিয়েছেন—
“এটি আমাদের কাছে একটি বড় সাফল্য। আমরা এতদিন জানতাম না যে প্রাচীন মিশরের শেষকৃত্যের প্রক্রিয়ায় সাহিত্যও ব্যবহৃত হতে পারে।”
এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়—এই আবিষ্কার শুধু একটি নতুন নিদর্শন নয়, বরং একটি নতুন ধারণার দরজা খুলে দিয়েছে।
বহু বছর ধরে সমাধির নিচে চাপা পড়ে থাকার ফলে প্যাপিরাসটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রাথমিক পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়েছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন—
তবে এখনও সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ বাকি। ভবিষ্যতে এক্স-রে ও উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
প্রাচীন মিশরের বহু মমির সঙ্গে প্যাপিরাস পাওয়া গেছে। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই ছিল—
অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির আত্মার পরবর্তী যাত্রা সহজ করতে এসব লেখা ব্যবহার করা হত।
কিন্তু সাহিত্য—বিশেষ করে গ্রিক মহাকাব্য—এই প্রথম কোনও মমির সঙ্গে পাওয়া গেল বলে দাবি গবেষকদের।
এই ঘটনাটি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দেয়—
গ্রিক ও মিশরীয় সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগ কতটা গভীর ছিল?
সাহিত্য কি শুধুই বিনোদন বা শিক্ষা ছিল, নাকি ধর্মীয় বা আচারগত গুরুত্বও ছিল?
মৃতদের সঙ্গে কেন একটি মহাকাব্যের অংশ রাখা হয়েছিল?
সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে—
গবেষকরা এখনও এই প্যাপিরাস নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে—
এর মাধ্যমে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
মিশরের প্রাচীন শহর Oxyrhynchus-এ আবিষ্কৃত মমির সঙ্গে পাওয়া প্যাপিরাস ইতিমধ্যেই ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ভাষাতত্ত্ববিদদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। গ্রিক মহাকাব্য Iliad-এর অংশ হিসেবে চিহ্নিত এই পাণ্ডুলিপি শুধু একটি বিরল নিদর্শন নয়, বরং এটি এক বহুমাত্রিক গবেষণার দরজা খুলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন—এর পর কী? কীভাবে এগোবে গবেষণা? ভবিষ্যতে আমরা আর কী জানতে পারি?
এই আবিষ্কারকে ঘিরে আগামী দিনে যে গবেষণাগুলি হতে চলেছে, তা মূলত তিনটি বড় স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে—উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর স্ক্যানিং, গভীর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, এবং তুলনামূলক সাহিত্য গবেষণা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা এবং আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা।
প্রাচীন প্যাপিরাস সাধারণত খুব ভঙ্গুর হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার ফলে এগুলি ক্ষয়ে যায়, লেখা মুছে যায় বা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। তাই সরাসরি হাত দিয়ে খুলে দেখা বা পড়া অনেক সময় বিপজ্জনক—এতে নথিটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এই জায়গাতেই আধুনিক প্রযুক্তি গবেষকদের সবচেয়ে বড় সহায়ক।
এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ব্যবহার করে প্যাপিরাসের ওপরের অদৃশ্য বা মুছে যাওয়া লেখা শনাক্ত করা যায়। অনেক সময় খালি চোখে যা দেখা যায় না, এই প্রযুক্তিতে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গবেষকরা পরিকল্পনা করছেন এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করার, যাতে প্যাপিরাস না খুলেই তার ভিতরের স্তরগুলি দেখা যায়। বিশেষ করে যদি প্যাপিরাসটি মমির সঙ্গে মোড়ানো অবস্থায় থাকে, তাহলে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভাঙা লেখা বা অসম্পূর্ণ বাক্য পুনর্গঠন করা সম্ভব। Iliad-এর পরিচিত টেক্সটের সঙ্গে মিলিয়ে এআই সম্ভাব্য লাইন বা শব্দ অনুমান করতে পারে।
এই প্যাপিরাসে ব্যবহৃত ভাষা গবেষকদের জন্য এক বিশাল তথ্যভান্ডার।
গ্রিক ভাষারও বিভিন্ন রূপ রয়েছে—হোমেরিক গ্রিক, কোইনে গ্রিক ইত্যাদি। প্যাপিরাসে কোন ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে বোঝা যাবে এটি কোন সময়ের কপি।
হাতের লেখার স্টাইল দেখে পাণ্ডুলিপির বয়স নির্ধারণ করা যায়। অক্ষরের গঠন, ব্যবধান, কালি ব্যবহার—সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।
Homer-এর রচিত Iliad বহুবার কপি করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন সংস্করণে ছোটখাটো পার্থক্য রয়েছে। এই প্যাপিরাসে পাওয়া অংশটি যদি অন্য সংস্করণের থেকে আলাদা হয়, তাহলে তা অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য দিতে পারে।
এই আবিষ্কার শুধু একটি পাণ্ডুলিপি নয়—এটি দুই মহান সভ্যতার সংযোগের প্রমাণ।
Oxyrhynchus ছিল এমন একটি জায়গা যেখানে গ্রিক, রোমান এবং মিশরীয় সংস্কৃতি মিলিত হয়েছিল। এই প্যাপিরাস সেই মেলবন্ধনের বাস্তব প্রমাণ।
এটি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সম্ভাব্য ব্যাখ্যা—
বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত Iliad-এর অন্যান্য পাণ্ডুলিপির সঙ্গে এই অংশটি তুলনা করা হবে।
প্যাপিরাসটি যে মমির সঙ্গে পাওয়া গেছে, সেই মমির বিশ্লেষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই তথ্যগুলো একত্র করলে বোঝা যাবে কেন এই প্যাপিরাসটি সেখানে রাখা হয়েছিল।
এই ধরনের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে একাধিক শাখার বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে কাজ করতে হয়—
University of Barcelona-এর গবেষকরা ইতিমধ্যেই এই ধরনের যৌথ গবেষণার দিকে এগোচ্ছেন।
এই গবেষণা থেকে ভবিষ্যতে যা যা জানা যেতে পারে—