Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রবিশঙ্করের হাত ধরে হলিউডে পা রাখছেন বলিউড তারকা

এক ছবিতে চারটি গল্পে দেখা যাবে বলিউড অভিনেতাকে আর বাকি সবাই হলিউডের তারকা খবর ছড়াতেই অভিনন্দনে ভাসছেন তিনি

ফারহান আখতারের শিল্পীজীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল যে তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অবশেষে সেই জল্পনা সত্যি হতে চলেছে। বলিউডের পরিচিত মুখ এবার হলিউডের এক উচ্চাভিলাষী জীবনীচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে চলেছেন। প্রয়াত সেতার সম্রাট রবিশঙ্কর এর চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি পা রাখছেন বিশ্ব সিনেমার মূলধারায়। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই অভিনন্দন আর শুভেচ্ছায় ভরে উঠেছে সামাজিক মাধ্যম। ভারতীয় দর্শক যেমন গর্বিত তেমনই আন্তর্জাতিক মহলেও তৈরি হয়েছে কৌতূহল।

এই ছবিটি নির্মাণ করছেন বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক স্যাম মেন্ডেস। তিনি অতীতে একাধিক প্রশংসিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং চরিত্রনির্ভর গল্প বলায় তাঁর দক্ষতা বিশ্বজোড়া স্বীকৃত। এবার তিনি তৈরি করতে চলেছেন কিংবদন্তি ব্যান্ড The Beatles কে নিয়ে এক অভিনব জীবনীচিত্র। ছবিটির নাম The Beatles। এই প্রকল্পের বিশেষত্ব হল এটি একক গল্প নয় বরং চারটি স্বতন্ত্র কাহিনি নিয়ে নির্মিত হবে। ব্যান্ডের চার সদস্যের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা হবে চারটি আলাদা গল্প। ফলে দর্শক একই ঘটনার চার রকম মানসিক ও সৃজনশীল ব্যাখ্যা দেখতে পাবেন।

এই ব্যান্ডের সদস্যরা হলেন Paul McCartney John Lennon George Harrison এবং Ringo Starr। বিংশ শতাব্দীর সঙ্গীত ইতিহাসে তাঁদের প্রভাব অপরিসীম। তাঁদের গান শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি বরং সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও সূচনা করেছিল। এই ব্যান্ডের সৃষ্টিশীল যাত্রা কেবল পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ভুবনেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং বিশ্বসঙ্গীতের সঙ্গে এক গভীর মেলবন্ধন তৈরি করেছিল। সেই মেলবন্ধনের অন্যতম সেতুবন্ধন ছিলেন রবিশঙ্কর।

বিশেষ করে জর্জ হ্যারিসনের জীবনে রবিশঙ্করের প্রভাব ছিল গভীর। হ্যারিসন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সেতার শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই সূত্রেই তাঁর সঙ্গে রবিশঙ্করের পরিচয় এবং পরে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। রবিশঙ্কর শুধু তাঁর গুরুই নন বরং এক অর্থে পথপ্রদর্শকও ছিলেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রবিশঙ্কর বলেছেন যে তাঁদের সম্পর্ক ছিল আন্তরিক এবং স্নেহপূর্ণ। তিনি হ্যারিসনকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। এই সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং সঙ্গীতচর্চায়ও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

হ্যারিসনের অনুপ্রেরণায় বিটলসের সঙ্গীতে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। সেতারের সুর পশ্চিমা রক সঙ্গীতের সঙ্গে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে। এই সাংস্কৃতিক বিনিময় ষাটের দশকে বিশ্বসঙ্গীতে এক বিপ্লব ঘটায়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুনভাবে পরিচিতি পায়। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলিই এবার চলচ্চিত্রের পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠতে চলেছে।

এই ছবিতে রবিশঙ্করের চরিত্রে অভিনয় করবেন ফারহান আখতার। তিনি বরাবরই বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। অভিনয় পরিচালনা প্রযোজনা সঙ্গীতচর্চা সব ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। তবে আন্তর্জাতিক জীবনীচিত্রে এমন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের চরিত্রে অভিনয় তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। চরিত্রটির গভীরতা বোঝার জন্য তাঁকে নিশ্চয়ই ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। রবিশঙ্করের ব্যক্তিত্ব ছিল মাধুর্যপূর্ণ অথচ দৃঢ়। তাঁর সঙ্গীতচর্চা ছিল কঠোর সাধনার ফল। এই সমস্ত দিক পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সহজ কাজ নয়।

ছবিতে বিটলসের চার সদস্যের চরিত্রে অভিনয় করবেন এক ঝাঁক হলিউড তারকা। পল ম্যাককার্টনির ভূমিকায় দেখা যাবে পল মেসকালকে। জন লেননের চরিত্রে অভিনয় করবেন হ্যারিস ডিকিনসন। জর্জ হ্যারিসনের চরিত্রে থাকবেন জোসেফ কুইন। আর রিঙ্গো স্টারের ভূমিকায় অভিনয় করবেন ব্যারি কেওগান। আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে এঁরা পরিচিত মুখ। তাঁদের সঙ্গে ফারহানের অভিনয় এক নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।

এই ছবির মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হবে যে সঙ্গীত ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করতে পারে। সেতারের ধ্বনি যখন দূর দেশ পেরিয়ে অন্য সংস্কৃতির হৃদয়ে জায়গা করে নেয় তখন তা কেবল সুরের বিনিময় নয় বরং অনুভূতির আদান প্রদান হয়ে ওঠে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বহু শতাব্দীর সাধনা ও ঐতিহ্যের ফল। সেই ঐতিহ্য যখন পাশ্চাত্যের রক সঙ্গীতের সঙ্গে মিলিত হয় তখন সৃষ্টি হয় এক নতুন সেতুবন্ধন। এই সেতুবন্ধনের অন্যতম কারিগর ছিলেন রবিশঙ্কর। তাঁর সেতারের সুর যেমন ধ্যানমগ্ন তেমনই প্রাণস্পন্দনে ভরপুর। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে সঙ্গীতের ভাষা আলাদা হলেও আবেগের ভাষা এক এবং অভিন্ন।

রবিশঙ্করের শিল্পীসত্তা গড়ে উঠেছিল কঠোর সাধনার ভিতের উপর। অল্প বয়স থেকেই তিনি গুরু আলাউদ্দিন খানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং নিয়মিত রিয়াজের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলেন। তাঁর পরিবেশনায় ছিল শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে দৃঢ়তা আবার একই সঙ্গে ছিল নতুনের অনুসন্ধান। তিনি কেবল প্রথা মেনে চলেননি বরং প্রথাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। ইউরোপ ও আমেরিকার নানা প্রান্তে তাঁর কনসার্ট শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। অনেকেই প্রথমবার ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হন তাঁর হাত ধরেই।

ষাটের দশকে বিশ্বজুড়ে যখন সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে তখন পশ্চিমা তরুণ সমাজ নতুন সুর ও নতুন দর্শনের সন্ধানে ছিল। সেই সময় ব্রিটিশ ব্যান্ড The Beatles বিশ্বসঙ্গীতের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছে। তাঁদের সঙ্গীত ছিল আধুনিক যুবসমাজের কণ্ঠস্বর। ব্যান্ডের সদস্যদের মধ্যে George Harrison ভারতীয় সঙ্গীতের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেতারের ধ্বনি তাঁর মনে কৌতূহল জাগায়। সেই সূত্রেই তাঁর পরিচয় হয় রবিশঙ্করের সঙ্গে। এই পরিচয় পরবর্তীতে গভীর বন্ধুত্বে রূপ নেয়।

news image
আরও খবর

হ্যারিসন রবিশঙ্করের কাছে সেতার শিক্ষা নেন। এই সম্পর্ক কেবল গুরু শিষ্যের ছিল না বরং ছিল আন্তরিক মানবিক বন্ধনের। রবিশঙ্কর একাধিকবার বলেছেন যে তিনি হ্যারিসনকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। অন্যদিকে হ্যারিসন ভারতীয় দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁদের এই সম্পর্ক সঙ্গীতের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় রচনা করে। বিটলসের গানেও ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। পশ্চিমা রক সঙ্গীতে সেতারের অন্তর্ভুক্তি তখন এক অভিনব ঘটনা। শ্রোতারা নতুন এক সুরের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

এই সাংস্কৃতিক বিনিময় কেবল সঙ্গীতের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতীয় সংস্কৃতি যোগ ধ্যান ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি পাশ্চাত্যে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। রবিশঙ্করের কনসার্টে বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রোতা উপস্থিত হতেন। তাঁরা শুধু সুর শুনতে নয় বরং এক ভিন্ন জীবনদর্শনের স্পর্শ পেতে আসতেন। এভাবেই সেতারের তার ছুঁয়ে যায় বহু দূরের মন।

এবার সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গল্প চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নতুনভাবে তুলে ধরা হতে চলেছে। পরিচালক স্যাম মেন্ডেস নির্মাণ করছেন এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প যার কেন্দ্রবিন্দু বিটলসের চার সদস্য। ছবির নাম The Beatles। বিশেষত্ব হল এখানে চারটি পৃথক কাহিনি থাকবে যা ব্যান্ডের চার সদস্যের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হবে। এই কাঠামো দর্শকদের একই সময়ের চারটি মানসিক ভুবনে প্রবেশের সুযোগ দেবে।

ব্যান্ডের সদস্য Paul McCartney John Lennon George Harrison এবং Ringo Starr প্রত্যেকে ছিলেন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁদের অভিজ্ঞতা দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতার ধরন ছিল আলাদা। ফলে চারটি গল্প মিলিয়ে গড়ে উঠবে এক বিস্তৃত ক্যানভাস। এই ক্যানভাসে রবিশঙ্করের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে কারণ তিনি ছিলেন পূর্ব ও পশ্চিমের সেতুবন্ধন।

রবিশঙ্করের চরিত্রে অভিনয় করবেন ফারহান আখতার। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত মুখ। অভিনয় পরিচালনা প্রযোজনা ও সঙ্গীতে তাঁর সমান দক্ষতা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক জীবনীচিত্রে এমন এক ঐতিহাসিক শিল্পীর চরিত্রে অভিনয় করা নিঃসন্দেহে তাঁর কেরিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই চরিত্রে প্রাণ সঞ্চার করতে গেলে তাঁকে গভীর গবেষণা করতে হবে। রবিশঙ্করের কণ্ঠভঙ্গি দেহভাষা মঞ্চ উপস্থিতি এবং সঙ্গীতের প্রতি তাঁর নিবেদন সবকিছু আত্মস্থ করতে হবে।

দর্শকদের প্রত্যাশা তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কারণ এটি কেবল বিনোদনের জন্য নির্মিত ছবি নয়। এটি এক যুগের দলিল। ষাটের দশকের সঙ্গীত আন্দোলন সামাজিক পরিবর্তন এবং যুব সংস্কৃতির বিস্তার এই ছবির পটভূমি। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সেতারের সুরের অন্তর্ভুক্তি ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা। আজকের প্রজন্ম হয়তো সেই সময়ের উত্তেজনা সরাসরি অনুভব করেনি। কিন্তু চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তারা জানতে পারবে কিভাবে দুই ভিন্ন সংস্কৃতি পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে।

ফারহান আখতারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ঐতিহাসিক সত্যকে সম্মান জানিয়ে চরিত্রকে মানবিক করে তোলা। রবিশঙ্কর ছিলেন বিশ্ববন্দিত শিল্পী কিন্তু একই সঙ্গে ছিলেন একজন সংবেদনশীল মানুষ। তাঁর সাফল্যের পেছনে ছিল পরিশ্রম অধ্যবসায় এবং আত্মনিবেদন। চলচ্চিত্রে যদি এই দিকগুলি সঠিকভাবে ফুটে ওঠে তবে দর্শক কেবল একজন কিংবদন্তি শিল্পীকেই দেখবে না বরং একজন মানুষের অন্তর্লোকও অনুভব করবে।

এই প্রকল্প ভারতীয় সিনেমাপ্রেমীদের জন্য গর্বের কারণ। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় শিল্পীর অবদান নতুনভাবে স্বীকৃতি পাবে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করবে যে সাংস্কৃতিক বিনিময় কখনও একমুখী নয়। পূর্ব যেমন পশ্চিমকে প্রভাবিত করেছে তেমনই পশ্চিমও পূর্বকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

ছবিটি মুক্তি পেলে নতুন প্রজন্ম হয়তো আবার রবিশঙ্করের সঙ্গীতের দিকে ফিরে তাকাবে। তারা বুঝতে পারবে যে বিশ্বায়নের অনেক আগেই সুরের মাধ্যমে বিশ্ব এক হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গীত তখনই সীমানা ভেঙেছিল যখন রাজনৈতিক মানচিত্রে বিভাজন স্পষ্ট ছিল। এই বার্তাই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।

সবশেষে বলা যায় এই চলচ্চিত্র কেবল এক ব্যান্ড বা এক শিল্পীর গল্প নয়। এটি মানবিক সংযোগের গল্প। এটি অনুসন্ধানের গল্প। এটি সেই মুহূর্তের গল্প যখন এক সংস্কৃতির সুর অন্য সংস্কৃতির হৃদয়ে অনুরণিত হয়েছিল। ফারহান আখতারের অভিনয় সেই ইতিহাসকে কতটা জীবন্ত করে তুলতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এই ঘোষণা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে ভারতীয় শিল্প ও শিল্পী বিশ্বমঞ্চে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছেন। এই গর্বই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

Preview image