Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মুরগি নয়, গলদা চিংড়ির ঝাঁঝালো রোস্টে বদলে ফেলুন ভোজের স্বাদ পোলাও ও নারকেলি ভাতের সঙ্গে জমবে রাজকীয় আহার

বিশেষ দিনের ভোজে স্বাদের বৈচিত্র আনতে এ বার চেনা চিংড়ির পদ ছেড়ে বেছে নিন গলদা চিংড়ির রোস্ট। সর্ষে ভাপা বা মালাইকারির একঘেয়েমি কাটিয়ে ঝাঁঝালো মশলায় তৈরি এই রেসিপি পোলাও বা নারকেলি ভাতের সঙ্গে দারুণ মানাবে। ঘরেই সহজ উপকরণে বানিয়ে ফেলুন রেস্তোরাঁর স্বাদের বিশেষ পদ।

বড়দিনের রাজকীয় ভোজে গলদা চিংড়ির রোস্ট: বাঙালিয়ানার সঙ্গে উৎসবের নতুন স্বাদ

ভূমিকা

বাঙালির জীবনে উৎসব মানেই খাওয়া-দাওয়া, আর খাওয়া-দাওয়া মানেই নতুন নতুন পদ রান্নার আনন্দ। বলা হয়, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ—এই প্রবাদ আজও অমলিন। দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে কালীপুজো, ভাইফোঁটা, জামাইষষ্ঠী কিংবা পয়লা বৈশাখ—প্রতিটি উৎসবেই বাঙালির রান্নাঘরে থাকে বিশেষ আয়োজন। বছরের শেষ দিকে এসে সেই উৎসবের তালিকায় যুক্ত হয় আরও একটি বড় উৎসব—বড়দিন

ডিসেম্বর মানেই ঠান্ডা হাওয়া, রঙিন আলো, কেকের গন্ধ আর বন্ধু-পরিজনের সঙ্গে পার্টির প্রস্তুতি। কেউ বাড়িতেই ছোটখাটো পার্টির আয়োজন করেন, কেউ আবার পরিবার-বন্ধুদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় গিয়ে ভোজ সারেন। তবে যেখানেই হোক, বাঙালির বিশেষ দিনের ভোজে একটি পদ না থাকলেই নয়—চিংড়ি

সর্ষে চিংড়ি, চিংড়ি মালাইকারি, দই চিংড়ি—এই সব পদ আমাদের রোজকার উৎসবের সঙ্গী। কিন্তু এ বার যদি একটু অন্য রকম কিছু করা যায়? যদি পরিচিত স্বাদের বাইরে গিয়ে বড়দিনের ভোজে যোগ করা যায় একটু রাজকীয় ছোঁয়া? ঠিক সেই ভাবনা থেকেই আজকের এই বিশেষ রেসিপি—গলদা চিংড়ির রোস্ট

কেন গলদা চিংড়ি?

গলদা চিংড়ি মানেই আলাদা এক আভিজাত্য। আকারে বড়, মাংসল ও স্বাদে ভরপুর এই চিংড়ি সাধারণত বিশেষ অনুষ্ঠান বা রেস্তোরাঁর মেনুতেই বেশি দেখা যায়। সাধারণ চিংড়ির তুলনায় গলদা চিংড়ির স্বাদ অনেক বেশি গভীর এবং রান্নায় মশলার সঙ্গে দারুণভাবে মিশে যায়।

রোস্ট জাতীয় পদে গলদা চিংড়ি ব্যবহার করলে তার স্বাদ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মশলার কষা, ঘি-এর সুবাস, বেরেস্তার মিষ্টি স্বাদ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় একেবারে উৎসবমুখর একটি পদ।

 বড়দিন ও বাঙালির ভোজ সংস্কৃতি

বড়দিন মূলত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব হলেও, আজ তা বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দের উপলক্ষ। কেক কাটার সঙ্গে সঙ্গে চলে নানা ধরনের খাবারের আয়োজন। চিকেন রোস্ট, মাটন স্টু, ফ্রাইড রাইস—এই সব তো থাকেই। কিন্তু বাঙালিয়ানা বজায় রাখতে চাইলে সামুদ্রিক স্বাদের কোনও পদ থাকা প্রায় বাধ্যতামূলক।

এই জায়গাতেই গলদা চিংড়ির রোস্ট হয়ে উঠতে পারে বড়দিনের ভোজের ‘স্টার ডিশ’। পোলাও, নারকেলি ভাত কিংবা বাসমতি রাইসের সঙ্গে এই পদ জমে যাবে অনায়াসেই।

 উপকরণ

প্রণালী ও পরিবেশন: গলদা চিংড়ির রোস্ট কেন উৎসবের সেরা আকর্ষণ

উৎসবের দিনে রান্নাঘরে নতুন কিছু করার আনন্দই আলাদা। বিশেষ করে যখন সেই পদটি হয় পরিচিত স্বাদের বাইরে, কিন্তু বাঙালিয়ানার সঙ্গে সম্পূর্ণ মানানসই—তখন তার কদর আরও বেড়ে যায়। গলদা চিংড়ির রোস্ট ঠিক তেমনই একটি পদ, যা স্বাদ, গন্ধ ও পরিবেশনের দিক থেকে একেবারে রাজকীয়।

প্রণালী (বিস্তারিত)

প্রথম ধাপে একটি বড় বাটিতে গলদা চিংড়িগুলি ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। গলদা চিংড়ি আকারে বড় ও মাংসল হওয়ায় পরিষ্কার করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন খোলসের ভিতরের অংশ ভালোভাবে ধোয়া হয়। এতে রান্নার পরে কোনও কাঁচা গন্ধ থাকবে না।

এ বার ম্যারিনেশনের পালা। পরিষ্কার করা চিংড়ির সঙ্গে একে একে যোগ করতে হবে টক দই, পেঁয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা, নারকেল বাটা, গোলমরিচের গুঁড়ো এবং স্বাদমতো নুন। এই মশলার মিশ্রণটাই এই রেসিপির প্রাণ। দই চিংড়িকে নরম করে, নারকেল বাটা এনে দেয় হালকা মিষ্টি স্বাদ, আর গোলমরিচ ও কাঁচালঙ্কা যোগ করে ঝাঁঝ।

সব উপকরণ একসঙ্গে ভালোভাবে মেখে অন্তত ১৫ মিনিট ম্যারিনেট করে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই সময়ের মধ্যে চিংড়ির ভেতরে মশলার স্বাদ ঢুকে পড়ে, যা রোস্টের সময় আলাদা গভীরতা তৈরি করে।

এর পর একটি কড়াইতে সাদা তেল ও ঘি একসঙ্গে গরম করতে হবে। তেল ও ঘির এই মিশ্রণ রান্নায় ভারসাম্য আনে—তেল রান্নাকে হালকা রাখে, আর ঘি যোগ করে সুগন্ধ ও উৎসবের ছোঁয়া। তেল গরম হয়ে এলে গোটা গরমমশলা (দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ) ফোড়ন দিতে হবে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কড়াই ভরে যাবে মশলার ঘ্রাণে।

এ বার ম্যারিনেট করা মিশ্রণ থেকে শুধু চিংড়িগুলি আলাদা করে নিয়ে কড়াইতে দিয়ে হালকা করে ভেজে নিতে হবে। এই ধাপটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে চিংড়ির বাইরের অংশ সিল হয়ে যায় এবং ভেতরের রস ধরে রাখে। বেশি ভাজা যাবে না, শুধু হালকা রঙ ধরলেই যথেষ্ট।

চিংড়িগুলি তুলে নেওয়ার পর কড়াইয়ে বাকি ম্যারিনেট করা মশলাটি ঢেলে মাঝারি আঁচে কষাতে হবে। ধীরে ধীরে মশলা ঘন হয়ে আসবে এবং প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে তেল ছেড়ে দেবে। এই তেল ছাড়া মানেই মশলা ঠিকঠাক কষা হয়েছে।

এখন ভেজে রাখা চিংড়িগুলি আবার কড়াইয়ে দিয়ে মশলার সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। আঁচ কমিয়ে আরও কয়েক মিনিট রান্না করলে চিংড়ি পুরোপুরি মশলার স্বাদ শুষে নেবে।

সবশেষে উপর থেকে পরিমাণমতো ঘি ও বেরেস্তা ছড়িয়ে দিন। বেরেস্তা এই পদে যোগ করে হালকা মিষ্টি স্বাদ ও সুন্দর টেক্সচার। গ্যাস বন্ধ করে কড়াই ঢেকে রাখুন আরও ৫ মিনিট। এই স্টেপে চিংড়ি ও মশলা একে অপরের সঙ্গে ভালোভাবে সেট হয়ে যায়।

ব্যস, তৈরি হয়ে গেল সুস্বাদু, ঝাঁঝালো ও সুগন্ধি গলদা চিংড়ির রোস্ট

কীসের সঙ্গে পরিবেশন করবেন ও কেন গলদা চিংড়ির রোস্ট এত বিশেষ

গলদা চিংড়ির রোস্ট এমন একটি পদ, যার অন্যতম বড় গুণ হলো—এটি নানা ধরনের ভাতের সঙ্গে সমানভাবে মানিয়ে যায়। উৎসবের ভোজে অনেক সময় আলাদা আলাদা স্বাদের মানুষের জন্য মেনু বাছাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই পদটি সেই সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে, কারণ হালকা থেকে ঝাঁঝালো—সব রকম স্বাদের সঙ্গেই এর দারুণ সামঞ্জস্য রয়েছে।

সাদা পোলাও
হালকা মিষ্টি স্বাদ ও ঘিয়ের সুগন্ধে ভরপুর সাদা পোলাওয়ের সঙ্গে গলদা চিংড়ির রোস্ট একেবারে আদর্শ কম্বিনেশন। পোলাওয়ের কোমল স্বাদ চিংড়ির ঝাঁঝালো ও মশলাদার রোস্টকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। বড়দিন বা বিশেষ পার্টির ভোজে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় পছন্দ হতে পারে।

নারকেলি ভাত
যাঁরা একটু আলাদা স্বাদের ভাত পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য নারকেলি ভাতের সঙ্গে গলদা চিংড়ির রোস্ট এক অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দেয়। নারকেলের হালকা মিষ্টি স্বাদ আর চিংড়ির মশলাদার ঝাঁঝ—এই দুইয়ের মেলবন্ধন জিভে এক চমৎকার কনট্রাস্ট তৈরি করে, যা সহজেই মন জয় করে নেয়।

বাসমতি রাইস
সুগন্ধি বাসমতি ভাতের সঙ্গে এই রোস্ট পরিবেশন করলে গলদা চিংড়ির নিজস্ব স্বাদটাই প্রধান হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত কোনও উপাদান ছাড়াই শুধু চিংড়ি ও মশলার স্বাদ উপভোগ করতে চাইলে বাসমতি রাইস হতে পারে সেরা বিকল্প।

সাদাভাত
যাঁরা ঝাল ও ঘি-ঘ্রাণযুক্ত খাবার ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে সাদাভাতের সঙ্গে গলদা চিংড়ির রোস্ট আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। সাধারণ সাদাভাতের সঙ্গে এই পদ পরিবেশন করলে চিংড়ির মশলাদার রসটাই হয়ে ওঠে মূল তারকা।

কেন এই পদ এত বিশেষ?

রেস্তোরাঁ স্টাইল স্বাদ
এই রেসিপিটি এমনভাবে তৈরি করা যে বাড়িতে রান্না করলেও স্বাদে কোনও অংশেই রেস্তোরাঁর খাবারের থেকে কম নয়। মশলার কষা, ঘিয়ের সুবাস আর বেরেস্তার মিষ্টি স্বাদ মিলিয়ে একেবারে প্রিমিয়াম ফিল দেয়।

উৎসবের জন্য পারফেক্ট
বড়দিন, পার্টি, জন্মদিন কিংবা বিশেষ অতিথি আপ্যায়ন—যে কোনও অনুষ্ঠানে গলদা চিংড়ির রোস্ট ভোজের মান একধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দেয়।

অতিথি আপ্যায়নে আলাদা চমক
চেনা চিংড়ির পদ ছেড়ে গলদা চিংড়ির রোস্ট পরিবেশন করলে অতিথিদের কাছে তা স্বাভাবিকভাবেই আলাদা নজির তৈরি করে এবং ভোজের স্মৃতি দীর্ঘদিন মনে থাকে।

বাড়িতে সহজ উপকরণেই তৈরি
দেখতে রাজকীয় হলেও এই পদটি বানাতে লাগে পরিচিত ও সহজলভ্য উপকরণ। একটু যত্ন ও সময় দিলেই বাড়িতেই তৈরি করা যায় উৎসবের মতো বিশেষ স্বাদের রান্না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এ বার যদি উৎসবের দিনে ভোজের মেনুতে নতুনত্ব ও আভিজাত্য যোগ করতে চান, তবে গলদা চিংড়ির রোস্ট নিঃসন্দেহে হতে পারে আপনার সেরা পছন্দ—স্বাদে, গন্ধে ও পরিবেশনে একেবারে রাজকীয়।

Preview image