ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ, যা ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ৪০% আমদানি প্রভাবিত করছে।
দিন চারেক আগে মার্কিন প্রশাসন বিশ্ব তেলের বাজারকে স্থিতিশীল রাখার জন্য রাশিয়ার তেল সম্পর্কিত নীতি কিছুটা নমনীয় করার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছিল, ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে ৩০ দিনের ‘ছাড়’ দেওয়া হয়েছে। খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর মার্কিন ভেতরে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার তেলের বাজার বন্ধ রাখার উদ্যোগকে নস্যাৎ করার মতো এই পদক্ষেপ বিতর্কের জন্ম দেয়।
তবে মার্কিন প্রশাসন পরিষ্কার জানিয়েছে, কেন তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংবাদসংস্থা এপির বরাতে জানা যায়, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতকে এই ‘ছাড়’ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেছেন, “রাশিয়ার তৈলজাহাজগুলো চিহ্নিত করা যাবে। তবে এজন্য অন্তত ছ’সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। তার পরিবর্তে যদি সেই তেল ভারতের তৈলশোধনাগারে পৌঁছে যায়, তবে তেলের ঘাটতি কমবে। এর ফলে তেলের দাম বাড়ার চাপও কিছুটা কমবে।”
ইরান আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু করার পর পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী সরু হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতি দিন বিশ্বের মোট রফতানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৪০ শতাংশ আসে এই পথ দিয়ে।
ইরানের অবরোধের কারণে ভারতের তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে ৩০ দিনের জন্য ‘ছাড়’ দেয়। তবে শর্ত একটিই: ছাড় কেবল সমুদ্রপথে আটকে থাকা তেলের ট্যাঙ্কার বা জাহাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
ক্রিস রাইট আরও বলেন, “ভারতের তৈলশোধনাগারে এই তেল পাঠানো হলে তেলের ঘাটতি কমবে। দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।” মার্কিন প্রশাসন এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা এবং ভারতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখার দিক থেকে যৌক্তিক হিসেবে দেখছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক মাধ্যমে একটি নতুন বিবৃতি দেন। তিনি লিখেছেন, “ইরান প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা যদি সাহস করে হামলা করে, আমরা এমন প্রতিক্রিয়া দেখাব যা আগে কখনও দেখা যায়নি।”
ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় হত্যা করা হয়েছে বলে রবিবার তেহরান নিশ্চিত করেছে।
তেহরানের রাস্তায় হাজারো মানুষ কান্না করেছে। মহিলারা খামেনেইয়ের ছবি হাতে রাস্তায় নেমেছেন। তেহরান জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট এবং তিন সদস্যের কাউন্সিল আপাতত দেশের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেছে।
শনিবার সকাল থেকে ইজরায়েল আক্রমণ শুরু করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, হামলার লক্ষ্য খামেনেই ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ছিলেন। মার্কিন বাহিনীও এই হামলায় ইজরায়েলকে সমর্থন করেছে।
ইজরায়েলি ও মার্কিন যৌথ আক্রমণে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তেহরানসহ বড় শহরে আছড়ে পড়ে। ইরানও প্রত্যাঘাত করছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে।
ভারতের জন্য হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়া মানে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে এই পথ দিয়ে। এই পরিস্থিতি বাজারে দামের ওঠানামা এবং জ্বালানি ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে আমেরিকার ‘ছাড়’ ভারতকে এই অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে শর্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র ইতিমধ্যেই সমুদ্রপথে আটকে থাকা তেলের ট্যাঙ্কার বা জাহাজের ক্ষেত্রে এই ছাড় প্রযোজ্য।
বিশ্ব জুড়ে মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার তেল বাজার বন্ধ রাখার উদ্যোগকে আবার ছাড় দেওয়া হয়েছে—এটি কিছু দেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের কাছে বিতর্কিত মনে হচ্ছে।
তবে মার্কিন প্রশাসন বলছে, এটি বাজার স্থিতিশীল রাখার পদক্ষেপ এবং ভারতের তেলের জোগান নিশ্চিত করার একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রাখছে। তেলের ক্ষেত্রে রাশিয়ার উপর নির্ভরতা আছে।
এই প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের ৩০ দিনের ‘ছাড়’ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোর একটি। বিশ্বের মোট রফতানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়।
ইরানের সাম্প্রতিক অবরোধ এবং সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ভারতের মতো দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে।
ভারত সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। দেশের রিফাইনারি এবং সঞ্চয় ভাণ্ডার ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাশিয়ার তেল আমদানি ৩০ দিনের ছাড় পাওয়ায় এই প্রস্তুতি আরও কার্যকর হবে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোর একটি। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যে এই সরু নৌপথে দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট রফতানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এই প্রণালী শুধুমাত্র তেলের জন্যই নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস, LPG এবং বিভিন্ন জ্বালানির সরবরাহের জন্যও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মতো জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালী একটি “লাইফলাইন” হিসেবে বিবেচিত।
হরমুজ প্রণালী প্রায় ৩৯ কিলোমিটার চওড়া এবং এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এই নৌপথের মাধ্যমে বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো—সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক—তাদের তেল রপ্তানি করে।
এই প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব অতি উচ্চ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সবসময় এই অঞ্চলের উপর নজর রাখে, কারণ এখানে কোনো স্থবিরতা বা সংঘাত পুরো বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। তেল এবং গ্যাসের আন্তর্জাতিক দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পেতে পারে, এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিতে পারে।
সম্প্রতি ইরান আমেরিকা এবং ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ইরান ঘোষণা করেছে যে তারা “প্রত্যাঘাত” করবে যদি কোন বাহিনী তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরান-ইজরায়েল-আমেরিকা সংঘাতের কারণে প্রণালীর দুই পাশে অসংখ্য তেলবাহী জাহাজ এবং ট্যাঙ্কার আটকে আছে। এই ঘাটতি ভারতের মতো তেল আমদানির উপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করেছে। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে।
তেলের দাম বৃদ্ধি: হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যায়। ফলে প্রতি ব্যারেলের দাম বৃদ্ধি পায়।
ভারতের অর্থনৈতিক চাপ: ভারতীয় রিফাইনারি ও শিল্পে তেলের ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
বিনিয়োগ ও রিজার্ভ: প্রণালীর অনিশ্চয়তা ভারতের রিজার্ভ এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা: বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি ও দামের ওঠানামা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
ভারত বিশ্বের তেলের বৃহত্তম আমদানি দেশগুলোর মধ্যে একটি। দেশের শিল্প, পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য ক্ষেত্র প্রায় সম্পূর্ণভাবে তেলের উপর নির্ভরশীল।
মোট অপরিশোধিত তেলের আমদানি: ২৪ কোটি টন (প্রায়)
হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা তেলের পরিমাণ: প্রায় ৪০%
প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি: ৪০%
এই নির্ভরশীলতার কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে ভারতকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়। তবে বিকল্প সরবরাহে আরও সময় এবং ব্যয় লাগায় ভারতের বাজারে দামের চাপ বাড়ে।
মার্কিন প্রশাসন ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে ৩০ দিনের জন্য ‘ছাড়’ দিয়েছে। ক্রিস রাইট জানান, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের তেলের ঘাটতি কিছুটা কমানো সম্ভব।
এই ছাড় কেবল সমুদ্রপথে আটকে থাকা তেলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকা তেল সরাসরি ভারতের রিফাইনারিতে পাঠানো যেতে পারে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে:
ভারতের তেলের ঘাটতি কমানো যায়
তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব
আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা আনা যায়
ভারত সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ভারতীয় রিফাইনারি বর্তমানে তেলের যোগান নিশ্চিত করতে সঞ্চয় ভাণ্ডার ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা যেমন ONGC, IOCL এবং HPCL প্রয়োজনমতো তেল মজুদ করছে। এই স্টক মার্কেটের অস্থিরতা এবং প্রণালী বন্ধের সময় কার্যকর হবে।
ভারত অন্যান্য দেশ থেকে তেল আমদানির চুক্তি বাড়াচ্ছে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হচ্ছে। এছাড়া আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকেও তেল ও গ্যাস সরবরাহের বিকল্প খুঁজছে ভারত।
সরকার জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি উৎস (সোলার, উইন্ড, বায়োগ্যাস) ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বিকল্প উৎস খুঁজছে।
ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও অবরোধের সমাধান চাচ্ছে। অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
ইরানের হুমকি, হরমুজ প্রণালী বন্ধ এবং মার্কিন ছাড়—এই সমস্ত ঘটনা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
দামের ওঠানামা: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায়ই এই ধরনের পরিস্থিতিতে তীব্র ওঠানামা করে।
সামরিক নিরাপত্তা: প্রণালী নিরাপদ না থাকলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বিপদ তৈরি হয়।
বিনিয়োগ ও বাণিজ্য: অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগের উপর প্রভাব ফেলে।