টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলা নিয়ে প্রাক্তন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে একহাত নিয়েছেন মহম্মদ সালাউদ্দিন। বাংলাদেশের সহকারী কোচের দাবি, মিথ্যা কথা বলে ক্রিকেটারদের স্বপ্নভঙ্গ করেছেন নজরুল।টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলা নিয়ে প্রাক্তন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন বাংলাদেশের সহকারী কোচ মহম্মদ সালাউদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনা না করেই ক্রিকেটারদের স্বপ্নকে হত্যা করেন নজরুল। তাঁর সিদ্ধান্তের ফলে দুই ক্রিকেটার মানসিক ভাবে কোমায় চলে গিয়েছিলেন বলে দাবি তাঁর।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত বিসিবি বা ক্রিকেটারদের ছিল না। প্রাক্তন ক্রীড়া উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুললেন লিটন দাসদের সিনিয়র সহকারী কোচ। বাংলাদেশের প্রাক্তন ক্রীড়া উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ক্রিকেটারদের স্বপ্নভঙ্গ করার অভিযোগও করেছেন সালাউদ্দিন। তিনি বলেছেন, ‘‘একটা ছেলে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যায়। হয়তো সে ২৭ বছর ধরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বেড়ে উঠেছে। কঠোর পরিশ্রম করেছে। আর একজন এক সেকেন্ডে তার স্বপ্ন ধ্বংস করে দিল। যদি এটা জাতীয় স্বার্থে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত হয়, তা হলে ক্রিকেটারেরা ত্যাগ স্বীকার করতেই পারে। কিন্তু যদি ক্ষতির কথা বলা হয়, তা হলে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কথাই বলব।’’
তিনি আরও বলেছেন, ‘‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে ছেলেদের স্বপ্ন ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দলের অন্তত দু’জন ক্রিকেটার মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কোচ হিসাবে জানি, প্রায় পাঁচ দিন ওরা মানসিক কোমার মধ্যে ছিল। নিজেদের সামলাতে পারছিল না। আমরা যে ওদের আবার মাঠে ফেরাতে পেরেছি, সেটাই যথেষ্ট।’’
নজরুলের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘জানি না, এক জন শিক্ষক কী করে এমন ডাহা মিথ্যে কথা বলতে পারেন! আমিও একজন শিক্ষক। শিক্ষকেরা এত মিথ্যে বলেন না। অথচ উনি প্রকাশ্যে নির্বিকার ভাবে মিথ্যে বলে গেলেন। সত্যি বলতে, আমি ভাবতেই পারি না। এ রকম করলে ছাত্রদের মুখ দেখাব কী করে? উনি তো আগের অবস্থানের পুরো বিপরীত অবস্থান নিলেন।’’ সালাউদ্দিন আরও বলেছেন, ‘‘উনি তো শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক কী করে এমন মিথ্যা বলতে পারেন! আমাদের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কী ভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব বলুন তো? প্রথমে এক কথা বললেন। তার পর সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বললেন!’’
উল্লেখ্য, গত ২২ জানুয়ারি নজরুল বলেছিলেন, ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের। পরে ১০ ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন, বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভাবে বিসিবি এবং ক্রিকেটারদের। সালাউদ্দিনের দাবি, বোর্ড এবং ক্রিকেটারদের সঙ্গে নজরুল যে বৈঠক করেছিলেন, তা-ও লোক দেখানো ছিল। তিনি বলেছেন, ‘‘উনি সিদ্ধান্ত নিয়েই বৈঠকে এসেছিলেন। ক্রিকেটারদের বা বোর্ড কর্তাদের মতামত দেওয়ার কিছু ছিল না। ছেলেরা সকলে চুপ করে বসেছিল। কেউ কিছু বলার মতো জায়গাতেই ছিল না। শুধু নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। কারণ, ওই বৈঠক ছিল সিদ্ধান্ত জানানোর। সিদ্ধান্ত গ্রহণের নয়।’’
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিসিবি এবং ক্রিকেটারেরা একমত ছিলেন না, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন সালাউদ্দিন। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশের নবনির্বাচিত তারেক রহমান সরকার শপথ গ্রহণ করেছে। তার তিন দিন পরেই নজরুলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সালাউদ্দিন।
বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলে হঠাৎ করেই তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠেছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। এই সিদ্ধান্ত আদৌ কি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ক্রিকেটারদের ছিল, নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে তা কার্যকর করা হয়েছিল—এই প্রশ্ন ঘিরেই উত্তাল পরিস্থিতি। লিটন দাসদের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন সরাসরি প্রাক্তন ক্রীড়া উপদেষ্টা নজরুলের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, ক্রিকেটারদের স্বপ্ন এক মুহূর্তে ভেঙে দেওয়া হয়েছে, অথচ পরে সেই দায় এড়াতে ভিন্ন সুরে কথা বলা হয়েছে।
এই বিতর্ক শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জড়িত তরুণ ক্রিকেটারদের বহু বছরের সাধনা, মানসিক স্থিতি, জাতীয় স্বার্থ এবং ক্রীড়া প্রশাসনের স্বচ্ছতার সঙ্গে।
গত ২২ জানুয়ারি নজরুল প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের। অর্থাৎ এটি ছিল রাষ্ট্রীয় স্তরের একটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে, ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি জানান—বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে বিসিবি এবং ক্রিকেটারদের।
এই দুই বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। সালাউদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, পরে সেই দায় বোর্ড ও ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, বোর্ড ও ক্রিকেটারদের সঙ্গে যে বৈঠক হয়েছিল, সেটি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা; সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল।
সালাউদ্দিন আবেগঘন ভাষায় বলেছেন, “একটা ছেলে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যায়। হয়তো সে ২৭ বছর ধরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বড় হয়েছে।” এই বক্তব্য কেবল অলঙ্কার নয়—এটি প্রতিটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের বাস্তবতা। ছোটবেলা থেকে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখা, কঠোর অনুশীলন, আঞ্চলিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো—সবকিছুর চূড়ান্ত লক্ষ্যই বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে খেলার সুযোগ জীবনে এক বা দুইবারই আসে। সেই সুযোগ হঠাৎ কেড়ে নেওয়া হলে মানসিক ধাক্কা স্বাভাবিক। সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, দলের অন্তত দু’জন ক্রিকেটার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং প্রায় পাঁচ দিন “মানসিক কোমা”-র মতো অবস্থায় ছিলেন। কোচিং স্টাফের প্রধান কাজ তখন হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের মানসিকভাবে পুনরুদ্ধার করা।
সালাউদ্দিন স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি সিদ্ধান্তটি প্রকৃতপক্ষে জাতীয় স্বার্থে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে ক্রিকেটারেরা ত্যাগ স্বীকার করতেই পারেন। কিন্তু যদি ক্ষতির কথা বলা হয়, তবে সেটি ব্যক্তিগত ক্ষতি—ক্যারিয়ার, স্বপ্ন, মানসিক স্থিতি—সব মিলিয়ে এক গভীর আঘাত।
এখানেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ক্রীড়াবিদরা বহুবার ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু সেই ত্যাগের ব্যাখ্যা যদি অস্পষ্ট হয় বা পরে পরিবর্তিত হয়, তবে তা আস্থার সংকট তৈরি করে।
সালাউদ্দিন নজরুলের শিক্ষক পরিচয়কে সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, “এক জন শিক্ষক কী করে এমন ডাহা মিথ্যে কথা বলতে পারেন!” তাঁর মতে, একজন শিক্ষক সমাজে নৈতিকতার প্রতীক। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হলে তাঁর কথাবার্তায় স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা থাকা উচিত।
এই বক্তব্য প্রশাসনিক বিতর্ককে নৈতিক বিতর্কে রূপ দিয়েছে। কারণ এখানে কেবল একটি সিদ্ধান্ত নয়, ব্যক্তির সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সালাউদ্দিনের দাবি, বোর্ড ও ক্রিকেটারদের সঙ্গে যে বৈঠক হয়েছিল, সেটি ছিল সিদ্ধান্ত জানানো মাত্র। সেখানে মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ক্রিকেটারেরা নীরবে বসে ছিলেন, মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলেন—এমনই চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি।
যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। ক্রীড়া প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশের নবনির্বাচিত তারেক রহমান সরকার শপথ গ্রহণ করেছে। তার কয়েক দিনের মধ্যেই সালাউদ্দিনের এই বিস্ফোরক মন্তব্য সামনে আসে। ফলে অনেকে মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও এই অভিযোগের সময়কাল তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে সালাউদ্দিনের বক্তব্যের মূল সুর রাজনৈতিক নয়; বরং ক্রিকেটারদের মানসিক ক্ষতি ও প্রশাসনিক অসঙ্গতি নিয়ে।
আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞানে মানসিক স্বাস্থ্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। বড় টুর্নামেন্টের আগে প্রস্তুতি শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও জরুরি। বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত হঠাৎ এলে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা লাগে।
সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, কোচিং স্টাফের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল খেলোয়াড়দের আবার মাঠে ফেরানো। এই মানসিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সহজ নয়।
যদিও বিসিবির তরফে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সীমিত, তবে বোর্ডের ভেতরে অসন্তোষের ইঙ্গিত মিলছে। বোর্ডের সদস্যদের একাংশ মনে করেন, সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় ক্রিকেট প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্ন তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর টুর্নামেন্টে অংশ না নেওয়া মানে র্যাঙ্কিং, স্পনসরশিপ ও আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে।
এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো আস্থার সংকট। ক্রিকেটাররা যদি মনে করেন তাঁদের মতামত গুরুত্ব পায় না, তবে ভবিষ্যতে প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন—
স্বচ্ছ তদন্ত
সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার স্পষ্ট ব্যাখ্যা
ক্রিকেটারদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা
মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বৃদ্ধি
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি ক্রীড়া ইস্যু নয়; এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও ক্রিকেটারদের স্বপ্নের প্রশ্ন। সালাউদ্দিনের অভিযোগ প্রাক্তন ক্রীড়া উপদেষ্টার বিরুদ্ধে গুরুতর। এখন প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক স্পষ্টতা।
ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়; এটি একটি জাতির আবেগ। সেই আবেগের সঙ্গে জড়িত থাকে লক্ষ মানুষের আশা। সিদ্ধান্ত যাই হোক, তা যেন স্বচ্ছ ও সম্মানজনক হয়—এই প্রত্যাশাই এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের।