হাকিমপুর বাজারে কামরুল গাজির হোটেলের বিক্রি হঠাৎই বেড়ে গেছে। দুপুর হলেই তিনি সাইকেলে খাবারের ব্যাগ ঝুলিয়ে বিএসএফ গেট পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন বাংলাদেশিদের অস্থায়ী শিবিরের সামনে। আজ শুরু হল তাঁর এই বাড়তি সরবরাহের প্রথম দিন
হাকিমপুরের সীমান্ত—যেখানে ভারত ও বাংলাদেশের মাঝের কাঁটাতারের ফাঁকে, ধুলোভরা রাস্তার ধারে, ইট-বালির স্তূপের পাশে গাদাগাদি করে বসে আছে এক সমুদ্রমানব-জমায়েত। নামহীন, পরিচয়হীন, রাষ্ট্রহীন মানুষেরা। হাঁটু জলে ডুবে থাকা মাঠ, ফাঁকা জায়গা, রাস্তার দু’ধার—যেখানে জায়গা পেয়েছে, সেখানেই বসে পড়েছে এই বিশাল জনসমাবেশ। বহু পরিবার, শিশু, কিশোর-কিশোরী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা—সবার চোখে এক ধরনের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা।
তাঁরা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’—এই শব্দবন্ধ তাঁরা নিজেরাই ব্যবহার করছেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে। কিন্তু কাগজে-কলমে তাঁদের এই পরিচয় কেউই স্বীকার করছে না। বিএসএফ করতে পারে না, পুলিশও নয়। অথচ বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে—এই মানুষগুলো কোনও দেশেরই নাগরিকত্বের সুরক্ষায় নেই। এক অদ্ভুত রাষ্ট্রহীন অস্তিত্বে তাঁরা দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন খোলা আকাশের নিচে, পেটের ক্ষুধায়, চোখের দুশ্চিন্তায়, আর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগেই। স্থানীয় বাচ্চু সর্দারের কথা শোনার পরে সাংবাদিকরা ছুটে যান বিএসএফের চেকপোস্টে। সেখানে প্রশ্ন আসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু নিয়ে—কাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, আর কাদের আবার ‘থেকে যেতে’ বলা হচ্ছে? এই প্রশ্নের কোনও সরাসরি উত্তর পাওয়া যায়নি। বরং সাক্ষাৎকার নিতেই কথোপকথন থেমে যায়। বিএসএফ আধিকারিকেরা সতর্ক হয়ে জানান—“রাজনীতির সঙ্গে বিএসএফের কোনও লেনদেন নেই। নির্দেশ যা আসে, আমরা সেটুকুই করি।”
তবে নির্দেশ কার কাছ থেকে আসে? সাংবাদিকের এই প্রশ্নে সাব-ইন্সপেক্টর ক্ষণিক থেমে বলেন—
“সবই তো জানেন। নির্দেশ এলে (কেন্দ্রীয়) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকেই আসে।”
কিন্তু ঠিক কী নির্দেশ? সেই প্রশ্নে এগোতে চান না কেউই। কর্তব্যরত জওয়ানরা বলেন—ওদের কাছে সরাসরি কোনও নির্দেশ আসে না। যা আসে, তা আসে উচ্চপর্যায়ের অফিসারদের কাছে। তাঁদের কাজ শুধু নিয়ম মেনে পুশব্যাক বা ‘রিটার্নিং প্রোসিডিউর’ সম্পন্ন করা।
অর্থাৎ, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর নিয়মকানুন কী হবে, তার খুঁটিনাটি জানতে চাইলেও বিএসএফ কথা বলছে না। বিধি মেনে, নির্দেশমতো কাজ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় তারা।
এরপর প্রশ্ন উঠে আসে—পুলিশ কী করছে?
কারণ, স্বরূপনগর থানার এক্তিয়ারে প্রতিদিন বসে থাকছে শত শত ‘অনুপ্রবেশকারী’। তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করছেন যে তাঁরা বেআইনি ভাবে ভারতে এসেছেন। কিন্তু পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করছে না।
থানায় গিয়ে দেখা যায়, ওসি অরিন্দম হালদার নেই। ডিউটি অফিসারকে খুঁজে আনতে মহিলা কনস্টেবল সময় নেন। তারপর আসেন এক সাদা-পোশাকের কর্মকর্তা। তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। জানালেন—
প্রথম দু’দিন বিএসএফ অনুপ্রবেশকারীদের পুলিশে তুলে দিয়েছিল।
দু’দিনে সংখ্যা ছিল ৯৫ জন।
কিন্তু এত মানুষকে একসঙ্গে রাখার জন্য কোনও থানারই বিশেষ পরিকাঠামো থাকে না।
থানা আটকে গিয়েছিল স্থান-সংকটে।
উপরন্তু—
এত জনের খাওয়াদাওয়া, পরিচর্যা, নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে খরচও অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
ফলত, দুই দিনের মধ্যেই পুলিশ সেই দিক থেকে সরে আসে। এই অফিসারের ভাষায়—
“আমরা আপাতত ও দিকে তাকাচ্ছি না।”
পুলিশও আবার ‘উপরমহলের নির্দেশ’-এর কথা বলে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। যেন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এক অঘোষিত ‘চুপ থাকার’ বার্তা পৌঁছে গেছে।
থানার মতোই বসিরহাট আদালতও ‘স্থানের সংকটে’ পড়েছিল।
এমনকি বসিরহাট সংশোধনাগারও এত মানুষের হঠাৎ আগমনে চাপে পড়ে যায়।
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বা কক্ষ না থাকায় সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এই অবস্থায় পুলিশ অনুপ্রবেশকারীদের আটক করা বন্ধ করে দেয়।
যা পরিস্থিতিকে আরও ‘অব্যবস্থাপনার দিকে’ ঠেলে দেয়।
চেকপোস্টের চারপাশে লাগানো রয়েছে সিসি ক্যামেরার সারি।
সীমান্ত থেকে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার, ৩০০ মিটার—চারদিকে রয়েছেন অপেক্ষমান মানুষ।
আর নজর রাখছে বিএসএফ।
কারা খাবার দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে—সবই রেকর্ড হচ্ছে।
এই মানুষগুলোর খোলা আকাশের নিচে তিন-চার দিন বসে থাকতে হচ্ছে।
ক্ষুধার্ত শিশু, অসহায় বৃদ্ধদের জন্য স্থানীয় তৃণমূল যুব সভাপতি ইমরান গাজি ‘মানবিক উদ্যোগ’ নিয়েছিলেন—রাতে খিচুড়ি, দিনে জল বিলি। স্থানীয় ক্লাবের সাহায্যে সেই কাজ চলছিল।
কিন্তু কয়েক দিনের মাথায় তা বন্ধ করতে হয়।
কারণ?
বিএসএফ আপত্তি তোলে।
জিজ্ঞাসা করলে বিএসএফের যুক্তি—
“আমরা ক্যাম্পে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছি। বাইরে কেউ কী দিচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে দিচ্ছে—আমরা বুঝতে পারি না।”
চেকপোস্টের বাইরের বিশাল লাইনের দিকে ইঙ্গিত করে কর্মকর্তারা বলেন—
“এখান থেকে কলকাতা পর্যন্ত যদি লাইন বাড়ে, আমরা কি সকলের দায়িত্ব নিতে পারব?”
সত্যিই প্রশ্ন থাকে—
যদি বাইরের মানুষের দায়িত্ব বিএসএফ নিতে না পারে, তবে স্থানীয়দের সাহায্য করতেও বাধা কেন?
বিএসএফের যুক্তি স্পষ্ট—
“আমাদের সিসি ক্যামেরার সামনে অন্য কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে—এই দৃশ্য তৈরি হোক, আমরা চাই না।”
অর্থাৎ, মানবিক সহায়তা নয়; দায়বদ্ধতা, রেকর্ড, নিরাপত্তা—এসবই এখানে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থায় হাকিমপুর বাজারে কামরুল গাজির হোটেলের বিক্রি বেড়ে যায় হঠাৎই।
দুপুর সাড়ে ১২টায় তিনি সাইকেলের সামনে বড় ব্যাগ ঝুলিয়ে বিএসএফের গেট পার হয়ে চলে যান বাংলাদেশিদের ‘অস্থায়ী শিবিরে’।
তাঁর খাবারের দাম—
ডিমভাত ৪০ টাকা
মাছভাত ৫০ টাকা
মাংসভাত ৬০ টাকা
ছোট ছোট পলিথিন-প্যাকেটে ভাত-তরকারি।
পৃথক প্যাকেটে ডিম/মাছ/মাংস।
তিনি আধবসা হয়ে সাইকেল থেকেই বিক্রি চালান।
শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত প্রত্যেকে কাগজের থালা পেতে গোল হয়ে বসে খেতে থাকে।
কামরুলের নিজের কথায়—
“আমার হোটেলের খুব নাম। খেয়ে দেখুন। বাজারে গিয়ে বলবেন ‘কামরুলের হোটেল’—সবাই দেখিয়ে দেবে।”
হোটেলের কোনও আনুষ্ঠানিক নাম নেই।
যেমন নাম নেই এই অপেক্ষায় থাকা মানুষের শিবিরগুলোরও।
এই প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ ও পুলিশ কেউই প্রকাশ্যে কিছু বলছে না।
তবে যারা বসে আছে ফুটপাতে, মাঠে, রাস্তার ধারে—
তাঁরাই বলছেন—
“হ্যাঁ, আমরা অবৈধ।”
অদ্ভুত এক রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন অবস্থা।
তিন-চার দিন খোলা আকাশের নিচে বসে থাকা।
বৃষ্টি-রোদে ভিজে থাকা।
খাবারহীন, ওষুধহীন, নিরাপত্তাহীন অবস্থায় প্রতিদিন কাটানো।
অবশেষে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
রাতে খুলে দেওয়া হচ্ছে সীমান্তের কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট—
আরশিকারি
পদ্মবিলা
দহরকান্দা
হাকিমপুর
তারালি
আমুদিয়া
এই ছ’টি গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রতিরাতে চলছে ‘হস্তান্তর প্রক্রিয়া’।
একাধিক ‘ঘাট’ খোলা থাকায় পারাপারের সময় কম লাগে, ভিড় কম হয়,
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সিসিটিভিতেও বড় ভিড় ধরা পড়ে না।
সবকিছু যেন ‘নিরাপদ ও ভদ্রস্থ’ রাখার চেষ্টা। রাষ্ট্রহীন মানুষের শেষ প্রশ্ন — আমরা কোথায় ফিরব?
এই অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে কেউ শ্রমিক, কেউ গৃহবধূ, কারও ছোট ছোট শিশু, কারও অসুস্থ বৃদ্ধ মা।
সবাইয়ের লক্ষ্য একটাই—
“ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া।”
তাঁরা ‘বাংলাদেশি’—কিন্তু তার প্রমাণ দিতে পারেন না।
তাঁরা ‘ভারতীয়’—তা হতে পারেন না।
সুতরাং সীমান্তের ধুলোমাখা রাস্তাই তাঁদের সাময়িক ঠিকানা।
কেউ বলছেন—
“ওপার যাবে, ঠিক এইখানেই আমাদের থামিয়ে রেখেছে তিন দিন।”
কেউ বলছেন—
“ওরা ফিরিয়ে দেবে কি না—তা আমাদের জানা নেই।”
কারও মুখে আতঙ্ক, কারও মুখে নিরাশা, কারও চোখে অল্প আলো।
পুরো ঘটনাটি এক বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
যে প্রক্রিয়ার কথা প্রশাসন মুখে বলতে পারে না।
এবং মানবস্রোতের মাঝের মানুষগুলো সেই কথার কোনও সূত্রই জানে না।
তাঁরা শুধু জানে—
তাঁদের জীবন অনিশ্চিত।
পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ তাঁদের দৈনন্দিন বাস্তবতাকে ছিঁড়ে ফেলছে।
হাকিমপুরের সড়ক, মাঠ আর সীমান্তচৌকি—এখন পরিণত হয়েছে এক ‘রাষ্ট্রহীন মানুষের অপেক্ষার ঘরে’।
এখানে কেউ নেই তাঁদের অভিভাবক, কেউ নেই তাঁদের পাশে দাঁড়ায়।
প্রশাসনের চোখে তাঁরা সংখ্যা মাত্র—
কিন্তু তাঁদের জীবনে এই সময়টি এক নির্দয় পরীক্ষার মতো।
তাঁদের ক্ষুধা, কান্না, ক্ষোভ, ক্লান্তি সব মিলিয়ে এই মানবস্রোত দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার দোরগোড়ায়।
এমন এক দোরগোড়া যেখানে রাষ্ট্রের সীমারেখা স্পষ্ট,
কিন্তু মানুষের অস্তিত্ব ঝাপসা।
হাকিমপুরে তাই আজ দেখা যাচ্ছে এক বিরল চিত্র
মানুষ আছে, কিন্তু তাঁদের কোনও নাম নেই।
আছে জনসমুদ্র, নেই নাগরিকত্ব।
আছে অপেক্ষা, নেই পরিচয়।
এই রাষ্ট্রহীন-মানবস্রোতের গল্প নিছক একটি সীমান্তঘটনা নয়
এ এক সময়ের নির্মম দলিল।
যেখানে মানবিকতা, রাজনীতি, প্রশাসন সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে জট পাকিয়ে আছে।