Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সাদা চায়ের চমক ৩০ হাজারে বিক্রি মহিলাদের হাতে তৈরি চায়ে মাতোয়ারা কলকাতা

উত্তরবঙ্গের মহিলাদের হাতে তৈরি বিশেষ হোয়াইট টি কলকাতায় বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। স্বাদ ও গুণমানে অনন্য এই হ্যান্ডমেড চা কেজি প্রতি ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

কলকাতার বুকে উত্তরবঙ্গের মহিলাদের হাতে তৈরি চায়ের এমন অভূতপূর্ব সাফল্য কার্যত নতুন দিগন্ত খুলে দিল হ্যান্ড মেড টি শিল্পের জন্য। পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মহিলাদের পরিশ্রম, দক্ষতা এবং ধৈর্যের ফসল যে আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে, তা এবার কার্যত প্রমাণিত হল কলকাতার সল্টলেকে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনীতে। সেখানে কেজি প্রতি ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হল বিরল ও উৎকৃষ্ট মানের হোয়াইট টি। শুধু তাই নয়, দু’হাজার টাকা কেজি দামে অর্থোডক্স ব্ল্যাক টি, গ্রিন টি এবং ওলং টির বিক্রিও ছিল চোখে পড়ার মতো।

এই প্রথমবার কলকাতার মতো বড় শহরের বাজারে নিজেদের হাতে তৈরি চা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের মহিলারা। এতদিন চা মানেই বড় বড় বাগান, কর্পোরেট সংস্থা কিংবা পরিচিত ব্র্যান্ড—এই ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের। কিন্তু সেই ধারণাকে ভেঙে নতুন গল্প লিখলেন গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা, যাঁদের হাতে তৈরি চা আজ জায়গা করে নিচ্ছে প্রিমিয়াম ও স্পেশালিটি টি মার্কেটে।

সল্টলেকে ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই বিশেষ প্রদর্শনীতে অংশ নেয় দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলার একাধিক স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও ফার্মার্স প্রডিউসার কোম্পানি। প্রদর্শনীর শুরু থেকেই ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। চা-প্রেমী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক এবং অনলাইন মার্কেটিং সংস্থার প্রতিনিধিরাও ভিড় করেন এই স্টলে। হাতে তৈরি চায়ের স্বাদ, গন্ধ এবং প্রস্তুত প্রণালীর গল্প শুনে অনেকেই মুগ্ধ হন।

প্রদর্শনী চলাকালীন কাউন্টার থেকেই বিক্রি হয়েছে ৫০ কেজির বেশি চা। শুধু তাই নয়, প্রদর্শনী শেষ হওয়ার আগেই আরও প্রায় ৫০ কেজি চায়ের বরাত পাওয়া গেছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। এই সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই আপ্লুত উত্তরবঙ্গের মহিলারা, যাঁরা এতদিন নিজেদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য না পেয়ে কিছুটা হলেও হতাশ হয়ে পড়ছিলেন।

ময়নাগুড়ির জামতলা প্রোগ্রেসিভ ফার্মার্স প্রডিউসার অর্গানাইজেশনের সদস্যা দীপ্তি রায় জানান, তাঁরা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই হ্যান্ড মেড টি তৈরি করে আসছেন। কিন্তু উপযুক্ত বাজার ও বিপণন প্ল্যাটফর্মের অভাবে সেই চা সীমিত পরিসরেই বিক্রি হত। অনেক সময় উৎপাদন খরচ উঠিয়ে আনাও কঠিন হয়ে পড়ত। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছিল। কলকাতার এই প্রদর্শনী তাঁদের কাছে এক নতুন আশা এনে দিয়েছে। দীপ্তি রায়ের কথায়, তাঁরা যে পরিমাণ চা নিয়ে এসেছিলেন, সবটাই বিক্রি হয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য, ২ হাজার টাকা কেজি থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা কেজি পর্যন্ত দামে চা বিক্রি করতে পেরেছেন তাঁরা। এই সাফল্য তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।

কলকাতায় উত্তরের মহিলাদের হাতে তৈরি চায়ের এই বিপুল কদর দেখে খুশি জলপাইগুড়ি জেলা ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তীও। তাঁর মতে, হ্যান্ড মেড চায়ের আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ চাহিদা রয়েছে। ইউরোপ, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে এই ধরনের চায়ের দাম অনেক বেশি। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্স মিলিয়ে প্রায় ১৬টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলা বর্তমানে হ্যান্ড মেড টি তৈরি করছেন। কিন্তু এতদিন তাঁদের সামনে বিক্রির জন্য বড় কোনও প্ল্যাটফর্ম ছিল না।

এই সমস্যার কথা মাথায় রেখেই সল্টলেকে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। শুধু বিক্রির সুযোগ নয়, বিপণনের সুবিধার্থে ‘তিস্তা’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে চায়ের প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এর ফলে ক্রেতাদের কাছে পণ্যটি আরও বিশ্বাসযোগ্য ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিজয়গোপাল চক্রবর্তীর দাবি, আগামী দিনে এই মহিলারা যাতে আরও বড় বাজার পান, সেই দিকেই নজর রাখা হবে। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে টি বোর্ডের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।

বিজয়গোপাল আরও জানান, টি বোর্ড ইতিমধ্যেই উত্তরের মহিলাদের হাতে তৈরি চা অনলাইনে বিক্রির জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম তৈরির ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও উত্তরবঙ্গের হ্যান্ড মেড চা পৌঁছে যাবে। এতে একদিকে যেমন মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা বাড়বে, অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।

কোচবিহারের দ্বারিকামারি ফার্মার্স প্রডিউসার কোম্পানির সদস্য রতন রায় প্রামাণিক জানান, কলকাতার মতো বড় শহরে হ্যান্ড মেড টি যে এতটা সমাদৃত হবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। এই সাফল্যের পর তাঁরা এখন আরও বেশি করে হ্যান্ড মেড চা উৎপাদনের পরিকল্পনা করছেন। উন্নত মান বজায় রেখে কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, সেই দিকেই তাঁদের জোর।

news image
আরও খবর

জলপাইগুড়ির রুকরুকা স্মল টি ফার্মার্স প্রডিউসার অর্গানাইজেশনের সভাপতি দেবাশিস রায় বলেন, তাঁদের জেলা থেকে পাঁচটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর তৈরি হ্যান্ড মেড টি নিয়ে এই প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, একটি প্যাকেট চাও ফেরত আসেনি। এই সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সঠিক বাজার ও বিপণন ব্যবস্থা পেলে গ্রামের মহিলারাও নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।

দেবাশিস রায়ের মতে, বিক্রির বাজার তৈরি হলে আরও অনেক মহিলা হ্যান্ড মেড টি তৈরিতে আগ্রহী হবেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং চা শিল্পে কর্পোরেট নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমবে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গের চায়ের পরিচিতি নতুন মাত্রা পাবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, কলকাতার এই প্রদর্শনী শুধু একটি বাণিজ্যিক সাফল্য নয়, বরং উত্তরবঙ্গের মহিলাদের আত্মনির্ভরতার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ৩০ হাজার টাকা কেজি দরে হোয়াইট টি বিক্রির ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে, গুণমান ও পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পেলে গ্রামবাংলার মেয়েরাও আন্তর্জাতিক মানের উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারেন। আগামী দিনে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে উত্তরবঙ্গের হ্যান্ড মেড চা দেশের অন্যতম গর্বে পরিণত হতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

এই সাফল্যের প্রভাব যে শুধু ওই কয়েকটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা এখনই স্পষ্ট। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব মহিলা এতদিন চা শিল্পের মূল স্রোত থেকে দূরে ছিলেন, তাঁরাও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। বহু পরিবারে এই সাফল্য নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। আগে যেখানে চা পাতা সংগ্রহ বা সহায়ক শ্রমিক হিসেবেই মহিলাদের ভূমিকা সীমিত ছিল, এখন সেখানে তাঁরাই হয়ে উঠছেন উদ্যোক্তা, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং ব্র্যান্ডের মুখ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্যান্ড মেড চায়ের বাজার মূলত গুণমান, স্বতন্ত্র স্বাদ এবং সীমিত উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের জলবায়ু এবং মাটির গুণাগুণ এই ধরনের চা তৈরির জন্য আদর্শ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহিলাদের দক্ষ হাতের ছোঁয়া, ধৈর্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত অভিজ্ঞতা। এই সবকিছুর সমন্বয়েই তৈরি হচ্ছে এমন এক পণ্য, যা আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।

কলকাতার প্রদর্শনীতে যে সাড়া মিলেছে, তা ভবিষ্যতের জন্য এক শক্ত ভিত তৈরি করে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক বিপণন কৌশল। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশের ক্রেতারাও সহজেই এই চা কিনতে পারবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে এবং উৎপাদক মহিলারাই পাবেন লাভের বড় অংশ।

সরকারি স্তরে সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহযোগিতা আরও বাড়লে এই উদ্যোগ বহুগুণে বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মহিলারা যদি এই শিল্পে যুক্ত হন, তাহলে কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র বদলে যেতে পারে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পে একটি নতুন পরিচয় তৈরি হবে—যেখানে কর্পোরেট বাগানের পাশাপাশি গ্রামীণ মহিলাদের হাতে তৈরি প্রিমিয়াম চাও সমান গুরুত্ব পাবে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই সাফল্য উত্তরবঙ্গের সমাজে এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। আত্মবিশ্বাস, স্বনির্ভরতা এবং নিজেদের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস—এই তিনটি বিষয়ই আজ গ্রামবাংলার মেয়েদের এগিয়ে চলার মূল শক্তি হয়ে উঠছে। কলকাতার প্রদর্শনী সেই পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মাত্র। আগামী দিনে এই উদ্যোগ আরও বড় আকার নিলে, উত্তরবঙ্গের হ্যান্ড মেড চা শুধু দেশের গর্ব নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ভারতের এক স্বতন্ত্র পরিচয় হয়ে উঠতে পারে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল এবং চা শিল্পের বিশেষজ্ঞরা।

Preview image