Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

জাপানি পদ্ধতিতে দূর হবে মানসিক চাপ, মন থাকবে ফুরফুরে ও স্মৃতিশক্তি হবে আরও তীক্ষ্ণ

জাপানি পদ্ধতি শেইজ়াকু শিখলে কোনও শারীরিক ব্যায়াম ছাড়াই কমবে মানসিক চাপ, ব্যস্ততার মাঝেও মন থাকবে শান্ত ও স্থির।

জাপানি পদ্ধতি শেইজ়াকু: দুশ্চিন্তা দূর করে মন হবে শান্ত, চাঙ্গা হবে স্মৃতিশক্তি

দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগ আধুনিক জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় এসে ভিড় করে একগুচ্ছ চিন্তা—আজ অফিসে কী কাজ আছে, আর্থিক অবস্থা কেমন চলছে, স্বাস্থ্য ঠিক আছে তো, পরিবারের কেউ অসুস্থ নয় তো, সম্পর্কের জটিলতা মিটবে তো? দিনের পর দিন এই মানসিক চাপ জমতে জমতে কখন যে তা ক্লান্তি, হতাশা, অনিদ্রা, রাগ, উদ্বেগ বা স্মৃতিভ্রংশের দিকে ঠেলে দেয়, তা অনেক সময় টেরও পাওয়া যায় না।

মন অশান্ত থাকলে শরীরও ভালো থাকে না—এ কথা চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক সমস্যা এমনকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আমরা বেশির ভাগ সময়ই এই মানসিক অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিই না। ভাবি—“সবাই তো চাপের মধ্যেই আছে, আমিই বা আলাদা কী!”

কিন্তু এই চাপকে উপেক্ষা না করে যদি সহজ, ওষুধবিহীন, প্রাকৃতিক কোনও পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? ঠিক এমনই এক জাপানি কৌশল হল শেইজ়াকু (Seijaku)—যার অর্থ নিস্তব্ধতা, স্থিরতা বা অন্তরের শান্তি।

এই পদ্ধতিটি কোনও শারীরিক ব্যায়াম নয়, কোনও কঠিন যোগাসন নয়, আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যানেও বসে থাকতে হয় না। বরং এটি এমন এক মানসিক প্রশিক্ষণ, যা মানুষকে শেখায় কী ভাবে কোলাহলের মধ্যেও শান্ত থাকা যায়, কী ভাবে উদ্বেগের মাঝেও মনকে স্থির রাখা যায়।

এই প্রতিবেদনে জানব—

  • শেইজ়াকু আসলে কী

  • এর পেছনের দর্শন

  • কী ভাবে এই পদ্ধতি করতে হয়

  • মানসিক ও শারীরিক উপকারিতা কী

  • কারা এই পদ্ধতি করলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন

  • নিয়মিত অভ্যাসে জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে


শেইজ়াকু কী? জাপানি দর্শনে এর গুরুত্ব

জাপানি শব্দ ‘শেইজ়াকু’ (静寂 / Seijaku)-র আক্ষরিক অর্থ হল নিস্তব্ধতা, শান্তি বা গভীর স্থিরতা। তবে এটি কেবল বাইরের নীরবতার কথা বলে না, বরং বোঝায় মনের ভিতরের প্রশান্ত অবস্থা, যেখানে চারপাশে যত কোলাহলই থাকুক না কেন, ভিতরে কোনও অস্থিরতা থাকে না।

জাপানি সংস্কৃতিতে শেইজ়াকু শুধু একটি ধ্যানপদ্ধতি নয়, বরং এটি একটি জীবনদর্শন। চা-অনুষ্ঠান (Tea Ceremony), মার্শাল আর্ট, জেন বৌদ্ধ দর্শন, বাগান পরিকল্পনা—সব ক্ষেত্রেই এই নিস্তব্ধতা ও সংযমের ধারণা গভীর ভাবে জড়িত।

জাপানিরা বিশ্বাস করেন, মানুষের প্রকৃত শক্তি আসে স্থিরতা থেকে। মন যদি অস্থির হয়, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, স্মৃতি ধরে রাখা, সম্পর্ক সামলানো কিংবা সৃজনশীল চিন্তা করা—সব কিছুতেই সমস্যা দেখা দেয়। শেইজ়াকু সেই অস্থিরতাকে ধীরে ধীরে প্রশমিত করতে সাহায্য করে।


কেন আজকের জীবনে শেইজ়াকু বেশি প্রয়োজন?

বর্তমান সময়ের জীবনযাত্রা আমাদের মস্তিষ্ককে ক্রমাগত উত্তেজিত করে রাখে—

  • মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন

  • সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনা ও প্রতিযোগিতা

  • কাজের চাপ ও ডেডলাইন

  • আর্থিক উদ্বেগ

  • ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন

  • অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

এর ফল হিসেবে দেখা যায়—

  • ঘুমের সমস্যা

  • মনোযোগে ঘাটতি

  • সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা

  • স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া

  • বিরক্তি, রাগ ও হতাশা বেড়ে যাওয়া

  • অ্যাংজ়াইটি ও প্যানিক অ্যাটাক

অনেকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ওষুধের সাহায্য নেন, যা অনেক ক্ষেত্রে জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকেরা আজকাল জীবনযাত্রাভিত্তিক সমাধান—যেমন ধ্যান, মাইন্ডফুলনেস, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন ও মানসিক প্রশিক্ষণ—এই সব পদ্ধতির উপর জোর দিচ্ছেন।

এই প্রসঙ্গে শেইজ়াকু একটি সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।


শেইজ়াকু কী ভাবে কাজ করে?

শেইজ়াকু মূলত তিনটি বিষয়ের উপর কাজ করে—

শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ
মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা
বিচার না করে পর্যবেক্ষণ করা

এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করে স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে দেয়। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বলতে গেলে—

  • শেইজ়াকু করার সময় প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়, যা শরীরকে “রেস্ট অ্যান্ড রিল্যাক্স” অবস্থায় নিয়ে যায়।

  • কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন কমে যায়।

  • হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়।

  • মস্তিষ্কের আলফা ও থিটা ওয়েভ বৃদ্ধি পায়, যা গভীর শান্তি ও সৃজনশীল চিন্তার সঙ্গে যুক্ত।

এই সবের ফলেই মানুষ মানসিকভাবে হালকা বোধ করেন, চিন্তার চাপ কমে, মন পরিষ্কার হয়।


শেইজ়াকু করার পদ্ধতি: ধাপে ধাপে গাইড

শেইজ়াকু করার জন্য কোনও বিশেষ জায়গা, সরঞ্জাম বা সময়ের প্রয়োজন নেই। তবে নিয়মিত ও মন দিয়ে করলে এর সুফল অনেক বেশি পাওয়া যায়।

ধাপ ১: জায়গা ও ভঙ্গি নির্বাচন

  • ঘরের কোনও শান্ত জায়গায় বসুন, যেখানে ১০–১৫ মিনিট কেউ বিরক্ত করবে না।

  • চাইলে খোলা জায়গা, বারান্দা, বাগান বা পার্কেও বসতে পারেন।

  • মাটিতে ম্যাট বা চাদর পেতে বসুন।

  • জাপানি রীতি অনুযায়ী বজ্রাসনে বসা ভালো, তবে হাঁটুতে ব্যথা থাকলে সুখাসন বা চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেও চলবে।

ধাপ ২: দেহের অবস্থান

  • মেরুদণ্ড সোজা রাখুন।

  • কাঁধ শিথিল করুন।

  • হাত দু’টি হাঁটুর উপর রাখুন বা কোলে রাখুন।

  • চোখ বন্ধ করুন বা আধখোলা রাখুন।

ধাপ ৩: শ্বাস-প্রশ্বাসে মনোযোগ

  • নাক দিয়ে ধীরে গভীর শ্বাস নিন।

  • ২–৩ সেকেন্ড ধরে রাখুন।

  • মুখ বা নাক দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন।

  • শ্বাসের ওঠানামা লক্ষ্য করুন, জোর করবেন না।

ধাপ ৪: শব্দ ও চিন্তার সঙ্গে সম্পর্ক বদলান

  • আশপাশে কোনও শব্দ হলে তাকে আটকানোর চেষ্টা করবেন না।

  • বরং ভাবুন, শব্দগুলো আপনার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে—আপনি কেবল দর্শক।

  • কোনও চিন্তা এলে তা দমন না করে লক্ষ্য করুন, তারপর আবার শ্বাসে মন ফেরান।

ধাপ ৫: কল্পনায় শান্ত দৃশ্য আনুন (ঐচ্ছিক)

  • চাইলে নিজেকে কল্পনা করুন পাহাড়, বন, নদী, সমুদ্র বা শান্ত কোনও জায়গায় বসে আছেন।

  • প্রকৃতির শব্দ কল্পনায় আনুন—পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ, জলের ঢেউ।

সময়সীমা


শেইজ়াকু করার উপকারিতা

নিয়মিত শেইজ়াকু অভ্যাস করলে মানসিক ও শারীরিক দুই ক্ষেত্রেই বহু উপকার পাওয়া যায়।

১. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায়

শেইজ়াকু স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে, ফলে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও উদ্বেগের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসে। যাঁরা অ্যাংজ়াইটি ডিসঅর্ডার বা প্যানিক অ্যাটাকে ভোগেন, তাঁদের জন্য এটি বিশেষ উপকারী।

২. ঘুমের মান উন্নত করে

ঘুমের আগে শেইজ়াকু করলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে রিল্যাক্সড মোডে চলে যায়। অনিদ্রা, বারবার ঘুম ভাঙা, দুঃস্বপ্ন—এই সমস্যাগুলি অনেকাংশে কমে।

৩. স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়

মন শান্ত থাকলে মস্তিষ্ক তথ্য গ্রহণ ও সংরক্ষণ করতে পারে বেশি কার্যকরভাবে। ফলে পড়াশোনা, কাজের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে।

৪. রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে রাখে

স্ট্রেস কমার ফলে হাই ব্লাড প্রেসার ও হার্ট রেট স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

৫. রাগ ও বিরক্তি কমায়

নিয়মিত শেইজ়াকু করলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ে। ছোটখাটো বিষয়েও অতিরিক্ত রাগ বা বিরক্তি হওয়া কমে যায়।

৬. আত্মসচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়ায়

শেইজ়াকু মানুষকে নিজের চিন্তা, আবেগ ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। ফলে জীবনের নানা পরিস্থিতিতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

৭. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করে

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করে। শেইজ়াকু স্ট্রেস কমিয়ে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।


কারা শেইজ়াকু করলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন?

শেইজ়াকু প্রায় সকলের জন্যই উপকারী, তবে বিশেষ করে—

  • যাঁরা অ্যাংজ়াইটি, প্যানিক অ্যাটাক বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভোগেন

  • যাঁদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে

  • যাঁরা কাজের চাপ বা মানসিক ক্লান্তিতে ভুগছেন

  • যাঁদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে

  • পরীক্ষার্থী, কর্মরত পেশাজীবী, গৃহিণী, প্রবীণ নাগরিক—সবাই এই পদ্ধতি থেকে উপকার পেতে পারেন


শেইজ়াকু বনাম ধ্যান ও মাইন্ডফুলনেস

অনেকে প্রশ্ন করেন—শেইজ়াকু কি ধ্যানের মতোই? হ্যাঁ, কিছুটা মিল থাকলেও পার্থক্য রয়েছে।

বিষয়

শেইজ়াকু

ধ্যান (Meditation)

মাইন্ডফুলনেস

মূল লক্ষ্য

অন্তরের নিস্তব্ধতা

চেতনার বিকাশ

বর্তমান মুহূর্তে সচেতন থাকা

সময়সীমা

৫–১৫ মিনিট

১৫–৩০ মিনিট বা বেশি

যে কোনও সময়

পদ্ধতি

শ্বাস ও নীরবতায় মনোযোগ

মন্ত্র, শ্বাস, দৃশ্য কল্পনা

দৈনন্দিন কাজেও সচেতনতা

জটিলতা

খুব সহজ

মাঝারি থেকে জটিল

সহজ

শেইজ়াকুর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল—এটি দ্রুত শেখা যায়, বিশেষ প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হয় না, আর ব্যস্ত জীবনেও সহজে মানিয়ে নেওয়া যায়।


দৈনন্দিন জীবনে শেইজ়াকু প্রয়োগের সহজ উপায়

শুধু বসে ধ্যান নয়, দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও শেইজ়াকুর দর্শন প্রয়োগ করা যায়—

হাঁটার সময় ধীরে পা ফেলুন, শ্বাসে মন দিন

চা বা কফি খাওয়ার সময় শুধু তার স্বাদ ও গন্ধে মন দিন

ঘরের কাজ করার সময় মন অন্য দিকে না ঘুরিয়ে কাজেই মনোযোগ দিন

দিনে কিছু সময় ফোন ও স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন

প্রকৃতির মাঝে সময় কাটান

এই ছোট অভ্যাসগুলিও শেইজ়াকুর মতোই মনের নিস্তব্ধতা বাড়াতে সাহায্য করে।


শেইজ়াকু করার সময় কিছু সতর্কতা

  • খুব বেশি মানসিক অসুস্থতা (যেমন সিজোফ্রেনিয়া, গুরুতর ডিপ্রেশন) থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একা এই ধরনের অনুশীলন না করাই ভালো।

  • প্রথম দিকে মন খুব বেশি অস্থির লাগতে পারে—এটি স্বাভাবিক, ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাবে।

  • জোর করে দীর্ঘ সময় বসে থাকার দরকার নেই, শরীর ব্যথা হলে ভঙ্গি বদলাতে পারেন।


নিয়মিত শেইজ়াকু করলে জীবনে কী পরিবর্তন আসে?

যাঁরা নিয়মিত ২–৩ সপ্তাহ শেইজ়াকু অভ্যাস করেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে—

  • মনের অস্থিরতা কমে

  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে

  • আত্মবিশ্বাস বাড়ে

  • সম্পর্কের টানাপোড়েন কমে

  • ঘুম গভীর হয়

  • কাজে মন বসে

  • সামগ্রিকভাবে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হয়

অনেকেই বলেন, “আগে যেসব বিষয় আমাকে খুব বিরক্ত করত, এখন সেগুলো সহজে সামলাতে পারি।”

Preview image