লন্ডনে এই প্রথম শুরু হল চালকহীন ট্যাক্সি পরিষেবা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এবার চালক ছাড়াই শহরের রাস্তায় চলবে ট্যাক্সি। এই পরিষেবার মাধ্যমে ব্রিটেনের পরিবহণ ব্যবস্থায় শুরু হল নতুন এক অধ্যায়।
লন্ডনে পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা। চালক ছাড়াই রাস্তায় চলবে ট্যাক্সি। প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিষেবাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। এত দিন পর্যন্ত চালকহীন গাড়ি নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও সাধারণ যাত্রী পরিবহণের ক্ষেত্রে এমন পরিষেবা চালু করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গা থেকেই লন্ডনে চালকহীন ট্যাক্সি পরিষেবার সূচনা শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চালকহীন ট্যাক্সি বা ‘রোবোট্যাক্সি’ আসলে এমন একটি স্বয়ংক্রিয় যান, যা নির্দিষ্ট প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই রাস্তার পরিস্থিতি বুঝে চলতে পারে। গাড়ির চারপাশে থাকা ক্যামেরা, সেন্সর, রাডার এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাড়িটি রাস্তার অবস্থান, অন্য যানবাহন, পথচারী, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং সম্ভাব্য বাধা শনাক্ত করার চেষ্টা করে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই গাড়ির গতি, দিক এবং থামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
লন্ডনের মতো ব্যস্ত ও জটিল শহরে এই ধরনের পরিষেবা চালু করা প্রযুক্তিগত দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শহরের রাস্তায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক গাড়ি, বাস, সাইকেল, মোটরবাইক ও পথচারী চলাচল করেন। তার সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক সিগন্যাল, সরু রাস্তা, ব্যস্ত মোড়, রাস্তার কাজ এবং পরিবর্তিত যান চলাচলের পরিস্থিতি। ফলে চালকহীন গাড়িকে এই পরিবেশে নিরাপদে পরিচালনা করা প্রযুক্তির জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
চালকহীন ট্যাক্সিকে সাধারণভাবে ‘অটোনোমাস ট্যাক্সি’ বা ‘রোবোট্যাক্সি’ বলা হয়। প্রচলিত ট্যাক্সির সঙ্গে এর প্রধান পার্থক্য হল, গাড়ি চালানোর জন্য সামনে একজন মানবচালকের প্রয়োজন হয় না। যাত্রী নির্দিষ্ট অ্যাপ বা ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে গাড়ি বুক করতে পারেন। এরপর নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি এসে যাত্রীকে নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রা করতে পারে।
এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে অত্যাধুনিক সফটওয়্যার এবং হার্ডওয়্যারের সমন্বয়। গাড়ির সেন্সর চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। সফটওয়্যার সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে গাড়ির পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করে। রাস্তার সামনে কোনও বাধা থাকলে গাড়ি গতি কমাতে বা থামতে পারে। সামনে অন্য যানবাহন থাকলে তার সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করার পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী গাড়ির গতিও পরিবর্তিত হতে পারে।
লন্ডন বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত মহানগর। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক এলাকা, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন এবং অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াত করেন। শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় বাস, ট্রেন, টিউব, ট্যাক্সি এবং ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবার জায়গা তৈরি হচ্ছে।
চালকহীন ট্যাক্সির ব্যবহার বাড়লে শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন একটি বিকল্প তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে যখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবহণ পরিষেবাকে আরও স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা চলছে, তখন রোবোট্যাক্সির পরীক্ষামূলক বা সীমিত পরিষেবা ভবিষ্যতের পরিবহণ ব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য রূপ দেখাতে পারে।
তবে পরিষেবা চালু হওয়া মানেই যে সব জায়গায় বা সব পরিস্থিতিতে চালকহীন গাড়ি চলবে, এমন নয়। সাধারণত এই ধরনের পরিষেবা নির্দিষ্ট এলাকা, নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট operational conditions-এর মধ্যে শুরু করা হতে পারে। প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের পর ধীরে ধীরে পরিষেবার পরিধি বাড়ানো সম্ভব।
চালকহীন গাড়ির প্রযুক্তি একাধিক স্তরে কাজ করে। প্রথমে গাড়ির বিভিন্ন সেন্সর রাস্তার চারপাশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। ক্যামেরা রাস্তার দৃশ্য দেখতে সাহায্য করে। অন্য সেন্সর গাড়ির কাছাকাছি থাকা বস্তু শনাক্ত করতে পারে। গাড়ির অবস্থান নির্ধারণের জন্য নেভিগেশন প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়।
এরপর সেই তথ্য সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। গাড়িটি বুঝতে চেষ্টা করে সামনে কী রয়েছে, কোন দিকে রাস্তা রয়েছে এবং কীভাবে নিরাপদে এগোনো যায়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-ভিত্তিক প্রযুক্তি।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, গাড়ির সামনে একজন পথচারী রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। সেন্সর এবং ক্যামেরা সেই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারে। এরপর সফটওয়্যার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে গাড়ির গতি কমানো বা থামানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একইভাবে সামনে কোনও গাড়ি আচমকা ব্রেক করলে চালকহীন গাড়িও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানানোর চেষ্টা করে।
চালকহীন ট্যাক্সির যাত্রা প্রচলিত অ্যাপ-ভিত্তিক ক্যাব পরিষেবার মতোই হতে পারে। যাত্রী একটি অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি বুক করবেন। বুকিং সম্পন্ন হলে নির্দিষ্ট পিক-আপ পয়েন্টে গাড়ি আসতে পারে। গাড়ির ভিতরে উঠে যাত্রী নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে পারবেন।
তবে চালক না থাকার কারণে অভিজ্ঞতাটি প্রচলিত ট্যাক্সির থেকে আলাদা হবে। গাড়িতে একজন চালকের সঙ্গে কথা বলা, পথ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা বা কোনও স্থানীয় তথ্য নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। পরিবর্তে যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ডিজিটাল interface বা অন্য কোনও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা থাকতে পারে।
এই ধরনের পরিষেবায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি। গাড়ির প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া এবং দূর থেকে সহায়তার ব্যবস্থা—সবকিছুর ওপরই গুরুত্ব দিতে হয়।
চালকহীন গাড়ির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা। একজন মানবচালক রাস্তার পরিস্থিতি দেখে নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে একই ধরনের পরিস্থিতি সফটওয়্যার এবং সেন্সরের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতে হয়।
তাই চালকহীন ট্যাক্সি পরিষেবা চালুর আগে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। দিনের বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন ট্রাফিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে গাড়ির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনও সেন্সর কাজ না করলে কী হবে, সফটওয়্যারে সমস্যা হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে অথবা গাড়ি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও পরিষেবার অংশ হতে হয়।
জরুরি পরিস্থিতিতে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নেওয়া হবে, সেই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক স্বয়ংক্রিয় যান ব্যবস্থায় দূরবর্তী মানব-সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হতে পারে। অর্থাৎ গাড়ির ভিতরে চালক না থাকলেও প্রয়োজনের সময় একটি remote operations team পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
চালকহীন ট্যাক্সি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে সেই প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করবে পরিষেবার পরিধি, গাড়ির সংখ্যা, যাত্রী চাহিদা এবং অন্যান্য পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে তার সমন্বয়ের ওপর।
একদিকে চালকহীন ট্যাক্সি মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে যদি একই সময়ে বিপুল সংখ্যক রোবোট্যাক্সি রাস্তায় চলে, তাহলে অতিরিক্ত যান চলাচলের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তাই শহরের পরিবহণ পরিকল্পনায় এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পার্কিং। প্রচলিত ট্যাক্সি বা ব্যক্তিগত গাড়ির মতো চালকহীন ট্যাক্সিও যাত্রী নামানোর পরে কোথায় যাবে, কোথায় অপেক্ষা করবে—এই প্রশ্নের উত্তর পরিবহণ পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত।
চালকহীন যান নিয়ে আলোচনা হলেই সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলির মধ্যে একটি উঠে আসে, তা হল চালকদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান। ট্যাক্সি, ক্যাব এবং পরিবহণ শিল্পে বিপুল সংখ্যক মানুষ চালক হিসেবে কাজ করেন। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে এই পেশার ওপর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে আলোচনা হয়েছে।
তবে চালকহীন গাড়ির পরিষেবা পরিচালনার জন্যও বিভিন্ন ধরনের কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে। সফটওয়্যার, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, রিমোট অপারেশন, কাস্টমার সার্ভিস এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ প্রযুক্তির প্রভাব শুধুমাত্র চাকরি কমা বা বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মসংস্থানের ধরনও পরিবর্তিত হতে পারে। ভবিষ্যতে পরিবহণ শিল্পে প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
চালকহীন ট্যাক্সির অন্যতম সম্ভাব্য সুবিধা হল পরিষেবার স্বয়ংক্রিয়তা। কোনও নির্দিষ্ট সময়ে চালক পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে। প্রযুক্তি নির্ভর পরিষেবা দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালনার সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
এছাড়াও যাত্রীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ধরনের ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি হতে পারে। গাড়িতে অন্য কোনও চালক না থাকায় যাত্রী নিজের মতো করে যাত্রা করতে পারবেন। তবে পরিষেবার প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে মূল্য, উপলভ্যতা, পরিষেবার এলাকা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।
বিশেষ করে যেসব মানুষ গাড়ি চালাতে পারেন না বা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে চান না, তাঁদের জন্য স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্সি ভবিষ্যতে একটি অতিরিক্ত পরিবহণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
চালকহীন ট্যাক্সি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি—এই দুটি প্রযুক্তি একসঙ্গে ব্যবহার করা হলে পরিবহণ খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে শুধুমাত্র চালকহীন প্রযুক্তি নিজে পরিবেশবান্ধব—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
গাড়িটি কী ধরনের শক্তি ব্যবহার করছে, কত দূরত্ব যাত্রী ছাড়াই চলছে, কত সময় রাস্তায় থাকছে এবং সামগ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থায় এটি কী পরিবর্তন আনছে—এসব বিষয় পরিবেশগত প্রভাব নির্ধারণ করে।
যদি রোবোট্যাক্সি যাত্রী না থাকা অবস্থায় দীর্ঘ সময় রাস্তায় ঘুরতে থাকে, তাহলে যান চলাচল বাড়তে পারে। আবার যদি এটি একাধিক যাত্রীর পরিবহণকে আরও দক্ষ করে এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে সাহায্য করে, তাহলে ভিন্ন ধরনের প্রভাব দেখা যেতে পারে।
লন্ডনে চালকহীন ট্যাক্সি পরিষেবার সূচনা স্বয়ংক্রিয় পরিবহণ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি নিয়ে পরীক্ষা এবং সীমিত পরিষেবা চালানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
আগামী দিনে প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে চালকহীন গাড়ি শুধু ট্যাক্সি পরিষেবাতেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। পণ্য পরিবহণ, ডেলিভারি পরিষেবা, গণপরিবহণের নির্দিষ্ট অংশ এবং অন্যান্য mobility service-এও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে।
তবে প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি আইন, বিমা, তথ্য নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণের মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চালকহীন গাড়ি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য রাস্তায় নামানোর ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে দায় কার—গাড়ির মালিক, প্রযুক্তি প্রস্তুতকারী, সফটওয়্যার নির্মাতা নাকি পরিষেবা পরিচালনাকারী—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন হতে পারে।
একইভাবে গাড়ি যাত্রীদের কাছ থেকে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করবে এবং সেই তথ্য কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গাড়ির ক্যামেরা এবং সেন্সর শহরের রাস্তার পাশাপাশি আশপাশের মানুষের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে privacy বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
লন্ডনের পরিবহণ ব্যবস্থায় ট্যাক্সি বহুদিনের পরিচিত মাধ্যম। সেই ব্যবস্থায় চালকহীন প্রযুক্তির প্রবেশ যাত্রীদের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রথমদিকে অনেক যাত্রী কৌতূহল থেকে এই পরিষেবা ব্যবহার করতে চাইতে পারেন। আবার কেউ কেউ চালকবিহীন গাড়িতে উঠতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ নাও করতে পারেন।
মানুষের আস্থা অর্জন করা তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি পরিষেবার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত নিরাপত্তা তথ্য প্রকাশ, পরিষ্কার বুকিং ব্যবস্থা, জরুরি যোগাযোগের সুযোগ এবং যাত্রীদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা এই আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া যায় না। চালকহীন ট্যাক্সি পরিষেবা চালু হওয়া মানেই প্রচলিত ট্যাক্সি পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নয়। দুই ধরনের পরিষেবা দীর্ঘ সময় পাশাপাশি চলতে পারে।
শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় চালকহীন গাড়ি কার্যকর হলেও সব ধরনের রাস্তা বা সব পরিস্থিতিতে একই প্রযুক্তি ব্যবহারযোগ্য নাও হতে পারে। তাছাড়া অনেক যাত্রী এখনও মানবচালকের সঙ্গে যাত্রা করাকেই পছন্দ করতে পারেন।
ফলে ভবিষ্যতের পরিবহণ ব্যবস্থা সম্ভবত একাধিক প্রযুক্তি ও পরিষেবার সমন্বয়ে তৈরি হবে। চালকহীন ট্যাক্সি সেই ব্যবস্থার একটি অংশ হতে পারে।
স্বয়ংক্রিয় গাড়ির প্রসার শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়। এটি শহরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেও পরিবর্তন আনতে পারে। মানুষ ধীরে ধীরে এমন পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারেন যেখানে গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সফটওয়্যার নেয়।
এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থা। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, বাস্তব রাস্তায় অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি থাকবেই। তাই প্রযুক্তির সক্ষমতার পাশাপাশি তার সীমাবদ্ধতাও বোঝা প্রয়োজন।
লন্ডনে চালকহীন ট্যাক্সি পরিষেবা সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। পরিষেবাটি কীভাবে বিস্তৃত হবে, কত সংখ্যক মানুষ ব্যবহার করবেন এবং শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে—তা সময়ের সঙ্গে আরও পরিষ্কার হবে।
লন্ডনে চালকহীন ট্যাক্সি পরিষেবা চালুর ঘটনা শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মানবচালকের পরিবর্তে সেন্সর, ক্যামেরা, সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নেভিগেশন প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি গাড়ি যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ধারণা এখন আর শুধুমাত্র ভবিষ্যতের কল্পনা নয়।
তবে এই প্রযুক্তির সাফল্য শুধু গাড়ি নিজে চালাতে পারছে কি না, তার ওপর নির্ভর করবে না। নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, যাত্রীদের আস্থা, পরিষেবার মূল্য, আইনগত কাঠামো এবং শহরের সামগ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বয়—সবকিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হবে চালকহীন ট্যাক্সির ভবিষ্যৎ।
লন্ডনের রাস্তায় এই পরিষেবার সূচনা তাই প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য যেমন আকর্ষণীয় খবর, তেমনই পরিবহণ বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ যাত্রীদের কাছেও তা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে স্বয়ংক্রিয় যান কতটা সাধারণ হয়ে ওঠে এবং মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে তার ভূমিকা কতটা বাড়ে, সেদিকেই এখন নজর।