পাইলস কেন হয়, কোন লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয় এবং চিকিৎসা কোন পথে এগোবে তা স্পষ্ট করে জানালেন চিকিৎসক প্রসেনজিৎ চৌধুরী। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ রইল এই প্রতিবেদনে।
অনেক মানুষের কাছেই সকাল শুরু হয় এক অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে শৌচালয়ে ঢুকলেও কাজ সেরে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কখনও আধঘণ্টা, কখনও তারও বেশি। ফলে অফিস বা কাজে বেরোতে দেরি হয়, মানসিক চাপ বাড়ে এবং দিন শুরুর আগেই এক ধরনের অস্বস্তি জমে ওঠে। প্রথমে বিষয়টি সাময়িক মনে হলেও, দীর্ঘদিন ধরে এ ভাবে চলতে থাকলে শরীরে তৈরি হতে পারে নানা জটিল সমস্যা। তার মধ্যেই অন্যতম হল পাইলস বা অর্শ।
আগে মনে করা হত, পাইলস মূলত বয়স্কদের রোগ। কিন্তু বর্তমান জীবনযাত্রায় সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, আজকাল কম বয়সিদের মধ্যেও পাইলসের সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, ফাস্ট ফুড নির্ভরতা, পর্যাপ্ত জল না খাওয়া এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অস্বস্তি। পাইলস সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে অনেকেই খোলাখুলি কথা বলতে চান না। সামাজিক লজ্জা বা অস্বস্তির কারণে বহু মানুষ শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে যান না। ফলস্বরূপ রোগ ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারণ করে। অথচ সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে এই সমস্যাকে সহজেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
চিকিৎসক প্রসেনজিৎ চৌধুরীর মতে, পাইলস বা অর্শ এমন একটি রোগ যা শুরুতে নিয়ন্ত্রণে রাখা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু অবহেলা করলে তা ভয়ানক যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি জানান, পাইলসের প্রধান লক্ষণ হল মলত্যাগের সঙ্গে বা পরে কাঁচা রক্তপাত। অনেক ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় তীব্র যন্ত্রণা হয়। কখনও কখনও মলদ্বারের কাছে ফোলা ভাব বা গাঁটের মতো অনুভূতিও হতে পারে।
পাইলস মূলত দু ধরনের হয়ে থাকে। একটি হল অভ্যন্তরীণ পাইলস এবং অন্যটি বাহ্যিক পাইলস। অভ্যন্তরীণ পাইলস সাধারণত ব্যথাহীন হলেও রক্তপাত হতে পারে। বাহ্যিক পাইলসের ক্ষেত্রে ব্যথা তীব্র হয় এবং বসতে বা হাঁটতে সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় দুটি সমস্যাই একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য পাইলসের অন্যতম প্রধান কারণ। মল শক্ত হয়ে গেলে মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়। এই চাপের ফলেই মলদ্বারের শিরাগুলি ফুলে ওঠে এবং ধীরে ধীরে পাইলসের সৃষ্টি হয়। নিয়মিত কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগলে পাইলস হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
শুধু কোষ্ঠকাঠিন্য নয়, দীর্ঘক্ষণ শৌচালয়ে বসে থাকার অভ্যাসও পাইলসের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেকেই মোবাইল ফোন নিয়ে শৌচালয়ে ঢোকেন এবং অজান্তেই দীর্ঘ সময় সেখানে কাটান। চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাস মলদ্বারের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে, যা পাইলসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পাইলসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পুষ্টিবিদদের মতে, খাওয়াদাওয়ায় সামান্য নিয়ন্ত্রণ আনলেই পাইলসের উপসর্গ অনেকটাই কমে যেতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফাইবার না থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত পাইলসের দিকে ঠেলে দেয়।
দ্রবণীয় ফাইবারে সমৃদ্ধ ফল এবং শাকসব্জি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর। এই ধরনের ফাইবার মলের পরিমাণ বাড়ায় এবং মলকে নরম রাখে। ফলে মলত্যাগ সহজ হয় এবং মলদ্বারের উপর চাপ কম পড়ে। নিয়মিত এই খাবারগুলি খেলে পাইলসের সমস্যা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিদদের মতে, রোজের খাবারে আলুবোখরা রাখা অত্যন্ত উপকারী। এতে প্রাকৃতিকভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ক্ষমতা রয়েছে। নাসপাতি এবং আপেলও ফাইবার সমৃদ্ধ ফল, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। বার্লি এবং মিষ্টি আলু নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
শুধু ফল এবং শাকসব্জি নয়, পর্যাপ্ত জল খাওয়াও অত্যন্ত জরুরি। দিনে অন্তত আট থেকে দশ গ্লাস জল না খেলে মল শক্ত হয়ে যায়। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ে এবং পাইলসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসকদের মতে, জল খাওয়ার অভ্যাস ঠিক করলেই অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ ছাড়াই উপসর্গের উন্নতি দেখা যায়।
জীবনযাত্রার পরিবর্তনও পাইলস নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম যেমন হাঁটা বা যোগাভ্যাস অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটা শরীরের জন্য উপকারী।
অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা ভাবেন, পাইলস মানেই অস্ত্রোপচার। কিন্তু চিকিৎসক প্রসেনজিৎ চৌধুরী স্পষ্ট করে জানান, সব ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। রোগের পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারিত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, জীবনযাত্রার সংশোধন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধেই ভালো ফল পাওয়া যায়।
তবে কিছু লক্ষণ একেবারেই অবহেলা করা উচিত নয়। নিয়মিত রক্তপাত হলে, তীব্র যন্ত্রণা থাকলে, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা অনুভব করলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। দীর্ঘদিন রক্তপাত চললে রক্তাল্পতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পাইলস কোনও লজ্জার রোগ নয়। এটি একটি সাধারণ শারীরিক সমস্যা, যার সমাধান সম্ভব। সময়মতো সঠিক পরামর্শ এবং জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনলেই এই যন্ত্রণাদায়ক রোগ থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া যায়।
আজকের ব্যস্ত জীবনে নিজের শরীরের কথা শোনা অনেক সময়ই পিছনের সারিতে চলে যায়। কিন্তু শরীরের ছোট ছোট সংকেত উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। পাইলস তেমনই একটি সমস্যা, যা শুরুতে ধরা পড়লে সহজেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নিয়মিত শৌচালয়ের সমস্যা, রক্তপাত বা মলত্যাগের সময় ব্যথা হলে তা কখনওই অবহেলা করা উচিত নয়। খাদ্যাভ্যাসে ফাইবার যুক্ত খাবার বাড়ানো, পর্যাপ্ত জল খাওয়া এবং সক্রিয় জীবনযাত্রা পাইলস থেকে মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় সহায়ক হতে পারে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়।
পাইলসের সমস্যা অনেক সময় আচমকা শুরু হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের অভ্যাস লুকিয়ে থাকে। অনিয়মিত জীবনযাত্রা এবং মানসিক চাপ অন্ত্রের স্বাভাবিক কাজকর্মকে ব্যাহত করে। মানসিক চাপ বাড়লে অনেকেরই হজমের সমস্যা দেখা দেয় এবং মলত্যাগের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। এই অবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য দীর্ঘস্থায়ী হলে পাইলসের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, সকালের সময় মলত্যাগের জন্য শরীরকে একটি নির্দিষ্ট অভ্যাসে আনতে পারলে অনেক সমস্যাই কমে যায়। প্রতিদিন একই সময়ে শৌচালয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে অন্ত্র ধীরে ধীরে সেই সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। তাড়াহুড়ো না করে শান্তভাবে মলত্যাগ করা শরীরের জন্য উপকারী।
অনেকে সকালে চা বা কফি না খেলে শৌচালয়ে যেতে পারেন না বলে মনে করেন। কিন্তু অতিরিক্ত চা বা কফি শরীরকে শুষ্ক করে দিতে পারে এবং উল্টো কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়াতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, সকালে উঠে এক গ্লাস কুসুম গরম জল অনেক বেশি উপকারী।
খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত তেল ঝাল এবং ভাজাভুজি পাইলসের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। এই ধরনের খাবার অন্ত্রকে উত্তেজিত করে এবং মলদ্বারের সংবেদনশীল অংশে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে। তাই যাঁদের পাইলসের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের এই খাবারগুলি সীমিত করা জরুরি।
দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার অনেকের ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়াতে পারে। তবে এটি ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়। তাই নিজের শরীর কোন খাবারে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়, তা লক্ষ্য করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে খাদ্যতালিকা তৈরি করা ভালো।
পাইলসের ক্ষেত্রে ওষুধের পাশাপাশি ঘরোয়া যত্নও গুরুত্বপূর্ণ। মলত্যাগের পর পরিষ্কার জল দিয়ে জায়গাটি ধুয়ে নেওয়া আরাম দেয়। অতিরিক্ত ঘষাঘষি না করে নরম কাপড় ব্যবহার করা ভালো। এতে সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে।
অনেকে পাইলসের ব্যথা সহ্য করে দিনের পর দিন কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যথা উপেক্ষা করলে তা মানসিক অবসাদ ডেকে আনতে পারে। ফলে ঘুমের সমস্যা এবং কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায়। চিকিৎসকদের মতে, ব্যথা এবং রক্তপাত কোনওটাই স্বাভাবিক নয় এবং এগুলি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মহিলাদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার সময়ও পাইলসের ঝুঁকি বাড়ে। এই সময় শরীরের হরমোনজনিত পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত চাপের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় খাদ্যাভ্যাস ও জল খাওয়ার বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া জরুরি।
বয়স্কদের ক্ষেত্রেও পাইলসের সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্ত্রের কার্যক্ষমতা কিছুটা কমে আসে। ফলে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়ামের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
সবশেষে বলা যায়, পাইলস এমন একটি সমস্যা যা নিয়ে ভয় বা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। শরীরের যত্ন নেওয়া মানেই নিজের ভবিষ্যতের যত্ন নেওয়া। সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে এই যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে।