Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

টাটাও আসবে, বাটাও আসবে’— শিল্পের আশ্বাসের মাঝেই শমীক ভট্টাচার্যের কটাক্ষ, ‘মানুষ আবার ধোঁয়া দেখতে চাইছে

রাজ্যে শিল্প ফেরানোর আশ্বাসের মাঝেই শমীক ভট্টাচার্যের কটাক্ষ— টাটা ও বাটা আবার আসুক, কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠুক, সেটাই এখন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

রাজ্যে নতুন শিল্প ও বিনিয়োগ ফেরানোর প্রতিশ্রুতির মধ্যেই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করলেন শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল বাংলার হারিয়ে যাওয়া শিল্পের ইতিহাস, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার কথা। টাটা ও বাটার মতো বড় শিল্পসংস্থার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজ্যে আবার বড় বড় প্রতিষ্ঠান আসুক, নতুন কারখানা তৈরি হোক এবং কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠুক— বাংলার মানুষ এখন এমন দৃশ্যই দেখতে চাইছেন।

শমীক ভট্টাচার্যের এই বক্তব্য নিছক একটি রাজনৈতিক কটাক্ষ নয়। এর মধ্যে রাজ্যের শিল্পনীতি, বিনিয়োগের পরিবেশ, যুবসমাজের কর্মসংস্থান এবং বাংলার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। তাঁর কথায় কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠার বিষয়টি আক্ষরিক অর্থের পাশাপাশি শিল্পের পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসাবেও উঠে এসেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আলোচনায় শিল্পায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এখন শুধু ঘোষণার পরিবর্তে বাস্তবে শিল্প স্থাপনের প্রমাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শিল্পের আশ্বাস নয়, বাস্তব কারখানা দেখতে চান মানুষ

রাজ্যে শিল্প ফেরানোর কথা বহুবার বলা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে শিল্প সম্মেলন, বিনিয়োগ বৈঠক এবং বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের শিল্পপতিদের সামনে পশ্চিমবঙ্গকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একাধিক বিনিয়োগ প্রস্তাব এবং সমঝোতাপত্রের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে বিরোধীদের প্রশ্ন, ঘোষিত বিনিয়োগের কতটা বাস্তবে কারখানায় পরিণত হয়েছে? কতজন যুবক স্থায়ী কাজ পেয়েছেন? কতগুলি শিল্পপ্রকল্পে উৎপাদন শুরু হয়েছে? শিল্পের জন্য নির্ধারিত জমিতে কতগুলি সংস্থা কাজ শুরু করেছে? রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন এই প্রশ্নগুলিই রয়েছে।

শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ আর শুধু বিনিয়োগের পরিসংখ্যান শুনতে চাইছেন না। তাঁরা নিজেদের চোখে কারখানা তৈরি হতে দেখতে চান। তাঁরা চান স্থানীয় যুবকেরা চাকরি পান, ছোট ব্যবসায়ীদের আয় বাড়ুক, পরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত হোক এবং শিল্পাঞ্চলগুলিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাক।

কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠার মন্তব্যটির মধ্য দিয়ে তিনি মূলত উৎপাদনশীল শিল্পের উপস্থিতির কথা বোঝাতে চেয়েছেন। একটি কারখানা চালু হওয়ার অর্থ শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের কয়েকশো বা কয়েক হাজার কর্মীর চাকরি নয়। তার সঙ্গে পরিবহণ, নির্মাণ, নিরাপত্তা, ক্যান্টিন, সরবরাহ, যন্ত্রাংশ, প্যাকেজিং, হোটেল, দোকান এবং স্থানীয় পরিষেবা ক্ষেত্রেও বহু কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

টাটা ও বাটার নাম কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যে টাটা ও বাটার নাম উঠে আসা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক— উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। টাটা গোষ্ঠী ভারতের অন্যতম পুরনো ও পরিচিত শিল্পগোষ্ঠী। অন্যদিকে, বাটা নামটি বাংলার শিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। ফলে এই দুই সংস্থার নাম ব্যবহার করে তিনি কার্যত বাংলার পুরনো শিল্পসমৃদ্ধির স্মৃতি এবং নতুন শিল্পায়নের প্রত্যাশাকে একসঙ্গে তুলে ধরেছেন।

টাটার নাম উঠলেই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে সিঙ্গুর প্রসঙ্গ সামনে আসে। ২০০৮ সালে সিঙ্গুর থেকে টাটা মোটরসের ন্যানো প্রকল্প সরে যাওয়ার ঘটনা রাজ্যের শিল্প-রাজনীতিতে একটি বড় মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। শমীক ভট্টাচার্য ইতিমধ্যেই টাটা গোষ্ঠীকে সিঙ্গুর অথবা পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোনও জায়গায় ফিরিয়ে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, টাটার প্রত্যাবর্তন শুধু একটি শিল্পপ্রকল্প নয়, বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলার ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে। া আবার আসুক’ কথাটিকে শুধু দু’টি নির্দিষ্ট সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে বক্তব্যটির বৃহত্তর অর্থ ধরা পড়বে না। এখানে টাটা ও বাটা বাংলায় বড়, বিশ্বস্ত এবং কর্মসংস্থানমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যের মূল দাবি হলো, বাংলায় এমন শিল্প আসতে হবে যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবে, উৎপাদন চালু রাখবে এবং স্থানীয় মানুষের জন্য কাজ তৈরি করবে।

সিঙ্গুরের স্মৃতি ও শিল্পের রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের আলোচনায় সিঙ্গুরের নাম এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক সময় সেখানে টাটা মোটরসের ছোট গাড়ি তৈরির কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন। কৃষকদের জমির অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং সম্মতির প্রশ্নে রাজ্যজুড়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে টাটা মোটরস প্রকল্পটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে নেয়। এই ঘটনাকে এক পক্ষ কৃষকের জমি রক্ষার আন্দোলনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্য পক্ষের বক্তব্য, এর ফলে শিল্পমহলের কাছে পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা গিয়েছিল। প্রায় দুই দশক পরেও সিঙ্গুর তাই কৃষি বনাম শিল্পের বিতর্ক, জমির অধিকার এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা— এই তিনটি প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, টাটা গোষ্ঠীকে সিঙ্গুরে ফেরানো সম্ভব হলে শিল্পের কাছে অতীতে যাওয়া নেতিবাচক বার্তা পরিবর্তন করা যাবে। তিনি সিঙ্গুরকে শিল্পের বিদায়ের প্রতীক থেকে শিল্পের প্রত্যাবর্তনের প্রতীকে পরিণত করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে নতুন ও বাস্তবসম্মত জমিনীতি ছাড়া বৃহৎ শিল্পায়ন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। রিস্থিতিতে সিঙ্গুরে আবার বড় কারখানা স্থাপন করতে হলে জমির মালিকদের মতামত, কৃষকদের স্বার্থ, পরিবেশগত প্রভাব এবং আইনি জটিলতা— সবকিছু গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভিত্তিতেই কোনও প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।

‘চিমনির ধোঁয়া’ কীসের প্রতীক?

আধুনিক শিল্পব্যবস্থায় পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠার কথাটিকে সরাসরি দূষণ সৃষ্টির আহ্বান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রাজনৈতিক বক্তব্যের ভাষায় এটি উৎপাদন, কর্মচাঞ্চল্য এবং চালু কারখানার প্রতীক।

একসময় হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিম বর্ধমান এবং কলকাতা সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য বড় কারখানা ছিল। সকাল-বিকেল কারখানার সাইরেন, শ্রমিকদের যাতায়াত এবং শিল্পাঞ্চলের ব্যস্ততা স্থানীয় অর্থনীতির পরিচিত দৃশ্য ছিল। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম কারখানার কাজের উপর নির্ভরশীল ছিল।

পরবর্তীতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, কিছু সংস্থা উৎপাদন কমিয়েছে এবং বহু শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। পুরনো শিল্পাঞ্চলের অনেক জায়গায় এখন বন্ধ কারখানার গেট, পরিত্যক্ত শেড এবং কর্মহীন মানুষের স্মৃতি দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠার আহ্বান আসলে বন্ধ শিল্পের জায়গায় নতুন উৎপাদন শুরু হওয়ার প্রত্যাশা।

তবে আধুনিক শিল্পায়নকে অবশ্যই দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সবুজ প্রযুক্তি, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নতুন কারখানা মানেই অবাধ ধোঁয়া বা দূষণ নয়। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে কম কার্বন নিঃসরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি।

কর্মসংস্থানই শিল্পায়নের প্রধান পরীক্ষা

পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজের একটি বড় অংশ চাকরি ও উন্নত আয়ের সন্ধানে অন্য রাজ্যে চলে যান। কেউ তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজ করতে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা পুনেতে যান। কেউ নির্মাণ, উৎপাদন, হোটেল বা পরিষেবা ক্ষেত্রের কাজের জন্য গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কেরল কিংবা দেশের অন্যান্য রাজ্যে পাড়ি দেন।

রাজ্যে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদন ক্ষেত্রের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে এই প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একজন যুবক নিজের জেলা বা রাজ্যের কাছাকাছি কাজ পেলে তাঁর পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ে। অন্য রাজ্যে বাসস্থান, যাতায়াত এবং অতিরিক্ত জীবনযাত্রার খরচও কমে যায়।

শিল্পায়নের সাফল্য শুধু মোট বিনিয়োগের অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে হবে না। কতজন সরাসরি চাকরি পেলেন, কতজন চুক্তিভিত্তিক কর্মী কাজ পেলেন, কতজন স্থানীয় যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো এবং কতগুলি ক্ষুদ্র ব্যবসা বড় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হলো— সেগুলিও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

একটি বড় কারখানায় প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বহু পরোক্ষ কাজ তৈরি হয়। কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহণ, মেরামত, নিরাপত্তা, প্যাকেজিং, খাবার, আবাসন, ব্যাংকিং এবং খুচরো ব্যবসায় নতুন সুযোগ আসে। এই কারণেই একটি কার্যকর শিল্পপ্রকল্প স্থানীয় অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে।

শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও জরুরি

টাটা বা বাটার মতো বড় প্রতিষ্ঠানের নাম মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করলেও রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্ষুদ্র, ছোট এবং মাঝারি শিল্পের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার বিভিন্ন জেলায় বহু ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, পোশাক কারখানা এবং পরিষেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এলে এই ক্ষুদ্র সংস্থাগুলি সরবরাহকারী বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে। একটি মোটরগাড়ি বা যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানার জন্য শতাধিক ধরনের যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়। সেগুলির অনেকটাই স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্প উৎপাদন করতে পারে। ফলে বড় ও ছোট শিল্পের মধ্যে একটি শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে কর্মসংস্থানের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

রাজ্যের শিল্পনীতিতে তাই বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোগপতিদের জন্য সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ, বাজার সংযোগ এবং দ্রুত সরকারি অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। শুধু বাইরে থেকে শিল্প আনার পরিবর্তে বাংলার নিজস্ব উদ্যোক্তাদেরও বড় সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা দরকার।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

কোনও শিল্পসংস্থা একটি রাজ্যে বিনিয়োগ করার আগে একাধিক বিষয় বিবেচনা করে। জমি, বিদ্যুৎ, জল, পরিবহণ, দক্ষ শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা, করব্যবস্থা, সরকারি নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা— সবকিছু বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

একটি কারখানা স্থাপন করতে অনেক সময় কয়েকশো বা কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। সেই বিনিয়োগের ফল পেতে বহু বছর সময় লাগে। তাই শিল্পপতিরা এমন পরিবেশ চান যেখানে সরকারি নীতি হঠাৎ বদলে যাবে না, স্থানীয় স্তরে বাধার মুখে পড়তে হবে না এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন সময়মতো পাওয়া যাবে।

news image
আরও খবর

শমীক ভট্টাচার্য শিল্পক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, জোর করে অর্থ আদায়, ইউনিয়নের চাপ এবং কারখানার গেটে দলীয় প্রভাব বন্ধ করার বার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ব্য দিলেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হয় না। অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারি অনুমোদন, স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান যাতে কোনও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত চাপের মুখে না পড়ে, তার জন্য আইনকে নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।

নতুন জমিনীতি কি শিল্পের পথ সহজ করবে?

বড় শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে জমি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনও শিল্পসংস্থার প্রয়োজন অনুযায়ী একসঙ্গে বড় জমি পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। জমির মালিকানা, চরিত্র পরিবর্তন, রাস্তার সংযোগ এবং পরিবেশগত অনুমোদনের কারণে প্রকল্প আটকে যেতে পারে।

অন্যদিকে, জমি অধিগ্রহণের সময় কৃষকদের সম্মতি, যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত না করা হলে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সিঙ্গুরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কৃষকের স্বার্থকে উপেক্ষা করে শিল্পায়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

শমীক ভট্টাচার্য একটি সামগ্রিক জমিনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, শিল্পসংস্থাকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জমি কিনতে বাধ্য করলে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার নতুন জমিনীতি নিয়ে কাজ করছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। ্য জমিনীতিতে কৃষকের স্বেচ্ছাসম্মতি, বাজারদরের তুলনায় ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পরিবারের একজনকে প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং প্রকল্পে জমিদাতাদের দীর্ঘমেয়াদি অংশগ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে পারে। জমি নেওয়ার পরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প শুরু না হলে জমির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিও নীতিতে পরিষ্কার থাকা দরকার।

জেলার ভিত্তিতে শিল্প পরিকল্পনার প্রয়োজন

পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলার ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং দক্ষতার ধরন আলাদা। ফলে সব জেলায় একই ধরনের শিল্প গড়ে তোলার পরিবর্তে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় ধাতু, খনিজ, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং শক্তিনির্ভর শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। হুগলি, হাওড়া এবং উত্তর ২৪ পরগনায় উৎপাদন, লজিস্টিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প গড়ে উঠতে পারে। মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় কৃষিভিত্তিক শিল্প, রেশম, আম এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ রয়েছে।

উত্তরবঙ্গে চা, পর্যটন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ওষুধ এবং সীমান্ত বাণিজ্যভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে। উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ, বন্দরনির্ভর ব্যবসা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ আনা সম্ভব।

জেলার নিজস্ব উৎপাদন ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিল্প ক্লাস্টার তৈরি করলে স্থানীয় মানুষ বেশি সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে কলকাতাকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে গোটা রাজ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হবে।

দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া শিল্পায়ন অসম্পূর্ণ

নতুন শিল্প এলেও প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী পাওয়া না গেলে সংস্থাগুলি অন্য রাজ্য থেকে কর্মী নিয়োগ করতে পারে। তাই শিল্প স্থাপনের ঘোষণার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আইটিআই, পলিটেকনিক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলির পাঠ্যক্রমকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিল্পসংস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে শিক্ষানবিশ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এতে পড়াশোনা শেষ করার আগেই শিক্ষার্থীরা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।

শুধু ডিগ্রি নয়, যন্ত্র পরিচালনা, বৈদ্যুতিক মেরামত, ওয়েল্ডিং, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন, গুণমান পরীক্ষা, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং শিল্প নিরাপত্তার মতো দক্ষতার চাহিদা রয়েছে। নতুন শিল্পনীতি সফল করতে হলে এই ধরনের কর্মমুখী প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পরিকাঠামো উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ

কারখানা তৈরির জন্য শুধু জমি যথেষ্ট নয়। উন্নত রাস্তা, রেল যোগাযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, জল, ইন্টারনেট, গুদাম এবং দ্রুত পণ্য পরিবহণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। বন্দর ও বিমানবন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকলে রফতানিমুখী শিল্পের সুবিধা হয়।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের জন্য আবাসন, হাসপাতাল, স্কুল, গণপরিবহণ এবং নিরাপদ পরিবেশও দরকার। বড় শিল্পের পাশে পরিকল্পনাহীন বসতি গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে নানা সামাজিক ও নাগরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

শিল্পের জন্য নির্ধারিত জমিতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারেন। আলাদা আলাদা সরকারি দপ্তরে ঘুরে অনুমতি নেওয়ার পরিবর্তে একক জানালা পদ্ধতি বাস্তবে কার্যকর করাও জরুরি।

পরিবেশ রক্ষা করেই শিল্পায়ন

বাংলার মানুষ শিল্প চান, কিন্তু সেই শিল্প যেন পরিবেশ, কৃষি এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে— এই প্রত্যাশাও রয়েছে। শিল্পায়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে না দেখে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দু’টির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

নতুন কারখানায় দূষণ নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র, বর্জ্য শোধনাগার, জল পুনর্ব্যবহার এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। নিয়মিত পরিবেশগত পরীক্ষা এবং তার ফলাফল প্রকাশ্যে আনার ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠা শিল্পের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু বাস্তব কারখানার চিমনি থেকে যেন বিষাক্ত ধোঁয়া না বেরোয়, সেটিও প্রশাসনের দায়িত্ব। মানুষের কর্মসংস্থান এবং সুস্থ পরিবেশ— দু’টিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব মূল্যায়ন প্রয়োজন

শমীক ভট্টাচার্যের কটাক্ষ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও সাধারণ মানুষের কাছে শেষ পর্যন্ত ফলাফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প ফেরানোর ঘোষণা কতটা বাস্তবায়িত হলো, সেটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রকাশ করা প্রয়োজন।

কোন সংস্থা কত টাকা বিনিয়োগ করছে, কোথায় জমি পেয়েছে, কবে নির্মাণ শুরু হবে, কবে উৎপাদন শুরু হবে এবং কতজন চাকরি পাবেন— এই তথ্যগুলি সরকারি পোর্টালে প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে বিনিয়োগের দাবি নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে এবং সরকারের জবাবদিহি বাড়বে।

শিল্প প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, প্রশাসন, স্থানীয় প্রতিনিধি এবং শিল্পমহলের সদস্যদের নিয়ে কমিটি তৈরি করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ না হলে তার কারণও প্রকাশ করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলির উচিত শিল্পায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধু একে অপরকে দোষারোপ না করে একটি দীর্ঘমেয়াদি ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করা। সরকার পরিবর্তন হলেও শিল্পনীতি এবং বৈধ প্রকল্প যাতে হঠাৎ বন্ধ না হয়ে যায়, সেই নিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার যুবসমাজ কী চাইছে?

বর্তমান প্রজন্মের যুবক-যুবতীরা শুধু সরকারি চাকরির উপর নির্ভর করতে চান না। তাঁরা তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন, স্টার্টআপ, ডিজিটাল পরিষেবা, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, পর্যটন এবং সৃজনশীল শিল্পে কাজের সুযোগ খুঁজছেন।

তবে পর্যাপ্ত বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান না থাকলে তাঁদের অনেককেই অন্য রাজ্যে যেতে হয়। তাই শিল্পায়নের প্রশ্নটি এখন শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।

যুবসমাজ এমন শিল্পনীতি চাইছে যেখানে স্বচ্ছ নিয়োগ হবে, দক্ষতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়া যাবে এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা থাকবে। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নতির সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু কম বেতনের কাজ তৈরি করলেই শিল্পায়নের লক্ষ্য পূরণ হবে না। গবেষণা, প্রযুক্তি, নকশা, ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কাজের সুযোগও বাংলায় তৈরি করতে হবে। তাহলেই রাজ্যের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা বাইরে চলে যাওয়ার পরিবর্তে নিজের রাজ্যে ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবেন।

 

 

 

Preview image