Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

থর মরুভূমি এখন শস্য শ্যামলা ভারতের বৈজ্ঞানিক জাদুতে বালির দেশে ফলছে সোনা এবং বদলে গেল রাজস্থানের মানচিত্র

ভারতের ইতিহাসে এক অসম্ভব সম্ভব হওয়ার দিন। রাজস্থানের থর মরুভূমির এক বিশাল অংশ আজ সবুজে ঢাকা। বিজ্ঞানীদের তৈরি বিশেষ প্রযুক্তি এবং নিরলস প্রচেষ্টায় বালির সমুদ্র আজ ফসলের খেতে পরিণত হয়েছে। এই সাফল্য ভারতের খাদ্য নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সারা বিশ্বকে এক নতুন পথ দেখাবে। জয়সলমীরের ধূসর প্রান্তর আজ সবুজের সমারোহে উজ্জ্বল।

থর মরুভূমি এখন শস্য শ্যামলা ভারতের বৈজ্ঞানিক জাদুতে বালির দেশে ফলছে সোনা এবং বদলে গেল রাজস্থানের মানচিত্র
Environment & Geoscience

যেখানে দৃষ্টি যায় শুধুই ধূ ধূ বালির প্রান্তর। সূর্যের প্রখর তাপে বাতাস যেখানে আগুনের মতো গরম। জলের অভাবে যেখানে জীবন ছিল এক কঠিন সংগ্রাম। সেই রাজস্থানের থর মরুভূমি আজ এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের সাক্ষী। ভারতের বিজ্ঞানীদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে মরুভূমির বুকে আজ সবুজের বিপ্লব ঘটেছে। আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী জয়সলমীরের কাছে এক বিশাল কৃষি খামারের উদ্বোধন করে ঘোষণা করলেন যে থর মরুভূমির প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকাকে সফলভাবে চাষযোগ্য জমিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এটি কেবল ভারতের নয় সমগ্র মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য নজির।

মরুভূমি জয়ের দীর্ঘ সংগ্রাম

থর মরুভূমি ভারতের উত্তর পশ্চিম অংশে অবস্থিত এক বিশাল শুষ্ক অঞ্চল। হাজার হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলটি ছিল রুক্ষ এবং বসবাসের অযোগ্য। এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল পশুপালন এবং সামান্য কিছু বাজরা চাষ যা সম্পূর্ণ বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল ছিল। জলের সংকট এখানে এতটাই তীব্র ছিল যে মাটির কলসিতে করে মাইলের পর মাইল দূর থেকে জল আনতে হতো মহিলাদের। খরার সময় গবাদি পশু মারা যেত এবং মানুষকে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যেতে হতো।

কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে এক নীরব বিপ্লব চলছিল এই বালির দেশে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজস্থান সরকারের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়েছিল মরু সঞ্জীবনী প্রকল্প। এই প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় কৃষি বিজ্ঞানী ভূতত্ত্ববিদ এবং ইসরোর মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই মরুভূমিকে সবুজে পরিণত করা। অনেকেই তখন এই প্রকল্পকে পাগলের প্রলাপ বলেছিলেন। কিন্তু আজ সেই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ।

প্রযুক্তির নাম হাইড্রো জেল স্যান্ড এবং সোলার ওয়াটার হার্ভেস্টিং

এই অসাধ্য সাধনের পেছনে রয়েছে মূলত দুটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি। প্রথমটি হলো মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো। মরুভূমির বালি জল ধরে রাখতে পারে না তাই সেখানে গাছ বাঁচে না। বিজ্ঞানীরা ন্যানো টেকনোলজি ব্যবহার করে এক বিশেষ ধরনের হাইড্রো জেল তৈরি করেছেন। এই জেলটি বালির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এটি একটি স্পঞ্জের মতো কাজ করে। সামান্য বৃষ্টি বা সেচের জল পেলে এই জেলের কণাগুলো ফুলে ওঠে এবং জল ধরে রাখে। গাছের শিকড় যখন জলের প্রয়োজন বোধ করে তখন এই জেল থেকে জল শুষে নেয়। এর ফলে খুব কম জলে চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল জলের উৎস। মরুভূমিতে জল কোথায় পাওয়া যাবে। এর জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন বিশাল আকারের সোলার অ্যাটমোস্ফিয়ারিক ওয়াটার জেনারেটর বা সৌর বায়ু জল উৎপাদক যন্ত্র। থর মরুভূমিতে সূর্যের তাপ প্রচুর। সেই তাপকে কাজে লাগিয়ে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে বিশাল বিশাল যন্ত্র চালানো হয় যা বাতাস থেকে আর্দ্রতা শুষে নিয়ে তাকে বিশুদ্ধ জলে পরিণত করে। এই জল পাইপলাইনের মাধ্যমে খেতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়াও মাটির অনেক গভীরে থাকা লবণাক্ত জলকে সৌর পাতন বা সোলার ডিস্যালিনেশন পদ্ধতিতে পানীয় এবং সেচের জলে পরিণত করা হয়েছে।

আজকের থরের রূপ

আজ যদি আপনি হেলিকপ্টারে করে জয়সলমীর থেকে বারমেঢ়ের দিকে যান তবে নিচের দৃশ্য দেখে বিশ্বাস করতে পারবেন না যে এটি সেই পুরনো মরুভূমি। মাইলের পর মাইল জুড়ে গম সর্ষে জিরে এবং ইসুবগুলের ক্ষেত। মাঝেমধ্যে খেজুর এবং জলপাই বা অলিভের বাগান। ইসরায়েলি প্রযুক্তিতে ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। প্রতিটি গাছের গোড়ায় পাইপ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও জলের অপচয় নেই।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আবহাওয়ায়। এত বিপুল পরিমাণ গাছপালা লাগানোর ফলে মরুভূমির তাপমাত্রা আগের চেয়ে গড়ে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি কমে গেছে। বাতাসে আর্দ্রতা বেড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন এখন আগের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বালিঝড়ের প্রকোপ অনেক কমে গেছে। মরুভূমির বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম বদলে যাচ্ছে। নতুন নতুন পাখি এবং কীটপতঙ্গ দেখা যাচ্ছে যা আগে এখানে দেখা যেত না।

অর্থনৈতিক বিপ্লব ও কৃষকদের নতুন জীবন

মরুভূমির এই পরিবর্তন রাজস্থানের অর্থনীতিতে এক বিশাল জোয়ার এনেছে। যে জমির কোনো দাম ছিল না আজ তা সোনার চেয়েও দামি। স্থানীয় কৃষকরা যারা একসময় পেটের তাগিদে গুজরাট বা মহারাষ্ট্রে শ্রমিকের কাজ করতে যেতেন তারা আজ নিজেদের জমিতে ফিরে এসেছেন। তারা এখন আধুনিক কৃষক। তাদের আয় কয়েকগুণ বেড়েছে।

রামলাল চৌধুরী নামে বারমেঢ়ের এক সত্তর বছরের বৃদ্ধ কৃষক বলেন আমি স্বপ্নেও ভাবিনি আমার জীবদ্দশায় এই বালিতে ফসল ফলতে দেখব। আগে আমরা একবেলা খেয়ে থাকতাম। আজ আমার ছেলেরা ট্রাক্টর চালাচ্ছে আমার নাতিরা ভালো স্কুলে পড়ছে। সরকার এবং বিজ্ঞানীদের আমি প্রণাম জানাই।

news image
আরও খবর

থর এখন ভারতের নতুন খাদ্য ভাণ্ডার বা ফুড বাস্কেট হিসেবে উঠে আসছে। এখান থেকে উৎপাদিত উচ্চ মানের জিরে এবং মশলা বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। রাজস্থানে ফুড প্রসেসিং বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটছে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।

পরিবেশগত প্রভাব ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধ

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যখন সারা বিশ্বে মরুভূমির প্রসার ঘটছে তখন ভারত মরুভূমিকে সংকুচিত করে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। থর মরুভূমির এই সবুজায়ন বায়ুমণ্ডল থেকে লক্ষ লক্ষ টন কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করছে। এটি গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে ভারতের লড়াইয়ে এক বড় হাতিয়ার। বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি একটি বিশাল কার্বন সিঙ্ক বা কার্বন শোষক অঞ্চল হিসেবে কাজ করছে।

এছাড়াও মরুভূমির প্রসারণ রোধ করা গেছে। থর মরুভূমি ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে দিল্লি এবং পাঞ্জাবের দিকে এগিয়ে আসছিল। এই সবুজ দেওয়াল সেই আগ্রাসন থামিয়ে দিয়েছে। এটি উত্তর ভারতের পরিবেশ রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

আন্তর্জাতিক মহলে বিস্ময় ও আগ্রহ

ভারতের এই সাফল্য সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন দেশগুলো এই প্রযুক্তির প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই ভারতের সাথে চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছে যাতে তারা তাদের মরুভূমিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। রাষ্ট্রপুঞ্জ ভারতকে এই সাফল্যের জন্য বিশেষ সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক বলেছে ভারত প্রমাণ করল যে সঠিক প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে প্রকৃতির প্রতিকূলতাকেও জয় করা সম্ভব।

চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা

তবে এই সাফল্য ধরে রাখা সহজ নয়। বিজ্ঞানীদের মতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বিশাল কর্মযজ্ঞের রক্ষণাবেক্ষণ। হাইড্রো জেল প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মাটির ওপর কী পড়ে তা নিয়ে গবেষণা চলছে। সৌর প্যানেলগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং জলের অপচয় রোধ করা অত্যন্ত জরুরি।

সরকার জানিয়েছে এটি কেবল শুরু। আগামী দশ বছরের মধ্যে পুরো থর মরুভূমিকে সবুজের চাদরে ঢেকে ফেলার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর জন্য আরও বেশি করে গবেষণা এবং বিনিয়োগ করা হবে। স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা এই নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

পর্যটনের নতুন দিগন্ত

সবুজ মরুভূমি এখন পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ। ডেজার্ট সাফারি এখন আর কেবল বালির টিলায় সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটকরা এখন মরুভূমির মাঝখানে তৈরি হওয়া আধুনিক কৃষি খামার দেখতে আসছেন। অ্যাগ্রো টুরিজম বা কৃষি পর্যটন এখানে জনপ্রিয় হচ্ছে। মরুভূমির মাঝে তৈরি হয়েছে ইকো রিসর্ট যেখানে বসে পর্যটকরা সবুজের মাঝে সূর্যাস্ত দেখতে পারেন।

উপসংহার

২০২৬ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি দিনটি ভারতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করল। থর মরুভূমির এই রূপান্তর কেবল বিজ্ঞানের জয় নয় এটি মানুষের অদম্য সাহসের জয়। এটি প্রমাণ করল যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষ হার মানে না। বালির নিচে চাপা পড়া সম্ভাবনাকে ভারত আজ বিশ্বের সামনে তুলে ধরল। এই সবুজ থর আমাদের আশা দেখায় যে ভবিষ্যতের পৃথিবী হবে আরও সুন্দর আরও শস্য শ্যামলা। আমরা যদি প্রকৃতির সাথে বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটাতে পারি তবে ক্ষুধা এবং দারিদ্র্যকে পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব। ভারতের এই মরু বিজয় গাথা আগামী প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। জয় কিষাণ জয় বিজ্ঞান জয় ভারত।

Preview image