ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজ়েই একটি করে ক্যাচ ফেলেছেন বিরাট কোহলি। তারকা ব্যাটারের এমন ফিল্ডিংয়ে বারবার ভুল নজর কেড়েছে ক্রিকেটমহলের।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের একদিনের সিরিজ়ে ব্যাট হাতে বিরাট কোহলির পারফরম্যান্স মোটের উপর খারাপ ছিল না। তিন ম্যাচ মিলিয়ে ভারতীয় তারকার সংগ্রহ ১৬৮ রান। তবে এই পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে পুরো ছবিটা বোঝা যায় না। কারণ কোহলির মোট রানের বড় অংশই এসেছে সিরিজ়ের প্রথম ম্যাচে। প্রথম ODI-তে দুর্দান্ত ১৩৯ রানের ইনিংস খেলার পর দ্বিতীয় ম্যাচে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ২৯ রান। আর তৃতীয় ODI-তে তো প্রথম বলেই বোল্ড হয়ে রানের খাতাই খুলতে পারেননি তিনি। ফলে সিরিজ়ের শেষ দিকে কোহলির ব্যাটিং নিয়ে কিছুটা আলোচনা হলেও তাঁর ফর্ম নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়নি।
বরং ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে এই ODI সিরিজ়ে বিরাট কোহলিকে নিয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, তা হল তাঁর ফিল্ডিং। দীর্ঘদিন ধরে দুর্দান্ত ফিল্ডার হিসেবে পরিচিত কোহলি তিন ম্যাচের প্রতিটিতেই একটি করে ক্যাচ ফেলেছেন। একই সিরিজ়ে পরপর তিন ম্যাচে ক্যাচ মিস করা বিরাট কোহলির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক ঘটনা। আর সেই কারণেই তাঁর ফিটনেস এবং ফিল্ডিং নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সিরিজ়ের প্রথম ম্যাচ থেকেই এই ভুলের শুরু। ওয়েস্ট ইন্ডিজ় প্রথমে ব্যাট করার সময় ইনিংসের ৪৯তম ওভারে আমির জ্যাঙ্গু ডিপ স্কোয়ার লেগের দিকে একটি শট খেলেছিলেন। সেই সময় বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করছিলেন বিরাট কোহলি। বলটির দিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ডাইভ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলটি তাঁর হাতে জমা হয়নি। শুধু ক্যাচই মিস করেননি কোহলি, বলটিও আটকাতে পারেননি। ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের ব্যাটারের শট থেকে চার রান চলে আসে। প্রথম ম্যাচেই তাঁর ফিল্ডিং নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অন্যতম কারণ ছিল এই ঘটনা।
তবে প্রথম ম্যাচের ভুলকে হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখা যেত। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে ফের ক্যাচ মিস করায় বিষয়টি অন্য মাত্রা পায়। এবারও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সুযোগ নষ্ট করেন কোহলি। নীতিন ধীরের বলে শর্ট মিড-অনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় অধিনায়ক শাই হোপের ক্যাচের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বলটি কিছুটা জোরে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু বিরাট কোহলির মতো অভিজ্ঞ ফিল্ডারের কাছ থেকে সাধারণত এই ধরনের ক্যাচ ধরে নেওয়ার প্রত্যাশাই থাকে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সেই সময় শাই হোপ মাত্র ২৯ রানে ব্যাট করছিলেন। ক্যাচটি ধরা পড়লে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় বড় ধাক্কা খেতে পারত। কিন্তু জীবন ফিরে পেয়ে হোপ পরবর্তীতে নিজের ইনিংসকে বড় করেন এবং শতরানও করেন। অর্থাৎ কোহলির মিস করা ক্যাচটি ম্যাচের পরিস্থিতির উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের কাছ থেকে এমন ভুল যে দলের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, এই ঘটনাই তার বড় উদাহরণ।
দ্বিতীয় ম্যাচের পরও অবশ্য কোহলির ফিল্ডিং নিয়ে খুব বেশি আতঙ্ক তৈরি হয়নি। কারণ ক্রিকেটে ক্যাচ মিস হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের সেরা ফিল্ডাররাও কখনও কখনও সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। কিন্তু তৃতীয় ODI-তেও যখন একই ধরনের ঘটনা ঘটল, তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
তৃতীয় ম্যাচে ফের ক্যাচের সুযোগ পেয়েছিলেন বিরাট কোহলি। গুরনুর ব্রারের বলে ব্যাটিং করছিলেন আমির জ্যাঙ্গু। তিনি কাট শট খেলেছিলেন। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে থাকা কোহলির কাছে বলটি আসে। কিন্তু এবারও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। বল তাঁর হাতে এলেও ক্যাচটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি ভারতীয় তারকা। সেই সময় আমির জ্যাঙ্গু ৩৫ রানে ব্যাট করছিলেন।
একই সিরিজ়ে একই ফিল্ডারের পরপর তিন ম্যাচে একটি করে ক্যাচ মিস করা নিঃসন্দেহে নজর কাড়ার মতো ঘটনা। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্রথম ও তৃতীয় ম্যাচের ক্ষেত্রে আমির জ্যাঙ্গুর সঙ্গেও এই ঘটনাগুলির যোগ রয়েছে। প্রথম ম্যাচে তাঁর শট থেকেই কোহলির ক্যাচ মিস হয়েছিল, তৃতীয় ম্যাচেও তাঁর ক্যাচ ধরতে পারেননি কোহলি। যদিও পরে জ্যাঙ্গুকে রান আউট করে দেন ভারতীয় তারকা। অর্থাৎ ক্যাচ মিসের পর শেষ পর্যন্ত তাঁকে রান আউট করে কিছুটা ক্ষতিপূরণ করেন কোহলি।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—হঠাৎ কী হল বিরাট কোহলির ফিল্ডিংয়ে?
বিরাট কোহলি শুধু বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটারই নন, তাঁর ফিল্ডিং দক্ষতার জন্যও দীর্ঘদিন ধরে প্রশংসিত। কেরিয়ারের শুরু থেকেই তিনি মাঠে অত্যন্ত সক্রিয় এবং আগ্রাসী ফিল্ডার হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ক্যাচ নেওয়া, দ্রুত বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং রান আটকানোর ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ভারতীয় দলের জন্য বহুবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই একই সিরিজ়ে তিন ম্যাচে তিনটি ক্যাচ মিস করা স্বাভাবিকভাবেই নজরে এসেছে।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। শুধুমাত্র তিনটি ক্যাচ মিসের ভিত্তিতে বিরাট কোহলির ফিটনেস নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ঠিক হবে না। ক্যাচ মিসের পিছনে বলের গতি, আলো, মাঠের অবস্থান, বাতাস, শরীরের ভারসাম্য এবং প্রতিক্রিয়ার সময়—একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে। ফলে এই তিনটি ভুলকে সরাসরি শারীরিক ফিটনেসের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করার আগে আরও তথ্য প্রয়োজন।
তবে পরপর তিন ম্যাচে একই ধরনের ভুল হওয়ায় প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে বিরাট কোহলি এমন একজন ক্রিকেটার, যাঁর কাছ থেকে ফিল্ডিংয়ে সর্বোচ্চ মানের পারফরম্যান্সের প্রত্যাশা থাকে। তাঁর ক্ষেত্রে একটি ক্যাচ মিসও তাই সাধারণ আলোচনার বিষয় হয়ে যায়। কারণ তিনি বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এই সিরিজ়ে তাঁর ব্যাটিংয়ের দিকে তাকালে অবশ্য ছবিটা কিছুটা আলাদা। প্রথম ODI-তে ১৩৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংস দেখিয়েছে যে রান করার ক্ষমতা এখনও তাঁর মধ্যে যথেষ্ট রয়েছে। সিরিজ়ের দ্বিতীয় ম্যাচে ২৯ রান এবং তৃতীয় ম্যাচে প্রথম বলেই আউট হওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কিন্তু তিন ম্যাচে ১৬৮ রান তাঁর সামগ্রিক সিরিজ়ের পরিসংখ্যানকে খারাপ বলা যায় না।
বিশেষ করে প্রথম ম্যাচের ১৩৯ রান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ইনিংসের মাধ্যমে কোহলি দেখিয়েছিলেন, বড় মঞ্চে এখনও তিনি ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তাই এই সিরিজ়ে তাঁর ব্যাটিং নিয়ে বড় কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পুরো পারফরম্যান্সকে বিবেচনা করা জরুরি।
অন্যদিকে ফিল্ডিংয়ের বিষয়টি একটু আলাদা। ক্রিকেটের আধুনিক যুগে একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে ব্যাটিং বা বোলিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও সর্বোচ্চ মানের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করা হয়। বিশেষ করে ODI ক্রিকেটে একটি ক্যাচ বা একটি রান বাঁচানো ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে। শাই হোপের ক্যাচ মিসের ঘটনাটি তারই উদাহরণ। ২৯ রানে থাকা ব্যাটারকে জীবন দিয়ে পরে শতরান করতে দেখা যায়। ফলে ক্যাচ মিসের মূল্য কতটা হতে পারে, তা স্পষ্ট।
তৃতীয় ম্যাচে আমির জ্যাঙ্গুর ক্যাচ মিসের পরও অবশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের ব্যাটার শেষ পর্যন্ত ৬৭ রান করে আউট হন। আর কোহলি নিজেই পরে তাঁকে রান আউট করেন। ফলে তৃতীয় ম্যাচের ভুলের প্রভাব দ্বিতীয় ম্যাচের মতো বড় হয়নি। তবুও একই সিরিজ়ে ধারাবাহিকভাবে ক্যাচ মিস করার বিষয়টি ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর এড়ায়নি।
এখন প্রশ্ন, সামনে বড় ম্যাচ ও বড় টুর্নামেন্টে বিরাট কোহলির ভূমিকা কী হতে চলেছে? ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাট হাতে তাঁর অভিজ্ঞতা, চাপের মুহূর্ত সামলানোর ক্ষমতা এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার রেকর্ড তাঁকে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার করে রেখেছে। ফলে কয়েকটি ক্যাচ মিসের কারণে তাঁর সামগ্রিক মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।
তবে ফিল্ডিংয়ের জায়গায় উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্ট নিশ্চয়ই নজর রাখবে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতায় একটি ক্যাচ মিসও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই কোহলির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের কাছ থেকে আবারও আগের সেই ক্ষিপ্রতা ও নির্ভরযোগ্য ফিল্ডিং প্রত্যাশা করতেই পারেন সমর্থকেরা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে এই সিরিজ় তাই বিরাট কোহলির জন্য এক অদ্ভুত মিশ্র অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল। ব্যাট হাতে মোট ১৬৮ রান, যার মধ্যে প্রথম ম্যাচেই ১৩৯। কিন্তু ফিল্ডিংয়ে তিন ম্যাচে তিনটি ক্যাচ মিস। তৃতীয় ম্যাচে আবার প্রথম বলেই ব্যাটিংয়ে ফিরে যেতে হয়েছে সাজঘরে। অর্থাৎ ব্যাটিংয়ের চেয়ে ফিল্ডিং নিয়েই সিরিজ়ের শেষে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে।
কোহলির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এটাই—এই ক্যাচ মিস কি শুধুই সাময়িক ভুল, নাকি তাঁর ফিল্ডিংয়ের ধারাবাহিকতায় সত্যিই কোনও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে? তিনটি ম্যাচের ঘটনা সামনে রেখে ক্রিকেট মহলে আলোচনা শুরু হলেও এর উত্তর পেতে আরও ম্যাচ দেখতে হবে। কারণ একজন ক্রিকেটারের ফর্ম বা ফিটনেস বিচার করতে একটিমাত্র সিরিজ় যথেষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—বিরাট কোহলির মতো তারকার প্রতিটি ভুলই স্বাভাবিকভাবেই বেশি আলোচনায় আসে। তিনি যখন দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন, তখন যেমন প্রশংসা হয়, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যাচ ফেললে প্রশ্নও ওঠে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচে পরপর ক্যাচ মিসের ঘটনা তাই ভারতীয় দলের সমর্থকদেরও ভাবাচ্ছে।
ব্যাটিংয়ে কোহলি এখনও ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা রাখেন—প্রথম ম্যাচের ১৩৯ রান তার প্রমাণ। কিন্তু ফিল্ডিংয়ে তাঁকে দ্রুত নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে হবে। সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এবং বড় প্রতিযোগিতা থাকায় ভারতীয় দলের জন্য তাঁর ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজ় সিরিজ় থেকে কোহলির জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে—ব্যাট হাতে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও ফিরিয়ে আনতে হবে পুরনো ধার।