Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়

বাংলা বিনোদন জগতের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এ বছর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়ে অনুরাগীদের গর্বের মুহূর্ত এনে দিলেন।

পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
বিনোদন

তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন — তিনি নিজেই এক ‘ইন্ডাস্ট্রি’। নবাগত থেকে শুরু করে আজকের টলিপাড়ার সুপারস্টারদের কাছেও তিনি অভিভাবকসম। টলিউডে তাঁর ডাকনাম ‘বুম্বাদা’, আর সাধারণ দর্শক ও অনুরাগীদের কাছে তিনি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় — এমন এক নাম, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সিনেমার বিবর্তনের প্রতিটি ধাপে তিনি নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন, বদলেছেন সময়ের সঙ্গে, বদলেছেন নিজের অভিনয়ভঙ্গি, চরিত্রের ধরন, এমনকি দর্শকের প্রত্যাশাও।

চলতি বছর চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে দেওয়া হল দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান — পদ্মশ্রী পুরস্কার। সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে ঘোষিত এই পুরস্কারের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসতেই টলিপাড়া জুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। সহকর্মী, পরিচালক, শিল্পী থেকে শুরু করে লক্ষ লক্ষ অনুরাগী সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছা বার্তায় ভরিয়ে দেন অভিনেতাকে। অনেকেই বলেন, “এই সম্মান বহু আগেই তাঁর প্রাপ্য ছিল।”

এই সম্মান শুধু একজন শিল্পীর কৃতিত্বের স্বীকৃতি নয় — এটি বাংলা চলচ্চিত্রের চার দশকের এক অনবদ্য যাত্রারও স্বীকৃতি।

শিশুশিল্পী থেকে সুপারস্টার — এক অনন্য যাত্রার শুরু

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনের সূচনা খুব ছোট বয়সেই। বাবা ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। অভিনয় যেন তাঁর রক্তেই মিশে ছিল। শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই ক্যামেরার সামনে স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। তবে এই পরিচয় তাঁর কাছে আশীর্বাদ হলেও, একই সঙ্গে ছিল এক বিশাল দায়িত্বও — বাবার খ্যাতির ছায়া ছাপিয়ে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার।

প্রথম দিকের পথচলা সহজ ছিল না। একাধিক ছবিতে কাজ করলেও তেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেন। আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে তাঁর ক্যারিয়ারে আসে একের পর এক হিট ছবি। তখনই বাংলা ছবির মূলধারায় তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম জনপ্রিয় মুখ।

তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল এই যে, তিনি কখনও নিজেকে একটি নির্দিষ্ট ধাঁচের চরিত্রে আটকে রাখেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ভেঙে গড়েছেন বারবার — আর এই অভিযোজন ক্ষমতাই তাঁকে আজকের প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় করে তুলেছে।

বাণিজ্যিক ছবি থেকে আর্ট ফিল্ম — অলরাউন্ডারের জয়যাত্রা

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর বহুমাত্রিকতা। রোমান্টিক নায়ক, অ্যাকশন হিরো, পারিবারিক ছবির আদর্শ পুত্র বা স্বামী, সামাজিক ছবির প্রতিবাদী চরিত্র, আবার কখনও অন্ধকার মনস্তত্ত্বের ভিলেন — প্রতিটি রূপেই তিনি সাবলীল।

নব্বইয়ের দশকে বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার যে উত্থান দেখা গিয়েছিল, তার অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন প্রসেনজিৎ। ‘অমর সঙ্গী’, ‘প্রেমপুজা’, ‘আনন্দ আশ্রম’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’-এর মতো ছবিতে তাঁর রোমান্টিক নায়কসত্তা দর্শকের মন জয় করেছিল। তখন তাঁকে বলা হত “রোমান্সের রাজপুত্র”।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝেছিলেন — শুধু বাণিজ্যিক নায়ক হিসেবে নিজেকে আটকে রাখলে চলবে না। অভিনয়কে আরও গভীরে নিয়ে যেতে হবে। আর তখনই তাঁর জীবনে আসে এক নতুন অধ্যায় — আর্ট ফিল্ম ও বিকল্প ধারার সিনেমা।

ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা ছবির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ‘দোসর’, ‘চোখের বালি’, ‘অন্তরমহল’, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’, ‘নৌকাডুবি’ — এই ছবিগুলিতে তাঁর অভিনয় বাংলা ছবিকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে ‘দোসর’-এ এক সংবেদনশীল স্বামীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল এবং তাঁকে এনে দেয় জাতীয় পুরস্কার।

‘বাইশে শ্রাবণ’-এর ভিলেন থেকে ‘অটোগ্রাফ’-এর অমিত — চরিত্রের জাদু

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর চরিত্র নির্বাচন। তিনি কখনও নিজেকে “নায়ক” বা “নায়কসুলভ” ভাবমূর্তির মধ্যে বন্দি করেননি। বরং চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে দ্বিধা করেননি।

‘বাইশে শ্রাবণ’-এ সিরিয়াল কিলারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল ভয়ংকর অথচ সংযত, যা দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। আবার ‘অটোগ্রাফ’-এ সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবির অমিত চরিত্রের আধুনিক রূপে তাঁর অভিনয় ছিল পরিণত, সংবেদনশীল ও স্মরণীয়।

‘জাতিস্মর’-এ সময়ের বাঁকে বাঁকে ঘুরে বেড়ানো এক আত্মার চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল একেবারে অন্য মাত্রার। ‘চোখের বালি’-তে মহেন্দ্র চরিত্রে তাঁর দ্বিধাগ্রস্ত, আত্মকেন্দ্রিক অথচ মানবিক রূপ দর্শকের মনে গভীর দাগ কেটেছিল।

এই চরিত্রগুলিই প্রমাণ করে — প্রসেনজিৎ শুধু তারকা নন, তিনি একজন অভিনেতা, যিনি চরিত্রের গভীরে ঢুকে গিয়ে তাকে জীবন্ত করে তোলেন।

চার দশকের ক্যারিয়ার, সাড়ে তিনশোর বেশি ছবি

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ঝুলিতে রয়েছে সাড়ে তিনশোরও বেশি ছবি। এই বিশাল ফিল্মোগ্রাফিতে রয়েছে হিট, সুপারহিট, ব্লকবাস্টার থেকে শুরু করে সমালোচকপ্রশংসিত শিল্পসম্মত ছবি। এত দীর্ঘ ক্যারিয়ারে খুব কম অভিনেতাই এমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন।

তিনি শুধু পর্দায় অভিনয় করেননি, বরং বহু সময় বাংলা সিনেমাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন। যখন একসময় বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমা সংকটে পড়েছিল, তখন তাঁর উপস্থিতিই বহু প্রযোজক ও পরিচালককে সাহস জুগিয়েছে।

তাঁর নাম মানেই ছবির প্রতি দর্শকের আস্থা — এই বিশ্বাসযোগ্যতাই তাঁকে করে তুলেছে টলিউডের ‘ইন্ডাস্ট্রি’।

মুম্বইতেও জনপ্রিয়তা — জাতীয় স্তরে পরিচিত মুখ

শুধু বাংলা ছবিতেই নয়, হিন্দি ছবিতেও নিজের জায়গা তৈরি করেছেন প্রসেনজিৎ। মুম্বইয়ের একাধিক প্রজেক্টে কাজ করেছেন তিনি। বিশেষ করে বলিউডের আর্ট ও কমার্শিয়াল ছবিতে তাঁর উপস্থিতি প্রশংসিত হয়েছে।

news image
আরও খবর

এতে একদিকে যেমন তাঁর অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি মিলেছে, তেমনই বাংলা সিনেমার প্রতিনিধিত্বও হয়েছে জাতীয় স্তরে। অনেক সমালোচকই মনে করেন, বাংলা ছবির অভিনেতাদের মধ্যে খুব কম মানুষই এত স্বচ্ছন্দে ভাষা ও ইন্ডাস্ট্রির সীমা পেরিয়ে কাজ করতে পেরেছেন — প্রসেনজিৎ তাঁদের অন্যতম।

জাতীয় পুরস্কার থেকে পদ্মশ্রী — সম্মানের পথে এক উজ্জ্বল যাত্রা

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এর আগেই পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তাঁর অভিনয় জীবনের সেই স্বীকৃতি ছিল শিল্পীসত্তার এক বড় অর্জন। কিন্তু পদ্মশ্রী সম্মান তাঁর জীবনে এক আলাদা মাত্রা যোগ করল।

কারণ পদ্মশ্রী শুধু শিল্পী হিসেবে তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি নয় — এটি তাঁর চার দশকের শ্রম, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও সংস্কৃতির প্রতি অবদানের স্বীকৃতি।

এই সম্মান প্রসঙ্গে অভিনেতা বলেন,

“এটা আমার একার প্রাপ্তি নয়। গত ৪০ বছর ধরে যে মানুষগুলো আমাকে নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের সকলের জন্য এই সম্মান। তাঁরা না থাকলে আমি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় হতে পারতাম না। বাংলা ভাষায় ছবি করেছি এত বছর ধরে — তাই এই সম্মান আমাকে আরও বেশি গর্বিত করেছে। মাকে ভীষণ মিস করছি এই বিশেষ দিনে।”

এই বক্তব্যেই ধরা পড়ে তাঁর বিনয়, কৃতজ্ঞতা এবং শিকড়ের প্রতি গভীর টান।

টলিপাড়ায় উৎসবের আবহ

রবিবার এই ঘোষণা হতেই টলিপাড়া জুড়ে শুরু হয় আনন্দোৎসব। সহকর্মী অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রযোজক থেকে শুরু করে নবাগত শিল্পীরাও সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছা জানাতে থাকেন তাঁকে।

অনেকে লেখেন — “এই সম্মান বাংলা সিনেমারও সম্মান।” কেউ বলেন — “বুম্বাদা শুধু একজন তারকা নন, তিনি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অভিভাবক।” কেউ আবার লেখেন — “এই পুরস্কার বহু আগেই তাঁর প্রাপ্য ছিল।”

টলিপাড়ার অন্দরমহলে তাঁর অবদান শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ নয়। বহু নবাগত শিল্পী তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন উৎসাহ, পরামর্শ ও সুযোগ। অনেকের কেরিয়ারের শুরুতেই তাঁর সহানুভূতিশীল ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই তিনি শুধু পর্দার তারকা নন — পর্দার বাইরেও তিনি এক অভিভাবকসম ব্যক্তিত্ব।

প্রসেনজিৎ ও ঋতুপর্ণ ঘোষ — বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের জুটি বাংলা ছবির ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিল। তাঁদের সহযোগিতায় তৈরি ছবিগুলি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পায়নি, বরং বাংলা সিনেমার শিল্পমানকেও আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরেছে।

‘দোসর’, ‘চোখের বালি’, ‘অন্তরমহল’, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ — প্রতিটি ছবিতেই প্রসেনজিৎ নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। তাঁর অভিনয়ে এসেছে সংযম, গভীরতা ও মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা।

এই ছবিগুলি তাঁকে শুধু সুপারস্টার নয়, একজন পরিণত শিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বারবার নিজেকে ভেঙে গড়া — প্রসেনজিতের ইউএসপি

অনেক অভিনেতাই জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে গিয়ে নিজেদের নিরাপদ গণ্ডিতে আটকে ফেলেন। কিন্তু প্রসেনজিৎ সেই পথে হাঁটেননি। বরং তিনি বারবার নিজের ইমেজ ভেঙেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন এবং নিজেকে নতুন করে গড়েছেন।

কখনও তিনি রোমান্টিক নায়ক, কখনও তিনি ভিলেন, কখনও তিনি মধ্যবয়সী ক্লান্ত মানুষ, আবার কখনও আত্মকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী — প্রতিটি রূপেই তিনি বিশ্বাসযোগ্য।

এই সাহসিকতাই তাঁকে আজকের প্রসেনজিৎ করে তুলেছে — যিনি শুধু অতীতের তারকা নন, বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও গুরুত্বপূর্ণ মুখ।

বাংলা সিনেমার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর

আজকের দিনে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন অভিনেতা নন — তিনি কার্যত বাংলা সিনেমার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। দেশের বাইরে বাংলা ছবি নিয়ে বিভিন্ন উৎসবে অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব — সব ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি বাংলা সিনেমাকে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে।

তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাষার সীমা পার করেও ভালো অভিনয় দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে।

Preview image