ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর প্রয়াত হলেন জনপ্রিয় বাংলা টেলিভিশন অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক। কে আপন কে পর, আলো ছায়া, রাঙা বউ সহ একাধিক ধারাবাহিকে তাঁর স্মরণীয় অভিনয় দর্শকের মনে চিরকাল রয়ে যাবে।
বছর শেষের মুখে ফের এক হৃদয়বিদারক খবর নেমে এল বাংলা বিনোদন জগতে। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর প্রয়াত হলেন জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক। সোমবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি, সহকর্মী শিল্পী থেকে শুরু করে পরিচালক, প্রযোজক ও অগণিত দর্শক আজ গভীর শোক ও বেদনায় মুহ্যমান।
শ্রাবণী বণিক বাংলা টেলিভিশনের এমন এক মুখ ছিলেন, যাঁকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি কখনও মায়ের চরিত্রে, কখনও কাকিমা, মাসি কিংবা অভিভাবিকার ভূমিকায় দর্শকের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল এক ধরনের নির্ভরযোগ্যতা—যেন গল্পের ভিত শক্ত করে ধরে রাখার দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই।
বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে ফের শোকের ছায়া নেমে এল বাংলা বিনোদন জগতে। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর প্রয়াত হলেন জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক। সোমবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি হারাল এক অভিজ্ঞ, নির্ভরযোগ্য ও প্রিয় মুখকে—যাঁর উপস্থিতি বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য পারিবারিক ধারাবাহিককে সমৃদ্ধ করেছে।
শ্রাবণী বণিক এমন একজন অভিনেত্রী ছিলেন, যাঁর অভিনয় চিৎকার করে নজর কাড়ত না, কিন্তু নিঃশব্দে দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে যেত। তিনি ছিলেন সেই ধরনের শিল্পী, যাঁদের ছাড়া একটি ধারাবাহিক কল্পনাই করা যায় না, অথচ যাঁরা প্রায়শই আড়ালেই থেকে যান। তাঁর প্রয়াণ তাই শুধুই একজন অভিনেত্রীর চলে যাওয়া নয়—এটি বাংলা টেলিভিশনের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
শ্রাবণী বণিকের অভিনয় যাত্রা শুরু হয়েছিল থিয়েটারের মাধ্যমে। মঞ্চে অভিনয় করার সময়ই তাঁর সংলাপ বলার দক্ষতা ও স্বাভাবিক অভিনয়শৈলী চোখে পড়ে। থিয়েটার তাঁকে অভিনয়ের ভিত তৈরি করতে সাহায্য করে—কীভাবে চরিত্র বোঝা যায়, কীভাবে আবেগকে সংযত রেখে প্রকাশ করা যায়, এই সবকিছুই তিনি শিখেছিলেন মঞ্চে কাজ করার সময়।
পরবর্তীকালে টেলিভিশনে সুযোগ আসলে তিনি সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। প্রথমদিকে ছোট ছোট চরিত্রে দেখা গেলেও খুব দ্রুতই তিনি নির্মাতাদের নজরে পড়েন। কারণ, তাঁর অভিনয়ে ছিল এক ধরনের বাস্তবতা—যা দর্শকের সঙ্গে সহজেই সংযোগ তৈরি করত।
গত কয়েক মাস ধরেই অসুস্থ ছিলেন শ্রাবণী বণিক। জানা যায়, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যাচ্ছিল। গত মাসেই পরিবার সূত্রে ও ঘনিষ্ঠ মহলে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে অভিনেত্রীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। চিকিৎসার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল—প্রায় ১২ লক্ষ টাকা। সেই অর্থ জোগাড় করার জন্য তাঁর ছেলে সকলের কাছে সাহায্যের আবেদনও জানিয়েছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই আবেদন ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বহু মানুষই সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা চললেও জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব হয়নি।
অসুস্থতার মধ্যেও শ্রাবণীর মানসিক জোর ছিল চোখে পড়ার মতো। সহকর্মীরা জানিয়েছেন, শারীরিক কষ্টের কথা তিনি খুব একটা প্রকাশ করতেন না। বরং কাজের জায়গায় গেলে নিজের অসুস্থতা ভুলে গিয়ে অভিনয়ে মন দিতেন। এই পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতাই তাঁকে টেলিপাড়ায় একজন সম্মানিত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
শ্রাবণী বণিকের অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল থিয়েটারের হাত ধরে। মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাই তাঁকে পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ছোট পর্দায় তিনি প্রথমে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সাবলীল অভিনয় ও স্বাভাবিক অভিব্যক্তি নির্মাতাদের নজর কাড়ে।
ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন টেলিভিশনের এক পরিচিত মুখ। বিশেষ করে পারিবারিক ধারাবাহিকগুলিতে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তিনি কখনওই অতিরঞ্জিত অভিনয়ে বিশ্বাসী ছিলেন না। সংলাপ বলার ভঙ্গি, চোখের ভাষা, শরীরী অভিব্যক্তি—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের সংযম ও বাস্তবতার ছোঁয়া।
শ্রাবণী বণিকের অভিনীত ধারাবাহিকের তালিকা দীর্ঘ। ‘রাঙা বউ’, ‘সোহাগ চাঁদ’, ‘কে আপন কে পর’, ‘আলো ছায়া’—এই ধারাবাহিকগুলি তাঁকে ঘরে ঘরে জনপ্রিয় করে তোলে।
‘কে আপন কে পর’ ধারাবাহিকে জবার মায়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। একদিকে কঠোর বাস্তবতা, অন্যদিকে মায়ের অদম্য মমতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধন তিনি অসাধারণ দক্ষতায় পর্দায় তুলে ধরেছিলেন। বহু দর্শকই আজও বলেন, সেই চরিত্রে শ্রাবণী বণিককে ছাড়া অন্য কাউকে কল্পনা করা যায় না।
‘আলো ছায়া’ ধারাবাহিকে নায়কের মায়ের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় ছিল সংযত ও গভীর আবেগপূর্ণ। পর্দায় তিনি যেন এক নীরব আশ্রয়—যিনি সব বুঝেও অনেক সময় চুপ করে থাকেন, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে শক্ত হয়ে দাঁড়ান। এই ধরনের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল।
এছাড়াও ‘রাঙা বউ’ ও ‘সোহাগ চাঁদ’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকেও তাঁর উপস্থিতি গল্পকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। পার্শ্ব চরিত্র হয়েও কীভাবে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা যায়, শ্রাবণী বণিক ছিলেন তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
সম্প্রতি ‘মালাবদল’ ধারাবাহিকে দিতির সৎ মায়ের চরিত্রে দেখা গিয়েছিল শ্রাবণী বণিককে। এই চরিত্রটিও ছিল বহুস্তরীয়—একদিকে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে নিজের অবস্থান রক্ষা করার লড়াই। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি এই চরিত্রে অভিনয় করে গিয়েছেন, যা সহকর্মী ও দর্শক সকলের কাছেই অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সহশিল্পীরা জানিয়েছেন, শুটিং ফ্লোরে তিনি কখনও নিজের কষ্টের কথা সামনে আনতেন না। বরং কাজের সময় সব মনোযোগ ঢেলে দিতেন অভিনয়ে। তাঁর এই পেশাদার মনোভাবই তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দিয়েছিল।
শ্রাবণী বণিক শুধু একজন দক্ষ অভিনেত্রীই ছিলেন না, মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, বিনয়ী ও সহানুভূতিশীল। টেলিপাড়ার বহু শিল্পী ও কলাকুশলী তাঁর সঙ্গে কাজ করে এই কথাই বলেছেন।
এক সহশিল্পী জানান, “শ্রাবণীদির সঙ্গে কাজ করা মানেই ছিল এক ধরনের মানসিক শান্তি। তিনি কখনও কাউকে ছোট করে দেখতেন না। নতুন শিল্পীদের তিনি খুব স্নেহ করতেন, প্রয়োজন হলে পরামর্শ দিতেন।”
আরেকজন পরিচালক বলেন, “তিনি খুব কম কথা বলতেন, কিন্তু যখন ক্যামেরা অন হতো, তখনই বোঝা যেত তিনি কতটা প্রস্তুত। এমন শিল্পী এখন সত্যিই বিরল।”
দর্শকের কাছেও শ্রাবণী বণিক ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত বাংলা ধারাবাহিক দেখেন, তাঁদের কাছে তিনি যেন পরিচিত পরিবারের একজন সদস্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অসংখ্য মানুষ শোকবার্তা ও শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে শুরু করেন।
অনেকে লিখেছেন, “পর্দার মা হিসেবেই আপনাকে চেনা, সেই মায়াময় মুখটা আর দেখা যাবে না—এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।” আবার কেউ কেউ পুরনো দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, “আপনি আমাদের গল্পগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবেন।”
শ্রাবণী বণিকের প্রয়াণ বাংলা টেলিভিশনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি হয়তো নায়িকা ছিলেন না, কিন্তু তাঁর মতো চরিত্রাভিনেত্রীদের হাত ধরেই একটি ধারাবাহিক বাস্তব হয়ে ওঠে, বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। পর্দার গল্পের ভিত তিনি শক্ত করে ধরে রাখতেন নিঃশব্দে।
বর্তমান সময়ে যখন ধারাবাহিকের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু অভিজ্ঞ ও সংবেদনশীল চরিত্রাভিনেত্রীর সংখ্যা কমে আসছে, তখন শ্রাবণী বণিকের মতো শিল্পীর অভাব আরও বেশি করে অনুভূত হবে।
আজ তিনি আর নেই, কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো থেকেই যাবেন দর্শকের মনে। পর্দার সেই মমতাময়ী মা, কঠোর অথচ স্নেহশীল অভিভাবিকা কিংবা নিঃশব্দে সব সহ্য করে নেওয়া নারীর চরিত্র—সব মিলিয়ে শ্রাবণী বণিক বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন।
তাঁর প্রয়াণে আমরা হারালাম একজন দক্ষ অভিনেত্রীকে, আরেকজন নীরব পরিশ্রমী শিল্পীকে। কিন্তু তাঁর কাজ, তাঁর অভিনয় ও তাঁর মানবিক স্মৃতি থেকেই যাবে চিরদিন।
শ্রাবণী বণিককে শেষ শ্রদ্ধা। তাঁর পরিবার, পরিজন ও অনুরাগীদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।