Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

চারদিকে ছড়াচ্ছে খালি পেটের রোগ শিশু থেকে বৃদ্ধ কী কারণে বাড়ছে এই অসুখ

ভাইরাল জ্বরে জেরবার জনজীবন। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে পেটের অসুখ। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। কখনও বমি কখনও পেটখারাপ আবার কখনও ঘন ঘন ডায়েরিয়ায় দুর্বল হয়ে পড়ছেন মানুষ। তবে প্রশ্ন একটাই এই রোগ কি শুধুই খাওয়াদাওয়ার ভুলে হচ্ছে নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে দূষিত জল ভাইরাস সংক্রমণ ও মৌসুমি পরিবর্তনের মতো আরও গভীর কারণ

মরসুম বদল মানেই শরীরখারাপের খবর নতুন কিছু নয়। শীতের শেষ আর বসন্তের শুরুতে হালকা জ্বর, সর্দি-কাশি কিংবা এক-আধ দিন পেটখারাপ—এই অভিজ্ঞতা প্রায় সকলেরই পরিচিত। প্রতি বছরই এমন হয়, তাই এতে বিশেষ অস্বাভাবিকতার কিছু থাকে না। চিকিৎসকরাও বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগে। সেই সময়েই ভাইরাল সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

কিন্তু এবছর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ নিয়মের বাইরে চলে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ শুধু ভাইরাল জ্বর নয়, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হঠাৎ করেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে পেটের রোগ। এমন নয় যে শুধু নির্দিষ্ট কোনও এলাকা বা বয়সভিত্তিক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। বরং শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক—প্রায় সকল বয়সের মানুষই এই সমস্যার শিকার হচ্ছেন।

আজ বমি, তো কাল পেটখারাপ। কখনও পাতলা পায়খানা, কখনও তীব্র পেটব্যথা। অনেকের ক্ষেত্রে দিনে পাঁচ-ছয় বার甚至 তারও বেশি ডায়েরিয়া হচ্ছে। ফলে দ্রুত শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। একটানা ডায়েরিয়ায় জলশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা বাবা-মায়েদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে কয়েকগুণ।

চারপাশে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে একই গল্প। কেউ বলছেন, পরিবারের একজন আক্রান্ত। কেউ আবার জানাচ্ছেন, অফিসের একাধিক সহকর্মী একই সমস্যায় ভুগছেন। অনেক পরিবারে একসঙ্গে দু’তিন জনের পেটখারাপ শুরু হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই রোগ কি শুধুই খাওয়াদাওয়ার অনিয়মের ফল?

খাওয়াদাওয়াই কি একমাত্র কারণ?

এই সময়টা বিয়েবাড়ির মরসুম। নিমন্ত্রণ বাড়ছে, বাইরের খাবারের পরিমাণও বাড়ছে। অনেকেই তাই ধরে নিচ্ছেন, তেল-মশলাযুক্ত খাবার, বাসি বা দূষিত খাবার খাওয়ার কারণেই পেটের রোগ বাড়ছে। নিঃসন্দেহে খাবার একটি বড় কারণ। বাইরে খাওয়া, অনিয়মিত সময়ে খাওয়া, পর্যাপ্ত জল না পান করা—এসবই পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে।

কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এবছরের পরিস্থিতি শুধুমাত্র খাওয়াদাওয়ার গণ্ডিতে আটকে নেই। কারণ এমন অনেক মানুষই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যাঁরা বাইরে খাওয়াই বন্ধ রেখেছেন বা অত্যন্ত সচেতনভাবে খাবার খাচ্ছেন। তবুও তাঁদের পেটের সমস্যা হচ্ছে। এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন—তাহলে আসল কারণ কী?

ভাইরাসই কি আসল খলনায়ক?

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে সমীক্ষা চালিয়েছে Indian Council of Medical Research (আইসিএমআর)। সেই সমীক্ষায় উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। গবেষকদের মতে, শীত ও গরমের এই সন্ধিক্ষণে একাধিক ভাইরাস একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারাই মূলত এই ব্যাপক পেটের রোগ ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী।

এই ভাইরাসগুলির মধ্যে অন্যতম হল নোরোভাইরাস এবং রোটাভাইরাস। এই দুই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেই মূলত হয় ‘ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস’। সাধারণ ভাষায় যাকে বলা হয় ‘স্টমাক ফ্লু’। নামের সঙ্গে ফ্লু থাকলেও এটি আসলে ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়। এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে পাচনতন্ত্রের উপর।

স্টমাক ফ্লু হলে পেটখারাপ খুব সহজে সারে না। অনেক সময় ৫ থেকে ৭ দিন甚至 তারও বেশি সময় ধরে ডায়েরিয়া চলতে পারে। সঙ্গে বমি, বমি ভাব, তীব্র পেটব্যথা, জ্বর, শরীর ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই রোগ আরও গুরুতর রূপ নিতে পারে।

শিশু ও বয়স্কদের জন্য আলাদা ঝুঁকি

গবেষণায় আরও জানানো হয়েছে, অ্যাস্ট্রোভাইরাস নামের আরেকটি ভাইরাস বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে। এই ভাইরাস বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের পেটের রোগের জন্য দায়ী। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় তারা দ্রুত আক্রান্ত হয়। একইভাবে বয়স্কদের ক্ষেত্রেও শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ঝুঁকি বেড়ে যায়।

শিশুদের ভাইরাল জ্বরের পাশাপাশি পেটখারাপের পিছনে অ্যাডিনোভাইরাসের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে অ্যাডিনোভাইরাসের কিছু নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে, যা আগের তুলনায় বেশি সংক্রমণক্ষম। ফলে খুব সহজেই একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ।

কীভাবে ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাসগুলি মূলত ছড়ায় সংক্রমিত মানুষের সংস্পর্শে, দূষিত জল ও খাবারের মাধ্যমে। এছাড়াও অপরিষ্কার হাত, ঠিকমতো হাত না ধোয়া, একই বাথরুম বা বাসনপত্র ব্যবহার করার কারণেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

স্কুল, ডে-কেয়ার, বিয়েবাড়ি, জনসমাগমপূর্ণ অনুষ্ঠান—এই সব জায়গায় সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। একবার পরিবারে একজন আক্রান্ত হলে, খুব সহজেই অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

কেন এবছর পরিস্থিতি এত ভয়াবহ?

চিকিৎসকেরা বলছেন, এবছর একসঙ্গে একাধিক ভাইরাস সক্রিয় হয়ে ওঠাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। সাধারণত এক বা দুটি ভাইরাস সক্রিয় থাকে। কিন্তু এবছর নোরোভাইরাস, রোটাভাইরাস, অ্যাস্ট্রোভাইরাস ও অ্যাডিনোভাইরাস—সব মিলিয়ে একাধিক সংক্রমণ একসঙ্গে ছড়াচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবহাওয়ার অস্থিরতা। কখনও ঠান্ডা, কখনও গরম। এই ওঠানামার মধ্যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে ভাইরাস সহজেই আক্রমণ করতে পারছে।

news image
আরও খবর

কীভাবে সাবধান হবেন?

চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন—

  • বাইরে খাওয়ার পরিমাণ কমাতে হবে

  • ফুটানো বা পরিশোধিত জল পান করতে হবে

  • খাওয়ার আগে ও পরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে

  • শিশুদের ডায়েরিয়া হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে

  • ডিহাইড্রেশন এড়াতে ওআরএস বা তরল খাবার খেতে হবে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পেটখারাপকে অবহেলা করা যাবে না। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলাও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

এই মুহূর্তে পেটের রোগ নিছক ব্যক্তিগত অসুখ নয়, বরং একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সচেতনতা ও সতর্কতাই একমাত্র উপায় এই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া রোগের হাত থেকে বাঁচার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পেটখারাপকে কোনও ভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। আমাদের সমাজে এখনও অনেকের মধ্যেই একটি ভুল ধারণা কাজ করে—পেটখারাপ তো এমনিই সেরে যাবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এই অবহেলাই অনেক সময় বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলা থেকেও মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

শিশুদের শরীরের জলীয় ভারসাম্য খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। একটানা ডায়েরিয়া বা বমি হলে অল্প সময়ের মধ্যেই ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। এর ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, চোখ বসে যায়, প্রস্রাব কমে যায় এবং শিশুটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অনেক বাবা-মা শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ঘরোয়া উপায়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য বয়স্কদের ক্ষেত্রেও। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ বা কিডনির সমস্যার মতো অন্যান্য অসুখ থাকলে পেটের রোগ আরও দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে।

এই মুহূর্তে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চিন্তার, তা হল এই রোগের ব্যাপকতা। এটি আর শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়। পাড়া, মহল্লা, স্কুল, অফিস—সব জায়গাতেই একই ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। ফলে চিকিৎসকেরা বলছেন, বিষয়টিকে নিছক ব্যক্তিগত অসুখ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য সমস্যার অর্থ হল, এখানে শুধু একজন বা দু’জন নয়, গোটা সমাজকেই সতর্ক হতে হবে। একদিকে যেমন ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি, তেমনই প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। অনেক সময় দেখা যায়, পেটখারাপ নিয়েও মানুষ কাজকর্ম চালিয়ে যান, অফিসে যান, অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এর ফলে সংক্রমণ আরও ছড়ানোর সুযোগ পায়। একইভাবে শিশু অসুস্থ হলেও অনেক সময় স্কুলে পাঠানো হয়, যা অন্য শিশুদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল সচেতনতা। কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, কখন ঘরে থাকা নিরাপদ, কীভাবে অন্যদের সংক্রমণ থেকে বাঁচানো যায়—এই বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। পরিষ্কার জল পান করা, হাত ধোয়ার অভ্যাস, খাবার ঢেকে রাখা, বাসনপত্র আলাদা রাখা—এই ছোট ছোট বিষয়গুলিই বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরেও নজরদারি প্রয়োজন। পানীয় জলের মান ঠিক আছে কি না, জলাশয় বা পাইপলাইনের জল দূষিত হচ্ছে কি না, বাজারে বিক্রি হওয়া খাবারের স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না—এসব দিক খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ, একবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই মুহূর্তে পেটের রোগ আমাদের সামনে একটি বড় সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছে। অবহেলা নয়, বরং সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া রোগকে নিয়ন্ত্রণে আনতে। নিজের এবং পরিবারের সুরক্ষার পাশাপাশি সমাজের সুরক্ষার কথাও ভাবতে হবে। তবেই এই সংকট থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।

Preview image