বিজেপি নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, রাজ্যে সরকার গঠন হলে ৪৫ দিনের মধ্যেই সরকারি কর্মীদের জন্য কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) এবং সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা হবে।
রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) কবে মিলবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে জল্পনা, আন্দোলন এবং রাজনৈতিক চাপানউতোর। নতুন সরকার গঠনের পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। সোমবার রাজ্যের নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগামী সোমবার ফের মন্ত্রিসভার বৈঠক হবে এবং সেই বৈঠকেই ডিএ, বেতন কমিশন, এরিয়ার-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। ফলে রাজ্য সরকারি কর্মচারী মহলে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
সোমবার নবান্নে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু বলেন, “আরও একটি বৈঠক করব। আরজি কর-সহ নারী নির্যাতনের বিষয়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিষয়, বেতন কমিশন, এরিয়ার, ডিএর বিষয় যে রয়েছে, পরবর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠকে তা আলোচনা করব।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে চর্চা শুরু হয়েছে। কারণ, নির্বাচনী প্রচারের সময় বিজেপি বারবার দাবি করেছিল যে তারা ক্ষমতায় এলে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ডিএ সমস্যা দ্রুত সমাধান করবে।
তবে সোমবারের বৈঠকে কেন ডিএ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হল না, সেই প্রশ্নও উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এর উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, সরকার গঠনের পর এটিই ছিল প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাজের দিন। ফলে সব নথিপত্র ও প্রস্তাব এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। তিনি বলেন, “সরকারি কাজকর্ম দেখার খুব বেশি সময় আমরা পাইনি। সরকার গঠন হওয়ার পরে সোমবার প্রথম কাজের দিন। যে কাগজপত্র প্রস্তুত ছিল, তার উপরে মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্তগুলি নিয়েছে।” অর্থাৎ, নতুন সরকার প্রথমে প্রশাসনিক কাঠামো গুছিয়ে নিয়ে ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির দিকে এগোতে চাইছে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে।
প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে অবশ্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে, বিএসএফ-কে কাঁটাতারের জন্য জমি দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং বহু আলোচিত আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হলেও সবচেয়ে বেশি নজর ছিল সরকারি কর্মচারীদের ডিএ ইস্যুর উপরেই।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনী প্রচারের সময় বিজেপি রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দলীয় নেতৃত্ব জানিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতা কার্যকর করা হবে এবং সপ্তম বেতন কমিশন চালু করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের ডিএ-র পার্থক্য নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা যেখানে নিয়মিত হারে ডিএ পাচ্ছেন, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীরা অনেক কম হারে ডিএ পেয়ে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে বহুবার। সেই অসন্তোষই ক্রমশ আন্দোলনের রূপ নেয়।
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, মূল্যবৃদ্ধির বাজারে বর্তমান ডিএ কাঠামোতে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ বেড়ে যাওয়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি— সব মিলিয়ে কর্মচারীদের উপর আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছিল। ফলে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ-র দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলেছে।
এই আন্দোলনের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। ২০১৮ সালে বহু আবেদন-নিবেদনের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য ১৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় তাঁর একটি মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। আন্দোলনরত কর্মচারীদের উদ্দেশে করা তাঁর “মিউ মিউ-ঘেউ ঘেউ” মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় তোলে। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে যে এই মন্তব্য সরকারি কর্মচারীদের প্রতি অসম্মানজনক। এমনকি কলকাতা হাইকোর্টও সেই মন্তব্যকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে আখ্যা দেয়।
তারপর থেকেই ডিএ আন্দোলন আরও তীব্র হতে শুরু করে। বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মচারী সংগঠন, শিক্ষক সংগঠন এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের সংগঠন একাধিকবার পথে নেমে বিক্ষোভ দেখায়। ধর্মঘট, মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি— সব মিলিয়ে ডিএ ইস্যু রাজ্যের অন্যতম বড় প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।
বিশেষ করে শিক্ষক সংগঠনগুলির আন্দোলন ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অভিযোগ ছিল, সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় হারের তুলনায় অনেক কম ডিএ পেয়েছেন বলে দাবি করেন। শিক্ষামহলের একাংশের মতে, এতে শিক্ষক সমাজের মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
সে সময় বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী আন্দোলনরত সরকারি কর্মচারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন সভা এবং কর্মসূচিতে দাবি করেছিলেন যে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এমনকি আন্দোলনরত কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনে দফতরে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন আরও জোরদার করতে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের একাংশের কাছে শুভেন্দু তখন ডিএ আন্দোলনের অন্যতম রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।
ডিএ নিয়ে আইনি লড়াইও দীর্ঘদিন ধরে চলছে। বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন আদালতের দ্বারস্থ হয়। কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক মামলা হয় এবং পরে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। যদিও সুপ্রিম কোর্ট এখনও সরাসরি বকেয়া ডিএ অবিলম্বে মেটানোর চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়নি, তবুও মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে শুনানি হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ঘিরেও রাজনৈতিক চাপানউতোর কম হয়নি।
শিক্ষামহলের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদের ‘গ্রান্ট ইন এড’ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আগের সরকার গড়িমসি করেছিল। অনেক শিক্ষক দাবি করেন, অন্য সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ ডিএ পেলেও তাঁরা সেই সুবিধা পাননি। এমনকি সাম্প্রতিক বাজেটে ঘোষিত অতিরিক্ত ৪ শতাংশ মহার্ঘ ভাতাও অনেক শিক্ষক ও কর্মচারীর ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এখন নতুন সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারী এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। অনেকের মতে, বিজেপি নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণ করা এখন তাদের কাছে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই ইস্যুতে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা অত্যন্ত বেশি।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় হারে ডিএ কার্যকর করতে গেলে রাজ্য সরকারের উপর বড় আর্থিক চাপ পড়তে পারে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি সপ্তম বেতন কমিশন চালু করলেও রাজ্যের কোষাগারের উপর চাপ আরও বাড়বে। ফলে সরকার কীভাবে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রেখে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, নতুন সরকার এই ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিতেই পারে। কারণ সরকারি কর্মচারী এবং শিক্ষক সমাজের একটি বড় অংশ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে তাঁদের দাবি পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ রাজনৈতিকভাবেও রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে সরকার ডিএ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছে না। বরং আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় আসতে চলেছে। ফলে আগামী সোমবারের বৈঠকের দিকে এখন নজর রাজ্যের লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারীর।
সরকারি কর্মচারীদের অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘ আন্দোলন, আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হয়তো এবার সমস্যার বাস্তব সমাধানের পথে এগোনো সম্ভব হবে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলিও বিষয়টির উপর কড়া নজর রাখছে। তাদের দাবি, শুধুমাত্র আশ্বাস নয়, বাস্তবে কত দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বকেয়া ডিএ ইস্যু এখন নতুন সরকারের সামনে অন্যতম বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে সরকারের পদক্ষেপই ঠিক করবে, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ কতটা কমানো সম্ভব হবে। এখন সকলের নজর আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিকে, যেখানে ডিএ এবং সপ্তম বেতন কমিশন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলেই আশা করছেন সরকারি কর্মচারীরা।এদিকে সরকারি কর্মচারীদের সংগঠনগুলিও আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিকে বিশেষ নজর রাখছে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন, বিক্ষোভ এবং আইনি লড়াই চালানোর পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক বেশি। কর্মচারীদের একাংশ মনে করছেন, যদি দ্রুত ডিএ এবং সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা হয়, তাহলে প্রশাসনের কর্মীদের মনোবলও বাড়বে। পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও বকেয়া মহার্ঘ ভাতা নিয়ে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ইস্যুতে সরকারের সিদ্ধান্ত আগামী দিনে রাজ্যের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।