Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আরব মরুতে ৩০০ কিমি গতিতে বুলেট ট্রেন চালাবে রাজা ও যুবরাজ ইহুদিদের ভুলেই কি হাত মেলাল দুই শত্রু

প্রতিবেশী কাতারের সঙ্গে ঐতিহাসিক রেলচুক্তিতে সই করেছে সৌদি আরব। প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুযায়ী দুই দেশের রাজধানীর মধ্যে ভবিষ্যতে ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলবে বুলেট ট্রেন। মাত্র চার বছর আগেও এই দুই পশ্চিম এশীয় দেশের মধ্যে তীব্র শত্রুতা ছিল যা এই চুক্তিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে

পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে বর্তমানে এক গভীর পরিবর্তনের সময় চলছে
দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শত্রুতা অবিশ্বাস এবং কূটনৈতিক টানাপড়েনের ইতিহাসকে পিছনে ফেলে আরব দুনিয়া ধীরে ধীরে এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে আসছে সৌদি আরব এবং কাতারের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক রেলচুক্তি
যে দুই দেশ এক সময় একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল
যাদের সম্পর্ক একসময় চরম উত্তেজনায় ভরা ছিল
আজ সেই দুই দেশ পরিকাঠামোগত উন্নয়নকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের পথ একসঙ্গে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে
এই উদ্যোগ শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই নয়
বরং গোটা পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক এবং কৌশলগত শক্তির সমীকরণে নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে

এই রেলচুক্তি প্রমাণ করছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিস্থিতি বদলালে সিদ্ধান্তও বদলায়
এক সময় যে বিরোধকে অমোচনীয় মনে করা হত
আজ সেই বিরোধ বাস্তব প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে পিছনে পড়ে যাচ্ছে
সৌদি আরব এবং কাতার উভয় দেশই উপলব্ধি করেছে যে সংঘাত নয় বরং সহযোগিতাই ভবিষ্যতের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি
এই উপলব্ধিই তাদের একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে

চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের শুরুতে আরবের একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়
সৌদি আরব এবং কাতার একটি উচ্চগতির বৈদ্যুতিন যাত্রিবাহী রেল প্রকল্পে সম্মত হয়েছে
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল দুই দেশের রাজধানীকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধ এবং কাতারের রাজধানী দোহা ভবিষ্যতে একটি আধুনিক রেললাইনের মাধ্যমে সংযুক্ত হবে
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যাতায়াত ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় সাতশো পঁচাশি কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন পাতার কথা ভাবা হয়েছে
এই রেললাইন রিয়াধ থেকে শুরু হয়ে দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে
এই দীর্ঘ পথ জুড়ে চলবে উচ্চগতির আধুনিক ট্রেন
সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে যে এই ট্রেন ঘণ্টায় তিনশো কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম হবে
ফলে দুই দেশের রাজধানীর মধ্যে যাতায়াতের সময় নাটকীয় ভাবে কমে আসবে

বর্তমানে বিমানপথে এই দুই শহরের মধ্যে যাতায়াত করতে যে সময় এবং খরচ লাগে
তার তুলনায় রেলপথ অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে
এই প্রকল্পের ফলে শুধু সাধারণ যাত্রী নয়
ব্যবসায়ী পর্যটক এবং শ্রমজীবী মানুষও উপকৃত হবেন
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও মজবুত হবে
পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যাবে

এই রেল প্রকল্পের প্রভাব কেবল যাতায়াত ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
রেললাইন নির্মাণ পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে
এর ফলে দুই দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে
বিশেষজ্ঞদেরদের মতে এই ধরনের বড় পরিকাঠামো প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক উন্নয়নের ভিত মজবুত করে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই রেলচুক্তি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি প্রতীকী বার্তা বহন করছে
এটি দেখাচ্ছে যে অতীতের শত্রুতা যত গভীরই হোক
পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দেশগুলি নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে
সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারা ভবিষ্যতের পথে এগোতে পারে

সৌদি আরব এবং কাতারের এই যৌথ উদ্যোগ পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে
এই অধ্যায় ভবিষ্যতে আরও কতটা গভীর হবে
আর কতটা স্থায়ী রূপ নেবে
তা সময়ই বলবে
তবে এটুকু স্পষ্ট যে এই রেলচুক্তি আরব দুনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক
যা আগামী দিনে গোটা অঞ্চলের শক্তির সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে

এই রেল প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু যাতায়াতের সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাও বটে। মাত্র কয়েক বছর আগেও সৌদি আরব এবং কাতারের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত তিক্ত। এক সময় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। আকাশপথ স্থলপথ এবং সমুদ্রপথে কাতারের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এর ফলে কাতারের অর্থনীতি বিশেষ করে জ্বালানি রফতানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মক চাপে পড়ে। সেই সময় দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের জায়গা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল।

news image
আরও খবর

এই প্রেক্ষাপটে আজ সৌদি আরব ও কাতারের একসঙ্গে বসে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পের নকশা তৈরি করা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এই রেলচুক্তি দেখাচ্ছে যে দুই দেশ কেবল অতীতের বিরোধ ভুলে যেতে প্রস্তুত নয় বরং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আরও সুসংহত করতে চাইছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুই দেশে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে কয়েক দশ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বাণিজ্য পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানও নতুন গতি পাবে।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে একাধিক রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইজ়রায়েল এবং প্যালেস্টাইন সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। একাধিক আরব রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বিমান হামলার ঘটনা আরব দুনিয়ায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকের মতে এই পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য এবং সহযোগিতা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব এবং কাতারের ঘনিষ্ঠতা সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেরই অংশ।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন সম্ভাব্য বাইরের হুমকির আশঙ্কা আরব দেশগুলিকে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমাতে বাধ্য করছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব নিজেকে ইসলামীয় বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। সেই পথে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং যৌথ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমানের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কাতারও বুঝেছে যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়।

এই রেল প্রকল্পের আর একটি দিক হল অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বিমানপথে যাতায়াত তুলনামূলক দ্রুত হলেও খরচ বেশি। উচ্চগতির রেল পরিষেবা চালু হলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ কমবে। ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরকেও এই রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে দেশের ভেতরেও যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে
একদল বিশেষজ্ঞ মনে করছেন যে সৌদি আরব এবং কাতারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই রেলচুক্তির নেপথ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে রয়েছে
তাঁদের মতে এটি কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয় বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে
এই মতের সমর্থকেরা বলছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে
এর ফলে আরব দেশগুলি নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠছে
এই রেল প্রকল্প সেই ঐক্যের বাস্তব রূপ হিসেবেই দেখা যেতে পারে

অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন এই চুক্তিকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ঠিক নয়
তাঁদের যুক্তি হল বিশ্বজুড়ে বর্তমানে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট
উচ্চগতির রেল যোগাযোগ আধুনিক রাষ্ট্রগুলির উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ
সৌদি আরব এবং কাতারও সেই বিশ্বব্যাপী ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাণিজ্য পর্যটন এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হবে
ফলে অর্থনৈতিক লাভই এখানে প্রধান লক্ষ্য বলে তাঁদের দাবি

এই মত অনুযায়ী ভবিষ্যতে এই রেল প্রকল্প আরও বড় আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে
ভারত মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের মতো বৃহৎ পরিকল্পনার কথা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে
সেই ধরনের করিডরের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
সৌদি কাতার রেল প্রকল্প ভবিষ্যতে সেই বৃহৎ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ

যাই হোক না কেন সৌদি আরব এবং কাতারের এই উদ্যোগ পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এবং শত্রুতার পর এই দুই দেশের কাছাকাছি আসা নিজেই একটি বড় ঘটনা
এটি দেখাচ্ছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই
পরিস্থিতি এবং স্বার্থ বদলালে দেশগুলিও নতুন পথ বেছে নেয়
কৌশলগত প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের লক্ষ্য অনেক সময় অতীতের বিরোধকে পিছনে ফেলে দেয়

এই রেল প্রকল্পের মাধ্যমে কেবল লোহার রেললাইনই তৈরি হচ্ছে না
একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সহযোগিতার একটি নতুন সেতু
এই সেতু কতটা মজবুত হবে তা ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহই নির্ধারণ করবে
তবে এটুকু নিশ্চিত যে এই চুক্তি আরব দুনিয়ার রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে
এই অধ্যায় আগামী দিনে পশ্চিম এশিয়ার শক্তির সমীকরণে আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে

Preview image