২১ নভেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের সব জেলায় থাকছে মাঝারি থেকে ভারী কুয়াশা। দিনে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও রাতে পারদ নামবে উল্লেখযোগ্যভাবে। কুয়াশার কারণে রাতের দৃশ্যমানতা কমবে, এবং আগামী সপ্তাহ থেকে আবহাওয়া থাকবে শুষ্ক
শীতকাল ক্যালেন্ডারের হিসেবে শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু প্রকৃতি যেন তার আগমনী বার্তা আরও জোরালো ভাবে জানিয়ে দিয়েছে আগে থেকেই। বিশেষ করে নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাপমাত্রার গ্রাফ যে হারে নেমে গিয়েছে, তা গত এক দশকের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। আবহবিদেরা বলছেন—এ বছর শীতের দাপট শুধু তাড়াতাড়িই শুরু হয়নি, শুরুতেই যেন পূর্ণ শক্তিতে আবির্ভাব ঘটিয়েছে। ‘সুপর্ণা’, আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা ভারতের সামগ্রিক আবহাওয়া পরিস্থিতি, তাপমাত্রার পরিবর্তন, কুয়াশার আগমন, বায়ুদূষণের বৃদ্ধি, দক্ষিণাঞ্চলের বৃষ্টির সম্ভাবনা—সব কিছুই বিশদে খতিয়ে দেখব।
নভেম্বর মাস সাধারণত উত্তর ভারতের প্রারম্ভিক শীতের সংকেত দেয়। দিন ছোট হতে থাকে, রাত বাড়ে, আর তাপমাত্রার পারদ নামার প্রবণতাও স্পষ্ট হয়। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। দিল্লির মৌসম ভবনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, নভেম্বরের প্রত্যেক দিনই দেশের প্রায় সব রাজ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচে নেমেছে। শুধু উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি নয়—মধ্য ভারত, পশ্চিম উপকূল, পূর্ব ভারত—সব জায়গাতেই ঠান্ডার ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
এমনকি নভেম্বরের প্রথমার্ধেই তাপমাত্রার এমন গ্রাফ আগে খুব কম দেখা গেছে। মৌসম ভবন জানাচ্ছে—কোনও কোনও দিনে দেশের কিছু অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম নেমে গিয়েছে। এটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী।
এই আকস্মিক এবং অস্বাভাবিক ঠান্ডার কারণ হিসেবে বাতাসের গতিপ্রবাহ, পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সক্রিয়তা, তুষারপাতের আগাম উপস্থিতি এবং উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত ঠান্ডা বায়ুকে দায়ী করা হচ্ছে।
উত্তর ভারত সবসময়ই শীতপ্রবণ। কিন্তু এ বছর নভেম্বরেই তাপমাত্রা এমনভাবে নিচে নেমেছে যে, আবহবিদেরা বলছেন—এটি আগামী বছরের শীত প্রবল হওয়ার সংকেত বহন করছে।
রাজধানী দিল্লি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ঠান্ডা নভেম্বর কাটাচ্ছে। ১৫ নভেম্বর থেকে দিল্লিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে গেছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।
অনেক দিনে তাপমাত্রা ছিল ৯–১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস
সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৪–২৬ ডিগ্রি—যা স্বাভাবিকের তুলনায় কম
উত্তর থেকে প্রবল ঠান্ডা হাওয়ার প্রবাহের ফলে দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য বেড়ে গেছে
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে দিল্লির শীত আরও কঠিন হবে। যে ট্রেন্ড নভেম্বরের মাঝামাঝি দেখা যাচ্ছে, তা শীতের তীব্রতা বাড়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে বরফপাত শুরু হয়ে গেছে নভেম্বরের প্রথম দিক থেকেই। কোথাও কোথাও ২–৩ ফুট বরফ সঞ্চিত হয়েছে। বরফপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আরও দ্রুতগতিতে সমতলে নেমে আসছে।
এই রাজ্যগুলিতে সকাল-বিকেল শিরশিরে ঠান্ডা এবং রাত্রিতে কনকনে শীত। গ্রামাঞ্চলের মাঠ-ঘাটে কুয়াশার চাদর ভোররাতেই নেমে যাচ্ছে।
এ বছর শীতের বিশেষ লক্ষণ—মধ্য ভারত পর্যন্ত ঠান্ডার দাপট আগেভাগে পৌঁছে গেছে।
সাধারণত মুম্বইয়ের শীত মৃদু হয়। তাপমাত্রা ২০-এর নিচে খুব কমই নামে। কিন্তু এই নভেম্বর—
প্রতিদিনই তাপমাত্রা ৩–৪ ডিগ্রি কম
২১ নভেম্বরের কাছাকাছি দিনে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস
এটি মুম্বইয়ের জন্য বিরল ঘটনা।
এই অঞ্চলগুলোতেও শীতের দাপট বাড়ছে। সকালে শিশির, সন্ধ্যায় ঠান্ডা বাতাস এবং রাতের ঢের নিচে নামা তাপমাত্রা শীতের অনুভূতি আরও জোরালো করছে।
১৮ থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের সব জেলাতেই থাকবে মাঝারি থেকে ভারী কুয়াশা।
সকালে তাপমাত্রা খুব কমবে না
কিন্তু রাতে উল্লেখযোগ্য শীত পড়বে
কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যাবে
আগামী সপ্তাহ থেকে বৃষ্টি নেই—শুষ্ক আবহাওয়া
আবহবিদেরা বলছেন—শীত আসতে বাংলায় দেরি হয়, কিন্তু একবার এলেই স্থায়ী হয়। এ বছর যেভাবে কুয়াশা আগেভাগে দেখা দিচ্ছে, তাতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই কলকাতা-সহ বাংলা কনকনে ঠান্ডার দিকে এগোবে।
শীতের শুরু যেমন দিল্লিকে কাঁপিয়েছে, তেমনই দূষণের মাত্রাও বিপদজনক হয়ে উঠেছে।
দিল্লির বাতাস এখন ‘Very Poor’ থেকে ‘Severe’ ক্যাটাগরিতে উঠেছে
ঠান্ডা হাওয়া দূষণকে নিচে আটকে রাখায় পরিস্থিতি আরও খারাপ
অনেকেই হাঁপিয়ে উঠছেন, শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়ছে
শিশু, বয়স্ক, অ্যাজমা রোগীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে
শীতে বাতাসের গতি কম থাকে। ফলে দূষিত কণাগুলি ওপরে উঠতে পারে না। উল্টো, বাতাস স্থির থাকায় বিষাক্ত কণাগুলি নিচু স্তরে আটকে থাকে—মানুষের নিঃশ্বাসে প্রবেশ করে।
যখন উত্তর-মধ্য-পূর্ব ভারত কাঁপছে ঠান্ডায়, তখন দক্ষিণ ভারতে শুরু হয়েছে বর্ষার প্রভাব।
২৪ নভেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে বজ্রপাত
স্থানীয় বন্যার সম্ভাবনা
শহরাঞ্চলে জলজট
আগামী শনিবার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি।
সমুদ্রের উপর নিম্নচাপ তৈরি হওয়ায় ঝোড়ো বাতাস এবং বৃষ্টির যোগ রয়েছে।
ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য শীতকালে সবচেয়ে প্রকট হয়।
উত্তর ভারত—হিমশীতল
মধ্য ভারত—শুরুতেই ঠান্ডা
পূর্ব ভারত—কুয়াশার আধিপত্য
দক্ষিণ ভারত—ঝোড়ো বৃষ্টি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বহুমাত্রিক আবহাওয়ার কারণ
জলবায়ু পরিবর্তন
পশ্চিমী ঝঞ্ঝার বারবার আগমন
বরফপাতের আগাম শুরু
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তন
আর্দ্রতার ওঠানামা
মৌসম ভবন বলছে— আগামী ৫ দিনে
তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকবে
বেশিরভাগ এলাকায় দিন-রাত ঠান্ডা অনুভব বাড়বে
কুয়াশা আরও বিস্তার লাভ করবে
উত্তর-পশ্চিম ভারতে শীতের তীব্রতা জোরালো হবে
বাংলার আবহাওয়া শুষ্কই থাকবে
ডিসেম্বরে তাপমাত্রা আরও নামবে।
জানুয়ারি হবে সবচেয়ে ঠান্ডা মাস—গত বছরের তুলনায় বেশি শীত হতে পারে।
শীত যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনই কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে—
গ্রামাঞ্চলে সকালবেলার কুয়াশায় যাতায়াতে সমস্যা
কৃষিজ ফসলের উপর প্রভাব
অসহায় মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি
ঠান্ডার সঙ্গে দূষণ যুক্ত হলে শ্বাসকষ্ট বাড়ে
দক্ষিণে বৃষ্টির জলজট
এ বছরের শীত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একসঙ্গে আলাদা আলাদা রূপে দেখা দিচ্ছে। কোথাও প্রচণ্ড ঠান্ডা, কোথাও কুয়াশা, কোথাও আবার ঝোড়ো বৃষ্টি। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়—এ বার শীত আগেভাগেই নিজের দাপট দেখাতে শুরু করেছে।
বাংলায় কুয়াশার চাদর বিছিয়ে শীতের আগমন নিশ্চিত করছে, আর উত্তর ভারত জানিয়ে দিচ্ছে—এ বছর শীতের খেলা জমবেই।
বাংলায় কুয়াশার চাদর বিছিয়ে শীতের আগমন নিশ্চিত করছে, আর উত্তর ভারত জানিয়ে দিচ্ছে—এ বছর শীতের খেলা জমবেই। প্রকৃতির এই রূপান্তর শুধু তাপমাত্রায় নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা পরতে তার প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ভোরের আলো ফুটতেই নদী-খাল-বিল, মাঠ-ঘাট আর শহরের অলিগলিতে নেমে আসা দুধসাদা কুয়াশা একদিকে যেমন প্রকৃতির রূপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তাতে বাড়ছে যাতায়াতের ঝুঁকিও। বিশেষ করে গ্রামের কাঁচা পথ এবং জাতীয় সড়কগুলিতে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় গাড়িচালকদের অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন পড়ছে।
বাংলার আবহবিদরা জানাচ্ছেন, শুষ্ক বায়ু এবং রাতের তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পাওয়ার কারণেই এ বছর কুয়াশার পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। সাধারণত ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে যে কুয়াশা দেখা যায়, তা এ বছরই নভেম্বরের শেষ দিক থেকেই ঘন হতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আগাম কুয়াশার পেছনে রয়েছে বিহার–ঝাড়খণ্ডের দিক থেকে প্রবাহিত উত্তর-পশ্চিমী শুষ্ক বাতাস। এই বাতাস আর্দ্রতাকে দ্রুত শোষণ করে নেয়, ফলে রাতের শেষে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা এতটাই নিচে নেমে যায় যে জলীয়বাষ্প ছোট ছোট কণায় রূপান্তরিত হয়ে কুয়াশা তৈরি করে।
এদিকে উত্তর ভারত ইতিমধ্যেই কঠোর শীতের কবলে। রাজধানী দিল্লি, হরিয়ানা, পঞ্জাব এবং হিমাচলপ্রদেশ—সব জায়গাতেই নভেম্বরের শেষে তাপমাত্রার পতন স্পষ্ট। বাজার-দোকানপাটে সন্ধ্যা নেমেই লোকজনের ভিড় কমে যায়, কারণ রাতের কনকনে ঠান্ডা গায়ে লাগতেই মানুষ দ্রুত ঘরে ফিরতে বাধ্য হন। দিল্লিতে বায়ুদূষণের মাত্রা শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ঠান্ডা বাতাস দূষিত কণাগুলোকে মাটির কাছে আটকে রাখায় শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা বাড়ছে মানুষের। স্কুলে খোলামেলা খেলাধুলা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক জায়গায়, এবং চিকিৎসকেরা বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের যত্নবান হতে বলছেন।
মধ্য ভারতেও শীতের দাপট ক্রমে বাড়ছে। নাগপুর, ভোপাল, ইন্দোরের মতো শহরগুলোতে রাতের পারদ স্বাভাবিকের ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমছে। সাধারণত মধ্য ভারতে ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত শীত তেমন দেখা যায় না, কিন্তু এ বছর নভেম্বরেই গায়ে চাদর জড়ানোর মতো ঠান্ডা অনুভব করছেন সেখানকার বাসিন্দারা।
সব মিলিয়ে গোটা দেশজুড়ে এ বার শীতের যে চেহারা দেখা যাচ্ছে, তা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। আবহবিদেরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বরফপাতের আগাম শুরু এবং বায়ুর চলাচলের অস্বাভাবিকতার কারণে শীতের রূপান্তর আরও ঘন ঘন ও অনিয়মিত হবে ভবিষ্যতে। তবে আপাতত দেশের মানুষ শীতের স্বাদ পুরোপুরি উপভোগ করতে প্রস্তুত—কেউ নতুন সোয়েটার কিনছেন, কেউ গরম চায়ের দোকানে ভিড় করছেন, আবার কেউবা ছুটির পরিকল্পনা করছেন পাহাড়ের দিকে। শীতের এই আমেজ যত দিন থাকবে, তত দিনই মানুষের মনেও থাকবে উৎসবের ছোঁয়া।