পূর্ব বর্ধমানের বড়পলাশনে চায়ের দোকানে বইমেলার সভা নিয়ে বচসার জেরে প্রাণ হারালেন তৃণমূল কর্মী লাল্টু সিকদার। ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়ে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনায় তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে বলে অভিযোগ।
পূর্ব বর্ধমান জেলার মেমারি থানার অন্তর্গত বড়পলাশনে বুধবার সকালে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা মুহূর্তের মধ্যেই গোটা এলাকায় শোক, উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একটি সাধারণ চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়ার সময় বইমেলার সভায় যোগ দেওয়া নিয়ে শুরু হওয়া বচসা শেষ পর্যন্ত প্রাণ কেড়ে নিল এক প্রবীণ তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীর। এই ঘটনায় শুধু একটি পরিবারের মাথার ছাদ ভেঙে পড়েনি, বরং প্রকাশ্যে এসেছে শাসকদলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বাস্তব ও ভয়াবহ চিত্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকাল আনুমানিক ৬টা নাগাদ মন্তেশ্বর বিধানসভার অন্তর্গত বড়পলাশন–২ গ্রামপঞ্চায়েত এলাকার চাঁদের গাছতলা নামক স্থানে একটি পরিচিত চায়ের দোকানে নিয়মিতের মতোই ভিড় জমেছিল। গ্রামের প্রবীণ থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী বহু মানুষ সেখানে সকালে চা খেয়ে নিজেদের দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা করছিলেন। সেই সময়ই সেখানে উপস্থিত ছিলেন লাল্টু সিকদার (বয়স আনুমানিক ৭০ বছর) এবং তারু শেখ ওরফে শেখ আসলাম (বয়স আনুমানিক ৬০ বছর)।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, দু’জনের মধ্যে কোনও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং গোষ্ঠীগত অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মঙ্গলবার মন্তেশ্বর বিধানসভা এলাকায় আয়োজিত বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন লাল্টু সিকদার। সেই বিষয়টি নিয়েই বুধবার সকালে চায়ের দোকানে আলোচনার সূত্রপাত হয়। অভিযোগ, বইমেলার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া নিয়ে তারু শেখ লাল্টু সিকদারকে কটাক্ষ করেন। প্রথমে কথোপকথন স্বাভাবিক থাকলেও ধীরে ধীরে তা তর্কে পরিণত হয়।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কথাকাটাকাটি ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। দু’জনের মধ্যে উচ্চস্বরে বাক্য বিনিময় শুরু হয়, যা মুহূর্তের মধ্যেই হাতাহাতির রূপ নেয়। অভিযোগ, এই সময় তারু শেখ আচমকা লাল্টু সিকদারকে ধাক্কা দেন। বয়সের ভারে দুর্বল লাল্টু সিকদার ভারসাম্য রাখতে না পেরে চায়ের দোকানের সামনেই রাস্তায় উল্টে পড়ে যান। পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি।
ঘটনাটি দেখে উপস্থিত স্থানীয়রা তৎক্ষণাৎ ছুটে আসেন। কেউ জল আনেন, কেউ আবার দ্রুত মেমারি থানায় ফোন করে ঘটনার কথা জানান। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাল্টু সিকদারকে উদ্ধার করে মেমারি গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। প্রাথমিক চিকিৎসকদের অনুমান, পড়ে যাওয়ার পর তীব্র মানসিক চাপ ও আঘাতের ফলে তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন এবং সেই কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
এই ঘটনায় আহত হন অভিযুক্ত তারু শেখও। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ধস্তাধস্তির সময় তিনিও কিছুটা আঘাত পান। পরে তাঁকেও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পরেই ভেঙে পড়ে মৃত লাল্টু সিকদারের পরিবার। বাড়িতে খবর পৌঁছতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। মৃতের ছেলে ঝন্টু সিকদার প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, এটি কোনও সাধারণ ঝগড়ার ঘটনা নয়, বরং তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সরাসরি ফল। তাঁর দাবি, তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং মন্তেশ্বর বিধানসভার বর্তমান বিধায়ক সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ঝন্টু সিকদারের আরও অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত তারু শেখ প্রাক্তন ব্লক সভাপতি মোঃ ইসমাইল গোষ্ঠীর কর্মী হিসেবে পরিচিত। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে মতানৈক্য ও রাজনৈতিক টানাপড়েন চলে আসছে। মঙ্গলবার বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর বাবার সক্রিয় উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ সেই দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দেয়। বুধবার সকালে চায়ের দোকানে সেই ক্ষোভই প্রকাশ পায় কটাক্ষ ও বচসার মাধ্যমে, যার পরিণতি হয় এতটা ভয়াবহ।
ঝন্টু সিকদার বলেন, “আমার বাবা কোনও ঝগড়াটে মানুষ ছিলেন না। তিনি বয়সে প্রবীণ হলেও দলের কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিতেন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তাঁকে এইভাবে প্রাণ দিতে হবে, এটা আমরা ভাবতেও পারিনি।”
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বড়পলাশন এলাকায় নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, মানুষজন দলে দলে মৃতের বাড়িতে ভিড় করেন। এলাকায় চাপা উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়। রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনা নিয়ে শুরু হয় তীব্র আলোচনা। শাসকদলের অন্দরমহলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে কতটা গভীরে পৌঁছেছে, এই ঘটনা তারই এক নির্মম উদাহরণ বলে মনে করছেন অনেকেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, গ্রামবাংলায় রাজনৈতিক বিভাজন আজ আর কেবল ভোটের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। তা ঢুকে পড়ছে দৈনন্দিন জীবনের অতি সাধারণ জায়গাগুলিতেও—চায়ের দোকান, বাজার, পাড়া-প্রতিবেশে। একটি সামান্য মন্তব্যও বড়সড় সংঘাতের রূপ নিচ্ছে, যার পরিণতি কখনও কখনও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
এদিকে পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করা হবে। ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক কোনও ষড়যন্ত্র বা পূর্বপরিকল্পনা জড়িত কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এলাকায় যাতে কোনও অশান্তি না ছড়ায়, সেদিকে কড়া নজর রাখা হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল রাজ্য রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি নিয়ে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেখানে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অঙ্গ, সেখানে তা যদি ব্যক্তিগত আক্রোশ ও হিংসার রূপ নেয়, তবে তার ফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বড়পলাশনের এই ঘটনা তারই জ্বলন্ত উদাহরণ।
একটি বইমেলার মতো সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুষ্ঠানের সূত্র ধরে শুরু হওয়া একটি সামান্য বচসা যে শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারের জীবনে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা কেউই কল্পনা করেনি। বইমেলা মানেই যেখানে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মতবিনিময়ের মুক্ত পরিসর—সেই আয়োজনকে কেন্দ্র করেই যদি রাগ, অহংকার ও রাজনৈতিক বিদ্বেষের জন্ম হয়, তবে তা সমাজের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক। বড়পলাশনের এই ঘটনা সেই উদ্বেগকে বাস্তব ও রক্তমাখা রূপে সামনে এনে দিয়েছে।
লাল্টু সিকদারের মৃত্যু কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল নয়, বরং গ্রামবাংলার ক্রমশ অবনতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন। এক সময় গ্রামের চায়ের দোকান ছিল মতবিনিময়, হাসি-ঠাট্টা আর পারস্পরিক সহমর্মিতার জায়গা। আজ সেই জায়গাতেই রাজনৈতিক বিভাজন এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে, সামান্য কথার লড়াই মুহূর্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। এই বদল আমাদের সমাজের জন্য এক ভয়ানক সতর্কবার্তা।
সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হল, লাল্টু সিকদারের মতো প্রবীণ মানুষকে এই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন মানুষ, যিনি জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সাংগঠনিক আনুগত্যের জায়গা থেকে সক্রিয় ছিলেন, তাঁকে শেষ পর্যন্ত নিজের মতাদর্শের দাম দিতে হল জীবন দিয়ে। তাঁর পরিবারের কাছে এই ক্ষতি কোনওদিন পূরণ হওয়ার নয়। একজন বাবাকে হারানোর শূন্যতা, পরিবারের অভিভাবককে হারানোর যন্ত্রণা, কোনও রাজনৈতিক ব্যাখ্যাতেই ধামাচাপা দেওয়া যায় না।
এই ঘটনা রাজনৈতিক দলগুলির কাছেও এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। কর্মসূচি, সভা, মিছিলের বাইরে গিয়ে দলীয় নেতারা কি আদৌ তাঁদের কর্মীদের মধ্যে সহনশীলতা, সংযম ও মানবিকতা গড়ে তুলতে পেরেছেন? রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অঙ্গ হলেও, সেই মতভেদ যদি ব্যক্তিগত আক্রোশ ও হিংসায় রূপ নেয়, তবে তা গোটা সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বড়পলাশনের ঘটনা দেখিয়ে দিল, রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার অভাব কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই মৃত্যুর পর কি কোনও শিক্ষা নেওয়া হবে? নাকি কয়েকদিন আলোচনার পর, তদন্তের আশ্বাস আর রাজনৈতিক বিবৃতির ভিড়ে লাল্টু সিকদারের নামও ধীরে ধীরে সংবাদ শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাবে? ইতিহাস বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন ঘটনাগুলি সময়ের সঙ্গে ভুলে যাওয়া হয়। কিন্তু ভুলে যাওয়াই যদি অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়, তবে একই ধরনের ট্র্যাজেডি বারবার ফিরে আসবে।
লাল্টু সিকদারের মৃত্যু তাই শুধুমাত্র একটি খবর নয়, এটি এক গভীর আত্মসমালোচনার দাবি। রাজনীতি যদি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নেয়, তবে সেই রাজনীতির পথ ও উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় অনেক আগেই এসে গিয়েছে।