Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সিল্করুটের বাইরে পূর্ব সিকিমের অচেনা স্বর্গ নতুন ভ্রমণের গন্তব্য

র্ব সিকিম মানেই রেশমপথের সৌন্দর্য নয়। ছোট্ট নির্জন পাহাড়ি গ্রাম রোলেপ। কেন ভ্রমণ তালিকায় রাখবেন এই স্থান?  

পূর্ব সিকিমের একান্ত নির্জন অথচ অপরূপ সুন্দর গ্রাম রোলেপ যেন প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা এক অমূল্য রত্ন। আধুনিক জীবনের ক্লান্তি আর ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ যখন একটু শান্তি খোঁজে, তখন রোলেপ সেই আশ্রয় হয়ে ওঠে যেখানে সময় যেন ধীরে চলে, আর মন ফিরে পায় তার স্বাভাবিক ছন্দ। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা নদীর শব্দ, সবুজে মোড়া পাহাড়ি ঢাল আর নীল আকাশের বিস্তার মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনবদ্য দৃশ্য, যা একবার চোখে দেখলে ভুলে থাকা যায় না।

রোলেপে পৌঁছনোর পথটিও কম আকর্ষণীয় নয়। রংলি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ, তবে এই পথের প্রতিটি বাঁকেই যেন নতুন করে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সর্পিলাকার পাহাড়ি রাস্তা, একদিকে গভীর খাদ আর অন্যদিকে সবুজ বনভূমি—এই পথ চলা যেন নিজেই এক অভিজ্ঞতা। গাড়ির জানালা খুলে দিলে ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে মিশে আসে মাটির গন্ধ, যা মনকে মুহূর্তেই সতেজ করে তোলে।

গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে ছোট ছোট কাঠের বাড়ি, চারপাশে ধাপ চাষের জমি আর দূরে পাহাড়ের সারি। এখানে জীবনযাত্রা অত্যন্ত সরল, কিন্তু সেই সরলতার মধ্যেই রয়েছে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। গ্রামের মানুষজন অত্যন্ত আন্তরিক ও অতিথিপরায়ণ। তাদের মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকে, যা শহরের যান্ত্রিক জীবনে প্রায় হারিয়ে গেছে। এই হাসিই যেন শেখায়, সুখ আসলে কত সহজ হতে পারে।

রোলেপের অন্যতম বড় আকর্ষণ হল এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাখিপ্রেমীদের জন্য এটি যেন এক স্বর্গরাজ্য। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে সকাল শুরু হয়, আর সন্ধ্যায় পাহাড়ের আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে সূর্যাস্তের আলোয়। যারা প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য রোলেপ আদর্শ স্থান। এখানে হেঁটে হেঁটে গ্রাম ঘোরা, নদীর ধারে বসে থাকা বা শুধু নীরবে প্রকৃতিকে অনুভব করা—এই সবই হয়ে ওঠে এক অমূল্য অভিজ্ঞতা।

গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে রংপো খোলা নামের একটি খরস্রোতা নদী। নদীর উপর কাঠের ছোট ছোট সাঁকো আর তার দু’পাশে বাঁধা রঙিন প্রার্থনার পতাকা যেন এক অন্যরকম সৌন্দর্য এনে দেয়। এই পতাকাগুলি বাতাসে দুলতে দুলতে যেন এক অদ্ভুত শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। নদীর জলের শব্দ, বাতাসের ছোঁয়া আর পাহাড়ের নীরবতা মিলিয়ে এখানে সময় কাটানো মানেই এক অন্য জগতে হারিয়ে যাওয়া।

রোলেপে থাকার জন্য খুব বিলাসবহুল ব্যবস্থা না থাকলেও হোমস্টে গুলিতে মেলে আন্তরিক আতিথেয়তা। কাঠের ঘরে বসে গরম চা খেতে খেতে বাইরে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করা—এই অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ। স্থানীয় খাবার যেমন মোমো, থুকপা বা নুডলসের স্বাদও একেবারে আলাদা। এখানে খাবারের সঙ্গে মিশে থাকে মানুষের ভালোবাসা, যা শহরের রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় না।

যারা একটু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন, তাদের জন্য রোলেপের আশেপাশে রয়েছে বেশ কিছু আকর্ষণীয় স্থান। বুদ্ধ জলপ্রপাত তার মধ্যে অন্যতম। ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছতে হয় এই জলপ্রপাতের কাছে। পাহাড়ের বুক চিরে সাদা জলের ধারা নিচে নেমে আসার দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধকর। বর্ষাকালে এই জলপ্রপাত আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, তখন জলের স্রোত অনেক বেশি প্রবল থাকে।

শোকে খোলা আর ঝুলন্ত সেতুগুলিও ঘুরে দেখার মতো। এই সেতুগুলির উপর দাঁড়িয়ে চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করা এক অন্যরকম অনুভূতি দেয়। নিচে বয়ে যাওয়া নদী আর চারদিকে সবুজ পাহাড়—এই দৃশ্য যেন মনকে একেবারে অন্য জগতে নিয়ে যায়।

রোলেপে দুই থেকে তিন দিন কাটালে আরও একটি জায়গা অবশ্যই ঘুরে দেখা উচিত, তা হল চাচাল। জঙ্গল পথ দিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট হাঁটতে হয় সেখানে পৌঁছতে। এই পথ কখনও সিঁড়ি, কখনও বাঁশের সাঁকো, আবার কখনও সরু পাহাড়ি ট্রেইল—সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। চাচালে পৌঁছে মনে হয় যেন প্রকৃতি তার সমস্ত সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে। এখানে রয়েছে ক্যাম্পিংয়ের সুযোগ, আর রাতের আকাশে অসংখ্য তারার মেলা দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অবিস্মরণীয়।

চাচাল রোলেপের থেকেও বেশি নির্জন ও শান্ত। এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় নেই বললেই চলে, ফলে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতাই যেন প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করে। এখানে সময় কাটালে বোঝা যায়, জীবনের আসল আনন্দ কোথায় লুকিয়ে আছে।

রোলেপ শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি অনুভূতি। এখানে এসে মানুষ নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে। শহরের ব্যস্ততা, কাজের চাপ আর প্রতিযোগিতার মধ্যে আমরা প্রায় ভুলেই যাই, নিজের জন্য একটু সময় নেওয়া কতটা জরুরি। রোলেপ সেই সুযোগ করে দেয়, যেখানে মানুষ নিজেকে সময় দিতে পারে, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

এই গ্রাম শেখায়, জীবনের আসল সুখ বড় বড় জিনিসে নয়, ছোট ছোট মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে। একটি পাহাড়ি শিশুর হাসি, একটি নির্জন পথ, একটি নদীর শব্দ—এই সবই মিলে তৈরি হয় জীবনের প্রকৃত আনন্দ। রোলেপে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত যেন হৃদয়ে থেকে যায় দীর্ঘদিন।

সিল্ক রুট ভ্রমণের পরিকল্পনা থাক বা না থাক, রোলেপে কয়েকদিন কাটানো মানেই এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এখানে এসে মানুষ বুঝতে পারে, জীবনের গতির মাঝেও মাঝে মাঝে থেমে যাওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই থেমে যাওয়াই হয়তো আমাদের নতুন করে চলার শক্তি দেয়।

সবশেষে বলা যায়, রোলেপ এমন একটি জায়গা যেখানে প্রকৃতি, মানুষ আর সময় এক অদ্ভুত বন্ধনে আবদ্ধ। এখানে এসে যে কেউ নিজের ভেতরের শান্তিকে খুঁজে পেতে পারে। তাই যদি কখনও মনে হয়, জীবনের কোলাহল থেকে একটু দূরে গিয়ে নিজেকে খুঁজে নিতে চান, তবে রোলেপ হতে পারে আপনার জন্য আদর্শ গন্তব্য। 

news image
আরও খবর

পাহাড়ের মধ্যে এমন কিছু জায়গা থাকে, যেখানে গেলে মনে হয় সময় থমকে দাঁড়িয়েছে। জীবনের ব্যস্ততা, কোলাহল, দায়িত্ব—সবকিছু যেন দূরে কোথাও মিলিয়ে যায়। পূর্ব সিকিমের ছোট্ট গ্রাম রোলেপ ঠিক তেমনই এক জায়গা। এখানে প্রকৃতি নিজের ছন্দে বাঁচে, আর মানুষ সেই ছন্দের সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলে। শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে দূরে, এই গ্রাম আপনাকে শেখাবে ধীরে বাঁচতে, অনুভব করতে, আর নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে।

রোলেপের নাম হয়তো অনেকের কাছে অচেনা, কারণ এটি এখনও পর্যটনের প্রচারের আলোয় পুরোপুরি আসেনি। কিন্তু যারা একবার এখানে এসেছে, তারা জানে—এই জায়গার টান অন্যরকম। এটি শুধুই একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি অভিজ্ঞতা, যা শব্দে পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠি

 

 

রোলেপে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়, তা হল নিস্তব্ধতা। তবে এই নিস্তব্ধতা একঘেয়ে নয়, বরং জীবন্ত। পাখির ডাক, নদীর কলকল শব্দ, দূরের ঝরনার গুঞ্জন—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব সুর তৈরি হয়।

পাহাড়ের ঢালে ধাপ চাষের সবুজ দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। প্রতিটি ধাপে যেন মানুষের পরিশ্রম আর প্রকৃতির আশীর্বাদ একসঙ্গে মিশে আছে। সকালে যখন কুয়াশা ধীরে ধীরে সরতে থাকে, তখন পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো পড়ে এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করে—যা শুধু চোখে নয়, মনে গেঁথে যায়।

এখানকার বাতাসে এক ধরনের সতেজতা রয়েছে। শহরের দূষিত পরিবেশে যে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, এখানে সেই শ্বাসই হয়ে ওঠে আনন্দের। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়।


 

রোলেপের প্রাণ হল খরস্রোতা রংপো খোলা নদী। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা এই নদীর জলের শব্দ যেন এক অনন্ত সঙ্গীত। কখনও তা শান্ত, কখনও প্রবল—কিন্তু সব সময়ই জীবন্ত।

নদীর উপর দিয়ে কাঠের ছোট ছোট সাঁকো, আর তার রেলিংয়ে বাঁধা রঙিন প্রার্থনা পতাকা—এই দৃশ্য যেন ছবির মতো সুন্দর। বাতাসে পতাকার দোলায় এক ধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতি জেগে ওঠে।

নদীর ধারে বসে সময় কাটানোই এখানে সবচেয়ে বড় আনন্দ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, অথচ মনে হয় মাত্র কয়েক মিনিট হয়েছে। এই নদী শুধু জল নয়, এটি যেন সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যায়।


 

 

 

 

 

Preview image