সঙ্গীতজগতে এক নতুন অধ্যায় যোগ করলেন অরিজিৎ সিংহ। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের আসন্ন ছবি ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’-তে প্রথমবার কীর্তন গাইলেন তিনি। চৈতন্যদেবের জীবন ও দর্শনকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ছবিতে অরিজিতের কণ্ঠে কীর্তন ইতিমধ্যেই দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ বাড়িয়েছে।
ভারতীয় সঙ্গীত জগতের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী কণ্ঠ অরিজিৎ সিংহ। প্রেম, বিরহ, আবেগ কিংবা আত্মসংঘাত—সব ধরনের অনুভূতিকে নিজের কণ্ঠে নিখুঁতভাবে তুলে ধরার জন্য তিনি শ্রোতামহলে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সংগীতজীবনে এই প্রথম একেবারে ভিন্ন ঘরানার গানে কণ্ঠ দিলেন অরিজিৎ—একটি কীর্তন। আর সেই কীর্তন স্থান পেয়েছে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের আসন্ন বাংলা ছবি ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’-তে। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বাংলা সিনেমা ও সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। এই প্রেক্ষাপটে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস। আর এই ছবিতে অরিজিৎ সিংহের কণ্ঠে কীর্তনের সংযোজন সেই ব্যতিক্রমী প্রয়াসকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ মূলত মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের জীবন, দর্শন ও ভক্তি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক-আধ্যাত্মিক চলচ্চিত্র। চৈতন্যদেব কেবল একজন ধর্মীয় গুরু নন, তিনি ছিলেন এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অগ্রদূত। ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি জাতি, বর্ণ ও শ্রেণিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মধ্যে ঈশ্বরভক্তির ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সৃজিত মুখোপাধ্যায় এই জটিল ও গভীর দর্শনকে আধুনিক চলচ্চিত্র ভাষায় তুলে ধরার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন।
কীর্তনকে তিনি শুধুমাত্র ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং গল্প বলার একটি প্রধান ভাষা হিসেবেই কীর্তনকে তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও তা চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ করছে, কোথাও আবার সমাজের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলার সংস্কৃতিতে কীর্তনের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রধান সঙ্গীতধারা এই কীর্তন। চৈতন্যদেব নিজেই কীর্তনের মাধ্যমে ভগবানের নামগানকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ঢাক, খোল, করতালের তালে তালে ভক্তি ও আবেগের মিশ্রণে যে সুর সৃষ্টি হয়, তা শুধুমাত্র গান নয়—একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
এই ঐতিহ্যবাহী ধারায় অরিজিৎ সিংহের মতো একজন আধুনিক, মূলধারার গায়কের অংশগ্রহণ তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছবির কীর্তন তরুণদের কাছে এক ধরনের প্রবেশদ্বার হতে পারে—যার মাধ্যমে তারা বৈষ্ণব দর্শন ও বাংলা সংস্কৃতির শিকড় সম্পর্কে নতুন করে জানবে।
সৃজিত মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই ছবির কীর্তনের জন্য এমন একজন শিল্পীর প্রয়োজন ছিল, যাঁর কণ্ঠে আবেগ, গভীরতা ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি থাকবে। অরিজিতের কণ্ঠ সেই জায়গাতেই আলাদা। যদিও তিনি মূলত আধুনিক রোমান্টিক গান ও সিনেমার গানের জন্য পরিচিত, তবু তাঁর গানের মধ্যে যে আত্মিক আবেশ রয়েছে, সেটিই তাঁকে এই কীর্তনের জন্য উপযুক্ত করে তোলে।
কীর্তন শুধুমাত্র সংগীত নয়, এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনা। বৈষ্ণব দর্শনে কীর্তনের মাধ্যমে ভগবানের নাম উচ্চারণই মুক্তির পথ বলে মনে করা হয়। চৈতন্যদেব নিজে কীর্তনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ঈশ্বরভক্তিকে সহজ করে তুলেছিলেন। তাঁর কীর্তনে ছিল উচ্ছ্বাস, অশ্রু, নৃত্য এবং আত্মবিস্মরণের অনুভূতি।
এই জায়গাতেই একজন আধুনিক প্লেব্যাক শিল্পীর জন্য কীর্তন গাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে কণ্ঠের কারুকার্য নয়, মুখ্য হয়ে ওঠে অনুভব, সমর্পণ এবং অন্তরের আবেগ।
অরিজিৎ সিংহের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর কণ্ঠের আবেগ। বহু সমালোচকই বলেছেন, তাঁর গান শুনলে মনে হয় তিনি নিজে সেই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সেই কারণেই কীর্তনের মতো ধারায় তাঁর কণ্ঠ এত কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
সংগীত মহলের একাংশের মতে, অরিজিতের এই কীর্তন তাঁর সংগীতজীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির অন্যতম। কারণ এটি কোনও বাণিজ্যিক হিট গানের পথে হাঁটা নয়, বরং একেবারে আলাদা ধারার প্রতি আত্মসমর্পণ।
চৈতন্যদেবের সময়ের সমাজ ছিল গভীরভাবে বিভক্ত। জাতিভেদ, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তাঁকে শুধুমাত্র ধর্মগুরু নয়, বরং সমাজসংস্কারক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ ছবিতে সেই দিকটিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কীর্তনের মাধ্যমে সেই সামাজিক বার্তা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। একত্রে গান গাওয়া, নাচা এবং ঈশ্বরের নাম স্মরণ করার মধ্য দিয়ে যে সাম্যের বোধ তৈরি হয়, সেটিই ছবির অন্যতম মূল বক্তব্য।
অরিজিৎ সিংহের সংগীতজীবন মূলত বলিউড এবং আধুনিক বাংলা ও হিন্দি সিনেমাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ‘তুম হি হো’, ‘চন্না মেরেয়া’, ‘কে তুই বল’, ‘মন মাঝি রে’—এমন অসংখ্য গান তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু কীর্তন গাওয়া তাঁর কাছে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।
ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, এই কীর্তনের জন্য অরিজিতকে শুধুমাত্র সুর নয়, দর্শন ও ভাবনাকেও গভীরভাবে আত্মস্থ করতে হয়েছে। কারণ কীর্তন গাওয়া মানে শুধু গান গাওয়া নয়—এটি এক ধরনের সাধনা।
এই ছবির সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। বাংলা ছবির সংগীতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে তিনি বরাবরই দক্ষ। কীর্তনের ক্ষেত্রে ইন্দ্রদীপ এমন এক সুরের পরিকাঠামো তৈরি করেছেন, যেখানে প্রাচীন বৈষ্ণব রীতির সঙ্গে আধুনিক শ্রোতার অনুভূতির সেতুবন্ধন ঘটেছে।
অরিজিতের কণ্ঠ এবং ইন্দ্রদীপের সুর মিলিয়ে এই কীর্তন শুধুমাত্র ছবির অংশ নয়, বরং স্বতন্ত্রভাবেও শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ নির্মাণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করেছেন সৃজিত মুখোপাধ্যায় ও তাঁর টিম। ইতিহাসবিদ, বৈষ্ণব গবেষক ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলোচনা করে চৈতন্যদেবের জীবনের নানা দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধুমাত্র ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয়, বরং সামাজিক ও মানবিক দিকও ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই ছবিতে কীর্তন ব্যবহার করা হয়েছে গল্প বলার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে। কীর্তনের মাধ্যমে চরিত্রের মানসিক পরিবর্তন, সমাজের প্রতিক্রিয়া এবং সময়ের প্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।
ছবিটি এখনও মুক্তি পায়নি, কিন্তু অরিজিতের কীর্তনের খবর প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে আলোচনা। অনেকেই একে বাংলা ছবির সংগীতে এক সাহসী ও ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ বলছেন, এতে তরুণ প্রজন্ম কীর্তনের মতো প্রাচীন ধারার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হবে।
আজকের দিনে যখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে সংগীতের ধারা, তখন এই ধরনের প্রয়াস বাংলা সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অরিজিতের মতো জনপ্রিয় শিল্পী যদি কীর্তনের মতো ধারায় অংশ নেন, তাহলে তা নিঃসন্দেহে নতুন শ্রোতাদের আকৃষ্ট করবে।
এই কীর্তন শুধু একটি সিনেমার গান নয়—এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহনের একটি প্রয়াস।
ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই কীর্তন গাওয়ার অভিজ্ঞতা অরিজিতের কাছে অত্যন্ত আত্মিক। তিনি নাকি রেকর্ডিংয়ের সময় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে গানের ভাবের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। কোনও বাণিজ্যিক চাপ নয়, বরং এক ধরনের শান্তি ও সমর্পণের অনুভূতি নিয়ে তিনি গানটি গেয়েছেন।
এই কীর্তনের সাফল্যের উপর নির্ভর করেই হয়তো ভবিষ্যতে অরিজিতের কণ্ঠে আরও আধ্যাত্মিক বা ধ্রুপদী ঘরানার গান শোনা যেতে পারে। বাংলা সিনেমাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি বাংলা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সংগীতের এক সম্মিলিত যাত্রা। অরিজিৎ সিংহের প্রথম কীর্তন এই যাত্রাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। আধুনিক জনপ্রিয়তার সঙ্গে প্রাচীন ঐতিহ্যের যে সেতুবন্ধন এই ছবিতে গড়ে উঠছে, তা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন অনেকে।