মুর্শিদাবাদ জেলার বড়ঞা (Burwan) থানা এলাকায় অবৈধ বালি পাচার চক্রের বিরুদ্ধে বড়সড় সাফল্য পেল জেলা পুলিশ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত তিন মূল পাচারকারী ও দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতরা হলো বহরমপুরের তারাপুরের বাসিন্দা মহম্মদ মনিব আব্দুল্লাহ শেখ, এবং ইসলামপুরের দুই বাসিন্দা মুখলেশ্বর রহমান ও মুজিব রহমান। তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং খনি ও খনিজ পদার্থ (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন (MMDR Act)-এর একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ধৃতরা গোটা জেলায় বিস্তৃত এই অবৈধ বালি ব্যবসার নেটওয়ার্কের প্রধান মডারেটর ও ফেসিলিটেটর হিসেবে কাজ করত।
মুর্শিদাবাদে বালি পাচার চক্রের পর্দাফাঁস: বড়ঞা পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ৩ মূল দালাল, তদন্তে জেলা পুলিশ
বহরমপুর: পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সীমান্তবর্তী এবং নদীমাতৃক জেলা মুর্শিদাবাদে দীর্ঘদিন ধরেই মাফিয়া এবং বালি পাচারকারীদের দাপট নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছিল চরমে। নদীগর্ভ থেকে অবৈধভাবে বালি তুলে তা অন্যত্র পাচার করার এই চক্রটি রুখতে এবার কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ। গোপন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে বড়ঞা থানা (Burwan PS) এলাকায় একটি হাই-প্রোফাইল অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানের ফলস্বরূপ, অবৈধ বালি পাচার নেটওয়ার্কের অত্যন্ত সক্রিয় এবং প্রভাবশালী তিন দালাল তথা ফেসিলিটেটরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ধৃতদের পরিচয় ও গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট
পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, ধৃতদের নাম ও বাসস্থান সুনির্দিষ্টভাবে সনাক্ত করা গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলো: ১. মহম্মদ মনিব আব্দুল্লাহ শেখ—তিনি বহরমপুর থানার অন্তর্গত তারাপুর এলাকার বাসিন্দা। ২. মুখলেশ্বর রহমান—মুর্শিদাবাদের ইসলামপুর থানা এলাকার বাসিন্দা। ৩. মুজিব রহমান—ইনিও ইসলামপুর থানা এলাকার বাসিন্দা।
বড়ঞা থানার পুলিশ গত ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করে (মামলা নম্বর: ১৫৯/২৬)। ধৃতদের বিরুদ্ধে নতুন অপরাধ আইন অর্থাৎ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং খনি ও খনিজ পদার্থ (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন (MMDR Act)-এর সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ধারাগুলোর অধীনে মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এই তিন ব্যক্তি কোনো সাধারণ দিনমজুর বা লরি চালক নয়, বরং তারা এই বিশাল অবৈধ বালি ব্যবসার পর্দার পিছনের মূল চালিকাশক্তি বা "দালাল চক্রের" প্রধান মাথার অংশ। তাদের কাজ ছিল এই বেআইনি সিন্ডিকেটকে মসৃণভাবে পরিচালনা করা এবং আইনি চোখ ফাঁকি দেওয়া।
তদন্তে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য ও মডাস অপারেন্ডি (কাজের পদ্ধতি)
ধৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্তারা জানিয়েছেন যে, মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন ব্লক এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে যে অবৈধ বালি উত্তোলনের সিন্ডিকেট চলছে, তার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত এই তিন জন। তদন্তে জানা গেছে, এদের কাজ ছিল মূলত তিন স্তরের:
টাকা ও লেনদেনের রফা: নদী থেকে অবৈধভাবে তোলা বালি যখন এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বা ভিন রাজ্যে পাচার করা হতো, তখন বিভিন্ন চেকপোস্ট এবং রাস্তায় লরি পার করানোর জন্য লাইন ঠিক করার মূল দায়িত্ব ছিল এদের।
দালালি ও নেটওয়ার্ক পরিচালনা: স্থানীয় স্তরে অবৈধ খাদানের মালিক, ডাম্পার অ্যাসোসিয়েশন এবং বড় বড় বালি মাফিয়াদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করত এই ফেসিলিটেটররা।
প্রশাসনের নজর এড়ানো: লরি বা ডাম্পার চালকদের কোন রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেলে পুলিশের হাত থেকে বাঁচা যাবে, সেই সংক্রান্ত ‘রুট ম্যাপ’ এবং নজরদারির কাজও করত এরা। পুলিশের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে এরা নিজস্ব 'ইনফর্মার' বা তথ্যদাতা নিয়োগ করেছিল।
পুলিশের তদন্তে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, বহরমপুর এবং ইসলামপুরের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তারা উত্তর ও দক্ষিণ মুর্শিদাবাদের একটি বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে এই পাচার নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ব্যাংক লেনদেনের তদন্ত
পুলিশের সাইবার সেল এবং গোয়েন্দা বিভাগ ইতিমধ্যেই ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একাধিক স্মার্টফোন খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বালি পাচারের লভ্যাংশ আদান-প্রদানের জন্য এরা বিভিন্ন অনলাইন পেমেন্ট অ্যাপ এবং বেনামী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করত। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন হতো এই চক্রের মাধ্যমে। কার কার অ্যাকাউন্টে এই টাকা স্থানান্তরিত হতো এবং এই চক্রের পেছনে কোনো বড়সড় আর্থিক পৃষ্ঠপোষক বা 'ফাইন্যান্সার' রয়েছে কি না, তা জানতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের চিন্তাভাবনা করছে জেলা পুলিশ প্রশাসন।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও রাজস্ব ফাঁকি
এই অবৈধ বালি পাচারের ফলে রাজ্য সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। সরকারি নিয়ম মেনে যেখানে বালি খাদানের লিজ বা নিলাম হওয়ার কথা, সেখানে এই মাফিয়ারা কোনো রকম রয়্যালটি না দিয়েই সরকারি সম্পত্তি লুণ্ঠন করছিল। ধৃতরা ভুয়া চালান (Challan) তৈরি করে বা একই চালান বারবার ব্যবহার করে শত শত লরি বালি পাচার করত। এই চক্রের আর্থিক লেনদেনের উৎস খুঁজতে পুলিশ এখন ধৃতদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) খতিয়ে দেখছে। পুলিশের অনুমান, এই ব্যবসার লভ্যাংশ আরও বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির পকেটে পৌঁছেছে।
স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিকাঠামোয় কুপ্রভাব
অবৈধ বালি উত্তোলনের প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে। মাফিয়াদের ভারী ডাম্পার চলাচলের কারণে গ্রামীণ রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় সাধারণ চাষীরা তাদের উৎপাদিত ফসল সঠিক সময়ে বড় বাজারে নিয়ে যেতে পারছেন না। এর ফলে স্থানীয় কৃষিকাজে ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে, বালি উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে অনেক সময় কৃষিজমিতে বালির স্তর পড়ে যাচ্ছে, যা জমির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট করে দেয়। বড়ঞা এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই সিন্ডিকেটের কারণে গ্রামীণ পরিকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশের ওপর কুপ্রভাব ও স্থানীয়দের ক্ষোভ
মুর্শিদাবাদের ভাগীরথী, ভৈরব, জলঙ্গী বা দ্বারকার মতো নদীগুলো থেকে যত্রতত্র এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে বালি তোলার ফলে নদীপাড়ের ভাঙন পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। বর্ষার মরশুমে এই অনিয়ন্ত্রিত বালি তোলার কারণে প্লাবনের আশঙ্কা বহু গুণ বেড়ে যায়। মাটির গঠন দুর্বল হয়ে পড়ায় নদীর সংলগ্ন চাষের জমিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
বড়ঞা এবং সংলগ্ন এলাকার গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল যে, রাতের অন্ধকারে শয়ে শয়ে ওভারলোডেড বালির লরি যাতায়াত করার ফলে গ্রামীণ পিচ রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ভারী গাড়ির কম্পনে রাস্তার পাশের বাড়িঘরে ফাটল দেখা দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, বালি মাফিয়াদের দাপটে সাধারণ মানুষের নদীর ঘাটে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ। পুলিশের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে তাই সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সর্বস্তরের বাসিন্দারা।
আইনি পদক্ষেপ এবং কড়া ধারা প্রয়োগ
ধৃতদের বিরুদ্ধে শুধু সাধারণ চুরির মামলাই নয়, দেশের খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন করার অপরাধে খনি ও খনিজ আইনের (MMDR Act) কঠোর ধারা যুক্ত করা হয়েছে। জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, "আমরা এই চক্রের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে চাই। ধৃতদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে যাতে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য রাঘববোয়ালদেরও গ্রেপ্তার করা যায়।" নতুন আইন তথা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে এই ধরনের সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে সাজের মেয়াদ এবং জরিমানা অনেক বেশি, যা এই ধরনের অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
পুলিশের ভবিষ্যৎ রণকৌশল ও কড়া নজরদারি
বড়ঞা থানার এই সাফল্যের পর মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ জেলার সমস্ত নদীঘাট এবং বালি খাদানগুলোর ওপর নজরদারি আরও জোরদার করেছে। ড্রোন技术的 (Drone Technology) সাহায্যে নদীগর্ভের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং রাতের বেলা আকস্মিক নাকা চেকিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যে সমস্ত রাস্তায় বালির গাড়ি বেশি চলাচল করে, সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, পরিবেশ ধ্বংসকারী কোনো কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না।
political চাপানউতোর
মুর্শিদাবাদে বালি পাচারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যথারীতি political পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় কোনো না কোনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় না থাকলে বছরের পর বছর ধরে এত বড় খনিজ লুণ্ঠন সম্ভব নয়। যদিও পুলিশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক রঙ দেখা হবে না। যারাই আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাজ করবে, তাদের বিরুদ্ধেই কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপসংহার
বড়ঞা থানার ১৫৯/২৬ নম্বর মামলার এই অগ্রগতি মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের সদিচ্ছার এক বড় প্রমাণ। মহম্মদ মনিব আব্দুল্লাহ শেখ, মুখলেশ্বর রহমান এবং মুজিব রহমানের মতো ফেসিলিটেটরদের গ্রেপ্তার করার ফলে সাময়িকভাবে হলেও জেলা জুড়ে অবৈধ বালি পাচারকারীদের বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। তবে এই নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পুলিশকে আরও দীর্ঘমেয়াদী এবং নিচ্ছিদ্র নজরদারি বজায় রাখতে হবে। নদী, পরিবেশ এবং সরকারি রাজস্ব বাঁচাতে এই ধরনের মাফিয়া রাজের অবসান অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষ এখন এটাই আশা করছেন যে, পুলিশ এই তদন্তের জল বহুদূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে এবং মূল হোতাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।